Wednesday, June 22, 2022

75>পরেশনাথ পাহাড় ও ছোটনাগপুর::---

 75>পরেশনাথ পাহাড়::-ও ছোটনাগপুর::----

1>পরেশনাথ পাহাড়::---

2>তোপ চাচীর ড্যাম:;---

3>পরেশনাথ যাত্রা::--

4>ছোটনাগপুর মালভূমি::--

=====================

1>পরেশনাথ পাহাড়::---

ধানবাদে থাকার সময় 1980 থেকে 1985 পর্যন্ত বহুবার গিয়েছি পরেশনাথ পাহাড়, তোপ চাচীর ড্যাম বা জলাধার (এই জলাধার থেকে কোন প্রকার পাম্প ছাড়াই সম্পুর্ন ধানবাদ টাউনে ও আসে পাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জল সাপ্লাই হতো। কিন্তু বর্তমানে সেইভাবে জল আসে কিনা জানা নাই।

ধানবাদে থাকার সময় কারণে অকারণে  বহুবার গিয়েছি পরেশনাথ পাহাড়, কোন ধার্মিক চিন্তায় নয় শুধু ভালোলাগার কারণে, জায়গাটি সত্যি খুব সুন্দর। পাহাড় জঙ্গল সুন্দর পরিষ্কার পরিছন্ন রাস্থা। সত্যি এক সুন্দর মনোরম জায়গা। আমি বেশ কয়েকবার রাস্থা ধরে পাহাড়ে নাউঠে যেখানে রাস্থা নাই তেমন জায়গা দিয়ে পাহাড়ে উঠে ওপরের মন্দিরের উল্টো দিকে চূড়ার কাছে জঙ্গল পূর্ন জায়গায় গাছের নীচে  বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়েছি । ওখানে বসে নীচের শহর- ইসরি ,তোপচাঁচির দৃশ্য মন প্রাণ ভোরে উপভোগ করতে খুব ভাল লাগত। 

2> তোপচাঁচির ড্যাম:;---

তোপচাঁচি লেক (যা ওয়াটার পাম্প নামে লোক বেশি চেনে) সুন্দর, চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা লেক বা বিশাল জলাশয় নির্জন গাছগাছালি ভরা মনোরম পরিবেশে এই লেক। নিকটতম  রেল স্টেশন গোমো যা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র  স্টেশন নাম  দেওয়া হয়েছে । স্টেশন থেকে তোপচাঁচি ড্যাম ৬ কিলোমিটার।

বার বার দেখেছি গিরিডি ও ইসরীর জল-প্রপাত, এদের সৌন্দর্য্যের কারণে। 

 তোপচাঁচি লেকের সৌন্দর্য ভুলবার নয় । এখানকার নির্জন গাছগাছালি ভরা মনোরম পরিবেশে এই লেক। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর, বিশাল জলাধার বা লেক। লেকটির মাঝখানে একটি ছোট দ্বীপের মতন খুব সুন্দর মনোরম স্থান। ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমি, এই মালভূমি দাক্ষিণাত্য মালভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি মালভূমি। এটি পূর্ব ভারতের পাঁচটি রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত। এই রাজ্যগুলি হলো ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ছত্তীসগঢ়। তবে এই মালভূমির বেশির ভাগ অংশ ঝাড়খণ্ড রাজ্যে অবস্থিত। ছোটনাগপুর মালভূমিকে ভারতের ‘খনিজ ভাণ্ডার’ বলা হয়। কারণ ভারতে উৎপাদিত বেশির ভাগ খনিজ এই মালভূমি অঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়। এই মালভূমির সব থেকে উঁচু স্থানের নাম পরেশনাথ পাহাড়। এর উচ্চতা ১ হাজার ৩৫০ মিটার। যেটি পরেশ নাথ মন্দির আর জৈনদের বিশেষ ধার্মিক স্থান। এখানকার জৈন মন্দির গুলির সৌন্দর্য দেখবার মতন শ্বেতপাথরের কারুকার্য পরিপূর্ন মন্দির, কোলাহল মুক্ত শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। মনের, চোখের ও হৃদয়ের শান্তির ঠিকানা। মনকে একাগ্র করবার অপূর্ব স্থান। 

গিরিডি-ডুমরি, পথে  গিরিডি থেকে ২৬ কিমি, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ডুমরি থেকে ১৬ কিমি দূরে বাঁ হাতে আরও ৪ কিমি গেলে মধুবন। এই মধুবন থেকে ৯ কিমি পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ১৩৬৬ মি উঁচুতে জৈনতীর্থ ঝাড়খণ্ডের উচ্চতম পরেশনাথ পাহাড়। গহন বনের মাঝ দিয়ে পথ, চড়াই-এর আধিক্য, শেষ ৩ কিমিতে পেরোতে দুরূহ চড়াই।

ধানবাদ রেলওয়ে স্টেশনের  পরেই গোমো রেলওয়ে স্টেশন, এই গোম স্টেশন থেকে মাত্র ৬ কিমি পরেশনাথ।  

এখানে অনেক  ধর্মশালা আছে । মধুবনে শ্রীসম্মেত শিখর দিগম্বর জৈন ধর্মশালাকে ভর করে ১ কিমি জুড়ে দোকানপাট, ব্যাঙ্ক, ধর্মশালা। দিগম্বর ও শেতাম্বর জৈনদের ডজনখানেক ধর্মশালায় হাজার দেড়েক ঘরে যাত্রীবাসের সুন্দর ব্যবস্থা। 

23 তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ স্বামী 100 বছর বয়সে শ্রাবণ মাসের শুক্লা অষ্টমীতে এই পাহাড়ে এসে দেহ রাখেন। সেই থেকে তারই নামে নাম হয়েছে পরেশনাথ । এই পাহাড়ে চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মধ্যে বিশজন সমাধির মাধ্যমে মোক্ষলাভ করেছিলেন বলে জৈন মতে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়া তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ এই পাহাড়ে মোক্ষলাভ করেছিলেন বলে এই পাহাড়কে পার্শ্বনাথ বা পরেশনাথ পাহাড় নামে নামকরণ করা হয়। তবে, জৈন পুঁথিতে সম্মেত শিখর নামে সমধিক খ্যাত। তেমনই ২৪ জৈন তীর্থঙ্করের ২৩ জন মোক্ষলাভের তপস্যা করেন এই পরেশনাথে। পাহাড়ের অন্যতম আকর্ষণ পার্শ্বনাথ স্বামীর মন্দির। মন্দিরে পাথরের বুকে পায়ের ছাপ, দেবতার প্রতিভূ হয়ে পূজিত হচ্ছেন আজও। ৩০০ একর জায়গা জুড়ে হাজারিবাগ রেঞ্জের ২৪টি চূড়োয় মন্দির হয়েছে । প্রতিটিতেই পায়ের ছাপ তীর্থঙ্করদের। তবে জল মন্দিরে মূর্তিও রয়েছে তীর্থঙ্করদের। আর আছে পাহাড়ের প্রবেশ দ্বারে গৌতম স্বামীর সমাধি মন্দির জৈন তীর্থ পরেশনাথে। এই পার্শ্বনাথ থেকে বিকল্প পথ নেমেছে সীতানালায়। জনশ্রুতি এমনটাই যে বনবাসের পথে রামচন্দ্র সহ সীতাদেবী বিশ্রাম নেন এখানে। তীর্থযাত্রী আর ভ্রমণার্থী দুইয়ের কাছেই অতি পবিত্র ও মনোরম এই পরেশনাথ।

এই  ছোট নাগপুর মালভূমির উপর দিয়ে তিনটি প্রধান নদী বরাক নদী, দামোদর নদ, সুবর্ণরেখা নদী বয়ে গেছে। বরাক নদী হচ্ছে দক্ষিণ আসামের একটি প্রধান নদী এবং সুরমা-মেঘনা নদীর অংশ। এই নদী উৎপত্তি হয়েছে মণিপুর রাজ্যের পাহাড়ে। বদরপুরের কাছে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি শাখায় বিভক্ত হয় এবং বাংলাদেশের সিলেটের সমভূমিতে এসে দুটি শাখা আবার মিলিত হয়েছে। এই মিলিত ধারা সাধারণভাবে বরাক নদী হলেও স্থানভেদে এটি কালনী, ভেড়ামোহনা, বলেশ্বর ও মেঘনা নামে পরিচিত।

__________________________________________


3>পরেশনাথ যাত্রা::---

পরেশনাথ পাহাড় ভ্রমন ও তীর্থ উভয়ের জন্যই বিশেষ প্রসিদ্ধ। 

শ্রাবণ মাসেই তীর্থযাত্রীর সংখ্যা সব চেয়ে বেশি হয় পরেশনাথে। কিন্তু ফাল্গুনে শীত শেষের নরম রোদ আর বসন্তের সৌন্দর্য আগুন লাগা পলাশ বনের সৌন্দর্য  একসঙ্গে উপভোগ করাতে করতে পাহাড়ে চরার মজাই আলাদা। মনে অনুভব হবে স্বর্গ সুখের আকাশ ছোঁয়ার আনন্দ। ফাল্গুনের আদর মাখা রোদের সাথে হিমেল হাওয়ার পরশ। ভোর রাতে একটু ঠান্ডা-ঠান্ডা আমেজ। অপূর্ব এক মোহ ময় মসৃন পাহাড়ি পথে শিশির মাখা হৈমন্তির স্নিগদ্ধ আঁচলে নিজেকে জড়িয়ে এগিয়ে চলা নীল আকাশের নীচে চড়াই পথ বেয়ে। আমাদের মনে প্রাণে বসন্ত মানেই বনে বনে নতুনের আগমন। বসন্ত মানেই নানান রঙের বাহার। বসন্ত মানেই মনের কথার সাথে রূপ কথা মিলিয়ে প্রাণ খুলে কিছু বলা এবং একাগ্র চিত্যে মন দিয়ে শোনা। 

পরেশনাথের পথে বার বার আমি একলাই চলেছি । এবার কিন্তু আমরা আটজন চলেছি পরেশ নাথের পথে। আমরা ধানবাদ থেকে গাড়ি ভাড়া করে তোপচাচী হয়ে পৌঁছে ছিলাম মধুবনে। এমনিতে পরেশ নাথ স্টেশন থেকে মধুবন মাত্র (25) পঁচিশ কিলো মিটার।  মধুবনই পরেশনাথ পাহাড়ে ওঠার শুরু স্থান। সেবার আমরা দলে আট জন  ছিলাম এক  ধর্মশালায়। এখানেই রাত টুকু কাটিয়ে ভোর থেকে শুরু  পাহাড়ে চড়া। মধুবনের বাজার বেশ জমজমাট। অনেকটা অঞ্চল জুড়ে ছড়ানো মার্কেটের মধ্যেই দোকানপাট, ব্যাংক, ধর্মশালা। এখানে দিগম্বর আর শ্বেতাম্বর ধর্মশালা মিলিয়ে অনেক ধর্মশালা আছে।  প্রত্যেক ধর্মশালার ভিতরে একটি করে জৈন মন্দির। জানা গেল শ্রাবণ মাসেই তীর্থযাত্রীর সংখ্যা সব চেয়ে বেশি হয় এখানে। 23তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ। তিনি 100 বছর বয়সে শ্রাবণ মাসের শুক্লাষ্টমীতে এই পাহাড়েই এসে দেহ রাখেন। তাঁর নামানুসারে এই পাহাড়ের নাম হয় পরেশনাথ পাহাড়।তাছাড়া 24 জন তীর্থঙ্করের মধ্যে মহাবীর ছাড়া সকলেই তপস্যাস্থল হিসাবে এই পাহাড়কেই বেছে নেন। সেই জন্যই জৈনদের কাছে এই স্থানের মাহাত্ম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে হ্যাঁ মনে রাখতে হবে যে রাতে সূর্যাস্তের পর কোন ধর্মশালাতেই কোন খাবার পাওয়া যায় না , কারণ জৈন ধর্মাবলম্বীরা সূর্যাস্তের পর আর আহার গ্রহন করেন না। ধর্মশালার বাইরে অবশ্য  খাবার পাওয়া যায় । তবে কোথাও কোন প্রকার আমিষ খাবার পাওয়া যায়না।

আমরা রাত টুকু বিশ্রাম করে ভোর চারটের সময় রওনা দিলাম, প্রত্যেকেই সঙ্গে করে একটু ছাতু মুড়ি ও পথ চলার সুবিধার জন্য একটি করে লাঠি নিয়েছিলাম সাথে। কারণ পাহাড়ি পথে চড়াই চড়তে ও নামতে এই লাঠি বেশ সহায়ক।আর পথে খিদে পেলে একটু ছাতু মুড়ি খাবারের ব্যবস্থা। ঠিক  কাশ্মীরের বৈষ্ণোদেবী দর্শনে যাবার মতন,  সকলের একটি করে লাঠি সঙ্গে রাখতে হয় চড়াই  থেকে উৎরাইএর পথে এই লাঠি বিশেষ সহায়ক হয়।

আমাদের যাত্রা হোল শুরু--

তখনো রাত্রির হালকা অন্ধকার,চারিদিক যেন কুয়াশায় ঢাকা আধো অন্ধকার। দুই একটি পাখি সবে ডাকতে শুরু করেছে, এমন মুহূর্তে আমরাও যাত্রীনিবাসের রুম ছেড়ে সোয়েটার মাফলার জড়িয়ে, কেউ কেউ নাক মুখ ঢাকা মাঙ্কি টুপি পরে বেরিয়ে পড়লাম পরেশ নাথ পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছবার মনবাসনা নিয়ে। সকলেই উথসাহে টগবগ করে ফুটছে। কুয়াশা ঘেরা ভোরের আধো অন্ধকারে চারিদিক এক রোমাঞ্চকর মোহময় পরিবেশ, ছিম ছাম এমন সুন্দর পরিবেশে সকলেই প্রায় আনন্দে লাফিয়ে উঠছে। আমরা ছাড়া আরও কিছু যাত্রীদল চলেছেন । ওনাদের দেখে মনেহল ওনারা সকলে  তীর্থযাত্রয় চলেছেন। সেই অন্ধকার পাহাড়ি পথে সঙ্গী হলাম আমরাও। ধীরে ধীরে  লোকালয় থেকে দূরে চলে যাচ্ছি নির্জন পাহাড়ি পথে জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে। সুন্দর সিমেন্ট বাঁধানো  চওড়া ঝক ঝকে পথ। পথ ক্রমশ চড়াই হচ্ছে। আকাশে জ্বল জ্বল করছে উজ্জ্বল শুকতারাটা এমন বড় দেখাচ্ছে যে মনে হচ্ছে আকাশের গায়ে কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে  তারা টিকে । বাতাসে শীতল আমেজ। রাস্তার দু’ধারে পাতাঝরা অসংখ্য গাছ। তাদের নিবিড় উপস্থিতি আধো-অন্ধকারে সব কিছুই  স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে। অসংখ্য পাখিদের কোলা হল যেন ক্রমশই বেড়ে চলেছে। ঠান্ডা আমেজে চড়াই ভাঙতে গায়ে ঘাম জমছে । বোঝাই যাচ্ছে কঠিন চড়াই পথ। এভাবেই আমরা পৌঁছে গেলামকা লিকুণ্ড মন্দিরের কাছে। এবার একটু বিশ্রাম নিতে বসলাম পথের ধারে সিমেন্টের বাঁধানো উচু জায়গাতে।কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে  আবার চলা। 1366 মিটার উচ্চতায় ঝাড়খণ্ডের সর্বোচ্চ পাহাড় এই পরেশনাথ। যার সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছোতে চলতে হয় 9 কিলোমিটার পথ।আর তীর্থঙ্করদের সমস্ত মন্দিরগুলি স্পর্শ করতে আরও বাড়তি প্রায় 9 কিমি পথ চলতে হয়। অতএব সর্বমোট 27 কিমি পাহাড়ি পথ পরিক্রমণ। ঘন্টার হিসাবে প্রায় দশ-বারো ঘন্টার পথ । সেই কারণেই   এই ভোররাতে পথ চলা শুরু। কারণ আবার ফিতেও হবে ওই পথে। আমরা চড়াই পথেই দেখেছিলাম সূর্যোদয়। চারি দিকে রং ছড়িয়ে অপূর্ব সেই সূর্যদয়। সূর্যের কিরণের স্পর্শে  অন্ধকার জঙ্গলে ফিরে এলো  হরিৎবর্ণ। সবুজ জড়ানো পাহাড়শ্রেণি দেখা যাচ্ছিল। জঙ্গল  চিরে  আঁকাবাঁকা পথ। কখনও বা চড়াই উতরাই-এর পথ। চোখের সামনে পাহাড়ের চড়াই পথ । আরও দূরে সুন্দর রঙিন  নীল আকাশ। যেন মনে হচ্ছে মহাপ্রস্থানের পথে চলেছি। চড়াই পথে বেশ খানিকটা চলার পর দেখা মিলল  পরেশনাথ মন্দিরের। দূর থেকে মনে হচ্ছে নীল আকাশের গায়ে সাদা রঙের  ছবি আঁকা একটা মন্দির এঁকে দিয়েছে কেউ। অপূর্ব লাগছিল সে দৃশ্য দেখতে। চলার পথে মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছিল দিগম্বর সাধু, কেউ আমাদের মতন চড়াই চড়ে চলেছেন, কেউ আবার ঢালু পথে বেয়ে নীচে নামছেন।তবে ওনাদের চলা এতো দ্রুত ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ যে এই দেখলাম আমাদের পেছনে আসছেন কিন্তু প্রচন্ড দ্রুত গতিতে আমাদের পার করে এগিয়ে চলে যাচ্ছেন। মনে হয় ওনারা যেন সমতলেই হেটে চলেছেন। চড়াই বা উৎরাই কোন পথই ওনাদের চলার গতি শ্লথ হয় না। আর ডাইনে বাঁয়ে কোন দিকেই ওনাদের নজর নাই। পথে মহিলারা কেউ দৌড়ে গিয়ে প্রণাম করতে চাইলে ঠিক পাশ কাটিয়ে চলে যান, যেন কিছুই দেখলেন না। পায়ে চলা কংক্রিটের পথটা কিন্তু যথেষ্ট চওড়া। দেখলাম কেউ কেউ ডুলিতে চড়েও যাচ্ছেন। অশক্ত, অসমর্থ মানুষের ডুলিযাত্রির দলও কম নাই। এখানে ডুলি আবার দু’ধরনের। অপেক্ষাকৃত হালকা যাত্রীদের দু’জনের ডুলি। আর ভারী মানুষদের জন্য চারজনের ডুলি। কেদার বা যমুনোত্রীর মতো এখানেও মাঝপথে ডুলিওয়ালারা পীড়াপীড়ি করছেন যাত্রীদের। তবে এখানে ঘোড়া বা খচ্চরের ব্যাবসা নাই বললেই চলে আর সেই কারনে রাস্তাঘাটও অপরিচ্ছন্ন নয়।জঙ্গলের পথ অজানা পাখির দেখা মিলছে  পথে। পথে নানা রঙের অজস্র প্রজাপতি । পথের পাশে ডাইনে বাঁয়ে অজস্র  কাঞ্চন, শিমুল ও পলাশ ফুলের যে কী রূপ সে কথা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। অরণ্যপ্রকৃতির রূপে আমরা তখন পাগল। এই রূপের পরশ পেতেই চলার পথে থামতে হচ্ছিল বার বার। পথে জায়গায় জায়গায়  হনুমান দেখা যাচ্ছিল। ওরা কাছে আসছে কিছু খাবার পবার লোভে। অনেকেই দেখলাম বাদাম ছোলা দিচ্ছে হনুমান দের। ওরা বেশ আদর করে খাচ্ছে।  হঠাৎ দেখলাম কেউ কিছু ফল দিল ওদের, ফল দেখেই সব হনুমান যেন দৌড়ে এসে যে ফল দিচ্ছিলো তাকে ঘিরে ধরলো। কিছু হনুমান অন্য মানুষদেরও জমা প্যান্ট শাড়ি ধরে টানা টানি শুরু করে দিলো। সে এক বিষণ হুলুস্থুল ব্যাপার, হনুমান গুলি কাউকেই ছাড়ছে না কাউকে এগোতেও দিচ্ছেনা। কোথাথেকে যুটেগেল প্রচুর হনুমান। তখন যারকাছে যা ছিলো খাবার সবাই সব দিয়ে দিলো । ওদের দিকে লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেলে ওরা ভয় তো পাইনা উল্টে আরো তেরে মুখে ভেংচে বিকট ভাবে দাঁত বের করে এগিয়ে আসে তারা করে। একটি হনুমান তো একটি ছেলেকে মারলো এক থাপ্পর । দেখলাম ছেলেটির গেলে ভীষণ ভাবে আঙুলের দাগ বসে গেছে। আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওই আশায় মানুষগুলির অসহায়তা এবং হনুমান গুলির অকথ্য আচরন দেখলাম । আমাদের কিছুই করার ছিলনা,আমরাও একরকম নিরুপায়। এমনি করে আধাঘন্টা পার হবার পরে হঠাৎ একজন দিগম্বর সাধু এসে হাজির হলেন , আর অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। সাধু জী আসতেই সব হনুমান মুহূর্তের মধ্যে কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেল , মনেহল কোন ভোজবাজির খেলা দেখলাম। সাধুজী যে কোনদিক থেকে এসেছিলেন সেটা আমরা কেউই লক্ষ্য করতে পারিনি। এছাড়াও সাধু জী আসলেন এবং চলে গেলেন , উনি কিন্তু কোন কথা না ইশারা বা কিছুই করেন নি ,তথাপি হনুমান গুলি যেন ওনাকে দেখেই সব একসাথে পালিয়ে গেল। আর সাধুজী নিজের মতন চলে গেলেন,যেন কোথাও কিছুই ঘটেনি। আমরাও সকলে এমন ঘটনা ও হনুমানের এমন আচরণে হতবাক হয়ে কিছুসম়য় স্তম্ভিত হয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ ও অনুভব করতে চেষ্টা করছিলাম। এমনি ভাবে কিছুসম়য় কেটেজাবার পরে। আবার আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তায় একজন ভিখারী দেখলাম কম্বল গায়ে দিয়ে বসে ছিল, সেই ভিখারিটি বললো হনুমানের খাবার দিতে গেলে ওরা ওদের পেট না ভরা পর্যন্ত অমনি করে ওরা জোরকরে খাবার ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু কোন সাধুদের সামনে ওরা কোন প্রকার কোন উৎপাত করেনা। ওরা সাধুদের ভীষণ সম্মান ও ভক্তি করে। আমি বোললাম এই ফাঁকা জায়গায় একলা বসে ভিক্ষা করছো তা হনুমান তোমাদের কিছু বলেনা, ভিক্ষুক টি যা বললো সেকথা শুনে নিজের কানে শোনা কথা বিশ্বাস করতে মন চাইছেনা। ভিক্ষুক টি বললেন "যে হনুমানেরা ওনাদের কোন ক্ষতি তো করেই না বরঞ্চ কখনো কখনো ভীষণ উপকার করে। যেমন যদি কোনদিন ভিক্ষা করে কিছু না পাই বা কোন দর্শনার্থী এদিকে না এলে বা আমরা যে দিন কোন দিন কিছু খাবারও জোটাতে না পারি ,সেটা কিন্তু ওরা ঠিক বুঝতে পারে এবং তেমন সময় কখনো কখনো কলা, আপেল বা কোন ফল ওরা আমাকে দিয়ে যায় ।"

পথে বেশ কয়েকটি জায়গাতে চায়ের দোকান ছিল । আমরা চা খাওয়া ও একটু জিরিয়ে নেবার জন্য ওদের খাটিয়াতে বসে  জিরিয়ে নিয়ে আবার চলা শুরু করছিলাম। এভাবে চলতে চলতে বেলা দশটা নাগাদ আমরা চোপতাকুণ্ড নদীর সন্নিকটে উপস্থিত হলাম। এখানে আমরা সামান্য ছাতু মুড়ি খেয়ে একটু বিশ্রাম করে আবার চলতে শুরু করে ছিলাম। এখানকার জল খুব  মিষ্টি আমরা সকলেই পেটভরে জল খেয়েছিলাম। তীর্থযাত্রীদের অনেকেই পরিশ্রান্ত হয়ে এখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন। বিশ্রামের পর, আবার পথ চলা। চলতে চলতে এবার পৌঁছলাম একটা বড়ো পাহাড়ি ঝুল বারান্দার মতন জায়গায় ।  আবার এখান থেকে একাধিক তীর্থঙ্করদের মন্দির যাওয়ার জংশন পথ এটি । এখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছোটো বড়ো মিলিয়ে বেশ কয়েকটা মন্দির। এখান থেকে সিঁড়ি বেয়ে  একটু নীচেই জলমন্দির।  একাধিক তীর্থঙ্কর মুর্তি নিয়েই জলমন্দির। এখানে উল্লেখ্য, পরেশনাথ পাহাড়ে অন্যান্য ২৪টি মন্দিরই বিগ্রহহীন। সকল মন্দিরে পাথরখোদিত তীর্থঙ্করদের পদচিহ্নই আছে শুরু । আরও দুই তীর্থঙ্করের নামাঙ্কিত মন্দির দেখতে বেশ খানিকটা করে চড়াই চড়তে হয়েছিল। রাস্তায় দেখলাম, বেশ কিছু  সেচ্ছাশেবি পথে  প্লাস্টিকও নোংরা আবর্জনা কুড়োনোর  কাজে ব্যস্ত। তার পরে আবার চড়াই চড়ে এবার সর্বোচ্চ চুড়াতেই পরেশনাথের মেন মন্দির। এই পথ কিছুটা  পাথুরে পথ, বাকিটুকু সুন্দর মসৃণ পথ। চলতি পথে গাছপালার ফাঁক  দিয়ে দেখা যাচ্ছিল শীর্ষ মন্দির। মন্দিরের কাছে পৌঁছতেই দেখলাম বিশাল  ও সুন্দর মন্দির । নীল আকাশের বুকে শ্বেতশুভ্র মন্দির। যেন মেঘের মতো ভাসছে। এই দৃশ্য দেখে আমরা অভিভূত। আনন্দে কথাই সরছে না মুখ দিয়ে। তারপরে আবার উৎরাই পথে শেষপর্যন্ত চলতে চলতে সন্ধ্যায় এসে পৌঁছেছি  পরেশনাথ পাহাড়ের পাদদেশে মধুবনে।  সিঁড়ির দুদিকে বহু দোকানপাট। বিকিকিনির তালিকায় পুজোর ডালা থেকে খাদ্যসামগ্রী– বাদ নেই কিছুই। দোকানের সারি শেষ হয়েছে খাড়াই সিঁড়ির সামনে। সাজানো কংক্রিটের ধাপ শেষে 23 তম তীর্থঙ্করের মন্দির। না আর কোনও কষ্ট নেই। সিঁড়ি ভাঙছি আর ভাবছি এইসব দু’চোখ ভরে দেখতেই তো এত কষ্ট করে আসা।

মন্দির চত্বর থেকে দু’চোখ ভরে দেখলাম পাহাড়ি প্রকৃতি। শেষে প্রবেশ করলাম মন্দিরে। মন্দির অভ্যন্তরে ফুল ও ধূপের সৌরভ মনে এনে দিল এক পরম শান্তি। এ মন্দিরও বিগ্রহহীন। বদলে পাথরের বেদিতে বিরাজমান কষ্টি পাথরে খোদিত পরেশনাথ স্বামীর চরণচিহ্ন। মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় এক অতি সুন্দর শান্ত পরিবেশে আমরা বসে রইলাম কিছু সময়। 

এবার আমাদের ফেরার পালা । ফেরার পথে পরেশনাথ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে ধনবাদে ফিরলাম।

========================

4>ছোটনাগপুর মালভূমির বৈশিষ্ট্য

দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তর পূর্বে অবস্থিত ছোটনাগপুর মালভূমি ভারতীয় উপদ্বীপীয় মালভূমির অন্তর্গত। প্রায় সমগ্র ঝাড়খন্ড রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার অংশবিশেষ নিয়ে এই মালভূমি গঠিত। কর্কটক্রান্তি রেখা ছোটনাগপুর মালভূমির প্রায় মধ্যভাগ দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। এই ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, নদনদী, কৃষিকাজ, খনিজ সম্পদ প্রভৃতি বিভিন্ন দিক দিয়ে নানা রূপ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে ছোটনাগপুর মালভূমির বৈশিষ্ট্য গুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো -

1) বহু বছর ধরে বিভিন্ন নদী দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ছোটনাগপুর মালভূমি বর্তমানে ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে অর্থাৎ এটি একটি ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি।

2) উপদ্বীপীয় মালভূমির অংশ।  ছোটনাগপুর মালভূমি মূলত আর্কিয়ান যুগের গ্রানাইট ও নিস শিলা দ্বারা গঠিত।

3) ভূ-প্রাকৃতিক তারতম্য অনুসারে ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলকে রাঁচি মালভূমি, হাজারীবাগ মালভূমি, কোডার্মা মালভূমি,  বাগমুন্ডি উচ্চভূমি, রাজমহল পাহাড় প্রভৃতি অঞ্চলে ভাগ করা হয়।

4) হাজারীবাগ মালভূমিতে অবস্থিত পরেশনাথ পাহাড় ছোটনাগপুর মালভূমির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

5) সমগ্র অঞ্চলটি পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বে ঢালু।

6) ছোটনাগপুর অঞ্চলের প্রধান নদী হল দামোদর, সুবর্ণরেখা। এছাড়া এ অঞ্চলে প্রবাহিত নদীগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অজয়, ময়ূরাক্ষী, বরাকর প্রভৃতি।

7) ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের মাটি তেমন একটা উর্বর নয়। এখানকার অধিকাংশ অঞ্চলে ল্যাটেরাইট ও লোহিত মাটির প্রাধান্য দেখা যায়।

8) এখানে মৌসুমী পর্ণমোচী উদ্ভিদের প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন - শাল, শিমুল, পলাশ, মহুয়া, সেগুন প্রভৃতি।

9) প্রায় সব ধরনের ধাতব খনিজ সম্পদ যেমন কয়লা, আকরিক লোহা, তামা, বক্সাইট, চুনাপাথর, ইউরেনিয়াম প্রভৃতি অঞ্চলে পাওয়া যায় বলে, ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল কে ভারতের খনিজ ভান্ডার বলা হয়।

10) খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ভারী শিল্পের বিকাশে সহায়তা করেছে।

----------============≠=============================

No comments:

Post a Comment