81>জঙ্গলমহল= ( ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি , কাঁকড়াঝোর)
<---আদ্যনাথ--->
জঙ্গলমহল ( ঝাড়গ্রাম , বেলপাহাড়ি , কাঁকড়াঝোর ) ‘ জঙ্গলমহল 'এর নাম শুনলেই মনে জাগে ভয়। আসলে জঙ্গলমহল শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে এক রোমহর্ষক ও গা-ছমছমে আদিমতা।
কিন্তু বহু মানুষ এহেন ভয় ও গা-ছমছমে আদিমতাকেই ভালো বসে। তাইতো তারা বার বার বেরিয়ে পড়ে ওই জঙ্গলের টানে।
মাঝে কিছুকাল কিছু নানান আতঙ্কে সকলেই জঙ্গলমহল এড়িয়ে চলতো।
এখন আর তেমন ভয় নাই তাই সকলেই আবার বেরিয়ে পড়ছে জঙ্গলমহলের টানে।
আজ আমাদের যাত্রা পথ জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম , বেলপাহাড়ি আর কাঁকড়াঝোর।আমরা চারজন, বিশ্বনাথ নাথ, শংকর বিশ্বাস, ভূপেন্দ্র সিং, এবং আমি।
শুক্রুবার সকালেরই আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
এখন আর কদিন পরেই দুর্গা পূজা তাই শরতের বনাঞ্চল খেত খামার
মাঠজুড়ে দুলে ওঠে কাশফুল ঝাড়গ্রামের পথেঘাটে জঙ্গল ঘেরা পথ শুধু সবুজ আর সবুজ, আর কাশ ফুলে সমস্ত মাঠ সাদা তুলোর মতন হাওয়ার ঢেউ খেলে যাচ্ছে কাশ ফুলের ওপরে
প্রথম দিন::--
Day 1:
সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরে
প্রায় 9.30 টা নাগাদ এসে পৌঁছলাম ঝাড়গ্রাম।
স্টেশনের কাছেই একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হোল।হোটেলে স্নান খাওয়াদাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম করে বেড়িয়ের পড়লাম একটা ভ্যান ভাড়া করে, একটু কাছেপিঠে ঘুরে বেড়াবার জন্য।
( আজকাল তো অটো,টোটো, কতকি হয়েছে, আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন ঐ ভ্যান রিক্সাই একমাত্র যানবাহন ছিল। আসে পাশে ঘুরবার জন্য)।
পথের সৌন্দর্য অবর্ণনীয় । লাল মাটির রাস্তা আর দুইপাশে শুধু গাছ আর গাছ, সবুজ ধানের ক্ষেত , শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ আর সাথে প্রচুর কাশবনে কাশ ফুলে চারিদিকে সাদা, অপূর্ব সেই প্রকৃতির শোভাস্টেশন থেকে কাছেই কনকদুর্গা মন্দির।
মন্দিরের গেটের কাছে নেমে ভিতর যাবার জন্য টিকিট কেটে লাল মাটির রাস্তা ধরে চলে এলাম মন্দিরে। প্রায় 600 বছরের প্রাচীন মন্দিরটি বাজ পড়ে মাঝ বরাবর ভেঙ্গে গেছে দেখলাম। আর তার পাশেই রয়েছে বর্তমান মন্দিরটি , শুনলাম তারও বয়েস প্রায় 90 বছরের মতন।
মন্দিরের পাশ দিয়ে একটু হেঁটে চলে এলাম ডুলুং নদীর ধারে। তারপরে গেলাম চিল্কিগড় রাজবাড়ি । বিশাল বড় এই রাজবাড়ির না জানি কত ইতিহাস আছে এই রাজ বাড়ির। এখানে কয়েকটি মন্দিরও আছে ।
এবার গেলাম ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। শুনলাম এখানে এখনও রাজপরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন।
এবার আমরা হোটেলে ফিরে গেলাম।
রাত্রেই হোটেলে কথা বলে একটা
এম্বাস্যাডার গাড়ির ব্যবস্থ্যা করে রাখলাম।
দ্বিতীয় দিন----
2nd day:-----
সকাল সকাল রেডি হয়ে হোটেলে জলখাবার খেয়ে বেড়িয়ে পরলাম গাড়ি করে।
দিনের বেলা জঙ্গলমহলের ঠাণ্ডা মিষ্টি হাওয়া আমাদের সাথ দিয়েছিল সকাল থেকেই মেঘ মেঘ করেছিল। গাড়িতে যেতে যেতে দেখতে থাকি সবুজ ধানক্ষেত , কাশবন, খেজুর গাছের সারি, শাল গাছের জঙ্গল। আকাশে কালো মেঘ আর সবুজ গাছের যুগলবন্দী আর সাথে মনকাড়া সাদা কাশফুলের সারি অপূর্ব ছবি তৈরি করেছিল। মনেহচ্ছিল পটে আঁকা
সবুজ শাড়িতে সাদা রঙের ফুল আঁকা।
গাড়ি বেশ জোরেই চলছিল। আমরা
শেষ বর্ষা ও শরতের আগমনীর জঙ্গলমহলের রুপ উপভোগ করতে করতে ঘন্টাখানেক পর পৌঁছলাম ঘাঘরা জলপ্রপাতের কাছে। গাড়িথেকে নেবে
এক একটি করে পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম সামনে। ছোট্ট একটি জলাধার, সেখানে বেশ স্রোতের সঙ্গে জল নেমে আসছে পাথরের খাঁজ দিয়ে। সেই অর্থে জলপ্রপাত বলতে আমরা যা বুঝি সেরকম এটি নয় হয়ত, কিন্তু দুইপাশের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা জলধারার সামনে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে
বেশ ভালোই লাগলো। তারপরে আমরা গাড়ি করে চললাম তারাফেনী ব্যারেজের দিকে।
অল্প সময় পরেই পৌঁছলাম ব্যারেজের সামনে। ব্যারেজের ওপর থেকে তাকিয়ে দেখি নদীর ধারে যেন কাশফুলের মেলা।
হাওয়ায় দুলতে থাকা ঘন কাশের বন দেখে অভিভূত । যতদূর চোখ যায় শুধু সাদা ধবধবে হয়ে আছে চারিদিক।
মনে হচ্ছিল কোন গল্পের স্বপ্ন পুরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ব্যারেজের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম ব্যারেজের নীচে নদীর ধারে।
গেলাম বনের ভেতরে। ছুঁয়ে দেখলাম হালকা তুলোর মতো কাশফুলেদের।
মনে হচ্ছিল জঙ্গলমহলে কাশফুলেদের মেলা।
এবার আমাদের গাড়ি আবার এগিয়ে চললো কাঁকড়াঝোরের পথে। বেশ কিছুক্ষণ যাবার পর শুরু হল পাহাড় জঙ্গলের রাস্তা। রাস্তার দুইদিকে পাহাড় , টিলা আর লালমাটির রাস্তা দিয়ে জঙ্গল চলে গেছে। আদিবাসিদের সুন্দর সুন্দর মাটির বাড়ি মাঝেমধ্যে। চোখে পড়ল হলুদ রঙের কলার মত দেখতে একধরনের ফুল ফুটে আছে সারি সারি। নাম জানিনা।
গাড়ি দাঁড় করিয়ে সামনে থেকে চাক্ষুষ করার লোভ সামলাতে পারলামনা । এইভাবে জঙ্গলমহলের পথেঘাটে কতবার যে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে গিয়ে গাছেদের জড়িয়ে ধরেছি, খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হাওয়া গায়ে মেখেছি ঠিক নেই। আসলে প্রকৃতির নির্ভেজাল আদর শরীরে মনে মেখে নিতে চাইছিলাম আমরা। কাঁকড়াঝোরে নির্দিষ্ট কোন স্পট হয়ত নেই, শুধু ঐ রাস্তা ধরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাব বলেই ঐ পথ দিয়ে আসা। “এই বনপথে যেতে যেতে শুধু সবুজ সবুজ উপহার, আজ ভালোলাগে শুধু ভালোলাগে , মন কিছু চায়না আমার”। এদিকে খিদে খিদে পাচ্ছে, কিন্তু খাবার হোটেল সেরকম চোখে পড়লনা। আসলে আমরা এত বেশি হৈ হৈ করতে মত্ত ছিলাম যে দুপুরের খাবারের কথা ভুলেই গেছি। গাড়িতে যেতে যেতে সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার খাচ্ছিলাম। এক জায়গায় দেখলাম জিলিপি, মালপো ভাজছে। গাড়ি থেকে নেমে বেশ বড় সাইজ এর জিলিপি আর মালপো খেয়ে পেট ভরালাম। এখানকার মানুষজনদের ব্যবহারও বেশ আন্তরিক। জঙ্গলমহলকে ভালোভাবে চেনা যাবে কাঁকড়াঝোরের পথে এলে। জানিনা এখানে থাকার কি ব্যবস্থা আছে, পরে কখনও এসে শুধু এই কাঁকড়াঝোরেই থাকার ইচ্ছে আছে এই পাহাড় জঙ্গলের নিস্তব্ধতার আলিঙ্গনে। আমাদের এখন দুটি গন্তব্যে যাওয়া বাকি, খেঁদারানী লেক আর গাড়ড়াসিনী পাহাড়ে হেঁটে ওঠা।
কাঁকড়াঝোর থেকে চাকাডোবার পথে
গাড়ি চলল কাঁকড়াঝোর থেকে চাকাডোবার জঙ্গলের রাস্তা ধরে খেঁদারানী লেকের পথে।
দেখলাম লালমাটির রাস্থা ওপরে উঠে দূরে এক পাহাড়ে যেন সোজাসুজি মিশে গেছে। আর দুই পাশে শাল, মহুয়ার জঙ্গল। গাড়ি থেকে আমরা আবার নীচে নামলাম ।
খেঁদারানী লেক যাবার রাস্তাটা সরু লালমাটির মধ্যে দিয়ে আর দুই পাশে ঘন জঙ্গল। বৃষ্টি পড়ে লালমাটির মধ্যে জায়গায় জায়গায় গর্ত হয়ে জল জমে আছে। ড্রাইভার দাদা ভয় পাচ্ছিলেন যদি গাড়ির চাকা বসে যায়, কারণ বৃষ্টি হলে লালমাটি নাকি নরম হয়ে বসে যায়। যাইহোক পৌঁছলাম লেকের সামনে। পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা প্রাকৃতিক এই লেক। লেকের জলে কত পদ্মপাতা, শীতে পরিযায়ী পাখিরা ভীড় জমায় এখানে। পিছনেই গাড়ড়াসিনী পাহাড় দেখতে পেলাম। আকাশ কালো করে পাহাড় বেয়ে যেন মেঘ নেমে এসেছে লেকের জলে। বৃষ্টি ভেজা জঙ্গলমহলকে দেখে মুগদ্ধ হলাম।
এবার আমাদের শেষ গন্তব্য গাড়ড়াসিনী পাহাড়। বিকেল প্রায় চারটে(4টে ) বাজে। পৌঁছে গেলাম সত্যানন্দ স্বামীর আশ্রম, এখান থেকে পেরিয়ে শুরু হল হাঁটা । লালমাটির কাঁকুরে রাস্তা ধরে পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে বেশ চড়াই ভেঙ্গে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে উঠতে থাকলাম আমরা চারজন। দাঁড়াবার অবকাশ নেই, কাঁকুড়ে রাস্তায় পা পিছলে যাচ্ছে আর জঙ্গুলে মশারা ছেঁকে ধরছে আমাদের। ওদিকে মাঝেমধ্যেই টুপটাপ করে বৃষ্টিফোঁটারা গাছ বেয়ে ঝরে পড়ছে আমাদের গায়ে।
এখানকার পাহাড়ি পথে চড়াই ভাঙতে
বেশ কষ্টই হচ্ছিলো। এমন লম্বা ট্রেকিং পথ একটু উঠতে গিয়েই পায়ে ব্যথা করছে আর দাঁড়িয়ে পরছি। দাঁড়াতেও পারছিনা ঠিকমতো, পা পিছলে যাচ্ছে ।
তবুও আমরা প্রায় আধা ঘন্টা হেঁটে উঠে পৌঁছলাম পাহাড়ের মাথায়।
পাহাড়ের ওপরে উঠে ওপর থেকে জঙ্গলমহল কে দেখে আমরা উচ্ছসিত। নীচে যা দেখা যায় শুধু ঘন জঙ্গল, কোনো বসতি নেই। আর চারিদিক ঘিরে রেখেছে পাহাড়।
শেষ বিকেলের আলোয় বেশ কিছুক্ষণ কাটালাম পাহাড়ের মাথায় জঙ্গল ঘেরা পরিবেশে।
হঠাৎ মেঘ ছেয়েছে আকাশ। দুরের পাহাড়দের ঘিরে ধরে মেঘেদের
মনে হচ্ছে এখনই বৃষ্টি নামবে।
পাহাড়ের ওপর থেকে দেখি গোটা জঙ্গলমহল ঘিরে যেন এক নিস্তব্ধতা। শাল মহুয়ার এই জঙ্গলের মাতাল করা দৃশ্যে চোখ ডুবিয়ে দিতে দিতে ধীরে ধীরে নামতে থাকলাম। শুনতে থাকলাম সন্ধ্যে নামার মুখে জঙ্গলের শব্দ, ঝিঁঝিঁর ডাক।
নীচে নেমে আশ্রমটা একটু ঘুরে দেখলাম। এমন মন ভালোলাগার ছোট্ট ভ্রমনে খুশি সকলের মনে। এবার
বেলপাহাড়ি ছেড়ে চললাম ঝাড়গ্রামের দিকে। বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা জঙ্গলের হাওয়ায়
উড়তে উড়তে গাড়িকরে পৌঁছলাম হোটেলে।
পরদিন বাড়ি ফেরার পালা।
<----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
========================