Monday, October 17, 2016

6> =ভ্রমণ: ত্রিপুরার ঊনকোটির গল্প -----



ভ্রমণ: ত্রিপুরার ঊনকোটির গল্প ---
                    <---©-আদ্যনাথ--->


শিব নাকি একবার ১ কোটি দেবদেবীর পল্টন নিয়ে কৈলাস থেকে যাচ্ছিলেন বারাণসীর দিকে। পথে জিরিয়ে নেওয়া এবং রাত্রিবাসের জন্য ঘন জঙ্গলাবৃত স্নিগ্ধ সবুজ এই জায়গাটি বেছে নেন। কথা ছিল পরের দিন সূর্য ওঠার আগেই সবাই মিলে পুনরায় যাত্রা শুরু করবেন গন্তব্যের দিকে। সেই মতো রাতও পোয়াল সূর্যও উঠলো, কিন্তু শিব নিজে ছাড়া বাকিরা কেউই ঘুম থেকে উঠলো না। এই ঘটনায় অত্যন্ত রুষ্ট হয়ে শিব সবাইকে অভিশাপ দিলেন, এইস্থানেই পাথর হয়ে থাকার জন্যে। ব্যাস! শিব ছাড়া বাকি

‘উনকোটি’দেবদেবতা তাদের সাঙ্গপাঙ্গ সমেত চিরদিনের মতো এই স্থানে প্রস্তরীভূত হয়ে থেকে গেলেন আর ভারতের উত্তরপূর্বের এই ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরা পেল এই সুন্দর ভ্রমণস্থলটি। জানিনা ঘটনাটি এত সহজ ভাবে ঘটেছিল কি না ? অথবা এই ঊনকোটি দেবদেবী শিবের অভিশাপের হাত থেকে কবে বা কী ভাবে মুক্তি পেলেন বা আদৌ পেলেন কি না ? তবে এটুকু বলতে পারি ভারতীয় ভূখণ্ডের এক্কেবারে উত্তরপূর্ব কোনায় থাকা এই ছোট্ট রাজ্যটির ভ্রমণ মানচিত্রে এই “উনকোটি” অতি তাৎপর্যপূর্ণ এক সংযোজন।
বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পাহাড়ের গায়ে বৃহদাকায় প্রস্তর শিল্প। না, ভারতীয় ভাস্কর্য বলতে যে অতি পরিচিত খাজুরাহো বা অজন্তা ইলোরার প্রস্তরমূর্তি বোঝায়, এ তা নয়। এ আরও আদিম। দু’ধরনের পাথরের শিল্প দেখা যায় এখানে,এক হল বড়ো বড়ো পাথরের মূর্তি। যেমন নন্দীষাঁড়ের বিশালাকায় মূর্তি আছে আধামাটির নীচে প্রথিত। আবার আছে পাহাড়ের গায়ে পাথর কেটে বানানো শিব, দুর্গা, গণেশ ইত্যাদি মূর্তি। পুরো স্থানটির মধ্যমণি হল প্রায় ৩০-৪০ ফুট উচ্চতার শিবের মুখাবয়ব আর তার মাথার কারুকারজময় শিরস্ত্রাণটি, যেটি আরও ১০-১৫ ফুট উঁচু। এই মূর্তিটির নাম, “ঊনকোটিশ্বরকালভৈরব”। এর দুপাশে দুটি মহিলা মূর্তি, যার একজন দশভুজা। এরকম “ঊনকোটি” প্রস্তরমূর্তি আপনার জন্য এখানে অপেক্ষা করে আছে।

সপ্তম–অষ্টম শতাব্দী থেকে এই স্থানটি শৈবধর্মের তীর্থস্থান ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে এখানে ‘অশোকাষ্টমীর’ মেলা বসে। এটিই এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব। দূরদুরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন মেলায় মেতে উঠতে। তবে কি জানেন ধর্মস্থান শব্দটির সঙ্গে যে সমস্ত অনুষঙ্গ মনে আসে এই স্থানটি মোটেই সেরকম নয়। পাহাড়, খাদ, ঝরনা, জঙ্গল মিলিয়ে সবুজ শান্ত সুন্দর এই জায়গা। অনেক শতাব্দীর অবহেলায় বেশ খানিকটা ক্ষতি হলেও ‘ইন্ডিয়ান আরকিওলজিকাল সার্ভে’-র হাতে যাওযার পর থেকে এর সংস্কারের কাজ চালু হয়েছে। সরকারি তরফেও এই স্থানটি সংরক্ষণের সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে। পাহাড়ের সবুজ ঢাল বেয়ে অনেক নীচ পর্যন্ত নামা বা অনেক ওপরে ওঠার জন্য সিঁড়ি বানানো আছে। আপনার গায়ে ও পায়ে বল থাকলে যত দূর খুশি চলে যেতে পারেন। রাতকে আলোকিত রাখার জন্য রয়েছে আলোর ব্যবস্থা। সবমিলিয়ে খুবই পরিস্কার আর পরিচ্ছন্ন। ইদানি একে ‘ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ১৭৮ কিমি দুরত্বের এই জায়গাটির সবচেয়ে কাছের রেল স্টেশন ২০ কিমি দূরের কুমারঘাটা । আগরতলা- লামডিং লাইনের ট্রেনে এখানে নেমে গাড়ি নিয়ে উত্তর ত্রিপুরার জেলার সদর শহর ‘কইলাসহর’ হয়ে পৌঁছতে হবে ‘ঊনকোটি’। অন্যদিকে আসামের শিলচর (১৪৮ কিমি) থেকে বাস বা গাড়িতে করিমগঞ্জ হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ধর্মনগর হয়ে পাহাড়ি পথে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পৌঁছে যেতে পারেন ঊনকোটি। এই রাস্তাটি বড়োই মনোরম। একটা কথা বলে রাখা ভালো। ত্রিপুরার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বেশ ভালো আর সস্তাও, তাই অল্প খরচে বেড়াতে চাইলে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
শুরুতে ঊকোটির জন্মের যে গল্পটি শুনেছিলাম, জায়গাটা দেখতে দেখতে মনের মধ্যে তা নিয়ে প্রশ্ন জাগছিল। শিব যদি বাকিদের পাথর বানিয়ে ফেলে চলে গেলেন তাহলে এত বড়োবড়ো শিবের মূর্তি বানাল কে?? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আশায় গল্প জুড়লাম স্থানীয় এক চা-দোকানির সঙ্গে। উঠে এল আর এক গল্প।

স্থানীয় আদিবাসীদের মতে এসব মূর্তি কাল্লু কুমারের বানানো। শিল্পী ছিল কাল্লু কুমার। একাধারে সে ভাস্কর ও মৃৎ শিল্পী। আবার দেবী পার্বতীর ভক্ত। মা পার্বতীর কাছে সে বায়না ধরল, শিব আর পার্বতীর সঙ্গে কৈলাসে যাবে। মা -ও তার ভক্তের আর্তি রাখতে দিলেন শিবের কাছে আর্জি পেশ করে। পার্বতীর ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে শিব পাল্টা শর্ত দিলেন, যদি এক রাতের মধ্যে কাল্লু এককোটি শিবের (দেব দেবীর) মূর্তি বানাতে পারে তবেই শিব তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন কৈলাসে। যেই বলা সেই কাজ। কাল্লু লেগে পড়ল মূর্তি বানানোর কাজে। কৈলাসে যাওয়ার আকাঙ্খায় দ্বিগুন তিনগুন শক্তি লাগিয়ে সারাদিন সারারাত সে কাজ করতে থাকলো। কিন্তু নাহ! শেষ রক্ষা আর হলো না। ঊনকোটি (এক কোটি থেকে একটা কম) মূর্তি বানানো শেষ হতেই সূর্য ঊঠে গেল। আর একটা মূর্তি কম হওয়ায় শিবও কাল্লু কে কৈলাসে নিয়ে যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেলেন। এই ভাবেই ঊনকোটি, কাল্লুর হেরে যাওয়া শর্তের সাক্ষী হয়ে থেকে গেল।


ফিরতি পথে ভাবছিলাম কোন গল্পটা ঠিক তবে ? শিবের রুষ্ট হওয়ার গল্প না ফন্দি এঁটে সাধারণ ভক্তকে ঠকানোর গল্প, যে নাকি আবার আদিবাসী ? ঠাকুর দেবতার এহেন কাজকে কি ঠিক ঠকানো বলে না কি লীলা বলাই ভালো ? ঊনকোটির সবচেয়ে কাছের জায়গার(৮ কিমি) নাম “কৈলাসহর”, সেকি নিতান্তই কাকতালীয় নাকি তার ও আছে কোনও গল্প?

এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাক বা না যাক, বাঙালির ভ্রমণ মানচিত্রে , সমভাষী ত্রিপুরা (সরকারি ভাষা বাংলা) আর তার কোলে লুকিয়ে থাকা স্থানগুলির রূপ-রহস্যের উন্মোচন কিন্তু সত্যিই এক অতীন্দ্রিয় অনুভূতি।

                                            <---©-আদ্যনাথ--->

=======================================================