Friday, May 8, 2020

56>পুরীর মন্দিরের গোপন কথা-------বিমলা দেবী


পুরীর মন্দিরের গোপন কথা-------
বিমলা দেবী

পুরীর মন্দির অর্থাৎ  বৈষ্ণবক্ষেত্র,
এই বৈষ্ণবক্ষেত্রে বলি।
বলির এই শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসের ঐতিহ্য বুঝতে হলে আগে চোখ রাখতে হবে দেবী বিমলার স্বরূপে। পুরাণ এবং তন্ত্র মতে যিনি সাক্ষাৎ মহিষমর্দিনী।

অনেক  রীতি রয়েছে যা নিয়মিত ভাবে পালন করা হয়  পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে। তার মধ্যে একটি পাঁঠাবলি।
যা অনেকেই হয়তো জানেন না বা
জানলেও ঠিক বিশ্বাস করতে চাননা।
বৈষ্ণব ধর্মের মন্দিরে বলি কীভাবে সম্ভব?
জগন্নাথ মন্দিরের চত্বরেই বলি হয়।
তবে সেই বলি নীলমাধবের উদ্দেশে প্রদত্ত হয় না,সেই বলি প্রদত্ত হয় দেবী বিমলার উদ্দেশে যিনি  নীলাচলবাসিনী সেই দেবী বিমলার উদ্দেশেই হয় বলি।

উৎকলে সতী দেবীর নাভিদেশ পড়েছিলো ,দেবীর নাম বিমলা,ভৈরব জগন্নাথ।এই জগন্নাথ ক্ষেত্রের বিমলা দেবীকে একান্নটি শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ বলে ধরা হয় ।

""উৎকলে নাভিদেশশ্চ বিরাজক্ষেত্রমুচ্চতে।
বিমলা সা মহাদেবী ,জগন্নাথস্তু ভৈরব।।'"

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রাঙ্গনের দক্ষিণ-পশ্চিমে দেবী বিমলার মন্দির অবস্থিত।

বছরে একবার বলি হয়  শ্রীমন্দিরের চত্বরে। তবে অবশ্যই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে। ওই দিন জগন্নাথ দেবের শয়ন হওয়ার পর শুরু হয় বলির আয়োজন। আতপচাল দিয়ে বানানো হয় ঢিপি। তার উপরেই হয় বলি। এমনকি সূর্যোদয়ের আগেই চুনজল দিয়ে গোটা মন্দির চত্বর পরিষ্কার করা হয়। যাতে বলির কোনও চিহ্ন না থাকে।
   
মহাদেবী বিমলা যিনি জগন্নাথধামের সর্বময়ী কর্ত্রীও। তাঁর পূজা না হলে জগন্নাথের পূজা শুরু করার নিয়ম নেই।

প্রচলিত রীতি ও বিশ্বাস  এমনি যে মহাদেবী বিমলা অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই এই মন্দিরে দুই স্ত্রী লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং দুই ভাইবোন বলভদ্র, সুভদ্রাকে নিয়ে বাস করতে পারেন নীলমাধব।
এমনি জানা যায় যে  শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথের মন্দির স্থাপিত হওয়ার বহু পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল দেবী বিমলার মন্দির। নগরের প্রাণকেন্দ্রে ছিল তাঁর অবস্থান। পরে এই মন্দিরকে বেষ্টন করেই গড়ে ওঠে জগন্নাথধাম। সেই জন্যেই দেবী বিমলার কাছে জগন্নাথের এই অনুমতি গ্রহণের কাহিনিটি প্রচলিত হয়েছে।

        এ তো গেল পুরান ও তন্ত্রের কথ।  ইতিহাসও বলে, বিমলা মন্দিরের ইতিহাস সম্ভবত বৈষ্ণব জগন্নাথ-মন্দিরের চেয়েও প্রাচীন। জগন্নাথ মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর পরে নির্মিত। অথচ বর্তমান বিমলা মন্দিরটি খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজত্বকালে নির্মিত। তাও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়েছে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত আদি বিমলা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপরই গড়ে উঠেছে নবম শতাব্দীর এই মন্দিরটি।
            কষ্টিপাথরের নির্মিত বিমলা চর্তূভূজা।দেবীর পূজা হয় তন্ত্রমতে,পঞ্চমকারে।ধ‍্যানমন্ত্র -চন্ডীর ধ‍্যান।যখনই বলছি শক্তিপীঠ এবং তা তন্ত্রসম্মত, তখন দেবী বিমলার পূজাও তন্ত্রমতে হতে বাধ্য। অর্থাৎ পঞ্চ ম-কার মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন সহযোগে। তবে পঞ্চমকারের অনুকল্প ব‍্যবহৃত হয় এখানে।মৎস=হিং দিয়ে রান্না করা শাক।মাংস = আদা কুচি।মদ‍্য = কাসার পাত্রে ডাবের জল।মুদ্রা = জলে গোলা ময়দা আর চিনি।মৈথুন=রক্ত চন্দনে মাখা অপরাজিতা পুষ্প ও শ্বেত চন্দনে মাখা কলকে।
         আশ্চর্যের ব্যাপার, বছরের সবকটা দিন কিন্তু দেবী বিমলাকে বলি উৎসর্গ করা হয় না। তার কারণ দেবীর বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস। হিন্দুধর্মে দেবতাকে উচ্ছিষ্ট প্রসাদ নিবেদন করা নিষিদ্ধ। তবে জগন্নাথ মন্দিরের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। সাধারণত বিমলার জন্য আলাদা ভোগ রান্না করা হয় না। তিনি জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করেন। যা কি না নিরামিষ! এবং, সেই উচ্ছিষ্ট ভোগ দেবী বিমলা গ্রহণ করার পরেই তা মহাপ্রসাদের মর্যাদা পায়! অর্থাৎ, বছরের অন্য দিনগুলো বিমলা নিরামিষ আহারই ভক্ষণ করেন। যার পিছনেও নিহিত এক লোক কাহিনি। সেই কাহিনি বলে, শিব একবার বৈকুণ্ঠে গিয়েছিলেন বিষ্ণুদর্শনে। সদ্য তখন আহার সমাপ্ত হয়েছে শ্রীভগবানের। কিছু উচ্ছিষ্ট পড়ে রয়েছে মাটিতে। সেই ঐশ্বর্যময় ভোগকণা দেখে শিব আর লোভ সংবরণ করতে পারলেন না। মেঝে থেকে তুলে নিয়ে ভক্ষণ করলেন সেই আহারকণা। মুছে ফেললেন মুখ। একটি অন্ন যদিও লেগে রইল তাঁর দাড়িতে। শিব যখন কৈলাসে ফিরলেন, তখন সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন নারদ। তিনি সেই অন্নকণা দর্শনমাত্র তা মহাবিষ্ণুর প্রসাদ বলে চিনতে পারলেন। এবং তড়িৎগতিতে ভক্ষণ করলেন তা! ঘটনায় রীতিমতো ক্রুদ্ধ হলেন দেবী পার্বতী। প্রথা অনুযায়ী, শিবের ভাগে তাঁরই অধিকার, নারদের নয়। তিনি বৈকুণ্ঠে গিয়ে নালিশ জানালেন বিষ্ণুকে। পার্বতীর প্রীতিসম্পাদনের জন্য তখন কথা দেন বিষ্ণু, কলিযুগে তিনি নীলমাধব রূপে অবস্থান করবেন শ্রীক্ষেত্রে। পার্বতীও তখন বিমলা রূপে অবস্থান করবেন সেই মন্দির-প্রাঙ্গণে। এবং, প্রতি দিন তাঁকে উৎসর্গ করা হবে জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট ভোগ! সেই প্রতিশ্রুতিমতো দেবী বিমলা বছরের অন্য দিনগুলো নিরামিষ ভোগেই তুষ্টা থাকেন!
             কিন্তু, দুর্গাপূজার নবরাত্রির সময় চতুর্ভুজা,জপমালা-অমৃতকুম্ভ-নাগপাশ-বরদমুদ্রাধারিণী বিমলা পূজিতা হন উগ্রা মহিষমর্দিনী রূপে। তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করতেই এই কয়েক দিন তাঁকে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। পবিত্র মার্কণ্ড কুণ্ডের মাছ দেওয়া হয় ভোগে। আর দুর্গাষ্টমী এবং দুর্গানবমীর দিন উৎসর্গ করা হয় একটি পুরুষ পশু। আগে মহিষ বলি দেওয়া হত, এখন মূলত ছাগল বলি দেওয়া হয়। এই বলিদানেরও রয়েছে কিছু নিজস্ব প্রথা। রাতে জগন্নাথ দেব নিদ্রা যাওয়ার পর শুরু হয় এই আয়োজন। বৈষ্ণব মন্দিরে বলির জন্য পশুটিকে সরাসরি নিয়ে আসা হয় না, তাতে বৈষ্ণব লোকাচার ক্ষুণ্ণ হবে বলে! রাতেই মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে একটি বাঁশের ভারা বাঁধা হয়। সেই ভারায় উঠে বলির পশুটিকে নামিয়ে দেওয়া হয় মন্দিরের ভিতরে। অতঃপর, বলিদান! সেই বলিদান, ভোগ নিবেদন ও সেই নিবেদন করা প্রসাদ ভক্ষণ সব কাজই সেরে ফেলতে হয় জগন্নাথের ঘুম থেকে ওঠার আগে। বলিদানের পর সমস্ত চত্তর জল ও চুন  দিয়ে ধূয়ে দেওয়া হয় ও বলিদানের সমস্ত দ্রব‍্য পশ্চিম দ্বার দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। বৈষ্ণব ও স্ত্রী ভক্তদের এই সময় বিমলা মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। অনুষ্ঠানের অল্প কয়েকজন দর্শকই শুধু “বিমলা পারুষ” বা বিমলার আমিষ ভোগ পান। দেবী বিমলার ভক্তদের বিশ্বাস, দুর্গাপূজায় দেবী উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। সেই সময় তাঁকে শান্ত করতে আমিষ ভোগ দিতেই হয়। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় জগন্নাথের গর্ভগৃহের দরজা, শুরু হয় প্রভাত-আরতি। জগন্নাথ দেবের মন্দির চত্বরে পশুবলি ও আমিষ ভোগ নিবেদন নিয়ে বৈষ্ণবরা একাধিক বার আপত্তি জানিয়েছেন।
           যাহোক, শতাব্দী ধরে এই প্রথা চলছে।  এভাবেই শাক্ত আর বৈষ্ণব মতের সমণ্বয়ে পরিচালিত হয়ে চলেছে নীলাচলধামের দেবজীবন। তুষ্টা থাকেন দেবী বিমলা, প্রসন্ন থাকেন তাঁর ভৈরব জগন্নাথও!
তথ্য সূত্র
1) "Vimala temple at the jagannath temple complex, Puri" - Rajakar Mahaptra
2) কালিকা পুরান গ্রন্থ
3) বিমলা মন্দির - wikipedia
==================<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->================
=================================================================

55>পুরীর মন্দিরের কিছু আদি কথা।------


পুরীর মন্দিরের কিছু আদি কথা।------

কথিত আছে যে দ্বাপর যুগে মাতা যশোদা,দেবকী এবং সুভদ্রা একবার বৃন্দাবন থেকে দ্বারকা এসেছিলেন। সেইসময় দ্বারকাতে উপস্থিত রানীরা তাঁদের অনুরোধ করেন বালক শ্রীকৃষ্ণর লীলা শোনাতে। লীলার গল্প চলা কালিন সুভদ্রাকে দ্বারে পাহারায় রেখে  ছিলেন যাতে শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরামের আগামন বার্তা আগাম জানিয়ে দিতে পারেন সকলকে। কিন্তু সেই গল্প শুনতে শুনতে সুভদ্রাও এত মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে দুই ভাইয়ের আগমন তিনি টেরই পান নি।এদিকে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম নিজেদের বাল্য লীলা শুনে এতটাই আনান্দ পেয়েছিলেন যে তাঁদের চুল খাড়া হয়ে যায়, চোখ গোলগোল হয়ে যায়, হাঁসিটা আরও বেড়ে যায় এবং ওনাদের শরীর ভক্তি আর প্রেম ভাবনাতে গলে যেতে থাকে। সুভদ্রা সব শুরু থেকে শোনায় উনিই সবথেকে বেশি বিগলিত হয়ে পরেন, তাই আজও ওনার মূর্তি দৈর্ঘে এবং প্রস্থে বাকি দুজনার তুলনায় কম। যাইহোক, সেই সময় সেখানে আবির্ভাব হয় নারদ মুনি। নারদ মুনি শ্রীকৃষ্ণের এই রূপ দেখে অভিভূত হয়ে বলেন, হে প্রভু আপনি কবে এই রূপে অবতার নেবেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে কলিযুগে ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব তটবর্তি  উপকূলে তিনি আবার জন্ম নেবেন এই রূপে।

এমনি ছিল আদি কথা বা কাহিনী।
এর পরে কলিযুগে----
জগন্নাথ কে নিয়ে অনেক গল্প ই প্রচলিত আছে তারমধ্যে একটি গল্প এমন-----

একদিন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এক সন্ন্যাসীর বার্তা পেয়ে বিদ্যাধরকে শ্রী বিষ্ণুর সন্ধানে বর্তমান উড়িষ্যাতে পাঠান। বিদ্যাধর ওখানে এক গুহায় নীলমাধবের রূপে বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দেখা পান এবং রাজাকে খবর পাঠান। সেই খবর পেয়ে উৎফুল্ল চিত্তে রাজা তড়িঘড়ি ভগবানের দর্শনে বেড়িয়ে পরেন কিন্তু এসে দেখেন শূন্য গুহা, ভগবান অদৃশ্য হয়েছেন। বিষণ্ণ রাজা ভেবে পান না কি করবেন এমন সময় তিনি এক দৈববানী পান, সেইমতন তিনি পুরীর তটভূমিতে যান এবং সমুদ্রে একটি গাছের গুঁড়ি ভাসতে দেখেন। দৈববাণী অনুযায়ী রাজা ওই গাছের গুঁড়িটি জল থেকে তুলে আনেন
এবং তা দিয়ে শ্রীকৃষ্ণর মূর্তি বানানোর
উদ্যোগ নেন। কিন্তু আবার তিনি বাধার সম্মুখীন হন, যেহেতু কেউ শ্রীকৃষ্ণকে
চাক্ষুষ দেখেন নি তাই তার রূপ অজানা
এবং ওই গাছের গুঁড়িটি এত শক্ত যে  তাতে দাগও কাটতে বিফল হয় সবাই। এমত অবস্থায় ছদ্মবেশে আবির্ভাব হয় বিশ্বকর্মা দেব, তিনি ছদ্মবেশে রাজার সামনে উপস্থিত হন এবং বলেন যে তিনি এই দুরূহ কাজটি করতে সক্ষম যদিও তা শর্তসাপেক্ষ।
শর্ত হল এই মূর্তি তিনি ২১ দিন ধরে রুদ্ধদ্বারে গড়বেন এবং কেউ ইতিমধ্যে তাঁকে বিরক্ত করবে না। রাজা রাজি হন।  এবং রুদ্ধদ্বারে মূর্তি তৈরি আরম্ভ হয়। পনেরো দিনের মাথায় রানী আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে কৌতুহল বশত দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। বন্ধ দরজার ভিতরে দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণের অসম্পূর্ণ মূর্তি এবং বিশ্বকর্মা অদৃশ্য। পরে এই মূর্তিই স্থাপিত হয় পুরী মন্দিরে।
রাজা রানী উভয়েই এমন অর্ধ নির্মিত দেবতাদের দেখে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অতিশয় দুঃখিত হয়ে হাহুতাশ করতে থাকেন। তখন নারদ মুনি আবির্ভাব হয়ে বলেন কলি যুগে নারায়ন এমনই রূপে পূজা নেবেন।
আর সেই থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এমনি রূপেই বিরাজমান।

এমন কথাও প্রচলিত আছে যে,
এখন যেখানে পুরীর মন্দির মনে করা হয় প্রাচীন কালে এখানেই একটি বৌদ্ধ স্তূপ ছিল যেখানে গৌতম বুদ্ধের একটি দাঁত সংরক্ষিত ছিল  এবং ওই দাঁত নিয়ে প্রতি বছর এক শোভাযাত্রা হত যা
আজকের রথযাত্রার অনুরূপ।
পরবর্তী কালে হিন্দু ব্রাহ্মণদের চাপ ও দৌরাত্যে একসময় এখান থেকে বৌদ্ধ
ধর্মাবলম্বীরা সেই দাঁত নিয়ে শ্রীলঙ্কা চলে যান এবং স্তূপ প্রতিষ্ঠা করে গৌতম বুদ্ধের ওই দাঁতটি সংরক্ষণ করেন যা আজও বর্তমান সেখানে।

সম্প্রতি একটি তাম্রলিপি আবিষ্কার হয়েছে যা থেকে জানা যায় গঙ্গা বংশের রাজা, রাজা অনন্ত বর্মণ চৌর গঙ্গ দেব তার রাজত্বকালে পুরীর মন্দিরের
জগমোহন এবং বিমান অংশটি তৈরি করেন।
যদিও  ওড়িশার  রাজা অনঙ্গ ভীম দেব ১১৭৪ সালে এই মন্দির পুনরুদ্ধার ও সংস্কার করেন। তখন থেকে ১৫৫৮ সাল পর্যন্ত এখানে জগন্নাথ দেবের রূপে (বড় ঠাকুর) শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা হতে থাকে  একটানা। এরপর হয় কালাপাহাড়ের হামলা ও লুটপাট, কোণারকের সূর্য মন্দির সহ সারা উড়িষ্যা জুড়ে ধ্বংস করতে   থাকে  একের পর এক মন্দির।
ভাগ্যক্রমে পুরী মন্দির রক্ষা পায় যদিও বন্ধ হয়ে যায় মন্দিরের আরাধনা।
পরে  উড়িষ্যার  রাজা,  রামচন্দ্র দেব এই মন্দির পুনঃ-প্রতিষ্ঠাপিত করেন এবং সম্ভবত ১৬০৭ সালের আশেপাশে  আবার শুরু হয়  মন্দিরের আরাধনা।

উৎকল স্থাপত্যর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এই পুরী মন্দির।
মন্দিরটি ২১৮ ফিট উঁচু এবং ২০ ফিট উঁচু অভেদ্য পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা যার নাম মেঘনাদ। মূল মন্দিরের চূড়াতে অষ্টধাতুর একটি চক্র আছে যার নাম নীল চক্র বা সুদর্শন চক্র।
এই চক্র জগন্নাথ দেবের প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং বজ্র বিদ্যুৎ থেকে মন্দিরকে রক্ষা করতে ইন্সুলেটার হিশাবেও কাজ করে।
এটির সুদর্শন চক্রের ওজন এক টন। এই চক্রের উপর  তিনকোনা ধ্বজা / পতাকা বাঁধা হয়  যার নাম পতিত পাবন।

প্রতিদিন বিকালে এই পতাকা বদল করা হয় এবং ঠিক চোদ্দ বছর বয়সী এক বালককে এক বছরের জন্য প্রতিদিন এই কাজ করতে হয়। চোদ্দ বছর বয়সী এক বালকের তরতর করে বেয়ে ২০০ ফিটের বেশি ওঠা, পতাকা বদল এবং নেমে আসা প্রত্যক্ষ করা, সে সত্যিই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
ছেলেটি নীচে আসলেই সকল দর্শনার্থী তাকে ঘিরে ওই পতাকার একটু অংশ নিতে চায়।
কারন ওই পতাকার অংশ নাকি সৌভাগ্যের প্রতীক।

মূল মন্দির ছাড়াও এই চত্বরে আরও ৩০টি মন্দির আছে এবং ১২০ দেবদেবীর মূর্তি আছে। তৎকালীন স্থাপত্তশৈলী অনুসারে সব মন্দিরই একটি মণ্ডপ এবং প্রধান গর্ভগৃহ নিয়ে তৈরি হলেও এই মন্দির আরও বিস্তৃত ভাবে তৈরি। পুরী মন্দিরের চারটি অংশ,
প্রথমে সবথেকে বাইরের দিকে ভোগমণ্ডপ,
তারপর নাট্যমন্দির,
তারপর জগমোহন এবং
সর্বশেষে গর্ভগৃহ বা দেউল বা বিমান যেখানে জগন্নাথ দেব অবস্থান করেন দাদা বলরাম এবং ভোগিনী সুভদ্রার সাথে।
আমি একবারই সুযোগ পেয়েছিলাম
দেব পরিক্রমা করার।সেটা ১৯৮৩ সাল,
এর আগে আমি অনেকবার পুরীতে গিয়েছিলাম।
যখন আমি কলকাতা পুরীর বাস চালাতাম। তখন বেশ কয়েকবার পুরীর মন্দিরে পূজো দিয়েছি, কিন্তু পরিক্রমা    করিনি ।
তখন ১৯৮৩ সাল আমি ধানবাদে
বি সি এল এতে চাকুরী করি।
আমি ১৯৮০ সালে নাগপুর থেকে সি এম পি ডি আই এর চাকুরী ছেড়ে ধানবাদে বি সি সি এল এতে জয়েন করি।
ধানবাদে আমাদের প্রজেক্টের ডোজার অপারেটর  মহেন্দ্রর বড়ডা পুরীর এক পান্ডার নাম ঠিকানা দিয়েছিল।
আমি ১৯৮৩ তে একদিন পুরীর মন্দিরে গিয়ে ওই পান্ডার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম।
সেই পান্ডাজি আমাকে পুরীর অনেক গল্প কথা শুনিয়ে ছিলেন এবং জগন্নাথ দেবের পরিক্রমা করিয়ে ছিলেন।
দেব পরিক্রমা করতে গিয়ে দেখেছিলাম,
এই গর্ভগৃহ বেশ অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও পিচ্ছিল, জানিনা সূর্যালোক এই গর্ভগৃহে প্রবেশ করে কি না ।
পান্ডাজি বলেছিলেন পূর্বমুখী এই গর্ভগৃহে
ভোরের এক নির্দিষ্ট সময় সূর্যালোক প্রবেশ করে এবং জগন্নাথ দেব সেই আলোতে সূর্য স্নান করেন।
সূর্য স্নানের পর তাঁকে ফুল চন্দনের জলে স্নান করানো হয় এবং আরও কিছু আচার অনুষ্ঠানের পর তাঁকে নুতন কাপড় পড়ানো হয় প্রতিদিন। তারপরে চলে পূজা ও দিন ভরের নানান কার্য।

এই মন্দিরের চারটি প্রবেশদ্বার আছে, দক্ষিণে অশ্বদ্বার,
পশ্চিমে ব্যাঘ্রদ্বার,
উত্তরে হস্তিদ্বার এবং
পূর্ব দিকে প্রধান সিংহদ্বার।

সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেই সামনে অরুণ স্থম্ভ, অরুণ মানে সূর্যের রশ্মি।

(এটি আসলে পুরী মন্দিরের অংশ নয়, এই অরুণ স্থম্ভ  কোনারক সূর্য মন্দিরের নাট্য মণ্ডপ ও জগমোহনের মাঝে স্থাপিত ছিল।
শোনাজায় মারাঠা রাজত্বকালে এক কেউ এই স্থম্ভ কোনারকের বালি চাপা ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে পুরী মন্দিরে স্থাপন করেন। গ্রানাইট পাথরের তৈরি ৩২ফুট উঁচু অপূর্ব অটুট এই স্থম্ভ
এবং তার উপর করা কারুকার্য নিজেই এক বিস্বয়।)

সিংহ দুয়ারের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল দুই রক্ষীর নাম জয়া এবং বিজয়া।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু জগন্নাথ দর্শনে গেলে তাঁকে তৎকালীন পাণ্ডারা গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি দেয় নি।
তখন তিনি গর্ভগৃহের উল্টো দিকে দূরে দাঁড়িয়ে একটি পাথরের দেওয়ালে হাত রেখে হেলান দিয়ে দেবদর্শন সারেন। সেই পাথরে তাঁর হাতের ছাপ আজও বর্তমান।

 শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উড়িষ্যার  তৎকালীন রাজা প্রতাপরুদ্র বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহনের সিধান্ত নিলে পাণ্ডারা বুঝতে পারেন যে তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি
শেষ হতে চলেছে ।
আর সেই কারনে রাজা দীক্ষা নেওয়ার
আগের রাতে পাণ্ডারা শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে গুম-খুন করে এবং রটিয়ে দেয় যে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু স্বর্গদ্বার দিয়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছেন।
অন্য মতে মহাপ্রভুতে (জগন্নাথে) বিলীন হয়ে গেছে।
আসলে তারা হয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে হত্যা করে সমুদ্রে  ভাসিয়ে দেয়
অথবা দুই লক্ষ sq/ft মন্দির চত্বরেই কোথাও লুকিয়ে ফেলে। শুধু তাই নয়, বর্তমান কালে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর মৃত্যু নিয়ে গবেষণারত তিন ব্যক্তিরও মৃত্যু ঘটে যথেষ্ট রহস্যজনক ভাবে।

পুরী মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ নিষেধ, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তারা (পাণ্ডারা) মন্দিরে প্রবেশ করতে দেন নি কারন তাঁর স্বামী মুসলিম ছিলেন।

মহাত্মা গান্ধীকে তারা মন্দির চত্বরে ঢুকতে দেয় নি কারন তিনি হরিজনদের নিয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন এবং বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথকেও তারা মন্দিরে প্রবেশ করতে দেন নি কারন তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সমর্থক  ছিলেন।

Archaeological Survey of India পুরী মন্দিরের সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন।
=======================
.


বীচ চন্দ্রভাগা--------

পুরী থেকে দূরত্ব তিরিশ কিলোমিটার সময় লাগবে প্রায় এক ঘণ্টা। শহর ছাড়ানোর পর রাস্তা বেশ সুন্দর, মাঝে একটা অগভীর অভয়ারন্ন্য পড়ে, মাঝে মাঝে হরিণ চোখে পড়ে।

পুরী বীচের থেকে অনেক সুন্দর আর নির্জন এই বীচ, যদিও প্রতি বছর মাঘ মাসের সাত তারিখ সূর্য দেবতাকে উৎসর্গ করে সাত দিনের ধর্মীয় মেলাতে খুব জন সমাগম হয়। কথিত আছে, ভগবান কৃষ্ণের পুত্র সাম্বা চন্দ্রভাগার তীরে সূর্য দেবতার আরাধনা করেছিলেন কুষ্ঠরোগ থেকে মুক্তি লাভের জন্য।

এখান থেকে কোনারক মন্দির মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে।
=================