Wednesday, June 22, 2022

74>শহর দেরাদুন;; ও হরিদ্বার || ---

 74>|| শহর দেরাদুন;;---ও++হরিদ্বার ||

দেরাদুন (হিন্দি ভাষায় देहरादून) ভারতের উত্তরভাগে অবস্থিত উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রাজধানী শহর। 

স্থানাঙ্ক: ৩০.৩১৮° উত্তর ৭৮.০২৯° পূর্ব

দেরাদুন শহরটি একটি পাহাড়ি অবকাশযাপন কেন্দ্র। ভারতের সড়ক ও রেলব্যবস্থাগুলির সবচেয়ে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত শহরগুলির একটি হল দেরাদুন। চা প্রক্রিয়াজাতকরণ এ শহরের প্রধান শিল্প। এছাড়া বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সামরিক অস্ত্রশস্ত্রও প্রস্তুতের কারখানাও এখানে রয়েছে। দেরাদুনে ভারতীয় জরিপ সংস্থা ও বন বিভাগের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। এছাড়া এখানে বন গবেষণা ইন্সটিটিউট, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ পরীক্ষাগার, ভারতীয় সামরিক একাডেমি, রাষ্ট্রীয় ভারতীয় সামরিক মহাবিদ্যালয়, হিমালয় ভূবিজ্ঞান বিষয়ক ওয়াদিয়া ইন্সটিটিউট এবং আরও বেশ কিছু শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবস্থিত।

শহরটি রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম অংশে গাড়োয়াল বিভাগে হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে সমুদ্রসমতল থেকে প্রায় ৬৭০ মিটার উচ্চতায়, ভারতের রাজধানী শহর নয়াদিল্লি থেকে ২৩৬ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। দেরাদুন শহর ঘন বসতি পূর্ন শহর। এখানে  মৌসুমী বায়ুর কারণে বর্ষাকালে প্রচুর  বৃষ্টিপাত হয়। গ্রীষ্মকালে কদাচিৎ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় । স্থানীয় লোকেরা মূলত গাড়োয়ালি হিন্দি ভাষাতে কথা বলে।

শহরটিতে  বার বার নানান  বহিরাগত গোষ্ঠী আক্রমণ চালায়। এদের মধ্যে সর্বশেষ গোষ্ঠীটি ছিল নেপালি গুর্খা সৈন্যের দল। তবে সর্ব শেষে  অঞ্চলটি ব্রিটিশদের করায়ত্ত হয়। ব্রিটিশ রাজের শাসনামলে এর নাম ছিল দেরা। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর শহরটি উত্তর প্রদেশ নামক নবগঠিত রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়। ২০০০ সালে উত্তর প্রদেশের উত্তর অংশটিকে বিচ্ছিন্ন করে উত্তরাখণ্ড রাজ্যটি প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সেসময়ই দেরাদুনকে নতুন রাজ্যটির রাজধানীর মর্যাদা দেওয়া হয়।

 এখানে দর্শনীয় স্থান গুলি ----

আসান নদীর তীরে অবস্থিত তপকেশ্বর শিবমন্দির ও এর পবিত্র গুহা, স্নান করার প্রাকৃতিক পুকুরসমৃদ্ধ ডাকাতের গুহা বা গুছুপানি এবং সহস্রধারা জলপ্রপাত (গন্ধকযুক্ত পানি) কিছু আকর্ষণীয় স্থান। গুছুপানি গুহার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মালসি হরিণ উদ্যানে সাধারণ হরিণ ও ভারতীয় অ্যান্টিলোপ হরিণ চরে বেড়ায়, এলাকাটি বনভোজনের জন্য জনপ্রিয়। শহরের কেন্দ্রে ছয়পার্শ্ববিশিষ্ট একটি ঘড়ির মিনার আছে, যার নাম ঘণ্টাঘর। শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমভাগে আছে ব্যস্ত পল্টন বাজার। পূর্বে আছে গুরুদুয়ারা নানাকসার নামের শিখ মন্দির, যার সাদা ও সোনালি গম্বুজগুলি অত্যন্ত কারুকার্যময়। দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্লেমেন্ট টাউন এলাকাতে মিন্ডরোলিং মঠ নামের একটি তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মীয় কেন্দ্র আছে যার মহাস্তুপের মধ্যে অর্চনাস্থল ও ১০৩ ফুট উঁচু বুদ্ধের মূর্তি আছে। বন গবেষণা ইন্সটিটিউটে একটি বড় জাদুঘর আছে, যেখানে বনরোগ ও কাঠের উপর বিভিন্ন প্রদর্শনী আছে। ব্রিটিশ জরিপ পরিচালক ও ভূগোলবিদ জর্জ এভারেস্টের বাসভবন ও গবেষণাগারটিও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়; জর্জ এভারেস্টের নামেই বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতটির নাম রাখা হয়েছে। আরও আছে রাজা জি বাঘ অভয়ারণ্য। শহরের কাছে উত্তর দিকে মাসুরি নামের আরেকটি পাহাড়ি লোকালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থকেন্দ্র। নিকটবর্তী ঔলি শহরে পাহাড়ি পদযাত্রা ও স্কি করার ব্যবস্থা আছে। এছাড়া হিন্দুদের তীর্থকেন্দ্র হরিদ্বার ও ঋষিকেশও দেরাদুনের কাছেই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। শহরটি থেকে উত্তরে হিন্দুদের পবিত্র ধর্মীয় কিছু লোকালয়ে যাওয়া যায়, যাদেরকে একত্রে "ছোটা চার ধাম" নামে ডাকা হয়। দেরাদুনে ব্রিটিশরা অনেক আফগান রাজাকে নির্বাসিত করেছিল বলে শহরটির সাথে আফগান রাজপরিবারের সম্পর্ক আছে।

             <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

==========================================================================


      || হরিদ্বার ||

                   <--আদ্যনাথ-->

হাওড়া থেকে দেরাদুন।

দেরাদুন থেকে ট্রেনে হরিদ্বার পৌঁছে গেলাম ভোর ভোরই। স্টেশন থেকে রিক্সা নিয়ে সোজা পৌঁছে গেলাম গেস্ট হাউজ।

চৌহান জি আগেই আমাদের জন্য বুক করে রেখে ছিলো গেস্ট হাউজ।

হরিদ্বার--

হরি শব্দের অর্থ "ভগবান বিষ্ণু"। 

সুতরাং, হরিদ্বার বলতে বোঝায় "ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রবেশের দ্বার"। 

অর্থাৎ ভগবান বিষ্ণুর কাছে পৌঁছবার দ্বার-  সেই কারণে এই স্থান হরিদ্বার। আবার এই হোল হরদ্বার অর্থাৎ ভগবান  "হর" অর্থাৎ শিব বা মহাদেবের দুয়ারে প্রবেশের দ্বার। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ তীর্থযাত্রীর যাত্রা শুরু করার জন্য বিশিষ্ট জায়গা। এর থেকে, নাম হরিদ্বার বা হরদ্বার।

স্থানাঙ্ক: ২৯.৯৪৫° উত্তর ৭৮.১৬৩° পূর্ব

হরিদ্বার বা হরদ্বারকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে সপ্তপুরী নামে পরিচিত সাতটি পবিত্রতম স্থানের একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সমুদ্রমন্থনের অমৃতের বিন্দু, এই হরিদ্বারেও পড়েছিল, যেমন পড়েছিল,  উজ্জয়িনী, নাশিক এবং প্রয়াগরাজ (এলাহাবাদ)এতে। 

মহাজাগতিক পাখি গরুড় অমৃতের কলস বহন করার সময় দুর্ঘটনাক্রমে অমৃত ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি কুম্ভমেলায় অভিব্যক্ত হয়েছে, যা প্রতি ১২ বছরে একবার হরিদ্বারে পালিত হয়। হরিদ্বার কুম্ভ মেলা চলাকালীন, লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী, ভক্ত এবং পর্যটকরা মোক্ষ অর্জনের জন্য এবং তাদের স্খালন করার জন্য গঙ্গা নদীর তীরে ধর্মীয় স্নান করতে হরিদ্বারে জমায়েত হয়। 

ব্রহ্ম কুণ্ড হচ্ছে সেই জায়গা, যেখানে অমৃত পড়েছিল। এটি হর কি পৌরিতে অবস্থিত যার আক্ষরিক অর্থে, "প্রভুর পদবিন্যাস" এবং এই "হর কি পৌরি" হরিদ্বারের সবচেয়ে পবিত্র ঘাট হিসাবে বিবেচিত হয়। এটি কাঁওয়ার তীর্থযাত্রার প্রাথমিক কেন্দ্রও, যেখান থেকে লক্ষ লক্ষ অংশগ্রহণকারী গঙ্গা থেকে পবিত্র জল সংগ্রহ করে এবং শত শত মাইল বয়ে নিয়ে গিয়ে, শিব মন্দিরগুলিতে নৈবেদ্য হিসাবে দেয়।

ভারতের উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার জেলার একটি প্রাচীন শহর এবং পৌরসভা। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এখানেই দেবী গঙ্গা ভগবান শিবের জটা  থেকে মুক্তি পেয়ে পৃথিবীতে নেমেছিলেন। গঙ্গোত্রী হিমবাহের প্রান্তে গোমুখ থেকে উৎপন্ন হয়ে, উৎস থেকে 253 কিলোমিটার বা (157 মাইল)বয়ে চলে, হরিদ্বারে প্রথমবারের জন্য সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ করে। যা থেকে এই শহরটির প্রাচীন নাম হয়েছে গঙ্গাদ্বার। একেই আবার কপিল স্থান, গঙ্গাদ্বার এবং মায়াপুরী নামে বলা হয়েছে। 

এ ছাড়াও এই অঞ্চলটি চারধাম (উত্তরাখণ্ড ভ্রমনের চারটি মূল স্থান যেমন, বদ্রীনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী এবং যমুনোত্রি) ভ্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত।

এই স্থানটিকে যথাক্রমে হরদ্বার এবং হরিদ্বার বলে পৃথকভাবে ডাকে, কারণ হর হলেন শিব এবং হরি হলেন বিষ্ণু। মূল গঙ্গা নদী, যা এখানে 'নীল ধর' (বাম দিকে) এবং গঙ্গা খাল (ডানদিকে) নামে পরিচিত, হরিদ্বারের মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

চারধামের মধ্যে একটি বদ্রীনাথ ধামে পৌঁছানোর জন্য, যেখানে ভগবান বিষ্ণুর মন্দির আছে, হরিদ্বার তীর্থযাত্রীর যাত্রা শুরু করার জন্য বিশিষ্ট জায়গা। এর থেকেই, নাম হরিদ্বার।

হরিদ্বার ভ্রমণ মানেই গঙ্গার ঘাটের সন্ধ্যারতি। দেশ বিদেশ থেকে মানুষ হরিদ্ধার আসে খরস্রোতা কনকনে ঠান্ডা গঙ্গায় ডুব দিতে। তাতে নাকি সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। 

এখান কার সন্ধ্যারতি,সন্ধে নামলেই শয়ে শয়ে প্রদীপ জলে ওঠে। গঙ্গোত্রীর গোমুখ  থেকে সদ্য সমতলে  নেমেছে গঙ্গা। এখানে সমতল  মানেই হরিদ্বারে নেমেছে গঙ্গা।

তাই যেমন স্বচ্ছ্ব জল তেমনই ঠান্ডা। গঙ্গার পাড় ধরে বাঁধা রয়েছে লোহার শিকল। স্নান করতে হলে সেই শিকলের সাহায্য নিতেই হবে। না হলে স্রোত যে কোনও সময় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কখন যে জল বেড়ে স্রোত দ্বিগুণ হবে কেউ জানে না। তাই নিরাপত্তার কথা ভেবে এই শিকলের ব্যবস্থা। তবে স্নান করতে না চাইলে ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে খরস্রোতা গঙ্গাকে মন ভরে দেখা যায় সারাক্ষণ। সন্ধে নামলে শুরু হয় গঙ্গারতি। গঙ্গাপূজো। হর কি পাউরি ঘাটে তখন নেমে আসে এক টুকরো স্বর্গ।

হরিদ্বারে  অনেক মন্দির । তথাপি সকল জায়গাতেই বেশ  ভিড়। এখানে বিকেল হলেই গোটা হরিদ্বার হাজির হয় গঙ্গার ঘাটে। হালকা অন্ধকারেই শুরু হত আরতি। বিশাল বিশাল প্রদীপ নিয়ে কাসর-ঘণ্টা বাজিয়ে চলে সেই আরতি। যে দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। এই আরতি সকলে প্রিয় মনে হয় প্রদীপের আলো অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।

পরের দিন সকালেই কঠিন সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে গেলাম মনসাদেবী ও চন্ডিদেবীর মন্দিরে। পাহাড়ের মাথায় এই মন্দিরে থেকে  অনেকটা নিচে হরিদ্বার শহরকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগে।

পরের দিন পৌঁছে গেলাম  ঋষিকেশ  খুব সকাল সকাল বেরিয়ে  সন্ধ্যায় ফিরে আসলাম।

 ঋষিকেশ বেশ ফাঁকা ও লোক জনও অনেক কম । পাহাড়ের গা বেয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা গঙ্গা। এখানে নিয়মিত র‍্যাফটিং হয়। আর এখানের সব থেকে আকর্ষনীয় বস্তু হল লক্ষ্মণঝুলা। গঙ্গার উপর এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ের মাঝে 450  ফুট লম্বা ঝুলন্ত এই ব্রিজ। নদী থেকে 70 ফুট উঁচুতে।

1929 সালে এই ব্রিজ খুলে দেওয়া হয়েছিল সাধারণের জন্য। কথিত আছে, রাম ও লক্ষ্মণ এই পথেই গঙ্গা পাড় করেছিলেন এখন যেখানে এই ব্রিজ রয়েছে। পাশেই রয়েছে রামঝুলাও। মন্দিরপ্রেমীদের জন্য এখানেও রয়েছে প্রচুর বিকল্প। রাতে আলোয় যখন সেজে ওঠে লক্ষ্মণঝুলা তখন অপূর্ব এক স্বর্গীয় রূপ দেখা যায়। এখানেও গঙ্গারতি দেখা যেতে পারে। সেই দৃশ্যও মন ছুঁয়ে যায়। 

পরের দিন আমরা ফিরে আসলাম কোলকাতায়।

    <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

=========================




No comments:

Post a Comment