3>|| ভ্রমন - উড়িষ্যার নীলগিরিকে ছুঁয়ে::||
For SV2 Souvenir
আদ্যনাথ রায়চৌধুরী
আবার বেরিয়ে পড়লাম আমরা দুজনে,
সবিতা ও আমি ঘুরলাম মনের আনন্দে।
উড়িষ্যার নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশে,
বনে জঙ্গলে তীর্থ দর্শনে মনোরম পরিবেশে।
এবারে আমাদের সফর পরিকল্পনা মাত্র পাঁচ দিনের, 26 ফেব্রুয়ারি থেকে পয়লা মার্চ 2016. সাম্য ও অন্তরা উৎসাহী হয়ে আমাদের এই ভ্ৰমন পরিকল্পনার নিখুঁত ব্যবস্থাপনা করে দিয়েছিল। আমরা মহা আনন্দে ঘুরে বেড়ালাম উড়িষ্যার নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশ এলাকাতে, পাহাড়ে জঙ্গলে ও সাথে কিছু তীর্থ স্থানে।
আমি চিরদিনের ভ্রমণ পিপাসু পথিক,ভ্ৰমন আমার এক নেশা, যে নেশায় মত্ত হয়ে থাকতেই ভালবাসি। আর ভ্রমনের নেশায় আমি জানতে চাই প্রকৃতিকে, ভালোবাসি চলার পথকে। খুঁজে নিতে চাই প্রকৃতির সৌন্দর্যকে, ভালোবেসে আদর করে। তাইতো উপলব্ধি করতে পারি যে একমাত্র ভ্রমনেই পাওয়া যায় অসীম আনন্দ ও জীবনের ছন্দ, খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃতির মাঝে নিজের অস্তিত্ব,চেনা যায় নিজেকে আদর করে ভালোবেসে প্রকৃতির সাথে মিশে, খুঁজে পাওয়া যায় জীবনের গভীর ভালোবাসাকে, যে ভালোবাসা কোনদিন হারাবেনা, চিরদিন থাকবে হৃদয়ের অন্তরাত্মার সাথে মনের একান্ত গভীরে। আমি চলতে ভালোবাসি তাই এগিয়ে চলি, দেশ থেকে দেশান্তরে, আর এভাবেই পৌঁছতে চাই জীবন থেকে অনন্ত জীবনের পথে। যেখানে আছে শুধু প্রকৃতির অপরূপ ছন্দ, শান্ত নিবিড় মহাজাগতিক গভীর মনের একান্ত ছন্দ আর সুনিবিড় আনন্দ। ভ্রমণে যেমন প্রকৃতিকে চেনা যায় তেমনি নিজেকেও জানা যায়, আর খুঁজে পাওয়া যায় বেঁচে থাকার ছন্দ ও আনন্দ, আর সেই কারণেই আমি ভ্রমন করি,
ভ্রমন করতে ভালোবাসি।
26/02/2016: শুক্রবার,
হাওড়া থেকে ফলকনামা এক্সপ্রেসে বালেশ্বর স্টেশনে পৌঁছলাম। সাম্য আমাদের জন্য আগে থাকেই সকল ব্যাবস্থা ঠিক করে বুক করে রেখে ছিল তাই বালেশ্বর স্টেশনে নামতেই দেখি রুপার্ক ভিলেজের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নামের ফ্লাগবোর্ড উঁচিয়ে,
আমাদের রিসিভ করার জন্য। আমরা দুপুর 12 টা নাগাদ ওদের গাড়িতেই পৌঁছে গেলাম রিসর্ট, এই রিসর্ট-এর নাম রুপার্ক ভিলেজ। (ROOPARK VILLAGE, KANTABONIA, ORISSA)
কটেজে পৌঁছতেই এক ভদ্র মহিলা এগিয়ে আসলেন আমাদের আপ্যায়ন করতে এবং তিনি জানালেন যে এই কটেজে আগামী কটাদিন শুদু আমরাই এখানকার অথিতি। আর কোন গেস্ট নাই ফলে সর্বদাই এক শান্ত ও সুস্থ নিরিবিলি পরিবেশে আরামে কাটবে কটা দিন।
পরে জানলাম যে ঐ ভদ্র মহিলাই কটেজের মালিক। এই অতিথি আপ্যায়নের ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে কেউকেটা মনে করে বেশ একটা আলাদা আনন্দ অনুভব করলাম।
প্রথম দিনে দুপুরে বেলার খাবারের মেনু ছিল ভয়ানক লোভনীয় সুন্দর।ঘি ভাত, ডাল ফ্রাই, লাউসাক, লাউ চিংড়ি,তিন রকমের সবজি, বেশ বড় সাইজের বাটা মাছ ভাজা। কাটাপোনার ঝোল, চাটনি, পাঁপড়, ছানাপোড়া। দুপুরের খাবারের পরে একটু আরাম করে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম আসে পাশে একটু ঘুরে দেখতে । দেখলাম নীলগিরি পাহাড়ের নীচে এটি একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম গোটা দশেক বাড়ি নিয়ে ছোট এই গ্রাম। গ্রাম টি ছোট হলেও অতি পরিপাটি ,সুন্দর করে সাজান গোছান ছবির মতন গ্রাম। এই গ্রামের পাশেই আমাদের এই ভিলেজ কটেজ।
সন্ধ্যায় আধো অন্ধকারের রাত্রে বেশ রোমান্টিক লাগছিল। তার ওপরে সম্পূর্ন ভিলেজে কেবল মাত্র আমরা দুই জন গেস্ট। সত্যি বেশ গা-ছম-ছম পরিবেশ। আমরা রাত্রে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। রাত্রের খাবারও ছিল বেশ লোভনীয়। সালাদ, ছোলেবাটরে, চিকেন তন্দুড়ি, তিনরকমের আচার, ক্ষির, রসগোল্লা।
কটেজে পৌঁছেই আমার বহু দিনের পুরানো স্মৃতি র সাথে আজকের নীলগিরির তুলনা করছিলাম মনে মনে, আজ থেকে 43 বছর আগে আমি নিজে তিন বার উড়িষ্যার এই অঞ্চলের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, নীলগিরি , দেবকুন্ড দর্শন করেছি। সেই সময়ের নীলগিরি অঞ্চল আর এখন কার এই অঞ্চল আকাশ পাতাল পার্থ্যক্য। তখন 1969 to 1973 এই অঞ্চল গভীর অরন্যে পরিপূর্ণ ছিল। দিনের বেলাতেও জঙ্গলে প্রবেশ করা ভয়াবহ ছিল। পুরো এলাকাতে সুধু দরিদ্র গ্রাম বাসী একটু ভাত খেতে পেলে কত আনন্দ হত ওদের। আমি নিজে ,নিজ
সাধ্য মত কিছু চাউল আলু সমান্য সবজি নিয়ে যেতাম। সেই টুকুই ওরা যে কত আনন্দের সাথে খেত ,তা এখন ভাবলে অবাক ও বিস্ময় বোধ হয়। তখন মানে শেষ যেবার গিয়ে ছিলাম আজ থেকে 43 বৎসর আগে 1973 তে তখন আমি Bsc 3rd year এর student . বাড়ির আর্থিক কারনে বাস ট্যাক্সি চালাই এবং মাঝে দাদার ঠিকাদারীর কাজের প্রয়োজনে মাটি কাটার লেবার যোগার করতে এই সকল অঞ্চলে এসে ছিলাম, এখানকার লোকাল মুন্সিদের সাথে। প্রতিটি কাজের মানুষ কে দাদন ( অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে, যে টাকা ওরা কাজকরে পরিশোধ করে দিত ) দিয়ে কাজের লোক নিয়ে যাবার জন্য। তখন এই অঞ্চলে পাহাড়ে বেশ বড় বড় বেল পাওয়া যেত সেই বেল এবং বিড়ি পাতা (কেন্দু পাতা) সংগ্রহ করাই এখাকার গ্রাম বাসীদের প্রধান উপার্জন ছিল। ওরা পাহাড় জঙ্গল থেকে বেল এবং বিড়ি পাতা সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করত। পরিবর্তে পয়সা নয়, পেত তেল,নুন, কেরোসিন আর সমান্য কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী । ওদের আহার বলতে ছিল বন্য শিকার, সাপ, ইঁদুর, খরগোশ,বা কখনো কোন বড় পশু। তবে বেশিরভাগ দিন দের ফল মূল খেয়েই দিন চলতো। ওদের কাছে আমিও খেয়েছি সাপের ঝলসানো মাংস। কি তার স্বাদ বলে বোঝানো যাবে না। না বলে দিলে বোঝাই যাবেনা যে ওটা সাপের মাংস। ওখানে ওদের সাথেই আমি খেয়েছি কন্দমূল, আহা কি তার স্বাদ।
এখন এখানে সকলে মুরগি বা চিকেনের Barbique খায়, আমরাও খাব , তবে সেই দিনের সেই সাপের ঝলসানো মাংস বা বারবিকিউ বা বনফায়ার সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ছিল। যা আজ ভাবতে বসে বিশ্বয়ে অবাক হতে হয়। তখন আদিবাসীরা সন্ধাতে একসাথে মাদল বাজিয়ে "হাড়িয়া" খেয়ে নাচ করত। যা আজ লুপ্ত প্রায়, তথাপি আমরা যে Roopark Village(রূপার্ক ভিলেজ ) নামক কটেজে পাঁচ দিন ছিলাম। তারা আমাদের সেই আদিবাসী নাচ (Tribal Dance) এর ব্যবস্থা করেছিল। তবে সেই পুরনো দিনের মত নয়। এখন নানা সুন্দর পোশাকে সেজে ছেলে ও মেয়েরা একসাথে নাচছিল। এ নাচে সুন্দরতা আছে কিন্তু সেদিনের মত প্রাণ নাই। আজ থেকে 43 বৎসর আগে এখানে কোন কটেজ ছিলোনা, ছিল কিছু গ্রাম্য মাটির বাড়ি, 25-30 জন কাজের লোক জোগাড় করতে পাঁচ ছয় টি গ্রাম ঘুরতে হতো। সেদিনের সেই কেরোসিন এর ডিব্রি ও কাঠ এবং পাতার আগুনের আলোতে সেই প্রাণ খোলা হৃদয় দিয়ে নাচ, সারা দিনের কষ্ট কে ভুলে প্রাণ খোলা সেই নাচ , যা আজও স্মৃতি তে বিদ্যমান। সেই আগুনেই ঝলসানো হত বন্য শিকার। নাচের মাঝে সুধু মুখিয়া এবং আমি (অতিথি হিসাবে) খাবার খেতে পারতাম। বাকি সকলে নাচের শেষে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে হাড়িয়া তে চুমুক দিয়ে ঝলসানো মাংস খেত। সে দিনের স্মৃতি কোনো দিন ভুলবার নয়, ভুলব ও না। সেই স্মৃতি হৃদয়ে গেথে আছে থাকবে।
27/02/2016: শনিবার
আজকের গন্তব্য দেবকুন্ড ফলস। এই অঞ্চলটি উড়িষ্যার উদালা ব্লক বারিপাদা থেকে 45 কিলোমিটার। মৌরভঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট। 21.57 Degree North and 86.57 degree East উচ্চতা 187 feet .এটি শিমলীপাল রেঞ্জের উদলা ডিভিশনের অন্তর্গত পাহাড় ও সমতল ভূমি। দেবকুন্ড জলপ্রপাত বালেশ্বর থেকে 87 কিলোমিটার। এখনো মানুষ বিশ্বাস করেন যে দেবতা গণ প্রত্যেক দিন ব্রহ্মমুহূর্তে এই কুন্ডে ও ঝর্ণা তে স্নান করতে আসেন। এখানে পাঁচটি ঝর্ণার জল পাঁচটি কুন্ডে পড়ে এবং সেই কারণেই এই স্থানের নাম পঞ্চ কুন্ড। এই পাঁচটি কুন্ডের নাম যথাক্রমে: অমৃত কুন্ড, ঘৃত কুন্ড , হলাদি কুন্ড ,দেব কুন্ড ,এবং দেবী কুন্ড। এই কুন্ডের উপর দিকে সিঁড়ি বেয়ে উঠলে নদীর উৎস মুখের নিকটে দেবী অম্বিকার ছোট সুন্দর মন্দির। এখানে মোট 360 টি সিঁড়ি। বর্তমানে উড়িষ্যা সরকার এই স্থান টি কে দূষণ মুক্ত রাখতে এখানে কোনপ্রকার চড়ুইভাতি বা কোনো প্রকারের গাড়ি কুন্ডের কাছে যাবার আদেশ দেয় না। ফলে এইখানে জঙ্গলের শুরুতেই বেরিকেড ও পাহাড়াদারের ব্যবস্থা করা আছে।
গাড়ি পার্কিং এর জায়গা থেকে মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি পর্যন্ত দেড় কিলোমিমিটার পথ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটেই যেতে হয়। ওই পথে আবার কোন কোন স্থানে জংলী হাতি অন্য জন্তুরাও পথ পারাপার করে। মানুষের সুবিধার জন্য কোন কোন জায়গাতে ইউরিনালের জন্য ছোট ছোট ঘর বানায় সরকারি তরফে। কিন্তু হাতিরা হামেশাই ওই ঘর গুলি ভেঙে তছনছ করে দেয়। তাহলেও এই দেড় কিলোমিটার পথ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খুবই সুন্দর নানান পাখি ও জীবজন্তুও দেখতে পাওয়া যায়। মূলত এটি হাতিদের সংরক্ষিত এলাকা। তথাপি গভীর জঙ্গল অতি মনোরম পথ নানান পাখির ডাক শুনতে শুনতে পথ চলা সে এক মনে রাখার মতন পাকদন্ডী ও পাথুরে পায়ে হাটার পথ। পথটি পাথুরে হলেও জঙ্গলের নানান ঝরাপাতায় ঢাকা যেন মখমলের মতন নরম পথ। আমার মনেহয় শুধু মুখে বলে বা দুইকলম লিখে এহেন সুন্দর প্রকৃতির বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এই দেবকুন্ড জলপ্রপাত গভীর জঙ্গলের মধ্যে, এই অঞ্চল দেখে বোঝা যায় যে জঙ্গলের সৌন্দর্য বর্ষা কালে চারিদিকে সবুজে সবুজে অপূর্ব রোমাঞ্চ কর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই সুরক্ষিত বনাঞ্চল উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের এক মহামিলন স্থান যেখানে নানান ক্রান্তীয় পশু পাখিদের আনন্দে বিচরণের ক্ষেত্র।সমগ্র দেবকুন্ড অঞ্চল আদিবাসী অঞ্চল। এই আদিবাসীদের জীবন ধরণের প্রধান উৎস চাষ ও শিকার।
দেবকুণ্ডের এই মন্দির টি উড়িষ্যার মৌরভঞ্জ এর রাজা 1940 খ্রিস্টাব্দে তৈরী করেছিলেন। এটি দেবী সতীপীঠের একটপিঠ, এখানে সতীর বাঁপায়ের পাতা পড়েছিল। পঞ্চ পান্ডবদের অজ্ঞাত বাসের সময় পান্ডব গণ এখানে তাদের দিব্যাস্ত্র লুকিয়ে রেখে ছিলেন একটি গাছে। গাছ টির নাম সমিবৃক্ষ। এখান থেকে কাছেই আছে একটি শিব মন্দির জানকিশ্বর মন্দির। এই শিব লিঙ্গ কে উদ্ভবলিঙ্গও বলে, কারণ এই লিঙ্গ নিজের থেকে মাটির নিচে থেকে উদ্ভব হয়েছেন। সেই কারণে এখানে শিব লিঙ্গটি উদ্ভব লিঙ্গ রূপে পূজিত হয়। মন্দিরটি চারিদিক থেকে সুন্দর বনানীতে ঘেরা ,অতি মনোরম স্থান। এই অঞ্চলের সৌন্দর্য চিরদিন মনে গেথে থাকার মতন শান্ত সৌন্দর্য। শিব ও শক্তির সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলন মনকে শান্ত করে দেয়। সকালে আমরা রওনা দেবার সময় কটেজের ম্যানেজমেন্ট দুপুরের খাবার ও বিকেলের টিফিন প্যাক করেই নিয়ে এসেছিল। আমরা দিনের খাবার খেয়ে আবার খানিকটা ঘোরাঘুরি করে বিকেল তিনটে নাগাদ কটেজের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলাম। পথে এক চায়ের দোকানে চা খেয়ে কটেজে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। অনেক সিঁড়ি বেয়ে ও হেটে বেশ ক্লান্ত লাগছিলো,কটেজে ফিরে একটু বিশ্রাম করে রাত্রি আটটায় রাত্রের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
28/02/2016: রবিবার,
আজ আমাদের গন্তব্য পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মহাদেব মন্দির ও পঞ্চলিঙ্গ কুন্ড এবং সন্ধ্যায় আমাদের bonfire বা বহ্ন্যুৎসব (Barbecue) বারবিকিউ পার্টি। কটেজের হিসাব মতন ওরা বলছিল বারবিকিউ পার্টি হবে সোমবার। কিন্তু সোমবার আমাদের কিছু অসুবিধার কারনে আমরা বলেছি যে বারবিকিউ পার্টি করতে হবে রবিবার । যেহেতু কটেজে একমাত্র আমরাই অতিথি সেই কারণে আমাদের ইচ্ছাপূরণে রবিবার সন্ধ্যায় বারবিকিউ পার্টি ব্যবস্থা হবে।
আমাদের কটেজ থেকে কাছেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর পাহাড়। পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ওড়িশার নীলগিরি পর্বতশ্রেণির অন্তর্গত অনুচ্চ পাহাড়। পাহাড়ের শীর্ষে বনদেবীর মন্দির। সামনে ছোট জলাশয়। শীর্ষের উচ্চতা ষোলোশো (1600) ফুট। কথিত আছে, রামের বনবাসকালে সীতা পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পুজো দিতেন। রাজা বনাসুরের আরাধ্য ছিল শিব। তিনিই ওই লিঙ্গগুলো খুঁজে পান। এই শিবলিঙ্গ ও জরাসন্ধের অনেক রোমাঞ্চকর পল্প আছে। সে সব গল্পে আর যাচ্ছিনা।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পাঁচটি ছোট ছোট লিঙ্গ। বিশাল বিশাল পাথরের খাঁজে। জলকুণ্ডের গভীরে , সর্বদা অবিশ্রান্ত ধারায় বয়ে চলা ঝর্ণার জল দ্বারা সৃষ্ট কুণ্ডের গভিরে আছেন পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। সেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বরকে খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ওড়িশার বালেশ্বর স্টেশন থেকে দূরত্ব 27.7 কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে। 21.41ডিগ্রি উত্তর ও 86.71 ডিগ্রি পূর্বে। পঞ্চ লিঙ্গ পাহাড় শিবের বাসভূমি। এটি সম্পূর্ণ আদিবাসী অঞ্চল। এখান থেকে 3 কিমি দূরে আদিবাসী গ্রাম পার করে খুমকুট ড্যাম ও ওয়াচ টাওয়ার। পঞ্চলিঙ্গ পাহাড়ে মাঘী সপ্তমী ও শিবরাত্রিতে 15 দিনের মেলা বসে।
আমরা সকাল সকাল রওনা দিলাম পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দর্শনে। আমাদের ট্রেকিং এর পথ পাহাড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে ,কখন আবার কোন বাড়ির উঠোনের ওপর দিয়ে। বাড়ি গুলি মাটির হলেও কিসুন্দর, প্রত্যেকটি বাড়ির সামনে উঠোনে সুন্দর করে আল্পনা আঁকা। আলপনা গুলি এতই সুন্দর যে প্রতিটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে । ওদিকে দাঁড়িয়ে পড়লেই পথ নির্দেশক তারা দেয় ,কারন মন্দিরে ভিড় হয়ে গেলে ফিরতে দেরি হবে। আমি বললাম হোক দেরি এমন সুন্দর আল্পনা গুলি একটু ভালোকরে না দেখে যাই কি করে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর চলা হবেনা তাই আবার এগিয়ে চললাম। পাহাড়ের নিচের পথ ধরে হাটা পথ ।পাহাড় ও গ্রামের মাঝে মোটা মোটা তারকাটার বেড়া দেওয়া ,যাতেকরে হাতিরা গ্রামে ঢুকে পড়তে না পারে।
নীলগিরির নিচে থেকে উপরের মন্দিরে উঠতে একটু কষ্ট হয়, কুন্ডে পৌঁছতে 311টি সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। তবে প্রতিটি ধাপের পাশে বসবার জায়গা করা আছে, চলতে চলতে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য। সেই কারণে ধীরে সুস্থে আরামে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা যায়। উপরে আরো ওপরে গহীন বন,দেখাযায় গাছদের ঠাসবুনট। বিশাল বিশাল গাছ দেখলেই বোঝা যায় গাছগুলি বহু পুরোনো। একসাথে এতগাছের শেকড় গুলি একে অন্যকে জড়িয়ে কুন্ডের উপরে সে এক ভয়ঙ্কর আচ্ছাদন তৈরী করেছে। বিশাল বিশাল পাথর আর বিশাল বিশাল গাছের শিকড় মিলে মিশে কোনটা যে গাছের শিকড় ও কোনটি পাথর তা দূর থেকে বোঝাই মুষ্কিল। এখানে নানান জীবজন্তু দর্শন মেলাও অসম্ভব নয়।পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরছে ঝরনা। সেই ঝরনার জল এসে জমছে নীচের একটি গর্তে বা কুণ্ডে। জলভর্তি এই গর্তের ভিতর রয়েছে পাঁচটি শিবলিঙ্গ। জলে হাত ডুবিয়ে শিবলিঙ্গগুলি স্পর্শ করা যায়। পঞ্চশিবকে সর্বদা ধুয়ে চলেছে উঁচু পাহাড় থেকে বয়ে আসা এক শীতল জলপ্রবাহ।
তবে আমি সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম এই ভেবে যে দেবাদিদেব মহাদেব পঞ্চলিঙ্গেশ্বর আমাকে তাঁর স্পর্শ দিয়েছেন। এমন কথা বলার একটাই কারন যে এখানে রোজ অজস্র ভক্ত আসেন কুণ্ডের জলের মধ্যেহাত ডুবিয়ে চঞ্চলিঙ্গেশ্বরের একটু স্পর্শ পাবার মনকামনায় ।
কিন্তু ঈশ্বরের এমনি মহিমা যে কেউ একশিবলিঙ্গের স্পর্শ পায়, কেউ দুই,কেউ তিন শিবলিঙ্গের স্পর্শ পান। কেউ কিছুই নাপেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যায়। খুব কম মানুষই পঞ্চলিঙ্গের স্পর্শ পান। এমন কঠিন জায়গায় পাথরের ভয়ঙ্কর ভাঁজে জলের ভিতরে হাত ডুবিয়ে শিবলিঙ্গ স্পর্শ করা বেশ কঠিন ব্যাপার। সামান্য একটু অসতর্কতাতাই যেকোন মুহূর্তে কোন অঘটন ঘটতে পারে, এবং সেই রকম চিন্তা করে সবিতা মন্দিরে পুজো দিয়ে বসে গেল চাতালের সিঁড়িতে। আমি এগিয়ে গেলাম কয়েকজন লোক লাইন দিয়ে আছে, একজন দিশারী লাঠি হাতে ঝরণার পশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন নির্দেশ করে দিচ্ছেন পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য। কিভাবে কোথায় পা রেখে কিভাবে শিব লিঙ্গের স্পর্শ পাওয়া যাবে সেটি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ গাইডের কাজ করছেন। আমি যখন সুযোগ পেলাম কাছে গিয়ে দেখি স্রোতের উপরে পাথরের ফাঁটলে যেখান দিয়ে কুন্ড থেকে জল বয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে সেই পাথরের খাঁজে বাঁশ দিয়ে ভালো করে জায়গাটি সংরক্ষিত করেরেখেছে যাতে করে ভুল করলেও যেন কারুর কোন বিপদ না হয় বা কেউ যেন পাথরের ভাঁজের গর্তে পরে না যায়।
আমি দিশারীর কথামত পাথরের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে দেহের ভারসাম্য রক্ষাকরে চেষ্টা করতে করতে সম্পুর্ন নুয়ে পড়লাম, ডান হাত জলের তলায় ডুবিয়ে দিলাম। এবং কি আশ্চর্য,সহসা মনভরে গেল আনন্দে ।পাশাপাশি পাঁচটি শিবলিঙ্গের মত গড়ন, মসৃণ হ্যাঁ আমি বার বার ওপরে নিচে হাত বুলিয়ে খুব ভালো করে অনুভব করেছি। আমি যতই হাত বোলাচ্ছি মনে ততই বেশ এক আনন্দ অনুভব হচ্ছিল। আমি কেমন যেন হারিয়ে গেলাম,
মনে এক অদ্ভুত আনন্দ সনুভব করলাম মনে হল যেন সাক্ষাৎ সয়ম্ভূ কে দেখছি এবং তিনিও আমাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন আরও হাত বোলাতে। এমনি করে বেশ কিছুক্ষন কাটার পরে দিশারী বললেন 'বাবা উঠিয়ে পিছে বহুত আদমি খারা হায়' , কারুর দেরী হলে দিশারী তার লাঠি দিয়ে খোঁচা দেয়। কিন্তু আমার বেলায় দেখলাম শুধু মুখেই বললো তাড়াতাড়ি করতে। আমি যেহেতু একটু বয়স্ক সিনিয়র সিটিজেন তাই হয়তো আমাকে একটু অনুরোধ করলো মাত্র। আমি উঠে দাঁড়াতেই দিশারী বললেন "কেয়সে লাগা বাবা " আমি বলেছিলাম অপূর্ব অপূর্ব। সত্যি আজ আমি ধন্য। আমি চলে এলাম, কিন্তু মনে প্রাণে এক গভীর আনন্দ প্রশান্তিতে হৃদয় ভরে গেল। পঞ্চ শিবের অসীম কৃপা অনুভব করে আমি ফিরে এলাম প্রফুল্ল মনে।
জামা প্যান্ট ভিজে গেছে ঝরণার জলে, তাতে কি হয়েছে ওপরে চাতালে বেশ ভালো রোদ ছিল শুকানোর জন্য।এবার একটু নীলগিরির ওপরে অরণ্যের ভেতরে একটু ঘুরে এলাম। একলা বেশি দূরে গেলাম না।মনের আনন্দে নেমে আসলাম নিচে। এই দেবস্থানের পাশাপাশি এখানে রয়েছে মন ভালো করার মতন পরিবেশ সহ ঘন জঙ্গল । চারপাশ ঘিরে রয়েছে আম, শিরীষ, শাল, অশোক, আকাশমণি ইত্যাদি গাছ। বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। দুপুরেও শান্ত স্নিগ্ধ ছায়া ঢেকে রাখে চারদিক। সাথে রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটি মন্দির যেখানে আছে পার্বতী , হনুমান এবং আরও নানান দেব দেবীর মন্দির। এখানে চাইলে ট্রেকিং করে পাহাড়ের উপরে যাওয়া যায়। পাহাড়ের শীর্ষে বনদেবীর মন্দিরে। তবে উপরে যেতে হলে এলাকার কোন লোককে সঙ্গে রাখলে ভালো ,কারন বন্যা জন্তুর হামলা থেকে বাঁচতে ও পথ চিনে ফিরে আসতে যেন কোন অসুবিধা নাহয়।নিকটবর্তী দোকান থেকে ডালা কিনে পুজো দেওয়ার সুবন্দোবস্ত রয়েছে। পুজো দিতে হয় কুন্ডের কাছে চাতালের উপরে প্রতীক রূপে রাখা পাঁচ শিবলিঙ্গ।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পুজো সেরে আমরা আবার কটেজে ফিরে এসে সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে উঠে বসলাম গাড়িতে। গাড়ি ছুটলো নীলগিরি, কুলডিহার দিকে। এখান থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে এক আকর্ষণীয় জায়গা। যার নাম কুলডিহার জঙ্গল। এই জঙ্গলে সত্যি এক সুন্দর মনোরম পরিবেশ, পথের দু’পাশে শাল, সেগুন, ও আরও নানান গাছের ঘন জঙ্গল। ওই জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে মোরাম বিছানো লালমাটির রাস্তা। গাছে গাছে পাখিদের কলতান, অপূর্ব বিশুদ্ধ শীতল হওয়া, সব মিলিয়ে সে এক দারুণ পরিবেশ রোমাঞ্চ কর অভিজ্ঞতা। কুলডিহার এমন শান্ত সুন্দর পরিবেশে ইচ্ছা করে হারিয়ে যাই ওই গভীর জঙ্গলে। একটু এগিয়েই পেয়ে গেলাম রিসিয়া ড্যাম। আমাদের ড্রাইভার জানালেন কুলডিহার এই জঙ্গলে হরিণ, হাতি, লেপার্ড, বাঘ-বাইসন-হরিণ-বিষাক্ত সাপ আর ভয়ঙ্কর দর্শন ভালুক ঘুরে বেড়ায় নিশ্চিন্তে। এখানকার ভয়ঙ্কর ভাল্লুকদের বাঘ-হাতিও এড়িয়ে চলে। আমরা দুজনে যেন বেশি ভেতরে না যাই। বেশি লোক হলে একটু নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। কুলডিহা জঙ্গলে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরলাম কটেজে।
হঠাৎ দেখি আকাশের মুখ ভার, আর ঠিক সন্ধ্যতে শুরু হয়েগেল বৃষ্টি। সন্ধ্যায় আমাদের বারবিকিউ পার্টি হবার কথা। আর এই bonfire বারবিকিউ পার্টি মানেই এক আলাদা অনুভূতি। সকাল থেকেই বেশ একটা আলাদা অনুভূতি তে মন মেজাজ বেশ রোমাঞ্চিত ও আনন্দে ভরপুর ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে একটু চিন্তিত ছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ বৃষ্টি হবার পরে বৃষ্টি একটু থামতেই কেয়ারটেকার ডাকতে আসলেন বারবিকিউ হবে। এহেন bonfire বা বারবিকিউ এতে আমার একটু উত্সাহ বেশি। সবিতার তেমন উৎসাহ ছিলোনা । যেটুকুও ছিল তাও ওই বৃস্টিতে ধুয়ে মুছে গেছে। বৃষ্টির অবস্থা দেখে ভাবেছিলাম আজ আর বারবিকিউ হবেনা সেই কারণে আমরা রুমে কম্বল জড়িয়ে গল্প করছিলাম। এখন সন্ধ্যার পার্টি হবে জেনে গায়ে কম্বল জড়িয়ে গেলাম এই বারবিকিউ চাতালে৷ সেখানে আমরা দুজন ও কটেজের কয়েক জন গোল করে ঘিরে বসে পড়লাম। আমাদের জন্য চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা ছিল। কটেজের কিছু ছেলে ও মেয়ে মিলে মোট দশ জন ছিলাম। একটু পরেই কিছু ছেলে মেয়ে সুন্দর পোশাকে মাদল ঘুঙুর ও নানান সরঞ্জাম নিয়ে এসে পৌঁছলো। বুঝলাম ওরা নাচ করবে। তাই ব্যাপারটা বেশ রোমান্টিক হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে,কাঠ গুলি পুড়ে যাবার পরে লাল গনগনে আগুন তার উপরে আগেথেকে মসলা মাখিয়ে ম্যারিনেট করে রাখা মুরগি গুলো শিকে গেঁথে নিয়ে সেকতে শুরু করলো। মনে হয় গোটা ছয়েক মুরগি আগুনে ঝলসান হচ্ছিল, মাঝে মাঝে ব্রাশদিয়ে তেল মাখাচ্ছিল।
ওদিকে কিছু ছেলে মেয়ে সুন্দর পোশাকে সেজে ঝুমুর ও মাদল নিয়ে আগুনকে ঘিরে নানান ভঙ্গিমায় নাচতে শুরু করলো। বারবিকিউর ঝলসানো মাংস সাথে তন্দুড়ি রুটি । তাও আবার এই বৃষ্টি ভেজা পার্কের খড়ের ছাউনির নীচে। অল্পতেই জমে উঠলো নাচ ও বারবিকিউর পার্টি। মেয়েদের তালে তালে ছেলেরাও মাদল বাজিয়ে নাচ, বেশ ভালোই লাগছিলো।
তখনও একটু একটু ঝোড়োহাওয়া মাঝে মাঝে শীতল পরশ দিয়ে যাচ্ছিল। ওদিকে জঙ্গলে মাঝে মাঝে দূরে পশুদের ডাক বিশেষ করে হাতির ডাক শোনা যাচ্ছিল। পাখিরাও ঝোড়ো হাওয়ায় এদিক সেদিক উড়ে উড়ে ডাকাডাকি করছিল। একটু অন্ধকার হতেই সামনে পাহাড়ের ঢালে মনে হচ্ছিল হাজার হাজার আলো জ্বলছে নিবছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে, ঝোপ ঝাড়ে জোনাকিরাও যেন গ্রাম্য মেয়েদের নাচের তালে তাল মিলিয়ে নেচে চলেছে।তাই সেদিন আমাদের bonfire ছিল বেশ মনে রাখার মতন। এমনি করে বেশ অনেক রাত পর্যন্ত চললো আনন্দ ফুর্তি। বারবিকিউর ঝলসানো দেশী মুরগির মাংস সাথে তন্দুরী আরো দুটি আইটেম ছিল, আর ছিল রসগোল্লা ও আইস্ক্রীম। যে মেয়েরা নাচ করছিলো ওদের বাড়ি আসে পাশের গ্রামে কারুর একটু দূরে। কটেজের ব্যবস্থাপনায় ওরা নাচ করে পেটের দায়ে। রাত্রী 9:30 মিনিটের পরে মেয়েরা বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো কারন রাতের অন্ধকার তার ওপরে বৃষ্টির রাত, ওদের বাড়ি ফিরতে অসুবিধা হবে। নানা হিংস্র পশুদের থেকে একটু সাবধানতা অবলম্বন করাই ভালো।
ওরা নাচ বন্ধ করে চলে যাবার পরে আমরাও খাওয়া শেষ করে সকলকে বিদায় জানিয়ে শুতে চলে গেলাম। জঙ্গলে ঘুরে অনেক হেটে বেশ ক্লান্ত লাগছিল। সবে ঘুমটা এসেছে এমন সময় হঠাৎ আমাদের কটেজের বাইরে কিছুর আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল মনে হচ্ছিল করা যেন হাসছে। একটু পরেই আমার ভূল বুঝতে পারলাম এ কোন হাসির আওয়াজ নয় এ হোল হায়নাদের ডাক বা আওয়াজ। সেইকারনে ঘুম ভেঙে গেল ভাবলাম টর্চ নিয়ে বাইরে যাই। কিন্তু না, ভাবলাম যদি অনেক হয়না থাকে তবে বিপদ হতে পারে। বেশ কিছু পরে কিছু হাতির ডাক শুনতে পেলাম। বাইরে তখন ঝিম ঝিমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছিল।
29/02/2016: সোমবার
সকালে ঘুম ভাঙতেই ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে রাত্রের কথা বলতেই উনি বললেন তেমন কিছু নয়, রোজ রাত্রেই পাশের পাহাড় থেকে হাতি, হয়না, ভাল্লুক নেমে আসে খাবারের খোঁজে। গ্রামে উপদ্রব মচায়। আর সেইকারনে গ্রাম তার দিয়ে ঘেরা থাকে। তবুও ওরা উপদ্রব করে। গত কাল রাত্রে কটেজের খামার ভেঙে তিনটে ছাগল ও কয়েকটি মোরগ নিয়ে গেছে হায়নার দল। পরে হাতি গুলি আসতেই বোধ হয় পালিয়েছে হায়নার দল। ফরেস্ট অফিসে খবর পাঠান হয়েছে। আমরা যখন সকালের চা পান করছিলাম ঠিক তখনই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের চার জন লোক এসে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে কটেজের বাইরের দিকে গেলেন। ওনাদের সাথে আমি ও গেলাম। কটেজের পেছনের দিকে র জঙ্গল দেখে মনে হচ্ছিল এখানে রাত্রে কোন ভয়ংকর যুদ্ধ হয়ে গেছে । গাছ পালা সব লন্ড ভন্ড কতো গাছ মাটি থেকে উপরে পড়েআছে। বৃষ্টি ভেজা মাটিতে কিছু বেশ বড় বড় হাতির পায়ের ছাপ খুব স্পষ্ট ছিলো। ওনারা সকলে পশুদের পায়ের ছাপ মাপ-জোপ কোরছিলেন। দেখলাম জঙ্গলের পাশে এক নালার ধারে দুটো ছাগল ও একটা হায়নার বাচ্ছা মরে পড়েআছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা ওই ছাগল দুটি ও হায়নার বাছাটা জিপে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। ওনারা বলছিলেন হায়নার সাথে হাতিদের লড়াই সচরাচর হয়না। তবুও এমন কেন হোল সেই বিষয়ে ওনাদের বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছিল। আর আমি ভাবছিলাম ভাগ্গিস আমি রাত্রে বের হয়নি, বের হলে কি-যে হতো ! সেই চিন্তা করলে এখনো বেশ শিহরণ অনুভব করি । আবার আপসোস ও হচ্ছিল যে ঘরের বাইরে এমন লড়াইটা দেখতে পেলাম না। রাত্রে তো ভালো ঘুম হয়নি তবুও বেশ একটা আনন্দের অনুভব ছিলো।
গত রাত্রের এমন ভয়ানক ঘটনার পরে মনে এক রোমান্টিক অনুভূতি নিয়ে
আজ আমরা নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশে দেখলাম প্রাচিন রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ ও জগন্নাথ মন্দির। প্রথমেই কাছেই জগন্নাথদেবের মন্দির। এই মন্দিরটি বেশ পুরনো। নীলগিরির রাজাদের তৈরি। পুরীর জগন্নাথদেব মন্দিরের অনুকরণে। এরপরে দিনের খাবারের খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম, আশেপাশের গ্রাম জঙ্গল ঘুরে দেখতে । কটেজের ম্যানেজার একজন লোককে সঙ্গে দিয়েছিলেন। ফলে খুব সুন্দর করে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালাম। হঠাৎ কোত্থেকে যেন ভেসে এল মেঘের পরে মেঘের দল সঙ্গে জোরদার জোলো হওয়া ৷ সহসা চারিদি অন্ধকার করে, শুরু হল মেঘের গর্জন, বৃষ্টি নামবে বুঝে তাড়াহুড়া করে কটেজের দিকে দৌড় ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি ৷ সঙ্গে তেমনি হাওয়ার দাপট৷ সেই বৃষ্টির দাপট চললো বিকেল গড়িয়ে রাত্রি পর্যন্ত। অগত্যা আজকের সন্ধ্যা ঘরে বসেই গল্প করেই কাটালাম ৷ আমি আমার কিছু অভিজ্ঞতার গল্প বলছিলাম সবিতাকে। আমার গল্প শেষ হওয়ার আগেই অবশ্য বৃষ্টি ধরে গেল ৷ আর রাত্রের ডিনারের ডাক পড়লো।
আজরাত্রের ডিনারে মেনু ছিল আমার পছন্দের কাঁকড়া আর তন্দুড়ি রুটি। সঙ্গে বাটার ডবল ডিমের তরকা। আর ক্ষীরের চমচম। বেশ আয়েশ করে খেয়ে সকল স্টাফ কে গুড নাইট জানিয়ে কম্বল জড়িয়ে ঘুমের দেশে চলে গেলাম।
01/03/2016: মঙ্গলবার
আজ ঘরে ফেরার পালা। রাতের বৃষ্টি আজ সকালকে করে তুলেছে অপরূপা রূপসী। সকালে ব্রেকফাস্ট করে একটু কাছের বাজারে গিয়ে কিছু ফল কিনলাম, তারপরে দুপুরের লাঞ্চের পরে বাক্স-প্যাটরা গুছিয়ে ঘরে ফেরার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। গাড়ি তৈরী ছিল, আমাদের বালেশ্বর স্টেশন পৌঁছে দিয়ে গাড়ি ফিরে গেল। আমরাও ট্রেনে করে ফিরে আসলাম হাওড়া।
আমি মনেকরি ভ্রমণ কেবল ঘুরে বেড়ানো ও গাছপালা জায়গা দেখা নয়। ভ্রমন মানে নিরালায়, প্রকৃতিকে ভালোবেসে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। অজানাকে জানা অচেনাকে চেনা। কিছু মানুষ কে হৃদয়ে ঠাঁই দেওয়া। তাইতো ভ্রমণে আমি খুঁজে পাই বেঁচে থাকার ছন্দ ও আনন্দ, আর সেই কারণেই আমি ভ্রমন করি, ভ্রমন করতে ভালোবাসি।
এই নীলগিরি ভ্রমনের যে শিহরণ ও আনন্দ আমি অনুভব করলাম সেই অনুভূতির স্পর্শ এ জীবনে ভুলব না।
সমাপ্ত।