68 >আমার তমলুক ভ্রমন:---=মাতঙ্গিনী হাজরার .
ইচ্ছা ছিল পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক শহর ও আশেপাশের বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান গুলি যেমন "কপালমোচন"তীর্থ, প্রাচীন বর্গভীমা মন্দির,রাজ বাড়ি, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সভা স্থল, মাতঙ্গিনী হাজরার পৈতৃক ভিটা, তমলুকের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, ইত্যাদি ঘুরে দেখব।
আমার বিশেষ পরিচিত পরমেশ্বর মাইতি জানালো ওনার মামা বাড়ি তমলুকের বর্গভীমা মায়ের মন্দিরের কাছে। এমন সংবাদ পেয়ে আমিও আর দেরি না করে পরমেশ্বরের সাথে গিয়েছিলাম তমলুকে।
তমলুক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটি সদর শহর ও পৌরসভা এলাকা । শহরটি রূপনারায়ণ নদীর তিরে অবস্থিত ।
প্রাচীন নগর তাম্রলিপ্ত বর্তমানে তমলুক। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান এই শহর।
সহরের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে খোঁজ করতে গিয়ে জানলাম ব্রহ্মপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, পদ্ম পুরাণ এবং মৎস্য পুরাণে তাম্রলিপ্ত বা তমলুকের নাম উল্লেখ রয়েছে।
পন্ডিত বলরাম শাস্ত্রীর মুখে শুনলাম
ব্রহ্মপুরাণের কথা, জানলাম – মহাদেব দক্ষযজ্ঞে ব্রহ্মার পুত্র প্রজাপতি দক্ষ কে নিহত করার পরে, ব্রহ্মহত্যার পাপে দক্ষের ছিন্ন মস্তক মহাদেবের হাতেই যুক্ত হয়ে থাকে। কিছুতেই তিনি এই মস্তক হস্তচ্যুত করতে না পেরে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়ে ছিলেন।
তখন বিষ্ণু মহাদেবকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কপালমোচন’ তীর্থে গমন ও স্নান করতে কারন সেখানে গিয়ে স্নান করলে সমস্ত পাপ মুক্ত হওয়া যায়।
সেই ‘কপালমোচন’ তীর্থ এখন আর নেই, সেই জায়গাটি রূপনারায়ণ নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বহু পূর্বে।
কিন্তু আজও প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তির দিনে তমলুকের পূর্বদিকে শঙ্করআড়া খালে এবং নিকটস্থ ‘কপালমোচন’ তীর্থরূপে চিহ্নিত বাঁধানো পুকুরে স্নান করে ভক্তরা পুণ্যার্জন করেন।
কথিত আছে মৃত লখিন্দরকে নিয়ে সমুদ্র ও নদী পথে ভাসতে ভাসতে বেহুলা তমলুকে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তমলুক তখন ছিল তাম্রলিপ্ত বন্দর।
তমলুক পুরাকালে বহু নামে অভিহিত হয়েছে; যথা – তমোলিপ্তী, তমোলিপ্ত, তাম্রলিপ্ত, তাম্রলিপ্তী, তামলিপ্তং, তমালিকা, দামোলিপ্তং, তমালিনী ইত্যাদি।
সেকালে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল পাঁচটি ভাগে বিভক্ত ছিল – 1>অঙ্গ, 2>বঙ্গ, 3>কলিঙ্গ,4>সুহ্ম, এবং 5>পুণ্ড্র।
অঙ্গ= অর্থাৎ ভাগলপুর অঞ্চল, বিহার;
বঙ্গ= যা ছিল দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও পদ্মা মেঘনার অববাহিকা;
কলিঙ্গ=যা বর্তমান কটক-উড়িষ্যা অঞ্চল;
সুহ্ম= অর্থাৎ ভাগীরথীর পশ্চিম দিকের রাঢ় দেশ, বর্তমান মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, হুগলী প্রভৃতি অঞ্চল
এবং পুণ্ড্র=বর্তমান উত্তরবঙ্গ, বগুড়া, মালদহ, রাজশাহী প্রভৃতি।
এই সুহ্ম রাজ্যের রাজধানী ছিল তাম্রলিপ্ত নগরী। কিছু কবি গণের রচনা থেকে জানা যায় এই সুহ্ম রাজ্যের নাম । দামোলিপ্ত বা তাম্রলিপ্ত তখনও সুহ্ম রাজ্যের রাজাধানী ছিল এবং সেখানে দেশী ও বিদেশী জাহাজ আসত বলে বর্ণনা রয়েছে।
অনেকে মনে করেন ইতিহাসে তমলুকের কথা প্রথম লিপিবদ্ধ হয় চৈনিক পরিব্রাজক ‘ফা-হিয়েনে’র ভারত ভ্রমণের কালে। ফা-হিয়েন তমলুকে দু’বছর ছিলেন। এই সময়ে তিনি বহু বৌদ্ধপুঁথির প্রতিলিপি প্রস্তুত করেছেন ও মূর্তির ছবি এঁকেছেন। তার বর্ণনায় তিনি তমলুককে বৌদ্ধদের সামুদ্রিক বন্দর বলে উল্লেখ করেছেন। এর প্রায় আড়াইশ বছর পরে চীনদেশীয় তীর্থঙ্কর হিউয়েন-সাঙ বৌদ্ধ ধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করতে ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে আসেন।
তার ভারত ভ্রমণকালে তমলুককে বৌদ্ধদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যবন্দর হিসাবে লিবিবদ্ধ করেছেন।
৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে হিউয়েন-সাঙ সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে তমলুককে প্লাবিত হতে দেখেছেন। উপকূলবর্তী তমলুক তখন মাঝে মাঝেই জলপ্লাবনে ক্ষতি গ্রস্থ হত।
সে সময় বহুসংখ্যক সম্পন্ন বণিক তমলুককে কেন্দ্র করে চিন, সিংহল, জাভা, মালয় প্রভৃতি স্থানে সমুদ্রপথে ব্যবসা করতেন।
বৌদ্ধদের মত তমলুকে জৈনদেরও ধর্মকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।
জানাজায় যে ১৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে শ্রীচৈতন্যদেব পুরী যাবার পথে তমলুকে গিয়ে ছিলেন।
পরে আবার ‘তমলুক’-এর নাম পরিবর্তন করে আবার পুরাণো ‘তাম্রলিপ্ত’ করার চেষ্টা বহু লোকের আপত্তিতে কার্যকর করা যায় নি।
তমলুকের প্রাচীন বর্গভীমা মন্দির।
৫১- শক্তি পীঠের অন্যতম মন্দির,,
পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক শহরেই বিরাজিতা মা বর্গভীমা।
মাকে প্রতিনিয়ত ভক্তিভরে স্মরণ করা হয় এখানে। পুরাণে কথিত আছে, বিষ্ণুর সুদর্শনচক্রে খণ্ডিত সতীদেহের বাম গোড়ালি পড়ে এখানে।
দেবী এখানে নানা রূপে পূজিতা।
করালবদনাং মুক্তকেশী, মুণ্ডমালা বিভূষিতাম।
এখানে দেবীর ভৈরব হলেন সর্বানন্দ।
তন্ত্রচূড়ামণি' অনুসারে দেবী হলেন কপালিনী। আবার 'শিবচরিত' অনুসারে দেবী হলেন ভীমরূপা। 'পীঠমালাতন্ত্র' অনুসারে কপালিনী ভীমরূপা।
তমলুক শহরের সমস্ত পুজো মণ্ডপেই বর্গভীমা মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর পুজো শুরু হয়। বাড়ি কিংবা ক্লাবের কালীমূর্তির পুজোর অনুমতি বর্গভীমা মন্দিরে পুজো দেওয়ার পরই পাওয়া যায়।
তমলুক শহরে আজও কোনও মণ্ডপে দুর্গাপুজার ঘটস্থাপনের আগে দেবী বর্গভীমা মন্দিরে পুজো দেওয়া হয়।
৩০ ফুট বেদির ওপর ৬০ ফুট উচ্চতার বৌদ্ধ স্থাপত্য ধাঁচে নির্মিত মন্দিরটি।
দেবী বর্গভীমা চতুর্ভুজা। নীচে রয়েছে শায়িত শিবের মূর্তি। মায়ের ডানহাতের উপরটিতে রয়েছে খড়্গ আর নীচেরটিতে ত্রিশূল। উপরের বাম হাতে খর্পর আর নীচের হাতে মুণ্ড। বর্গভীমার দু'পাশে শোভা পাচ্ছ দশভূজা মহিষমর্দিনী এবং দ্বিভূজা মহিষমর্দিনী মূর্তি।
এই বর্গভীমা মন্দিরের নানান গল্প কথা শোনা যায়।
কথিত আছে যে, মহাভারতের সময়কালে ময়ূরবংশীয় রাজা তাম্রধ্বজের রাজত্বকালে রাজার নির্দেশ অনুযায়ী এক জেলেনী রাজার নির্দেশে রোজ জ্যান্ত শোল মাছ নিয়ে যেতেন রাজবাড়িতে।
একদিন রাজপ্রাসাদে যাওয়ার সময় তিনি লক্ষ করেন সবকটি মাছ মরে গিয়েছে ৷ পাশেই ছিল একটা জলাশয়, সেই জলাশয়ের জল মাছের উপর ছিটিয়ে দিতেই মাছগুলো আবার বেঁচে উঠেছিল। এই অতিলৌকিক ঘটনার কথা রাজা জানতে পারেন। এরপর রাজা সেই জলাশয়ের পাশে বেদীর উপর একটি বিগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। রাজা বুঝতে পারেন এই দেবী জাগ্রত এবং এই জলাশয়ের জলের দৈবগুণ আছে। তখন রাজা তাম্রধ্বজ এই পবিত্র জলাশয়ের পাশে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা আজও মা বর্গভীমার মন্দির নামেই পরিচিত। আজও এই মন্দিরে প্রত্যেক দিন এবং কালীপূজোর দিন শোল মাছ দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।
এই মন্দির স্থাপন নিয়ে আরও কএকটি কাহিনি শোনা যায়।
এক ধনপতি সওদাগর নাকি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মন্দির প্রতিষ্ঠার কাহিনি থেকেই আন্দাজ করা হয় এই মন্দিরের প্রাচীনত্ব। মা বর্গভীমা তমলুকের এই মাতৃমন্দিরে এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বিরাজ করছেন বলে সেবায়েতরা জানিয়েছেন।
ভক্তি আর ভয় মিলে মিশে অনেক কিংবদন্তি আছে তমলুকের দেবী বর্গভীম মন্দির নিয়ে।
কথিত আছে, দেবী বর্গভীমার মন্দিরটি নির্মাণ করেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। তবে, তমলুকের মানুষের বিশ্বাস, ময়ূরবংশীয় রাজাই তৈরি করেন এই মন্দির।
সত্য কিংবা জনশ্রুতি যাই হোক, মা বর্গভীমা তাম্রলিপ্ত বন্দর নগরীর অধিষ্ঠাত্রী কালিকাদেবী। প্রাণভরে মায়ের কাছে কিছু চাইলে মা নাকি ফেরান না।
মঙ্গলকাব্য অনুসারে, এক সওদাগর সিংহল যাওয়ার পথে তমলুক বন্দরে নোঙর করেন। সেই সময় এক ব্যক্তিকে স্বর্ণকলস নিয়ে যেতে দেখেন তিনি। সওদাগর ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি জানান, এখানেই জঙ্গলের ভেতর একটি কুয়ো রয়েছে যার জলে পিতলের কলস ডোবালেই তা সোনার হয়ে যায়। এই কথা শুনে তিনি অনেক পিতলের কলসি কিনে তা ওই জলে ডুবিয়ে সোনা বানিয়ে তা বিক্রি করে বিপুল লাভবান হয়েছিলেন সওদাগর। তাই ফেরার পথে তিনি কুয়োর পাশেই বর্গভীমা মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।
এমম আরও প্রচলিত কাহিনী আছে। যেমন– প্রাচীন ময়ূরবংশের রাজা গরুড়ধ্বজের সময়ে একজন জেলেকে শোলমাছ ধরতে পাঠান হয়। একদিন মাছ ধরতে না পারায় ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা জেলেকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। গরীব জেলে কোন রকমে জঙ্গলে পালিয়ে যায় এবং সেখানে ভীমাদেবীর সাক্ষাৎ লাভ করে।
দেবী তাকে শোলমাছ ধরে শুষ্ক করে রাখতে বলেন এবং একটি বিশেষ কূপের জল ছিটিয়ে প্রয়োজন মত মাছগুলি বাঁচিয়ে তুলবেন বলে আশ্বাস দেন। রাজা সারা বছর মাছ পাচ্ছেন দেখে কৌতুহলী হয়ে জেলেকে এর রহস্য জিজ্ঞাসা করেন। জেলে সব কিছু খুলে বলায় কূপের সেই অমৃতবারির কথা প্রকাশ হয়ে পরে। এতে দেবী কুপিত হয়ে পাথরের মূর্তির রূপ ধরেন এবং কূপের মুখে উপবিষ্ট হয়ে মুখটি রুদ্ধ করে দেন যাতে কেউ সেই জল ব্যবহার করতে না পারে। রাজা তাম্রধ্বজ কূপের খোঁজ না পেয়ে পাথরের মূর্তির উপরেই মন্দির নির্মান করে দেন। এবং পূজার প্রচলন করেন এবং পরে কোন রাজা মন্দিরটির সংস্কার সাধন করেন।
বর্গভীমা মন্দিরটি একান্ন পীঠের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ নিয়ে মতভেদ আছে। তথাপি দেবী ভক্তদের মোক্ষদান করেন তাই দেবী বর্গভীমা নামেই পরিচিত।
নাটমন্দির, যজ্ঞ মন্দির, জগমোহন ও মূল মন্দির রয়েছে এখানে। মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরে নির্মিত দেবীর মূর্তি। কালীপুজোর দিন পূর্ব মেদিনীপুর-সহ পাশের জেলা থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরে। কালীপুজোর দিন সকাল থেকে প্রতি বছরই ভক্ত সমাগম ঘটে। সারাদিন চলে বিশেষ পুজোপাঠ। রাতে মাকে রাজরাজেশ্বরী বেশে সাজিয়ে চলে পূজার্চনা হোম যজ্ঞ। পুজো শেষ হয় ভোর রাতে। মাকে ষোড়শ উপাচারে পুজো করা হয়। মায়ের ভোগে শোল মাছ নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয়।
"মা"এর মন্দির সারা বছর প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সেই সময় মায়ের কাছে পুজো দেওয়া হয়। রাতে দেবীর নিদ্রার ব্যবস্থা করা হয়।
মা এখানে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পূজিতা হন। কখনও দুর্গা, কখনও কালী, কখনও জগদ্ধাত্রী। তবে, যেহেতু মন্দিরের মা কালিকারূপী, তাই শ্যামাপুজোয় বিশেষ পূজার ব্যবস্থা থাকে এবং সেই পূজা ও ভক্তির ভক্তিরস আলাদা মাত্রা পায়।
অনেকে বলেন, ধীবর সম্প্রদায়ের আরাধ্যা 'ভীমা' দেবীই 'বর্গভীমা'।
দেবী বর্গভীমা তমলুক তথা পূর্ব মেদিনীপুর ও বাংলার মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি তীর্থস্থান। লোকশ্রুতি আছে, দেবীর মন্দিরের পাশে থাকা পুষ্করিণীতে ডুব দিয়ে পাওয়া যে কোনও বস্তু লাল সুতো দিয়ে মন্দিরের পার্শ্ববর্তী গাছে বাঁধলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়।
বর্গভীমা দেবীর মন্দির শুধু তমলুকে নয় পার্শ্ববর্তী বহুদূর বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত জাগ্রত দেবী হিসাবে স্বীকৃত ও পূজিত।
অনেকে মনে করেন ময়ূরবংশীয় রাজারাই এর প্রতিষ্ঠাতা। ময়ূরবংশের শেষ রাজা নিঃশাঙ্ক নারায়ণ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান এবং পরাক্রমশালী ধীবর বংশীয় কালু ভুইঞা সিংহাসনে আরোহণ করেন। কালু ভুইঞাই ছিলেন কৈবর্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম নৃপতি। অনেকের মতে কৈবর্ত রাজারাই বর্গভীমা মন্দিরটি নির্মান করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীতে ‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে’র রচয়িতা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বর্গভীমা মন্দিরের উল্লেখ করেছেন –
তমলুক রাজবাড়ি ও মাতঙ্গিনী হাজরা::--
শোনা যায়, তমলুকের রাজবাড়ি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে ময়ূরবংশীয় রাজাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং সেই রাজা না কি দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সে সকল কথা ও রাজ বাড়ি ইতিহাসের গল্প কথা হয়েই রয়ে গেছে।
যাই হোক, যে রাজবাড়ীর ধংসাবশেষ এখন দেখা যায় সেটি একটি অসমাপ্ত দোতলা বাড়ি। রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ (১৮২১-১৮৫৭ খ্রিঃ) বাড়িটি তৈরি করতে শুরু করে পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দের কারণে জীবদ্দশায় শেষ করে যেতে পারেন নি। এটি এখন পর্যটকদের একটি দর্শনীয় স্থান হিসাবে চিহ্নিত।
হান্টার সাহেব রাজবাড়ীটি নদীর তীরে অবস্থিত বলে লিখেছেন, হয় ত তখন তাই ছিল; এখন নদী বহুদূরে।
পরিত্যক্ত এই রাজবাড়ীর এক সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময়ে এই বাড়িটিতেই সত্যাগ্রহীদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বোস জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। সেই বছরেই ১১ই এপ্রিল তমলুকে তার একটি সভার আয়োজন করে।
কিন্তু অসুবিধা দেখা দেয়, সভার স্থান নিয়ে। ইংরেজ সরকার চান না সুভাষচন্দ্র বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করুন। সরকারের শাসানিতে অনেকেই তাদের জায়গায় সভা অনুষ্ঠিত হতে দিতে চান নি। এই অবস্থায় এগিয়ে আসেন ময়ূরবংশের
৬১তম পুরুষ দেশপ্রেমিক রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ ও তার দুই ছেলে। ইংরেজদের চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে রাজবাড়ির সংলগ্ন আমবাগান পরিষ্কার করে সেই মাঠে সভার অনুমতি দেওয়া হয়। বেলা ১১টার সময় মহিলারা শঙ্খধ্বণির মাধ্যমে সুভাষচন্দ্রকে বরণ করেন। বিশাল সংখ্যক মানুষ সেদিন সুভাষ চন্দের উদাত্ত বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। দেশপ্রেমের প্রতি স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে রাজবাড়ির পাশেই সুভাষচন্দ্র বসু ও স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের মর্মর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।
মাতঙ্গিনী হাজরা তথা গান্ধী বুড়ি--
বুলেটে বিধ্বস্ত অবস্থাতেও তিনি বলে যান, "ব্রিটিশের গোলামি ছেড়ে গুলি ছোঁড়া বন্ধ করো- তোমরা সব আমাদের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে হাত মেলাও।" তার পরেও তাঁর দিকে ধেয়ে আসে তৃতীয় বুলেট। কপালবিদ্ধ সেই বুলেটের আঘাতে তার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তবু তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, জাতীয় পতাকাটি তখনও তাঁর হাতের মুঠোয় ধরা।
তিনিই সেই গান্ধী বুড়ি যার প্রকৃত নাম
মাতঙ্গিনী হাজরা:
তমলুকের বেনেপুকুর পাড়ে ইংরেজদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্বাধীনতার ৭৫ বছর কেটে যাওয়ার পরেও অবহেলিত ভারতের প্রথম মহিলা শহিদ স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা তমলুকের আলীনান গ্রামের মাতঙ্গিনী হাজরা। অবহেলায় পড়ে রয়েছে তাঁর বাস্তুভিটে। হয়নি সংস্কার। এগিয়ে আসেনি কোনও সরকারের প্রতিনিধি। এমন অভিযোগ, শহিদ পরিবারের।
মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম 19 অক্টোবর
1870 সালে মেদিনীপুরের তমলুক থেকে একটু দূরে হোগলা নামে একটি ছোট গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে তার জন্ম হয়। অতি অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়ে যায়, তিনি মাত্র 18 বছর বয়সে
নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হয়েছিলেন।
1905 সালে প্রত্যক্ষভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মাতঙ্গিনী হাজরা মতাদর্শগত ভাবে তিনি ছিলেন একজন গান্ধীবাদী। তাইতো গান্ধী বুড়ি নামে ডাকা হয়।
1932 সালে মাতঙ্গিনী আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন।
ভারতছাড়ো আন্দোলনের সময় কংগ্রেস সদস্যরা মেদিনীপুর জেলার সকল থানা ও অন্যান্য সরকারি কার্যালয় দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল জেলা থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে এখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম মহিলা স্বেচ্ছাসেবক ছয় হাজার সমর্থক তমলুক থানা দখলের উদ্দেশ্যে একটি মিছিল বের করেন। এই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন 73 বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা।
মিছিলে বারংবার তার গায়ে গুলি লাগে, তার কপালে ও দুই হাতে। তবু তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। এরপর তার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়।
কংগ্রেসের পতাকা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে বন্দেমাতরম ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
2002 সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনের 60 বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের ডাক বিভাগ মাতঙ্গিনী হাজরার ছবি দেওয়া 5 টাকার পোস্টাল চালু করা হয়ে ছিল।
১৯৭৩ সালে ভারতবাসীর মনেপ্রাণে স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তমলুকের আলীনান গ্রামে এসে মাতঙ্গিনী হাজরার শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেছিলেন । মাতঙ্গিনী হাজরা যেই বাড়িতে সংগ্রামী ক্রিয়াকর্ম চালাতেন সেই বসতভিটেও সংরক্ষণ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন প্রাইমমিনিস্টার ইন্দিরা গান্ধী। তারপর কেটে গিয়েছে বহু বছর। পরিবর্তন হয়েছে একাধিক সরকারের কিন্তু বদল আসেনি বিপ্লবীর দালানবাড়ির ।
মাতঙ্গিনীর পরিবারের বর্তমান সদস্য়দের অভিযোগ, বাড়ির অবস্থা এখন ভগ্নপ্রায়। মাতঙ্গিনীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র রাখার জন্য ছোট্ট একটি সংগ্রহশালা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে বটে ওই বাড়িতেই, কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে তার আয়ুও বেশিদিন নেই। মাতঙ্গিনীর স্মৃতি বিজড়িত সেই দালানবাড়ি অক্ষত রাখতে তত্পর শাসক ও বিরোধী শিবির এমনটাই খবর সূত্রের।
আমার তমলুক ভ্রমনের সামান্য লেখা এখানেই থামালাম কারন এর বেশি লিখতে গেলে যে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন সেই রূপ জ্ঞান আমার নাই।
তাই আজ এখানেই ইতি টানছি।
<---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
==============400=========