98>|| ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির::---||
29/04/2023
আমরা যখন গিয়েছিলাম লিঙ্গরাজ দর্শনে সেইসময় এখানে চন্দনযাত্রার উৎসব চলছে।
যে উৎসব অক্ষয়তৃতীয়াতে শুরু হয় এবং 22 দিন চলে। অর্থাৎ এইবৎসর
23 এপ্রিল থেকে 14 ইমে পর্যন্ত চলবে।
আমরা গিয়েছিলাম সাতদিনের দিন।
লিঙ্গরাজ মন্দির পূর্বভারতীয় রাজ্য উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে অবস্থিত প্রাচীন মন্দির গুলোর মধ্যে অন্যতম।
বিশ্বে একমাত্র শিব মন্দির যেখানে
মন্দিরটি লিঙ্গরাজ রূপি শিব কে উৎসর্গীকৃত, কিন্তু এখানে গর্ভগৃহে বিষ্ণু ভগবানের ছোট মূর্তি অধিষ্ঠিত আসছেন।
আর এখানে শিব ও বিষ্ণু উভয় দেবতার পূজা হয় একই লিঙ্গে।
শিব ও বৈষ্ণবধর্মের মিলন স্থান উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরেই এই হর-হরি’ লিঙ্গরাজ।
হিন্দুধর্মের দুটি ধারা শৈবধর্ম ও বৈষ্ণবধর্মের মিলন ঘটেছে এই মন্দিরে যেখানে বিষ্ণু ও শিবের মিলিত রূপ হরিহরকে পূজা করা হয় এক সাথে।
লিঙ্গরাজ মন্দির ভুবনেশ্বরের সব থেকে উঁচু মন্দির। এই মন্দিরের কেন্দ্রীয় মিনারটি ১৮০ ফুট উঁচু। মন্দিরটি কলিঙ্গ স্থাপত্যকলা এবং মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। মন্দিরটি লিঙ্গরাজ রূপি শিব কে উৎসর্গীকৃত।
মন্দিরটি ভুবনেশ্বর শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূস্থাপনা ও অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। লিঙ্গরাজ মন্দির ভুবনেশ্বরের সব থেকে বড় মন্দির।
ভুবনেশ্বর মানেই লিঙ্গরাজ মন্দির।
লিঙ্গরাজ মন্দিরটি পূর্বমুখী এবং চুনাপাথরে তৈরী। মন্দিরের প্রধান প্রবেশ পথটি পূর্বে হলেও উত্তর ও দক্ষিণে দুটি ছোট প্রবেশপথ আছে।
ধারণা করা হয়ে থাকে মন্দিরটি সোমবংশী রাজত্বকালে নির্মিত যা পরবর্তীতে গঙ্গা শাসকদের হাতে বিকশিত হয়। মন্দিরটি দেউল শৈলীতে নির্মিত যার চারটি ভাগ আছে। সেগুলো হচ্ছে বিমান, জগমোহন, নাট্যমন্দির এবং ভোগমন্ডপ। ভাগগুলোর উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। মন্দির চত্ত্বরটি দেয়ালঘেরা।
তবে বহু পূর্বে এই ভুবনেশ্বর শহরটির নাম ছিল একাম্র ক্ষেত্র।পুরান মতে এখানে এক আম গাছ বা এক আম্র গাছের নীচে পূজিত হতেন ‘হর-হরি’ অর্থাৎ একসাথে বিষ্ণু ও শিব , এবং একই লিঙ্গে। আসলে
তাঁরা একসাথে স্বর্গ-মর্ত-পাতালের অধীশ্বর, ত্রিভুবনেশ্বর আর সেই কারনেই এই এক লিঙ্গ রূপই ভুবনেশ্বর। আর এই রূপেই বিষ্ণু বা নারায়ণ পূজিত শিলায়।
আর আশ্চর্যের বিষয় এখানেই, লিঙ্গম বা শিবের মাথায় উপর বিষ্ণু এলেন কী ভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া অসম্ভব
তবে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন।
এটি একটি শিব মন্দির। এর প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছিল সৌম্যবংশী রাজাদের হাতে। তাঁরা ছিলেন শৈব উপাসক। উড়িষ্যায় বর্তমানে যে কটি শিব মন্দির আছে, লিঙ্গরাজ মন্দির তার মধ্যে অন্যতম। মন্দির নির্মাণ শেষ হয়েছিল গঙ্গাবংশীয় রাজাদের হাতে।
আর ঠিক সেই সময়েই উড়িষ্যা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিষ্ণু বা জগন্নাথ দেবের আরাধনা। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নির্মাণ পর্ব শুরু হয় এই সময়ে। আর সেই সময়েই অনুমান করা হয় যে কিছুটা জোর করেই হয়তো শিবের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিষ্ণু বা নারায়ণকে।
মূল লিঙ্গরাজ মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ মন্দির । পুরাতত্ত্ববিদ ফার্গুসন মনে করেন, মন্দিরের আদি কাঠামো তৈরি হয়েছিল ৬১৫ থেকে ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজা ললাটেন্দু কেশরীর হাতে। বর্তমানে যে মন্দিরের গঠন দেখতে পাই, সেটার নির্মাণ শুরু রাজা যযাতির, (১০২৫-১০৪০ খ্রিস্টাব্দ) শাসনকালে। পরে রাজা অনন্ত কেশরী ও উদ্যত কেশরী সক্রিয় ভাবে যুক্ত হন এই মন্দির নির্মাণে।
পুরো মন্দির চত্বরটাই উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।
★"জগমোহন"::--চন্দন কাঠের বিশাল প্রধান ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেই দেখলাম মন্দিরের প্রথম অংশ, "জগমোহন", অর্থাৎ ভক্তদের জমায়েত হওয়ার জায়গা।
★"নাটমন্দির"=তারপর এগিয়ে গিয়ে জগমোহন থেকে একটু উঁচুতে দেখতে পেলাম "নাটমন্দির",
এই অংশটি মূলত উৎসবের সময়ে ব্যবহার হত বা এখনো হয়।
★"ভোগ মন্দির",= এরপর আরো একটু উঁচুতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোটো আয়তনের "ভোগ মন্দির", অর্থাৎএখানেই প্রভুকে ভোগ নিবেদন করা হয়।
★"বিমান"=সব শেষে আরও একটু উপরে আছে "বিমান" অংশ। এই অংশে চূড়ার
উচ্চতা ১৮০ ফুট। এখানেই অধিষ্ঠান করছে ‘হর-হরি’ লিঙ্গরাজ।
এখানে মূল ভগবান রূপে "বিষ্ণু" বা "নারায়ণের" ছোটো একটি মূর্তিই পূজিত হন।
জগমোহন থেকে ক্রমে বিমান পর্যন্ত মন্দির অংশের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
★সম্পুর্ন মন্দিরটি ঘুড়ে দেখলাম, অপূর্ব নির্মাণ কৌশল আর সম্পুর্ন মন্দিরটি তৈরি হয়েছে বেলে পাথর ও ল্যাটেরাইট বা যাকে বলাহয় 'মাকড়া' পাথর দিয়ে। গোটা উড়িষ্যায় মন্দিরের গায়ে এরকম সূক্ষ্মতম ভাস্কর্যর নিদর্শন আর একটাও দেখিনি।
আরও অবাক হলাম যে মূল দেউলের গায়ে এক ইঞ্চি এমন কোন জায়গা নাই যেখানে ভাস্কর্য নেই।
দেখলাম পাথরের গায়ে তৈরি করা আছে মানুষ, পশু ও দেব-দেবীর ছবি বা মূর্তি।
আর যে খানে যেখানে ফাঁকা জায়গা আছে সেগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে নানা সূক্ষ্ম নক্সা।
আর সবার উপরে মাথায় মন্দিরের চূড়াতে আছে উল্টানো কলস।
নাটমন্দিরের গায়ে নারী-পুরুষের যুগল মূর্তি, নর্তকী রমণী, মানব জীবনের নানান মুহূর্ত।
তবে এখানে পুরীর মন্দিরের মতন
কোন প্রকার কোন মৈথুন মূর্তি খুঁজে পেলাম না।
পুরীর মন্দিরে দেখাযায় অনেক প্রকারের মৈথুন মূর্তি, কিন্তু এই লিঙ্গরাজ মন্দিরে সেই প্রকার কোন মূর্তি একেবারেই অনুপস্থিত।
সুবিশাল জগমোহনের প্রবেশদ্বারে রয়েছে, সামনের পায়ে ভর দিয়ে বসে থাকা দুটি বৃহদাকার সিংহ, দ্বাররক্ষীর ভূমিকায়।
এছাড়াও মন্দির চত্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে করেছে ভোগ রান্নার জায়গা, পাতকুয়ো, ছোট বড় অসংখ মন্দির।
মন্দির গাত্রে সিঁড়ি বেয়ে একটু উপরে উঠেলেই দেখতে পাওয়া যায় বেশ বড় কষ্টি পাথরের গণেশ মূর্তি।
এখানকার সিঁড়ি গুলি বেশ উঁচু উচু,
এই লিঙ্গরাজ মন্দির ঘিরে বছরভর চলে
নানান প্রকারের উৎসব।
এহেন বিশাল মন্দিরের মূল দেবতা "বিষ্ণু" ভগবানের খুব ছোট মূর্তি দেখে অবাক হতে হয়। আরও অবাক করার কথা যে এই "বিষ্ণু" ভগবানই এখানে "শিব ও বিষ্ণু" এক সাথে উভয় রূপেই পূজিত হন।
মন্দিরের প্রধান দেবতা লিঙ্গরাজকে শিব এবং বিষ্ণু উভয় হিসেবে পূজা করা হয়।
★এই লিঙ্গরাজ মন্দিরের প্রধান উৎসব "শিব রাত্রি"র মেলা। সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে চলে প্রার্থনা। শ্রাবণ মাস ভর শিব ভক্তরা বাকে করে কাঁধে বয়ে মহানদী থেকে জল নিয়ে পায়ে হেঁটে মন্দিরে আসে বাবার মাথায় জল ঢালতে।
●●এখানে ভাদ্র মাসে বাইশ দিন ধরে চলে "চন্দন উৎসব"।
আর অশোকাষ্ঠমীর রথযাত্রা তো বিশ্ব বিখ্যাত মেলা যা নিয়ে নতুন করে কিছু বলবার নেই।
এখানে এমনিতে সারাদিন ধরে চলে নিত্য পূজা, মহাস্নান পর্ব, ভোগ নিবেদন।
তবে জানতে পারলাম যে এই মন্দির থেকে লুপ্ত হয়েছে দেবদাসী প্রথা।
★★এই মন্দিরে প্রবেশ এখনও ‘অহিন্দু’দের জন্য নিষিদ্ধ।
লিঙ্গরাজ মন্দির সকাল ৬ টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ভোগ প্রদানের সময়ে বন্ধ থাকে। খুব ভোরে লিঙ্গরাজের ঘুম ভাঙাতে প্রকোষ্ঠে বাতি জ্বালানো হয়। তার পরেই স্নান ও আরতি করা হয়।
দুপুর বারোটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত মন্দির বন্ধ থাকে। দরজা বন্ধ হওয়ার পরে পঞ্চামৃত তথা দুধ, ঘোল, ঘি, মধু ইত্যাদি মিশিয়ে দেবতাকে মহাস্নান করানো হয়।
●বেলা এক টার সময়ে একটা পাকা ফল দুই টুকরো করে একটুকরো সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে এবং অন্য টুকরো দ্বারপালের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়।
●দুপুর এক টা থেকে দেড়টার মধ্যে দেবতাকে বল্লভ ভোগ দেওয়া হয়।
খাবারের একাংশ পার্বতীর মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে নিবেদন করা হয়।
●দুপুর দুটোয় সকাল ধুপ (সকালের খাদ্য নিবেদন) অনুষ্ঠিত হয়।
লিঙ্গরাজকে খাবার প্রদানের পরে পার্বতীর মন্দিরে যাওয়া হয়। সাড়ে তিনটায় ভান্দা ধুপ অনুষ্ঠিত হয়।
●পরে খাবারটি মহাপ্রসাদ হিসেবে তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
★★উৎসব::--
★★শিবরাত্রি::--
লিঙ্গরাজ মন্দিরের প্রধান উৎসব হচ্ছে শিবরাত্রি যা ফাল্গুন মাসে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এবং এ সময়ে কয়েক হাজার ভক্ত মন্দির পরিদর্শনে আসে। সারাদিনের উপবাস শেষে এই শুভদিনে লিঙ্গরাজকে বেলপাতা নিবেদন করা হয়। প্রধান উদ্যাপন হয় রাতে যখন ভক্তদল সারা রাত প্রার্থনা করে। মন্দির চত্ত্বরে মহাদ্বীপ প্রজ্জ্বলনের পর ভক্তদল তাদের উপবাস ভঙ্গ করে।
★★শ্রাবণমাসে::--
প্রতিবছর শ্রাবণমাসে হাজারো তীর্থযাত্রী মহানদী থেকে জল এনে পায়ে হেটে জল মন্দিরে বয়ে আনেন।
★★ভাদ্র মাসে সুনিয়ান দিবস::--
ভাদ্র মাসে সুনিয়ান দিবস পালন করা হয় যেদিন মন্দিরের চাকর, সেবায়েত এবং মন্দিরের জমি গ্রাহকেরা লিঙ্গরাজের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা নিবেদন করে।
★★চন্দন যাত্রা::--
অক্ষয়তৃতীয়ার দিন এই উৎসব পালিত হয়।
চন্দন যাত্রা হচ্ছে ২২ দিনব্যাপী উৎসব যখন মন্দিরের সেবায়েতরা বিন্দুসাগরে বিশেষভাবে নির্মিত নৌকায় অবস্থান করে। দেবতা এবং সেবায়েতগণকে চন্দনবাটা মাখানো হয়। নৃত্য, একসাথে ভোজন ইত্যাদির আয়োজন করে মন্দিরসংশ্লিষ্ট জনগণ।
★★রুকুন রথ যাত্রা::--
লিঙ্গরাজ মন্দিরের বাৎসরিক রথযাত্রা রুকুন রথ যাত্রা।
প্রতিবছর অশোকাষ্টমীতে লিঙ্গরাজ মন্দিরে রথ উৎসবের আয়োজন করা হয় যা রথযাত্রা নামে পরিচিত। একটি রথে চড়িয়ে দেবতাকে রামেশ্বর দেউল মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। হাজারো ভক্ত রথকে অনুসরণ করে ও রথ টানে। উজ্জ্বলভাবে সুসজ্জিত রথে লিঙ্গরাজ ও তার বোন রুকমনির মূর্তি থাকে।
================
অক্ষয়তৃতীয়ায় চন্দনযাত্রা::--
29/04/2023:::--
আমরা ভুবনেশ্বরে লিঙ্গরাজ দর্শনের পরে গেলাম পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে
চন্দনযাত্রার একটু আনন্দ উপভোগ করতে।
এই চন্দনযাত্রা দেখতে আমরা সপ্তম দিনে পৌঁছে ছিলাম পুরীর মন্দিরে।
অর্থাৎ আমরা 29 এপ্রিলে পৌঁছে ছিলাম।
এইবৎসর চন্দনযাত্রা শুরু হয়েছে 23 এপ্রিল অক্ষয়তৃতীয়ার দিন থেকে।
চন্দনযাত্রা একটি হিন্দু উৎসব। এই উৎসবটি বিশেষত জগন্নাথের সঙ্গে যুক্ত। প্রতি বছর পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে অক্ষয়তৃতীয়ার দিন এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনে রথযাত্রা উৎসবের জন্য রথ নির্মাণ শুরু হয়ে থাকে। সমগ্র উৎসবটি চলে ৪২ দিন ধরে। প্রথম ২১ দিন প্রতিদিন প্রধান দেবতাদের প্রতিনিধিমূর্তি সহ পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত পাঁচটি শিবলিঙ্গ সুসজ্জিত করে শোভাযাত্রা সহকারে জগন্নাথ মন্দিরের সিংহদ্বার থেকে নরেন্দ্র তীর্থ জলাধার অবধি নিয়ে যাওয়া হয়।বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের পর দেবতাদের একটি সুসজ্জিত রাজকীয় নৌকায় চাপিয়ে সান্ধ্যভ্রমণের জন্য জলাশয়ে ভাসানো হয়। শেষ ২১ দিনের যাবতীয় অনুষ্ঠান অবশ্য মন্দিরের ভিতরেই হয়ে থাকে।
============================
বাগবাজারের গৌড়ীয় মিশনে শ্রীকৃষ্ণের ‘চন্দনশৃঙ্গার’।
“গোপাল কহে পুরী আমার তাপ নাহি যায়/ মলয়জ চন্দন লেপ তবে সে জুড়ায়...” কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-তে আছে, মাধবেন্দ্র পুরী তাঁর আরাধ্য গোপালের জন্য নীলাচল থেকে চন্দন নিয়ে বৃন্দাবন ফেরার পথে রেমুণা-তে গোপীনাথ বিগ্রহে সেই চন্দন লেপন করেন, পালন করেন আরাধ্যের আদেশ। স্কন্দপুরাণ-এর উৎকলখণ্ডে আছে, পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে অক্ষয়তৃতীয়ায় শ্রীবিগ্রহে চন্দন লেপনের আদেশ দেন স্বয়ং জগন্নাথ। গ্রীষ্মে শ্রীবিগ্রহে চন্দন লেপনের এই বৈষ্ণব পরম্পরা মেনে বাগবাজারের কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী স্ট্রিটে গৌড়ীয় মিশনে অক্ষয়তৃতীয়ার দিন থেকে শুরু হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের ‘চন্দনশৃঙ্গার’। একুশ দিন ব্যাপী মহোৎসবে চন্দন লেপনের পর প্রতি দিন নানা বেশে সেজে উঠছেন শ্রীকৃষ্ণ, যেমন— নটবর, রাজাধিরাজ, খটদোলী, চক্রনারায়ণ, নৌকেলী, রাসমণ্ডল বেশ ইত্যাদি (ছবিতে গোমতীকৃষ্ণ বেশ)। প্রতি দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিগ্রহ দর্শন করা যাবে, শোনা যাবে শ্রীমদ্ভাগবত-কথা, সঙ্কীর্তন, চন্দনযাত্রা মাহাত্ম্যকথা, দেখা যাবে আরতি, নৃত্য। এই সব কিছুই আগামী ১৩ মে পর্যন্ত।
=========================
চন্দন যাত্রা::--অক্ষয় তৃতীয়াতে::--
দীর্ঘ ২১ দিন ধরে প্রত্যহ পূজারী প্রভু গোপীনাথের শ্রীঅঙ্গে চন্দন লেপন করলেন। সেইদিন থেকেই চন্দন যাত্রা শুরু।
হিন্দু পুরাণ মতে, অক্ষয় তৃতীয়ার (Akshaya Tritiya) দিন সত্যযুগের অবসান ঘটিয়ে ক্রেতা যুগের সুচনা হয়। অক্ষয় তৃতীয়া হলো চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের তৃতীয়া তিথি, অক্ষয় তৃতীয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ তিথি, অক্ষয় শব্দের অর্থ হল যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। বৈদিক বিশ্বাসানুসারে এই পবিত্র তিথিতে কোন শুভকার্য সম্পন্ন হলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয়ে থাকে। উৎকলখণ্ডে বর্ণিত আছে, শ্রীজগন্নাথদেব মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নকে বৈশাখী শুক্লা অক্ষয় তৃতীয়াতে সুগন্ধি চন্দন দ্বারা জগন্নাথের অঙ্গে লেপন করার নির্দ্দেশ দিয়েছিলেন। সেদিন থেকে শুরু হয় চন্দন যাত্রা উৎসব। গ্রীষ্ম ঋতুতে শ্রীহরির অঙ্গে কর্পূর চন্দন লেপন করলে ভগবান শ্রীহরি প্রীত হন।
দুই বছর পর ভক্তদের উপস্থিতিতে এবার বিখ্যাত চন্দন যাত্রা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। পুরীর নরেন্দ্রপুকুর চন্দন যাত্রার জন্য সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। ঐতিহ্য অনুসারে, অক্ষয় তৃতীয়ার অনুষ্ঠান বিশ্ব বিখ্যাত রথযাত্রার রথ নির্মাণের সূচনা করে। চলতি বছরের ১ জুলাই জগন্নাথ রথযাত্রা উৎসব পালন করা হবে।
চন্দ্নযাত্রা
চন্দন যাত্রা চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে শুরু হয়ে ২১ দিন পর্যন্ত চলে। ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব এই দিনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে চন্দনযাত্রা মহোৎসবটি পালন করার জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। ভগবানের অঙ্গলেপন এক ধরণের ভক্তিমূলক কর্ম এবং চন্দন হল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রলেপন। যেহেতু ভারতে বৈশাখ মাস অত্যন্ত উষ্ণ থাকে, তাই চন্দনের শীতল গুণ ভগবানের আনন্দ প্রদান করে। জগন্নাথের দুই চক্ষু ব্যতীত সর্বাঙ্গে চন্দন লেপন করা হয়ে থাকে। এবং উৎসব-মূর্তি বা বিগ্রহগণকে নিয়ে শোভাযাত্রা করা হয় এবং মন্দির পুষ্করিণীতে নৌকাবিহার করা হয়ে থাকে।
শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে দেখা যায়, বৃন্দাবনে পরম বৈষ্ণব শ্রীমাধবেন্দ্র পুরীকে স্বপ্নে তাঁর আরাধ্য শ্রীগোপাল বলছেন, “আমার শরীরের তাপ জুড়োচ্ছে না। মলয় প্রদেশ থেকে চন্দন নিয়ে এসো এবং তা ঘষে আমার অঙ্গে লেপন কর, তা হলে তাপ জুড়োবে।” তার পর বৃদ্ধ মাধবেন্দ্র পুরীপাদ পূর্বভারতে নীলাচলে জগন্নাথধাম পুরীতে এসে রাজার কাছে পূর্ব স্বপ্নগত সমস্ত কথা বললেন। রাজা গোপালের জন্য এক মণ মলয়জ চন্দন, ২০ তুলা কর্পূর এবং এই চন্দন বহে নিয়ে আসার জন্য দুইজন সেবকের ব্যবস্থা করেদিলেন। মাধবেন্দ্র পুরীপাদ রাজার কাছে মলয়জ চন্দন ও কর্পূর নিয়ে বৃন্দাবনে ফিরছিলেন। পথে রেমুণাতে শ্রীগোপীনাথ মন্দিরে আসেন। সেই রাত্রে সেখানে শয়ন কালে স্বপ্ন দেখেন, গোপাল এসে বলছেন, “হে মাধবেন্দ্র পুরী, আমি ইতিমধ্যেই সমস্ত চন্দন ও কর্পূর গ্রহণ করেছি। এখন কর্পূর সহ এই চন্দন ঘষে ঘষে শ্রীগোপীনাথের অঙ্গে লেপন কর। গোপীনাথ ও আমি অভিন্ন। গোপীনাথের অঙ্গে চন্দন লাগালেই আমার অঙ্গ শীতল হবে।” সকালে শ্রীমাধবেন্দ্র পুরিপাদ পূজারীর নিকট রাত্রের স্বপ্নের সমস্ত কথা বলিলেন। পূজারী প্রভু শুনে খুব খুশি হলেন এবং কর্পূর আর চন্দন ঘষে শ্রীগোপীনাথের শ্রীঅঙ্গে লেপন করলেন। দীর্ঘ ২১ দিন ধরে এইভাবে প্রত্যহ পূজারী প্রভু গোপীনাথের শ্রীঅঙ্গে লেপন করলেন। সেইদিন থেকেই চন্দন যাত্রা শুরু হল।
=================================