Friday, November 2, 2018

19>।।-নর্মদার উৎসস্থলে -।।th MAY 1974. to 21th May 1974 =10 days


19/1)>|| নর্মদার উৎসস্থলে ||
19/2)>।। ভয়ঙ্কর দুর্গম ভ্রমণ,শ্বাপদ সংকুল গভীর জঙ্গলে।
19/3>11th May 1974 --দশ দিনের টুরে অমর কণ্টক
19/4)> ||নিজের কিছু বিশেষ কথা::---
19/5)>|| নর্মদা কে নুড়ি/ কঙ্কর শিবশঙ্কর ||
19/6)>|| নর্মদা নদী ||+ বাণলিঙ্গ::--
19/7)|| নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ::----
19/8)>||অমরকন্টক-নর্মদার উৎসস্থলে  সংক্ষিপ্ত--to word FOR  SV2 শোভেনিওর 2020
19/9)>||অমরকণ্টক  মোক্ষদাত্রী,
To diary No-ভ্রমন(29)- page No -(49)
19/10)>|| নর্মদা ||
To diary No-ভ্রমন(29)- page No -(52)
19/11)>অমর কথা::-
To diary No-ভ্রমন(29)- page No -(41)
অমর কথা::---
মোক্ষদাত্রী নর্মদা---(সংগ্রহ)
=============================


19/1)।।-নর্মদার উৎসস্থলে -।।
                            <---©-আদ্যনাথ--->
প্রাক কথা -------

হে মাতা নর্মদে,
শ্বাপদসংকুল গভীর জঙ্গলে,
পাহাড়ের চড়াই , উপেক্ষা করে,
নিতান্ত  নির্বোধ অর্বাচীন মনে,
বারংবার  ছুটে গেছি তোমার দুয়ারে,
অস্থির মনে তোমার শ্রীপাদপদ্ম দর্শনে।
কোনদিন ফিরিনি শূন্য হৃদয়ে কুন্ঠিত মনে,
সদা তৃপ্ত হয়েছে হৃদয় আমার তোমার দর্শনে।
হে-'মাতা  ',আজ অশান্ত অস্থির মন আবার,
তাইত ব্যাকুল হৃদয়ে চলেছি তোমার দুয়ার।

ভয়ঙ্কর দুর্গম পথ ,পদে পদে বিপদ ভীষণ,
পথ চলতে তোমার 'রেবা' নাম জপ সারাক্ষণ।
আনন্দময়ী তুমি, রেবা নামেতেই  তুষ্ট অতি,
সকল বিঘ্ন দূরকরে করুণা করেছো আমার প্রতি।
রেবা নামের মাহত্ম গুণে বাঁধা বিপদ গেছে দূরে,
রেবা,রেবা,রেবা,-রেবা নামেই আছো হৃদয় ভরে।
কোনোদিন ,কোন বাঁধাই থামাতে পারেনি আমায় ,
নিৰ্ভয়ে পৌঁছেছি  তোমার কৃপায়।

তোমাকে করেছি দর্শন মনের আশ মেটানোর ছলে,
ব্যাকুল মন, চায় আবার পৌঁছতে তোমার আম্রকুটে।
কিন্তু আজ আর উপায় কোথায়,
বার্ধক্য ক্রমে  ঘিরিছে আমায়।
তাই ভাবনা পৌঁছবো কেমনে তোমার কাননে ,
তোমার পথ তুমি রেখেছো কঠিনে ঘিড়ে।

শুনেছি আজকাল,
হয়েছে সহজ,কিছু পথ, পৌঁছতে তোমার দুয়ারে,
সৃষ্টি রক্ষার তরে, তুমি বিলাইছো আশীষ অকাতরে।
পাপী তাপি যত আসে তোমার দুয়ারে,
সকলে তুষ্ট তোমার আশীষের বলে।
তোমার দুয়ার হতে কেউ ফেরেনা খালি হাত ,
সকলের তরে বাড়াও  তোমার বরাভয় হাত।

কিন্তু সেদিন, আজ থেকে 46 বৎসর আগে,
তোমার দুয়ার পথ  রেখেছিলে কঠিনে ঢেকে।
তখন চলছিল আমার  জীবনের লড়াই ,
সে লড়াই ছিল বেঁচে থাকার জন্য লড়াই।
জীবন যুদ্ধে প্রতিকূলে টিকে থাকার লড়াই,
একান্ত প্রয়োজন টুকু জোগাড়ের লড়াই।

কিছু পথ খুঁজে পাবার  জন্য লড়াই,
সংসার টুকু  টিকিয়ে রাখার লড়াই।
সমাজের বিরুদ্ধে কিছু লড়াই,
লোকে কি বলবে তার জন্য লড়াই।
শিক্ষা,কর্ম, ও ধর্ম এই তিনের শ্রেষ্ঠতার লড়াই,
ভাবনা হতো, হেরে যাওয়ার থেকে পাবনা রেহাই।

তাই, অস্থির চিত্তে ভাবনার আবেগে পাগল প্রায়,
পথ হারিয়ে লড়াইয়ের মাঝে  পালিয়ে বেড়াই।
নিরালায় শান্ত পরিবেশ খুঁজে বেড়াই ,
তখনি মনে মনে তোমাকে দেখতে পাই।
গভীর জঙ্গল আর পাহাড় ঘেরা তোমার ঠাঁই ,
তোমার দুয়ারে যাবার সহজ উপায় নাই।
তবুও  নির্ভয়ে পৌঁছে ছিলাম তোমার দুয়ারে ,
তোমার উৎসস্থলে তোমার আনন্দ কাননে ।

কপিল ধারায় দেখেছি তোমার ভয়ঙ্কর রূপ,
সমগ্র সৃষ্টি ধ্বংসের অতি বিক্রাল রূপ।
তোমার নৃত্য দেখেছি ওই স্রোতের মাঝে,
সু উচ্ছ হতে ঝাপদিচ্ছ  গভীরের  মাঝে।
তোমার শ্বেত শুভ্র ফেনিল জল ধারা,
জলপ্রপাত রূপে খ্যাত  কপিলধারা।

তোমার শ্বেত শুভ্র ফেনিল জলধারার ধ্বনি,
শুনেছি পাহাড়ে পাহাড়ে তার প্রতিধ্বনি।
ভাবলেও মনে শিহরণ জাগে,
শংকর তনয়া তুমি শঙ্করের সাজে।
করিছ প্রলয় নৃত্য আপন মনে সৃষ্টির তরে,
ওপারে পিতা শংকর দেখিছে তোমারে।

পিতার সদৃশ  জটাজুট ধারিণী,
রক্তবর্ণ ব্যাঘ্র চর্ম বসনে তুমি ভয়ঙ্করী।
কর তলে  ত্রিশূল ডমুরু ধারিনি,
আনন্ত্য নৃত্যে মগ্ন জগৎ তারিণী ।

ভোলানাথ দেখিতেছেন তোমার নৃত্যের তাল লয়,
তোমার অপর পারে বসিয়া নিজ আলয়।
কি দারুন শোভায় সুশোভিত দিগন্ত।
ক্ষণিক দর্শনেই মন প্রাণ হয় শান্ত।

প্রভাতে শ্বেতশুভ্র বসনে নিজ কাননে একনিষ্ঠ মনে,
শিব পূজার তরে, নিজ করে,নিবিষ্ট তুমি ফুল চয়নে।
অপরূপ রূপে  তুমি ষোড়শী  কুমারীর বেশে,
পিন উন্নত সুডোল পয়োধর উন্মুক্ত কেশে।

সুউচ্চ নীতম্ব,সূক্ষ্ম কটিবেষ্টনী,
যেন বিশ্বকর্মা নির্মিত স্বর্ণ কলাপিনী।
অপরূপ রূপ লাবণ্যে আলোকিত দিগন্ত,
শংকর তনয়া তুমি সদা হাস্য রত প্রশান্ত।

মালিনীর বেশে সুশোভিত ফুলমালা গলে , 
সে রূপে মোহিত দেবগন লালায়িত মনে।
তোমার রূপ যৌবনে উদ্ভাসিত দিগন্ত ,
কামুক দেবতাগণ অতিশয় বিভ্রান্ত।

প্রভাতে তোমার সঙ্গ লাভের তরে, 
তোমার বাগিচায় হাজির দেব গণ সকলে। 
কিন্তু বিধির বিধানে অসাধ্য তোমাকে পাওয়া, 
তুমি শিবের অতি আদরের, শিব তনয়া।
তোমারে রাখিতে খেয়াল সদাই ব্যাস্ত পিতা,
শিবলোক ছাড়ি তোমার উৎসকূলে বসেন সদা।

প্রত্যুষে তোমার বাগিচায় তুমি মঙ্গল বরদে, 
সৃষ্টির কল্যাণে তুমি মর্তে নর্মদা শুভদে।
মুনি ঋষি গণ জানেন এহেন সত্য,
মাই কি বাগিচাতে সত্য জ্ঞান সহজ লভ্য। 

সৃষ্টি উজাড় করে দিয়েছে ফল ফুলের সাজি,
তোমার নিত্য ভ্রমণের বাগিচাখানি।
যার শোভায় মুগ্ধ পৃথিবী বাসি,
সেই তোমার 'মাই কি বাগিচা ' বলে জানি।
তোমার স্নেহ স্পর্ষে আপ্লূত মুগ্ধ হৃদয় আমার,
তোমার আশীষ ভিন্ন চাহিনা কিছু আর।

মুনি গনের অতি কাম্য লভিতে সত্য জ্ঞান,
প্রত্যুষে তোমার বাগিচায় করেন জপ ধ্যান। 
হে মা নর্মদে তোমারে জানাই প্রণাম 
এই অধমের রাখিও মনে দিও সত্য জ্ঞান।  
মম নতিরেষা তব পদ কমল যুগলে,
অতি মূর্খ আমি,
জানি তুমি আছো আমার  হৃদকমলে।
                             <---©-আদ্যনাথ--->
======   ======    ======    =======

19/2)।। ভয়ঙ্কর দুর্গম ভ্রমণ,শ্বাপদ সংকুল গভীর জঙ্গলে।
যাত্রা পথ -------------
1974 সালের  MAY মাস----11th may 1974
আমি তখন  CMPDIL (Central Mine Planning and Design Institute) এতে চাকুরী করি এবং মধ্যপ্রদেশের বিলাস পুরের কোরবা অঞ্চলের বাকিমগরাতে পোস্টিং।
বাকিমগরা ক্যাম্প বেশ বড়ো ক্যাম্প ,চার খানা ড্রিলিং মেশিন চলছিলো।
কোলিয়ারি এলাকা বাদে বাকিসকল এলাকা বেশ ঘন জঙ্গল।
ভাল্লুকের উৎপাৎ ভীষণ। সন্ধ্যার পরে একলা চলা মুশকিল।
আমাদের ক্যাম্প কাঁটা তার দিয়ে ঘেড়া ,তাই ক্যাম্পে ভাল্লুক ঢুকতে পারতোনা।
আমরা কেহই জিপ ছাড়া পায়েহেঁটে চলতাম না।
সে যাইহোক এবারে আসল কথায় আসি।
May 1974 কদিন থেকে মনে একটাই চিন্তা জাগছিলো , আবার একবার অমরকণ্টক
যাবার জন্য মন টানছে।
1972 এতে প্রথমে একবার গিয়েছিলাম। তখন আমি কোলকাতায় Bsc 3rd year এর স্টুডেন্ট।
আর আজ যখন বিলাস পুরের কাছেই আছি ,তখন এমন সুযোগ উপেক্ষা করি কি করে।
সেই কারণে কিছু সাথী জোগাড়ের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একলাই যাবার পরিকল্পনা করলাম।

এমন ভাবে বার বার অমরকণ্টকে যাবার জন্য ব্যাকুলতার কারণ
 যে মন্দির বা তীর্থ স্থান সাধনা ও আরাধনার উত্তম স্থান।
যেখানে গেলে বা দর্শন করলে মনে শান্তি পাওয়া যায় তথা এক নিরালা  প্রশান্তিতে মনে প্রাণে
আনন্দ অনুভব হয় , মন কিছু ভালো কাজ করবার জন্য উদ্ভুদ্ধ হয় সেথা যেতে বার বার মন চায়। এবং এহেন কার্যের জন্য কিছু শক্তি সঞ্চার ও চিন্তন মননে ফুর্তির উদয় হয় বার বার  সেথা যেতে মন চায়।
অমরকণ্টক শুধু তীর্থ ভূমি নয় ,অমরকণ্টক হল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনাতীত সৌন্দর্যের খনি।
সেই কারণেই অমরকণ্টক যাবার জন্য মন ব্যাকুল।
আর এই ব্যাকুলতা মেটাতে একটাই পথ ---

"যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলরে একলা চলরে "
তাই আমিও একলাই চললাম -------

আমার মনে হয় সকল তীর্থ ভ্রমণ থেকে অমরকণ্টক ভ্রমণ বিশেষ মান্যতা  ও বিশেষ নিরালা। 
তথাপি সম্পূর্ণ অমরকণ্টকের বর্ণনা করা অসম্ভব। 
আমি বলতে পারি যে আমি নিজে যতটুকু দেখেছি বা জেনেছি শুধু সেই টুক লিখতে গেলে 
হাজার পৃষ্ঠার বইয়েও শেষ হবে না। 
সেই কারণে আজ এখানে এই ভ্রমণ কাহিনীতে (যদিও এটি ভ্রমণ কাহিনী বললে ভুল হবে 
এটি একদিকে তীর্থ দর্শন ও অপর দিগে আমার নিজের জীবনের এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার 
সামান্য একটু বর্ণনা। )

আজকাল যেকোন সময়ে  মন করলেই যাওয়া যেতে পারে অমরকণ্টক।
 প্রথমে যেতে হবে বিলাসপুর। সেখান থেকে আবার ট্রেনে পেণ্ড্রা রোড। আজকাল
 শালিমার-উদয়পুর (প্রতি রবিবার) এক্সপ্রেসে সরাসরি পেণ্ড্রা রোডেই যাওয়া যায়। স্টেশনের কাছেই  বাস, মোটর, ট্রেকারও পাওয়া যায় অমরকণ্টক যাবার জন্য ।
কিন্তু সেদিন, আজ থেকে 46 বৎসর আগে, অমরকণ্টক ছিল অতি ভয়ানক দুর্গম ,দিনের বেলাতেও
হিংশ্র পশুর ভয়। সামান্য কজন সাধু সন্ত ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছাবার প্রায় অসম্ভব ছিল।

 আজ আমি চেষ্টা করছি অমরকণ্টকের অতি সামান্য কিছু বর্ণনা দিতে ।

 অমরকণ্টক -----
মধ্যপ্রদেশের (বর্তমানে ছত্তিশগড় রাজ্যের )
শাহাদোল বা শ্যাডোল  জেলার অনুপপুরে অবস্থিত এই অমরকণ্টক তীর্থ ক্ষেত্র। 
উচ্চতা 1067/বা 1048 মিটার ( 3438 ফুট )
অক্ষাংশ  22-67"N 
দ্রাঘিমা 81-75"E
মন্দির ও পাহাড় দিয়ে ঘেরা পুন্য তীর্থ নগরী। 
মাইকাল ও বিন্ধ্যা পর্বতের অপূর্ব মিলন স্থল। 
নর্মদা, সোন ও জুহিলা  নদীর উৎস স্থল।
শহরের প্রদূষণ থেকে মুক্ত জল প্রপাত ,ঘন জঞ্জলে পূর্ন ,মনোরম সবুজে ঘেরা ,শীতল 
আবহাওয়ায় যেতে কার না মন চায়। 

বর্তমানে অনেক রাজ্ পথ হওয়ার কারনে পথ অনেক সহজ হয়েছে। 
কাটনি বিলাসপুর রোডে পেন্ড্রা রেল স্টেশন থেকে 45কি মি ,অনুপপুর থেকে 60কিমি ,বিলাসপুর থেকে 120কিমি,ডিন্ডোরি থেকে 80কিমি, রায়পুর থেকে 220কিমি এবং জব্বলপুর থেকে 235কিমি দূরে এই অমরকণ্টক পাহাড়ি,ধার্মিক তথা পর্যটন ক্ষেত্র।

সন্ত কবির ভাষায় "নর্ম "অর্থাৎ সুখ শান্তি। 
'সুখ -চৈন দক্ষতি ইতি " নর্মদা" '
সুখের তাৎপর্য সিদ্ধত্ব । সুখ, শান্তি, সিদ্ধত্ব, প্রাপ্তি স্থানের নাম নর্মদা।
অমরকন্টকের আবহাওয়াতে শরীরের উষ্ণতা যেমন কম হয় মনের অস্থিরতা ও তেমনি শান্ত হয়। 

পুণ্যতোয়া নর্মদা অমরকণ্টক থেকে উৎপন্ন হয়ে বিন্ধ্য পর্বত ও সাতপুরা  পর্বতের মধ্যে দিয়ে পাহাড় ভেদ করে নর্মদা ভীষণ ভীম বেগে ধাবিত হয়ে কাম্বে উপসাগরের সুরাটের কাছে বোরোচ বা ভারোচ নামক স্থানে গিয়ে মিলিত হয়েছে 813 মাইল পথ বেয়ে , যার উৎস স্থল অমরকণ্টকের
মূল মন্দিরের নিচে।  
এই নর্মদা নদী পরিক্রমা  করতে 1,007 কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। 
নর্মদার উভয় তট অতি পবিত্র ও সাধন ক্ষেত্র। 
পুরাণে উল্লেখ আছে , যমুনার জলে সাতদিনস্নান করলে, সরস্বতীর জলে তিনদিন ও গঙ্গার জলে একদিন স্নান করলে সকল পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । আর নর্মদার জল দর্শনমাত্রেই মোক্ষ লাভ।


মূল মন্দির শহর থেকে এক কিলোমিটার দূরে "মাই কে বাগিচা "এখানে প্রচুর আম ও ফুল  গাছ। নানা জাতির আম ও নানা নরকমের ফুল গাছ এখানে পাওয়া যায়। 
অপূর্ব এই বিশাল বাগান। ঘন অরণ্যের মধ্যে এমন সুসজ্জিত ফুলে ফলে পূর্ন অপূর্ব বাগান যা কিনা ভাবনার অতীত। 

অনেকে মনে করেন এই আম্রকুট থেকেই অমরকণ্টক নাম। এবং মহাকবি কালিদাসের আম্রকুট থেকেই এই অঞ্চলের নাম অমরকণ্টক। 
এখানে "গুল -ই -বকোয়ালি "নাম এক ক্যাক্টাস পাওয়া যায় ,যার অসাধারণ ভেষজ গুনও অতি সুমিষ্ট ও সুন্দর গন্ধ,এমন সুন্দর গন্ধ অন্য  কোন ফুলেই হয়না । 

এই বাগিচায় অনেকে জাগ্-যজ্ঞ করেন। কারণ এখানে নর্মদা অতিশয় জাগ্রত। 
এখানে পূঁজা জাগ্ যজ্ঞ করলে এটি সহজে শুদ্ধ জ্ঞান লাভ ও নর্মদা মায়ের দর্শনলাভ  হয়।
  
নর্মদা ও শোন নদীর মিলন স্থল "শোন মুড়া ",এখন থেকে সুর্যোদয়ের এক অসাধারণ মায়াবী 
দর্শণ হয়।  

উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত  ও দক্ষিণে সাতপুরা পর্বত মালা এই দুই পর্বত মালার  মিলন স্থানের নাম  মৈকাল বা ৠষ্য বা অমরকণ্টক। পুণ্যতোয়া নর্মদার তটে পুন্য তীর্থ অমরকণ্টক। 

এখানে একটু দূরে আছে জীবাশ্ম পার্কে ,ভারতের এক মাত্র জীবাশ্ম পার্ক। এখন থেকে একটু দূরে ঘুঘুরা জাতীয় উদ্যানের প্রবেশ দ্বার "পেট্রি ফায়েড ফরেস্ট ন্যাশানাল পার্ক "
অমরকণ্টক থেকে পশ্চিমে 11নম্বর জাতীয় সড়কে জব্বলপুরের দিগে ভিন্ডোরি,
শা'পুর শহর পার করে বাঁদিকে 14কিলোমিটার দূরে এই ঘুঘুরা জাতীয় উদ্যানের প্রবেশ পথ।
============================




19/3>11th May 197 --দশ দিনের টুরে অমর কণ্টক

আবার ফিরে চলি আমার কথায় , 11th May 1974 
যেমন পরিকল্পনা তেমনি কাজ দশ  দিনের  ছুটি নিয়ে বেৱিয়ে পড়লাম নর্মদা মা-এর উদ্যেশ্যে। 
বাকিমগড়া থেকে ট্রেনে চম্পা হয়ে বিলাসপুর।  বিলাসপুর থেকে আবার ট্রেনে কাটেনি লাইনে 
পেন্ড্রারোড স্টেশন। 
যখন পেন্ড্রারোড পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা বাজে। 
স্টেশনে নেমে খবর নিয়ে  জানলাম যে অমরকণ্টক যাবার বাস  আজকে আর পাবনা।
কারন পেন্ড্রারোড  থেকে অমর কন্টকের পাহাড়ের কাছে পর্যন্ত দিনে মাত্র একটা কি দুটা বাস চলে।
আজ একটা বাস ব্রেকডাউন। সকালের প্রথম বাস চলে গেছে,  তাই আজ আর বাস পাবনা।
এখানে কোন হোটেল ও নাই যে রাত কাটাবো। অতয়েব দুটি  রাস্থা একটি  ভোটেঙ্গা বা ভেটেঙ্গার  জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চোদ্দ মাইল  পথ হেঁটে পার হতে হবে।কারণ বাস রুট ধরে গেলে অনেক রাস্তা। অতটা হেটে যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়।অথবা বিলাস পুড়ে ফিরে যাওয়া।
অগত্যা ভেটেন্ডার জঙ্গলের পথ ,যাকিনা সেই গল্প শোনা সেই ভুতুড়ে জঙ্গল তার উপরে নানান জন্তু জানোয়ারের উৎপাত, অতিশয় শ্বাপদ সংকুল গভীর বন , অধিকাংশই কাটার ঝোপ।
বাঘ ভালুক তো আছেই, প্রতি পদে বিপদ। সাপ ,বিছা ,ও নানান কীট পতঙ্গের উৎপাত প্রতি পদেই বিপদ।
কোন উপায় না পেয়ে আবার স্টেশনের দিগে হাটতে লাগলাম, বিলাস পুড়ে ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ নাই। এবং সেই উদ্দেশেই স্টেশনের দিগে রওনা দিলাম।
হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ পেলাম "বেটা কাহা জাওগে  ".
আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং পেছনে ফিরে দেখি এক সাধু ডাকছেন।
( সাধুর বেশ বলিষ্ঠ দেহ ছয় ফুটের কাছে লম্বা। মাথায় বেশ বড়ো জটা ,তার উপরে একটি লাল কাপড় দিয়ে জড়িয়ে জটা ও মাথা ঢাকা। )
আমি বললাম মেরে ইরাদা থা অমরকণ্ঠক জনেকা।
সাধু বাবা পরিষ্কার বাংলায় বলেন তুমিকি বাঙ্গাল থেকে এসেছো ?
আমি বললাম হ্যাঁ আমি কোলকাতা থেকে এসেছি।
তুমিকি একলা এসেছ কেন ?
আমি নির্দ্বিধায় সকল কথা বললাম এবং এও বললাম যে হঠাৎ কেন জানিনা মনে হয়েছিল অমরকণ্টকের কথা। তাই নর্মদা মা এর  দর্শন করবার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল এবং কিছু ভাববার আগেই চলে এলাম এই পেন্ড্রা রোডে।
এখানে পৌঁছোবার আগে পর্যন্ত কোন চিন্তা হয়নি ,এখন ভীষণ চিন্তায় পড়েছি ,কি করে কোন পথে পৌঁছবো নর্মদার উৎস স্থলে। এখানকার কোন পথ ঘাট তেমন করে  চিনিনা শুধু এর আগে একবার
গিয়ে ছিলাম মাইকে দরবার, দুই বৎসর আগে। সেবার তো বাসে  গিয়েছিলাম। তাছাড়া তখন  আর  আজ, অনেক পাল্টে গেছে। কিছুই চিনতে পারছি না। এতদূরে এসে আবার ফিরে যেতে মন চাইছে না। অথচ ফিরে না গিয়েও  কোন উপায়ও দেখছি না।
একলা কিকরে পৌঁছব মায়ের কাছে। বোধ হয় মায়ের ইচ্ছা নাই আমাকে দর্শন দেবার।
আমার কথা শুনে সাধু বাবা বলতে শুরু করলেন দেখো বেটা আমি দুই তিন বার গঙ্গাসাগর গিয়েছি ,
বাঙ্গাল এর আদমি আমাকে বহুত মদত করেছে। তোমার কোন ভয় নাই আমিও যাবো মাইকে দরবার। জানে কে ইচ্ছা হায় তো চলো মেরে সাথ।
এমন সুযোগ পাবো সেটা ভাবতেই পারিনি। মনেহয় সত্যি ঈশ্বর আমার প্রতি দয়াবান।
মনেপড়ে গেল সেই চরৈবেতি চরৈবেতি-------
"চরণ বৈ মধু বিন্দতি,
চরণ স্বাদুমুদম্বরম।
পশ্য সূর্যস্য শ্রেমানং
যোন তন্ত্রয়তে চরণ,
চরৈবেতি চরৈবেতি। "

এগিয়ে চলো এগিয়ে চলো, যে এগিয়ে চলে দৃঢ়তার সাথে একনিষ্ঠ বিশ্বাসে সেই সোনা পায়।
তার চলার গতি কখনোই স্তব্ধ হয় না , এগিয়ে চললেই সত্যের সন্ধান খুঁজে পাওয়া যায়।
সত্য রূপ জ্যোতির প্রকাশ ও স্পর্শ পায়।
পৃথিবী সদাই গতিশীল তাইতো দিনরাত হয়. ঋতুর পরিবর্তন হয়। নিত্য নুতন সৃষ্টির সম্ভাবনা
হয়। নদী গতিশিল তাই নদীতে শেওলা জমেনা। আমরাও এগিয়ে চলবার মনস্থির করে নর্মদার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে রওনা দিলাম।
মনে নিশ্চিত ধারণা আছে যে মন্দিরের উদ্দেশে তীর্থে বেরিয়ে পড়লে সেই তীর্থের দেবতাই চলার পথের সকল বাধা দূর করে তাঁর কাছে নিয়ে চলে। শুধু মনে রাখতে হয় বিশ্বাস।
বিশ্বাসের প্রবল টানে পথ সুগম হয়।

আমার সম্বল মাত্র একটি কীট্স  ব্যাগ যার মধ্যে একটা ধুতি দুটো পাজামা দুটো টিশার্ট  একটি
গামছা। সাধু  বাবার সাথে যখন চলা শুরু করলাম তখন বেলা সাড়েবারটা।
চলবার আগে সাধু বাবা বললেন। ওই ব্যাগ নিয়ে হাতে ঝুলিয়ে পথ চলতে কষ্ট হবে ,কারণ পথে
অনেক কাটার ঝোপ। তাই সাধুবাবা আমার ধুতি দিয়ে ঠিক ওনার মতন করে একটি ঝোলা
বানিয়ে দিলেন যেটি কাঁধে বয়ে নিতে পারবো।
বাবা বললেন " তোমার সাথে কোন কম্বল নাই দেখছি ,রাত ক্যাসে গুজারেঙ্গে "
আমিতো কোন চিন্তা না করেই বেরিয়ে পড়েছি ,যা হবার তা হবে। দেখি কতটুকু শীত সইতে পারি।
কিন্তু  ,আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত এই জঙ্গল পার করতে পারবো কি ?
বাবা বললেন 'দেখো বেটা চৌদ মিইল  পারকরনা আসন নেহি। হামলোগ জাদাসে জাদা
সাত ইয়া আট মাইল  যা পাউঙ্গি ।
ইহাসে (10 1/2 ) সাড়ে দশ  মিইল কে বাদ শুরু হোঙ্গে ভোটেঙ্গা কি জঙ্গল।
আমরা সকালে সূর্য কিরণ থাকতে থাকতে জঙ্গল পাড় করবো।
রাস্তা ভীষণ পাথরিলা অউর চড়াই উতরাই  ভি। থোৱা কোশিষ  করকে হাম লোগোকো আট মাইল  যানা বহুতই  জরুরি।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন আট মাইল  গিয়ে কি জঙ্গল পার হয়ে যাব?
সাধু  বাবা বললেন নাহি জঙ্গল শুরুর একটু আগে ঝর্ণার পারে ওনার গুরুদেবের পুরানো একটা কুঠি আছে। যদি ঈশ্বরের কৃপায় সেই কুঠি ঠিক ঠাক থাকে তবে সেখানে আমরা রাত্রি টুকু কাটাতে পারবো। এবং সকালে আমরা সহজে  জঙ্গল পাড়  করবো ,  নচেৎ কি হবে তা ঈশ্বরই জানেন।
সাধু বাবা বললেন 'এত চিন্তা কেন যখন নর্মদার উদ্দেশে ঘর ছেড়েছো তখন মন প্রাণ সকলি মা কে  সঁপে দেও। ভালো মন্দ যা করবার মা ই করবেন।'
আর কথা না বাড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। পথ বলতে সামান্য পাক দন্ডীর মতন ঘাসের মধ্যে একটু সরু রেখার মতন। তাও আবার কোথাও আন্দাজেই চলতে হচ্ছে। প্রচন্ড কাটায় ঝোপ ঝাড়।
খুব সাবধানে হাটতে হচ্ছে। তবু একটু বাঁচোয়া যে বুট জুতো পরে আছি।

পথে কতগুলি সরু সরু নালা পাড় করলাম ,সামান্য জল ,তবে বর্ষাতে জলের বেগ থাকে বলে মনে
হলো। এভাবেই আমরা আন্দাজ করি ছয় কিলোমিটার পথ পার করার পরে
একটি গ্রাম পেলাম ,গ্রামটির নাম  পাকারিয়া গ্রাম।
পরোকিয়া /পাকড়িয়া গ্রামে দেখলাম এখানেগ্রাম বাসীরা  বাঘের মূর্তি গড়ে তার পূজা করে।
গ্রামে মানুষ খুবই কম ,কিন্তু এখানকার গোশালা দেখার মতন। দুধ ঘি প্রচুর।
আমরা একটু বিশ্রাম করার জন্য গ্রামের ভেতরে গেলাম।
একটু জল চাইবার আগেই একজন দুই গ্লাস দুধ নিয়ে এসে আমাদের দিলো।
আমরা কোন কথা না বলে এক শ্বাসে দুধ টুকু খেয়ে নিলেন। আহা কি অপূর্ব স্বাদ ,চারJদিন মনে থাকবে।এই দুধ খেয়ে মনে হল  কোলকাতার আমরা  দুধের নামে  সাদা রং করা জল খাই।
আমরা পেট পুড়ে দুধ, আম খেলাম। রাস্তায় দেখেছি প্রতিটি আম গাছে প্রচুর পরিমানে আম হয়ে আছে। ইচ্ছে মতন পেরে নিলেই হল।আর আছে কন্দ মূল ,যার স্বাদ অভূতপূর্ব।
এই  জঙ্গল ভয়ানক কিন্তু ফল, ফুল, দুধ, ঘি, দই, এর অভাব নাই। খাবার জন্য কোন চিন্তাই নাই।
এখানে কয়েক  ঘর মানুষ যারা বাস করে ওরা জাতিতে রাজ্পুত  প্রতিটি মানুষের বেশ হৃষ্ট পুষ্ট শরীর। প্রত্যেকের বেশ কয়েকটি করে গরু আছে। জানলাম ওরা এখানে বছর পাঁচেক থেকে বাস করছে। আগে শ্যাডোলের কাছে থাকতো।
এখানে গরু, মহিষ, ছাগল, কম খরচে পোষা যায়। কারণ জল ও ঘাসের অভাব নাই আর যত দুধ হয়

গোশালায় নিয়েগেলে উপযুক্ত দামে কিনে নেয়।তবে এখানে বিপদ একটাই বাঘ অথবা ভেরিয়া।
এরা একটু সুযোগ পেলেই গরু ছাগল এর তামাম করে দেয়। এ ছাড়া আর কোন অসুবিধাই নাই গরু মোষ ছাগল পালাবার।   তাই এই অঞ্চলে দুধ ঘি এর অভাব নাই।
সাধুবাবা বেশ খানিকটা ঘি খেলেন। আমি ঘি খেতে ভয় পেলাম কারন অভ্যাস নাই ,যদি হজম করতে না পারি তবে মুশকিলে পড়তে হবে ,সেই ভয়ে আমি ঘি খেলাম না। সকলেই জোরাজুরি করছিলো। তাছাড়া ঘিয়ের প্রতি আমার তেমন লোভ নাই।
যাইহোক আমরা আবার এগিয়ে চললাম।
জঙ্গলে অধিকাংশ ফলের গাছ ,আম, জাম , কাঁঠাল, বেল তো দেখবার মতো।  বেশ বড়ো বড়ো
বেল। কলাগাছ আছে প্রচুর। কন্দ মূল পাওয়া যায় অনেক।  তাই সাধু সন্তঃ ভ্রমণ কারি ,কারুরই খাবারে চিন্তা করতে হয় না ।
আমরা এগিয়ে চললাম নুড়ি পাথড়ের পথ তাও  ঘাসে ঢাকা। পথ চলা বেশ কষ্ট কর। কারণ পথ কোথাও চড়াই কোথাও উথরাই। যাইহোক এই ভাবে চলতে চলতে আমরা  আমরা গৌরেলা নামক
এক গ্রাম পাড় করে এগিয়ে চললাম। পথ তো নয় স্রেফ একটু পাকদন্ডী কাঁটা ঝোপ ঝাড়পূর্ন পথ। আসে পাশে চারিদিকে আমলকি ,হরিতকি ,বহেড়ার বড়ো বড়ো গাছ।
নানান প্রকারের ফুল গাছ ,কিসুন্দর সব ফুল ফুটে আছে।

হঠাৎ ভীষণ বৃষ্টি, বেশ জোরে বৃষ্টি নামলো। আমরা একেবারে সেই কাক ভেজা হয়ে গেলাম।
সাথে সাথে  বেশ শীত করতে লাগলো। ভাবলাম এখনই এমন শীত তা রাত্রে কি হবে।
আমার ঝোলা ভিজে কাদা পকেটে টাকা গুলিও ভিজে গেল । সেই বৃষ্টি ভেজা হয়েই আমরা চললাম এগিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে।বেশ খানিকটা চলার পরে এক নালার পাশে ইঙ্গিত করে সাধু  বাবা দেখালেন এই দেখো  ভালুকের পায়ের ছাপ , এইমাত্র বৃষ্টি হবার কারনে ওদের পায়ের ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। একটু খাড়াই পথে আমি একটা গাছের গুড়ির শেকড় ধরে ওঠার জন্য হাত বাড়াতেই সাধু বাবা আমাকে ধমক দিয়ে টেনে নিলেন এবং দেখালেন যেখানে আমি হাত দিতে যাচ্ছিলাম সেইখানে ওই গাছের শেকড়ের পাশেই বসে আছে বিশাল এক সাপ।
সাপটি দেখে মনে হোল আর একটু হলেই আমার ভব লীলা সাঙ্গ হতো। ওই সাপের এক ছোবলই
মৃত্যু অনিবার্য।
সাধু বাবা বললেন ,ভোটেঙ্গার   জঙ্গল (প্রকৃত ভোটেঙ্গা  এখন থেকে অনেক দূরে তবুও যেহেতু বিশাল জঙ্গলের সাথে এই জঙ্গলের যোগ আছে তাই সাধারণ ভাবে এই জঙ্গলকেও ভোটেঙ্গার  জঙ্গল বলে।উনি  যতবার এই পথে এসেছেন  প্রতি বার দেখেছেন  জঙ্গল একটু একটু করে কম হয়ে মানুষের বাস শুরু হয়েছে  প্রকৃত ভোটেঙ্গার  জঙ্গল  সত্যি অতি  ভয়ানক জঙ্গল।  ) আর একটি  গ্রাম  পাড়  করার পরেই শুরু হয়ে ছিল কুশের জঙ্গল,  এতো বিশাল ও ঘন কুশের জঙ্গল ভাবা যায় না।কুশের ধারে  হাত পাও কেটে জ্বালা করছিল।আমি প্যান্টের নিচের দিক লম্বা ঘাস দিয়ে দড়ির মতন করে বেঁধে নিয়ে ছিলাম ,যাতে করে কুশে পা না কাটে ,কিন্তু হাত বাঁচাতে পারছিলাম না। যেখানে যেখানে কেটে যাচ্ছিলো সেখানে ভীষণ জ্বালা করছিলো। সাধু বাবা কিছু ঘাস আমাকে দিয়ে বললেন এগুলি চিবিয়ে যেখানে জ্বালা করছে সেখানে রস লাগাতে। সত্যি কি অপূর্ব। যেখানে বিষ সেখানেই অমৃত।
ওই ঘাসের রস লাগাতেই জ্বালা কমে যাচ্ছিলো।
কুশের জঙ্গল শেষ হতেই শুরু ঘাস ও বড় বড় আমলকি হরতকি বহেরার জঙ্গল। আমগাছ প্রচুর। আর আছে ভেড়া ও লেবু গাছ।

পাহাড়ি পথের চড়াই উতরাই কঠিন পাথরের পথ।এবার পথে বড়ো বড়ো পাথর,তার ওপরে বৃষ্টির কারণে পাথর গুলি পিচ্ছিল হয়ে গেছে । প্রতি টি পাও খুব সাবধানেফেলে  চলতে হচ্ছে ,তার ওপরে ক্রমেই আলো কমে আসছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আগেই অন্ধকার হয়ে যাবে।
অবশেষে  বহু কষ্ট করে হলেও আমরা সাধু  বাবার গুরুদেবের আশ্রমে পৌঁছলাম।
আশ্রম বলতে চারটি খুঁটির ওপরে ঘাস দিয়ে ছাউনি।  তাও আবার জীর্ন অবস্থা। চারদিকে বেড়া
নাথাকার মতন। জঙ্গলের কাঠি কুশ দিয়ে ঘেরা কোন এক সময় হয়তো এই বেড়াতে মাটি লাগানো
ছিল ,কিন্তু আজ আর সেই মাটির লেশ মাত্র নাই। শুধু বেড়ার কঙ্কাল কয়েকটি কাঠি ও সামান্য
অংশ বেড়ার অবশিষ্ট আছে। আর আছে সুদৃঢ় একটি বেশ বড়ো মাচা।এই মাচায় চার পাঁচ জন আরামে বসতে ও শুতে পারে।
সাধু  বাবা "জয় গুরুজী কি জয় "বলে ওই জীর্ন ছাউনির ভিতের প্রবেশ করে আমাকে ডেকে
নিলেন। বাবা বললেন দেখো বেটা গুরুজী কি মহিমা দেখো ,হ্যাম লোগোকে লিয়ে কঠোরি
বনাকে রাখা। আও বেটা এহিপর হাম লোগোকো রাত গুজারন করনা হায়। আমরা দুজনেই মাচায় উঠে বসলাম। আমি একটু আসস্থ হলাম কারণ মাচার ওপরে থাকলে জন্তু জানোয়ারের ভয় থেকে একটু সাবধানে রাত কাটবে।  এদিকে সন্ধ্যায় বেশ ঘনিয়ে এলো।  চারিদিক অন্ধকার।শীত ও যেন জাকিয়ে বসছে  শুধু গাছে ফাক ফোঁকর দিয়ে  একটু চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছিলো ,আর তাতেই একটু আভা স্বচ্ছতা নজরে পড়ছিলো ,বাবা বললেন আজ অন্ধেরা দ্বাদশী ,তার মানে দুইদিন আগে পূর্ণিমা ছিল।
একটু আগে এমন জোরে বৃষ্টি হলো আর এখন আবার আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। কি অদ্ভুত।
বাবা আমার অবস্থা বুজতে পারলেন।  তিনি নিজের কম্বলটা আমাকে দিয়ে বললেন ' নে  বেটা রাত্রে দুজনে মিলে  একটু কষ্ট করে কাটিয়ে দেবো। চিন্তা করিস না। '

এতক্ষনে একটু আরামে  সুযোগ পেয়ে আমি সাধু বাবাকে তার পরিচয় জানতে চাইলাম।
উনি বললেন যে ওনার সাধন আশ্রমের নাম দন্ডি নাথ। সকলে দন্ডি বাবা বলে ডাকে।
ওনার গায়ের রং তামাটে তবে বেশ পেশী বহুল দেহ।  লম্বায় প্রায় ছয় ফুট হবে।
গাজা ভাং কোন নেশা নাই। তবে যদি পায় তো একটু আধটু নস্যি নেন। ফুরিয়ে গেলে তা ও নেন না।
ওনার আশ্রম কাশিতে বি এইচ ইউর কাছে। কাশিতে থাকা কালীন উনি কাশির মোটা শিবের মন্দিরে
পূজা করেন। ( মোটা শিব মানে সে এক বিশাল গোলাকার শিব লিঙ্গ। বেড়ে প্রায় ত্রিশ  ফুট হবে।
কাশিতে তো শিবের অন্ত নাই। কাশির প্রতিটি রাস্তায় একটি কি দুটি শিবের মন্দির। সত্যি কাশি মানে
শিবের নগরী। সকাল সন্ধ্যা শিবের নাম জপ চলতে থাকে । সন্ধ্যায় তো সম্পূর্ণ কাশি নগরী কীর্তনে মুখরিত হয়ে ওঠে। সে এক দেখার জিনিস ,এমন পরিবেশে মন প্রাণ শিবময় হতে বাধ্য়  )

রাত্রে আমাদের আম আর কন্দমূল খেয়ে রাত কাটলো।
দন্ডি বাবাসঙ্গে করে বেশ খানিকটা কন্দমূল সঙ্গে এনে ছিলেন ,আর এক গ্রামের লোকেরা আমাদের দিয়ে ছিল কিছু পাকা আম।কন্দমূল আমি আগেও খেয়েছি। তবে তা কিনে খেতে হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশের নানান স্থানে পাওয়া যায় কন্দমূল। চাল কুমড়োর মতন দেখতে তবে বিশাল আকার
ফলটির বাইরের রং গেরুয়া আর ভেতরে লালচে হলুদ। খেতে অপূর্ব স্বাদ ,বেশ মিষ্টি।
রাতে ঘুম কিআর হয় একেতো গভীর জঙ্গল ,নানান নিশাচর পশু পাখিদের নানান আওয়াজ।
ভয়ঙ্কর ভীতির কারন ,তার উপরে প্রচন্ড শীত।  আর বাবার যে কম্বলটা গায়ে দিয়েছি মনেহয়
সেটা সেই প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত কোনদিন ধোয়া হয় নি ফলে এক উৎকট গন্ধ।
কিন্তু উপায় কিছু নাই এই শীতে ওই কম্বলের জীবন বাঁচাতে হবে।
সে যাইহোক রাত  টা প্রায় নাঘুমিয়ে কোনমতে কাটানো গেল।

NEXT DAY--12th May

দন্ডি বাবা বেশ আরামেই ঘুমোলেন এবং ভোর হবার আগেই উঠে পড়লেন।
আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ঘুম হয়ে ছিল কিনা। আমাকে খানিকটা মিথ্যা কথাই বলতে হল।
যাইহোক সকালে উঠে ঝর্ণার জলে স্নান করে  বাবা নিজের ধ্যান জপ করলেন।সাথে একটু শরীর চর্চাও করে নিলেন  আমিও স্নান করে বেশ খানিক টা ঝর্ণার জল খেয়ে নিলাম।  তারপরে আমিও
একটু ধ্যান ও সামান্য শরীর চর্চা করে নিলাম।আমার শরীর চর্চা দেখে বাবা বেশ খুশি হলেন।
সাধু বাবা আমাকে  একটি ফল দিয়ে জিজেও একটি ফল খেয়ে নিলেন। ফল টি অতি  সুস্বাদু
তবে কিফল তা বুঝতে নাপেরে বাবাকে ফলটির নাম জিজ্ঞাসা করতে উনি বললেন আমাঠিয়া।
এমনফলের নামও কোনদিন শুনিনি ,দেখিও নি।
তার পরে আমরা আবার হাটা  শুরু করলাম। এতক্ষনে আমরা আবার একটি নালা পাড়  হলাম বাবা বললেন এই নালার নাম  অমর নালা। এটি একটি ছোট ঝর্ণার ধারা। ঝর্ণাটির নাম দূর্গা ধারা।
এই স্থানের মাহাত্ম্য হলো এখানে  দেবতা আর অসুরের যুদ্ধ হয়েছে বার বার। কারণ যখনি কোন
অসুর গভীর তপস্যা করে কোন দেবতাকে তুষ্ট করে বিশেষ কোন বড় প্রাপ্ত হয়েছে তখনি বেবরাজ
ইন্দ্রের ভীতির কারণ হয়েছে। তার রাজপাট ছিনিয়ে যাবার। আর সেই ভয়ের কারণেই দেবতারা
অসুর বধে মেতেছেন। সেই কারনে  দেবতারা যতবার অসুরদের সাথে যুদ্ধ করেছেন এইস্থানে ততোবারই দেবতারা হেরে গেছে। আর তাই দেবতাদের কাছে এই অঞ্চল কণ্টক স্বরূপ।
অনেকে মনে করেন এরথেকেই এই স্থানের নাম অমরকণ্টক।
এখানে অনেক সাধুর কুঠি দেখতে পেলাম।নালার দুই পাশেই অনেক ছোট ছোট কুটির।
আমি দন্ডি বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম এই ছোট ছোট কুটিরে সাধুরা থাকেন ,যেকোন সময়ে ই
বাঘের আক্রমণ তো হতে পারে। নিদেন পক্ষে সাপের থেকেও তো ভয়ের কারণ হতে পারে।
সাধু বাবা বললেন এখানে যেসকল সাধু থাকেন তাঁরা সকলেই বিশেষ মহাত্ম্যা।
জঙ্গলের কোন জন্তু জানোয়ার এনাদের কোন ক্ষতি করে না। বা ছুঁতেও পারেনা।
এনারা সর্ব ত্যাগী বিশেষ বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী নির্ভীক। অতি ক্রোধী আবার নিতান্ত দয়াবান।
এঁনাদের স্বভাব অদ্ভুত ,আচার বিচারও অদ্ভুত। কেউ কারুর থেকে কম নয়। এখানে এতো সাধুর বাস সকলেই সকলকে চেনে জানে ,কিন্তু কেউ কারুর সাথে কোন কথা বলেন না। যে যার নিজের
ধ্যান তপস্যা নিয়েই ব্যাস্ত।
বাবা আমাকে দেখালেন দেখো সূর্য উদয় হচ্ছে । ওই দেখো ,সামনেই বিন্ধা পর্বত ,পর্বতের চূড়া দেখা গেল। যেন মেঘের পর্দা ভেদ করে মাথা উঁচু করে স্থির অচল গম্ভীর দাঁড়িয়ে আছে বিন্ধ্যা পর্বত । কি অপূর্ব দৃশ্য  এই সকল  দৃশ্য দেখার মজা ,পায়ে হাঁটার সকল কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়।
ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় প্রকৃতিতে এমন শোভা মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল।
আমি সূর্য স্তোত্র পাঠ করতে লাগলাম। বাবা বললেন বেশ ভালো সূর্য উদয় কালে সূর্য স্তোত্র পাঠ
করলে পুরোদিন উর্জা বজায় থাকে ,মনে শান্তি বিরাজ করে।

এখান থেকে পথ যেমন শুরু তেমনি চড়াই। চড়াই একটু কষ্ট করে চড়া যায় কিন্তু উৎড়াই বড়োই
কঠিন ,অসাবধানে পা পিছলে গেলেই ভীষণ বিপদ। হাত পা তো ভাঙবেই ,খাদে পড়েগেলে মৃত্যু অনিবার্য তাই খুব সাবধানে উৎড়াই পার করতে হচ্ছে। এমনি করে একটু একটু এগিয়ে চললাম।
দুই  তিনটি চড়াই  পাড় করার  পরেই একটু উৎরাইয়ের পথে দূর থেকে দেখাগেল মা এর মন্দিরের চুড়া।
এর পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম মন্দির চত্বরে।
মোটা মুটি  সকাল ১০ টা নাগাদ আমরা  পৌঁছে গেলাম।

(শুনে ছিলাম ও গল্পে পড়েছিলাম ভোটেঙ্গর  জঙ্গলে ভূতের বেশি বাজে।
হ্যাঁ সেই বাঁশির আওয়াজ শুনে বাবা বলেছিলেন এখানে অনেক সিদ্ধ পুরুষদের আত্মারা ঘুরে বেড়ায় এবং তাঁদের শুদ্ধ ক্রিয়া কাণ্ডের ফলে সকল মন্ত্রের মিশ্রণে এক বিশেষ ধ্বনী উৎপন্ন হয় যার রেশ
কখনো কখনো এখন সুন্দর বাঁশির সুর শোনা যায়।
এই বাঁশির শব্দ শুনে ভয় পেলে রক্ষা নাই।
আমার কিন্তু ধারণা অন্য্ রকম হল। চারিদিগের শনের বন ,এই শনের উপর দিয়ে যখন হাওয়া বয়  তখন একটা শন শন শব্দ হতে থাকে তার সাথে যোগ হয় ঝি ঝি পোকার মতন এক প্রকারের কীটের আওয়াজ, দুই শব্দ মিলে উৎপন্ন হয় এক বিশেষ শব্দ যা কিনা ঠিক বাঁশির আওয়াজের মতন শোনায়।
যদিও এই বাঁশির আওয়াজ নিয়ে অনেক গল্প কথা আছে। তথাপি আমি নিজে যেটুকু অনুভব করতে পেরেছি সেটাই জানালাম।
তবে হ্যা দুপুরে ও সন্ধ্যাতে এমন বাঁশির আওয়াজ বেশি স্পষ্ট শোনা যায়, যখন হাওয়া বয় । )

আমরা পৌঁছলাম অমরকণ্টক মন্দিরে। 
দন্ডি বাবার চেনা জানা এক আশ্রমে। সেখানে আরও চার পাঁচ জন সাধু ছিলেন। 
তারাও মা এর দর্শনে এসেছেন। 
দিনের বেলা ওই আশ্রমের খিচুড়ি ও মিষ্টি আলুর পোড়া খেয়ে কাটালাম। 
আশ্রমে যিনি রান্না করছিলেন ওনাকে খাবারের দাম দিতে গেলে উনি নিলেন না ,
বললেন যেকদিন এখানে থাকবেন আমার কাছে থাকলে কোন পয়সা লাগবে না। 
আমি একটু অবাক হলাম তাহলে কি উনি কোন লঙ্গর চালান। 
আমার মুখের ভাব দেখে দন্ডি বাবা বললেন বেটা এখানে খাওয়া  থাকার কোন পয়সা উনি নেন না।
ওনার উদ্যেশ তীর্থ ভ্রমণ কারীদের সেবা করা। তা উনি যতটা পারেন করেন ,আমি  বললাম 
বাবা তীর্থ করতে এসে ফ্রি তে খাওয়া মোটেও উচিত নয়। 
তাহলে তো আমাদের সব পুন্য উনিই নিয়ে নেবেন। এবারে বাবা খুব জোরে হাঁ হাঁ করে হাসলেন,
'বললেন একজনের পুন্য অন্যকেউ কি নিতে পারে? পাপ পুন্য কি এটি খেলনা। 
ও সকল চিন্তা করো না আমরাও ফ্রিতে খাবোনা।  আমরা ওয়াপস ফিরে  যাবার দিনে ওনার হাতে 
এই চাল ডাল  কেনার নাম করে কিছু দিয়ে যাবো ,যতটা পারি এই ঋণ শোধ করেই ফিরবো।'
আমি একটু স্বস্তি পেলাম। খাবারের পরে দুপুরে একটু আরাম করতে সকলেই  মাটিতে পাতা  হোগলায় গা এলিয়ে দিলেন। আমি দন্ডি বাবাকে বলাম বাবা আমি তো এই স্থানে আগেও একবার 
চার জনে মিলে মায়ের দর্শন করে গেছি কিন্তু আগের  কিছুই চিনিতে পারছি না। কি অদ্ভুত ,মাত্র দুই বৎসরে এতো পরিবর্তন ,ভাবতেই পারছিনা। দন্ডি বাবার বললেন  এখানে রোজই ,নিত্য নুতন ভাঙা গড়া  চলছে। 
মাই রোজানা নয়া নয়া সাজমে সাজতে হায়। ইসলিয়ে রোজ ইহা নয়া কুছনাকুছ  হতে হায়। 
তবে কিকরে আমি সকল মন্দির দর্শন করবো?
'দেখো বেটা সব কিছু দর্শন করা সম্ভব নয়  কারণ আমি যখন প্রথম বার এই মা কি  
দরবারে এসেছিলাম তখন এখানে শুধু একটি ছোট সুন্দর মন্দির ছিল আর আসে পাশের স্থান 
গুলি এতো গভীর জঙ্গলে পড়ি পূর্ন ছিল যে সকল স্থানে পৌঁছনোই অসম্ভব ছিল। আর আজ দেখো কত মানুষ সাধু সন্ত এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জঙ্গল কত কমে গেছে। 
যত মানুষের আগমন বাড়ছে সাথে সাথে ততই জঙ্গল কমছে। 
আমাদে পরের জন্মে বোধ হয় এখানে শহর হয়ে যাবে। আর অন্যসকল  সিদ্ধ পিঠের মতন এই সিদ্ধ পিঠও একদিন শহরে পরিণত হবে। এই এত জন্তু জানোয়ার পশু পাখি কিছুই আর থাকবেনা।
শুধুই পাথরের বাড়ি ও গাড়ি ঘোড়ায় পরিপূর্ন হয়ে যাবে। 
সে কারণেই বলছি যতটুকু পারো দর্শন কোরো ,আর রোজ তিন বেলা মা এর  নাম জপ করো,
যেতনা হো ধ্যান করো।  আরে ইহা মা এর ঠাঁই ,মা কে  পেলে আর কাহাকে চাই। 
মাইতো জগতের আলো,বাতাস,মা ই জল রূপে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। 
মা ই বিদ্যা ,মা ই শিক্ষা , মা ই বেদ ,মা ই সর্ব শাস্ত্র, মা ই সৃষ্টির কারণ ,মা ই প্রলয়ের কারণ। 
তাই মা কে দর্শন করলেই সকল দেবতা তুষ্ট। তাই কোন চিন্তা নাকরে মা কে ডাক। 
আর যদি ঘুমনে কে লিয়ে এসে থাকো তো ঘুড়ে বেড়াও , যেখানে মন চায়। 
সিদ্ধ পিঠে এসেছো নিজেকে সিদ্ধ করে নেও। বাকি সকল চিন্তা আবার কেলকাত্তা গিয়ে করো। 
উনি আরও বললেন 'মেরে সাথ রহেঙ্গে তো ম্যানে যাহা যাহা যাউজ্ঞা উহা উহা তুম দর্শন করলেনা। 
বাকি জবচাহ তব চলে যাও। নিচে মে বস মিলেগা সবেরে আট বাজে, ফির দোপহর দো বজে। '

আমি ওনার সাথে থেকে  ঘুরলাম। 
ও বলতে ভুলে গেছিলাম দন্ডি বাবা আশ্রমের পড়িচালক কে বলে প্রথম দিন দুপুরেই  আমার জন্য একটা কম্বলের জোগাড় করে দিয়েছিলেন। সকল সাধুরা সাথে করে একটি কম্বল ও একটি গামছা সাথে রাখার কারণ হারে হারে বুঝতে পারলাম। 
দন্ডি বাবাই বললেন সমগ্র অমরকন্টক মন্দিরময়। যেখানে যেদিগে যাবে মন্দির পাবে। 
তবে দর্শনীয় স্থান গুলি  হল এই মা নর্মদার মন্দির।
মাই কা বাগিচা ,প্রাচীন মন্দির কালাচুরি , কোপিল ধারা (কোপিল জলপ্রপাত ), 
শ্রী যন্ত্র মন্দির , দুধ ধারা জলপ্রপাত , জালেশ্বর মহাদেব মন্দির, পরম বিনায়ক, ধূনিপানী, পুস্কর ড্যাম, শম্ভুধারা, চক্রতীর্থ, চন্ডীগুহা। শ্রী সর্বোদয় দিগম্বর জৈন মন্দির ,মৃত্যুঞ্জয় আশ্রম,
অমরেশ্বর মহাদেব মন্দির , শোন্ উদ্যান মন্দির ,ভৃগু কমণ্ডল।  এছাড়াও  আরও অনেক মন্দির, আশ্রম আছে এবং রোজই  তৈরী হচ্ছে  এখানে মন্দির ,হোটেল ধর্ম শালা ,যাত্রী নিবাস।  

তবে ওনার সাথে ঘুরে কিছু লাভ তো হয়েছে। বেশ কিছু হটযোগে অভ্যাস করতে পেরেছি। 
সেই কামাক্ষা মায়ের কাছে শেখা হটযোগের অনেককিছুই ভুলে গিয়ে ছিলাম। আমার  অভ্যাস 
করার সময় কোথায়। যাইহোক পুরোনো শরীর চর্চা আবার নুতন করে শিখলাম।
দন্ডি বাবার কাছ থেকে অনেক কিছুই জালাম।  

(1 2may  & 13 may)
দন্ডি বাবার সাথে দুদিন ঘুরে বেরিয়ে গাইডের মতন করে কত গল্প শোনালেন ও নানান মন্দির দর্শন করালেন। 
বাবা বললেন মেখলাগিরির এই পুণ্যক্ষেত্রে অনাদিকাল শিব ছিলেন কঠোর তপস্যারত। কত দিন, কত বছর, কত যুগ ধরে যে তিনি ধ্যানমগ্ন ছিলেন তার হিসেব কেউ জানেনা । ঠিক এমনই সময় এক শুভক্ষণে শিবের কণ্ঠদেশ থেকে নির্গত হলেন নর্মদা। আবির্ভূতা হয়েই তিনি শিবের দক্ষিণ চরণে দাঁড়িয়ে দশ হাজার বছর রুদ্রের (শিবের ) তপস্যা করেন। সেই কঠিন তপস্যার কারণে  শিবেরও ধ্যান ভঙ্গ হল। শিব চোখ মেলে তাকালেন এবং দেখলেন এক অপূর্ব সুন্দরী কুমারী কন্যা যার মাথায় পিঙ্গল জটাভার, এক হাতে কমণ্ডলু অন্য হাতে অক্ষমালা, তাঁর দক্ষিণ চরণে করজোড়ে দাঁড়িয়ে জপ এবং ধ্যানে মগ্ন হয়ে আছে। শিব তখন তার  ধ্যানভঙ্গ করিয়ে সস্নেহে ডাকলেন তাকে, ‘কে তুমি মা?’ কন্যা বললেন, ‘আমি আপনারই আত্মজা আপনারই কণ্ঠ হতে আবির্ভূতা।’ শিব বললেন, ‘তোমার তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কী বর চাও তুমি বলো?’ কন্যা বললেন, ‘আমি যেন অমৃতময়ী হতে পারি।
এবং  গঙ্গার মতো মাহাত্ম্য যেন আমারও হয়। আমার সলিলে স্নান করে যেন সর্বপাপ মুক্ত হয় মানুষ।’ শিব বললেন, ‘তাই হবে। শুধু স্নানে নয়, তোমাকে দর্শন করলেও মোক্ষলাভ হবে।’ কন্যা বললেন, ‘আমি আরও বর চাই পিতা। আপনার দেহ হতে নির্গত হয়েছি আমি। তাই এমন বর দিন যেন সবসময় আপনার সঙ্গে আমি একাত্ম থাকতে পারি।’ শিব প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘তথাস্তু। যেখানে তুমি সেখানে আমি।’ তাই তো ‘নর্মদা কি কঙ্কর সকলি  শঙ্কর’।
নর্মদা মায়ের মন্দির পরিসরে  অনেক  মন্দির আছে। মুখ্য মন্দিরে আছেন মা নর্মদা ও অমরেশ্বর। এই মন্দির যে কবে কোন যুগে কে নির্মাণ করিয়েছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না।
অমরকন্টকের প্রধান উৎসব হল মহাশিবরাত্রি, নর্মদা জয়ন্তী ও বৈশাখী পূর্ণিমা। সেইসময় নর্মদাপাড়ের অমরকন্টকের  মেলা দেখবার মতন।  

(14/May)---
সেদিন  বিকেল বেলা বাবা হঠাৎ বললেন যে উনি বিশেষ কিছু পূজাতে ব্যস্ত থাকবেন তাই উনি নিজে আর আমাকে কোথাও  নিয়ে যেতে পারবেন না। 
আমি এমন কথায় একটু বিষণ্য বোধ করাতে বাবা  এক দোকানে গিয়ে দোকান দারের সাথে কিছু কথা বলে একটি ছেলের সন্ধান করেন। ছেলেটির নাম বিলাস তাবড়। 
বাবার নির্দেশে বিলাস মোটর সাইকেলে (এনফিল্ড মটর সাইকেল )আমাকে  
35 কিলোমিটার দূরের শ্রী গণেশজির মন্দির, সাত কিলোমিটার দূরের কপিল ধারা ,মাইকী বাগিচা 
এমন এমন দুরের সকল মন্দির ,জলপ্রপাত এবং আরও নানান স্থান দেখিয়ে আনলো ওর বাইকে করে। 
বিলাস এখানে বেশ পরিচিত ছেলে এবং দন্ডি বাবার ভক্ত। 
ওই গাইডের মতন করে আমাকে নিয়ে তিনদিন ঘুরিয়ে দেখালেন নর্মদা মন্দিরের 
বহু স্থান। আর পথে যেতে যেতে গল্পের মতন করে কত যে কাহিনী শোনালেন। 
প্রতিটি মন্দিরের বিবরণ সুন্দর করে বলে গেল। বিলাসের  মুখে  শুনলাম ও প্রতিটি স্থান দর্শন করলাম -----
বাইকে করে গিয়েও প্রতিটি স্থান  দর্শনের জন্য পায়ে হেটে চড়াই উৎরাই পথে যেতে হয়েছে। 
কারণ স্থান গুলি কোনটি সেই গভীর খাদের নিচে কোনটি পাহাড়ের উপরে 'প্রতিটি স্থানই জঙ্গলে ঘেরা। এক স্থান থেকে আরেক স্থান অনেক দূর কোন বাহন ছাড়া পৌঁছে আবার ফিরে  আসা মুশকিল।তার উপরে সকল স্থান এতো গভীর জঙ্গল যে জানা না থাকলে সকল স্থানে পৌঁছনই অসম্ভব।
তবে বেশ কিছু মন্দির দর্শনে বেশ কষ্ট করে পাহাড়ে উঠতে ও কোথাও নিচে নামতে হয়েছে। 

জানা না থাকলে এই সকল মন্দির খুঁজেই পাওয়া যাবে না। 
যাইহোক দন্ডি বাবার কল্যানে বিলাস কে পেয়ে তিন দিন ধরে আমি অনেক মন্দির সিদ্ধ স্থান অনেক সহজে দর্শন করতে পারলাম। (13 to 15th May)
(11 to 15th May)
পাঁচ দিনই বেশ রোমান্টিক ভ্ৰমন ও দর্শন করে মনে অনেক তৃপ্তি অনুভব করলাম।
তার পরেও আমি আরও 4দিন 19 Mayপর্যন্ত আশেপাশের মন্দির দর্শন করে রয়ে গেলাম।
কারণ এই এমরকণ্টক থেকে ফিরে যেতে মন চাইছিল না। যাইহোক ফিরতে তো হবেই সেই কারণে 19 তারিখে রওনা দিয়ে কাজের জায়গাতে ফিরে আসলাম।

19/4) নিজের কিছু বিশেষ কথা::---

প্রথম দিন দন্ডি বাবার সাথে মায়ের মন্দির ও আসে পাশের কোটি তীর্থ ,গোমুখ,রং মহল,
শোন মুড়া,মার্কেন্ডেয় মন্দির। ডাকবাংলো ,মন্দির গুলি দেখলাম 
বাবার সাথে  পুজো হোম করেছিলাম।
এখানে নর্মদা মাতার মন্দিরে এলে মন ভরে যায়। কালো কষ্টিপাথরের তিন ফুট উচ্চতার মূর্তি নর্মদা মায়ের। এক হাতে কমণ্ডলু অপর হাতে বরাভায়। মূর্তির সামনেই বিপরীত দিকে অমরেশ্বর শিবের মন্দির। মন্দিরের ঠিক পিছনদিকেই নর্মদার উৎস। উৎসমুখে জলস্পর্শ করে সংলগ্ন এলাকারই বাঁধানো কুণ্ডে স্নান করা যায়। এর নাম কোটি তীর্থ।

অমরকণ্টকে এলে হাঁটাপথেই বেশ কয়েকটি স্থান দেখে নেওয়া যায়। তার মধ্যে একটি হল শ্রীযন্ত্র মহামেরু মন্দির। অমরকণ্টকের সেরা মন্দির এটি। এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা সবই বাহান্ন ফুট। মন্দিরের গায়ে সর্বত্র বিভিন্ন দেবদেবীর সুন্দরকলার ভাস্কর্য বিদ্যমান। এরপর আছে স্বল্প দূরত্বে বিখ্যাত কর্ণ মন্দির। সেই একই চত্বরে আছে কেশবনারায়ণ মন্দির। আর আছে ষোলোটি স্তম্ভের ওপর নির্মিত অতী সুন্দর মৎস্যেন্দ্রনাথের মন্দির।

আমি যতবার অমরকণ্টকে গেছি প্রতি বারেই কিছু নুতন নুতন মন্দির পেয়েছি। কিছু মন্দির তো খুঁজেই পাইনি। 
কারণ সেই মন্দির গুলি এমন এমন পাহাড়ের ঢালে বা গভীর জঙ্গলে যা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। 
আসলে অমরকণ্টকের মহিমাই এমন যে ,যেই যাক প্রত্যেকে কিছু না কিছু নুতন মন্দির নুতন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরবেন ,কারুর সাথে কারুর সম্পূর্ণ মিল হবেনা। 
আমি নিজে চারবার গেছি প্রত্যেক বারের অভিজ্ঞতার সাথে আর একবারের অভিজ্ঞতা মেলাতে পারিনি। 
( প্রথম বার 1972 সালে ,দ্বিতীয় বার 1974 সালে, তৃতীয় বার 1979 সালে, 
আর  শেষ বার গিয়েছিলাম 2008 সালে। 
প্রথম বার কোলকাতা থেকে ট্রেনে বিলাস পুর হয়ে পেন্ড্রারোড। 
পেন্ড্রারোড থেকে বাসে করে অমরকণ্টক পাহাড়ের কাছে পৌঁছে সেখান থেকে পায়ে হেটে পৌঁছেছি মন্দিরে । 
দ্বিতীয়বার পেন্ড্রা রোড থেকে পায়ে হেটে  ভোটেন্ডার জঙ্গল পাড় করে পৌঁছেছিলাম মায়ের 
মন্দিরে। সেই যাত্রা পথের বর্ণনাই আজকের এই লেখনীতে প্রকাশ করছি। 
তৃতীয়বার আমরা ছিলাম চার জন  নাগপুর থেকে বিলাস পুর, বিলাস পুর  থেকেএকটি জীপ্  
গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছে ছিলাম।    
আর 2008 সালে ধাবাদ থেকে বিলাস পুর হয়ে টুরিস্ট পার্টির সাথে যোগাযোগ করে ওদের ব্যাবস্থায়
বাস ও কারে পৌঁছে ছিলাম।তবে এই টুরিস্ট পার্টির সাথে গিয়ে মন ভরেনি ভালোও লাগেনি।
সেযেন  বুড়ি ছোঁয়ার মতন দেখা আর ফিরে আসা।)


দন্ডি বাবার সাথে আমি দ্বিতীয় দিনে সকাল 10 দশ তা নাগাদ মন্দিরের চত্বরে পৌঁছে ছিলাম । 
দেখেছিলাম বিশাল চত্বর। এই চত্বরের মাঝে বেশ বড়ো কুন্ড।  কুন্ড টির এগারোটি কোনা। 
কুন্ড টি দৈর্ঘে প্রস্থে বেশ বড়ো। বেশ পরিষ্কার স্বচ্ছ জল। 
এইটিই পবিত্র নর্মদা কুন্ড। কুন্ডের উত্তর দিগে অমরকণ্টকেশ্বর মন্দির। 
মন্দিরের মধ্যে বিরাজমান নর্মদেশ্বর মহাদেব। 
কন্যা নর্মদা মহাদেবের ডান পায়ের উপরে কৃতাঞ্জলিপুটে দাঁড়িয়ে আছেন। 
কালো কষ্টিপাথরের মূর্তি। নিরাভরণ মূর্তি ,ক্ষীণকোটী ,উন্নত নাসা ,আকর্ন চক্ষু,তপস্বিনী মূর্তী।
শক্তির প্রতীক মা নর্মদা তপস্বিনী মূর্তিতে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন পিতা  অমরনাথ মহাদেবের দিকে। 
সামনের মন্দিরে বিরাজমানমহাদেব নিজ আত্মজার দিকে তাকিয়ে আছেন অপলক দৃষ্টিতে।
দন্ডি বাবা বললেন দেখো আসলি বিশা যন্ত্র। 
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কোথায় বিশা যন্ত্র। 
বাবা আমার নির্বুদ্ধিতার টের পেয়ে বললেন এই দেখো  এগারো কোনা বিশিষ্ঠ  এই  কুণ্ডটি ঠিক যেন বিশা যন্ত্রের আকৃতি। আর বিশা যন্ত্র মানেই সিদ্ধি লাভের মূল আঁধার।
তখন মনে হলো হ্যা বিশা যন্ত্রের ছবি দেখেছি। তাই মিলিয়ে দেখলাম কুণ্ডটি। অপূর্ব অপূর্ব 
এতো প্রাচীন কালের কুন্ড ,তাঁর এমন রূপ ,সত্যি ভাবনার অতীত।  
অমরনাথ মন্দিরের সামনে দুটি মন্দির একটি গোরক্ষনাথের অপরটি গৌরীশংকরের। 

মন্দিরের বিশাল তোরণ। এখানে 16 টি মন্দির আর আছে নানান দেবদেবী ও বহু মূর্তি। 
প্রতিটি মন্দিরে চূড়ায় ধ্বজা আছে। ( আজকাল মন্দিরের সংখ্যা আরও বেড়েছে )
এখানে কাছেই আছেন বিষ্ণু ও নারায়ণের মন্দির ,রোহিণীদেবীর মন্দির ,পার্বতী মন্দির ,বালাসুন্দরীর মন্দির ,মুরলীমনোহরের মন্দির ,মহাভৈরবের মন্দির ,ঘন্টেশ্বরের মন্দির ,রামচন্দ্রের মন্দির।
সম্পূর্ণ মন্দির এলাকা যেন একটি দুর্গ। মন্দির দুর্গে বেষ্টিত অমরকণ্টকে মা নর্মদা সদা বিরাজমান।
মন্দির ময় অমরকন্টকে মন হয়েযায় ধীর স্থির। মাতৃ শক্তি তে বেষ্টিত মায়ের দুয়ার 
মনে প্রাণে জাগে চেতনার জোয়ার। পথের কষ্ট ভুলতেও সময় লাগেনা। 
মনে থাকেনা কোনপ্রকারের কোন বেদনা ,মনে সদাই থাকে পূর্ন আনন্দের চেতনা। 
এক গভীর আবেশে মন ভোরে গেল। 
এই পর্যন্ত জীবনে অনেক মন্দির দর্শন করেছি ,
শৈলতীর্থ অমরনাথ তিনবার দর্শন করেছি ,এমনকি সেই মরুতীর্থ হিংলাজ সেখানেও গিয়ে 
মাকে দর্শন করে এসেছি। গঙ্গোত্রী গোমুখ সেখানেও গিয়েছি। মোটামুটি বলতে পারি 
সমগ্র ভারতবর্ষের যতটা পেরেছি দর্শন করেছি। নেপাল ,পাকিস্তান চীনের নন্দনকানণ ,
তিব্বতের মন্দির ,ফ্লাওয়ার ভেলি কিছুই বাদ দেয়নি। 
এতো দর্শন করে ও তেমন কোন উপলব্ধি বোধ করিনি যা পেয়েছি এই অমরকণ্টকে। 
তাইতো বার বার ছুটে গেছি অমরকণ্টকে। 
আজ 69 বৎসরেও মন চায় আবার একবার অমরকণ্টক দর্শন করতে। 
কিন্তু বয়সের ভার আর হাঠুর ব্যাথা তাই সাহসে ভর করতে পারছি না। 
তবে যা হবার তা হবে আবার একবার যাবোই যাবো অমরকণ্টকে নর্মদা মাকে দর্শন 
করতে। 

সত্যই অমরকণ্টক - এক মায়াময়  অতি সুন্দর অধ্যাত্মভূমি। না দেখলে এই ভূমির মাহাত্ম 
অনুভব করা মুশকিল।বহু প্রাচীন বিন্ধ্য পর্বতমালার একটি শৃঙ্গ হল অমরকণ্টক। এখন থেকেই পৌরাণিক নদী নর্মদার যাত্রা শুরু। উদগমস্থল দিব্যতীর্থ হিসেবে মানা হয়। শাক্ত গ্রন্থ অনুযায়ী, চণ্ডিকা পীঠ নামে খ্যাত। গঙ্গা হলেন  উপাসনার নদী, সরস্বতী জ্ঞানের নদী, নর্মদা তপস্যার নদী। শিবের তপস্যাতে  সাক্ষাত্‍ নর্মদা হিসেবে উঠে এসেছে।

3rd dayতৃতীয় এবং 4thday চতুর্থ দিনে আমি দন্ডি বাবার সাথে ঘুড়ে বেরিয়ে অনেক ইতিহাস
জানলাম আর দেখলাম
শত শত বছর ধরে কুণ্ডে উঠে আসা জল বেরনোর জন্য রয়েছে একটি নালার সংযোগ। এর নাম গোমুখনালা। গোমুখনালার ভিতর দিয়ে নর্মদা এসে পড়েছে কোটি তীর্থে। 
কথায় প্রচলিত আছে যে দেবতাগণ একসময়ে কাম মোহিত হয়ে নর্দমাকে পাবার ইচ্ছায় ব্যাকুল 
হলে মহাদেবের লীলায় দেবতাগণ নর্মদার সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন। এবং মহাদেব ও মা নর্মদার 
নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয়ে এই কোটি তীর্থে সকল দেবতা নর্মদার তপস্যা করেন। সেই থেকে এই 
কোটি তীর্থের জল অতি পবিত্র। 
কোতিতীর্থের কাছেই আছে গায়ত্রী ও সাবিত্রী কুন্ড। 
দুটি জল ধারা একটি উত্তর দিগে আর একটি পূর্ব দিগ্ দিয়ে এসে এখানে মিশেছে 
সেই কারনে এখানে তিনটি ধারার মিলন হয়েছে।  এই তিনধারার মিলন ক্ষেত্রকে ত্রিকূটি বলে। 

পুরাণ অনুযায়ী শিব বিষ পান করলেন। বিষেয় জ্বালায় ছটফট। অমরকণ্টকে এসে জ্বালা জুড়োল।  এখানে শিব 5 হাজার বছর ধ্যানে করেছেন । 
এই তপস্যার কালে শিবের গলার ঘাম থেকে সৃষ্টি হল নর্মদার। মহাদেব চোখ খুলে তাঁকে দেখে প্রসন্ন হলেন। স্বয়ং মহাদেবের তপস্যার ফল নর্মদা। এই সতীপীঠের মাহাত্ম্য অনেক।

কথিত আছে, নর্মদার উত্‍সমুখের সন্ধান পান মরাঠা রাজা প্রথম বাজীরাও। তারপর থেকে ধীরে ধীরে বিশেষ পরিচিতি পায় এই তীর্থ। অমরকণ্টক সাধন তীর্থ। 

কথিত আছে, কপট পাশাখেলায় হারের লজ্যা থেকে মুক্তি পাবার জন্য যুধিষ্ঠির নর্মদার তীরে 
তপস্যা করেছিলেন । এছাড়াও ,মহামুনি  নারদ, বশিষ্ঠ দেব , কপিল মুনি , ভৃগু মুনি , দুর্বাসা
মুনি ও  ঋষিরা তপস্যা করেছেন নর্মদা তীর্থ অমরকণ্টকে।


শোনমূঢ়া-------

নর্মদা মন্দির থেকে 4-5 কিলোমিটার দূরে শোনমূঢ়া। এখানে শোন ও ভদ্র  নদীর উত্‍পত্তিস্থলে গড়ে উঠেছে দেবী শোনাক্ষীর মন্দির, যা একান্ন সতীপীঠের অন্যতম পীঠ। 

ব্রহ্মার মানস পুত্র শোন।ব্রহ্মার চোখের জল থেকেই শোন নদীর উৎপত্তি।
শোনের উদ্‌গম স্থলের অনতিদূরে ভদ্র নদীর উৎস স্থান। এখান থেকেই শোন ও ভদ্র এক হয়ে জল জল প্রপাতের সৃষ্টি করেছে। সেই প্রপাত দেখবার মতো। এরপর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শোন বিহার প্রদেশে শোনপুরে গিয়ে গঙ্গায় মিলিত হয়েছে।

এখানে শোন ভদ্র কুন্ড আছে। 
এখন থেকে সম্পূর্ণ এলাকার দৃশ্য এটি সুন্দর ও মনোরম। 
শোনমূঢ়া নর্মদা কুন্ড থেকে 1 1/2 ( দেড় ) কিলোমিটার দূরে এক পাহাড়ি ঝর্ণা রূপে প্রবাহিত। 
প্রায় 300ফুট উপর থেকে নিচে ঝর্ণার আকারে পড়ছে। 
শোন নদীর সৌন্দর্যের জন্যও একে সোননদী বলা হয়। 
একথা তো আমরা সকলেই জানি যে দক্ষযজ্ঞে সতীর প্রাণত্যাগের পর, মহাদেব যখন সতীকে  কাঁধে নিয়ে জগত্‍ পরিভ্রমণ করছেন, তখন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করেন। দেবীর দেহের বিভিন্ন অংশ যেখানে যেখানে পড়েছে, সেখানে গড়ে উঠেছে মহাশক্তিপীঠ। কথিত আছে, শোনমূঢ়ায় দেবীর বাম নিতম্ব পড়েছিল।

যেখানে সতী, সেখানেই শিব। শোনাক্ষী দেবীর মন্দিরের পাশেই রয়েছে শিবলিঙ্গ। শঙ্কর এখানে মহাকাল ভদ্রসেন নামে পূজিত হন। 

তীর্থভূমি ভারতের বুকে এই জায়গাখানি সাধু, সন্ত, মহাত্মা, তীর্থ অভিলাষীদের যুগ যুগ ধরে আহ্বান করে চলেছে।দিন কে দিন এই স্থানের  মাহাত্ম বেড়েই চলেছে। 
প্রথমে যে পথ দুর্গম ছিল সেই পথ এখন অনেক  সরল হয়েছে। 
আজকালতো গাড়িনিয়ে একেবারে মন্দিরের কাছেই যাওয়া যায়।


শ্রী যন্ত্র মহামেরু মন্দির ----

শ্রী যন্ত্র মহামেরু মন্দিরটি  পাহাড়ের চূড়োয়। 
মন্দিরের প্রবেশদ্বারে অপূর্ব কারুকার্য । মন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজমান দেবতা।  বালচুরি রাজাদের অনবদ্য নির্মান কর্নমন্দির। সমগ্র মন্দিরের কারুকাজ আর গঠনশৈলি অসাধারণ। এই মন্দিরের 
ঠিক বিপরীত দিকে  রয়েছে 'নর্মদাউদ্গম'। এই স্থানকেও অনেকে নর্মদা নদীর উৎসস্থল  বলে মনে করেন। 

নর্মদা মন্দিরের প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ,নর্মদা কুন্ডের দক্ষিণে শোনমূঢ়া যাবার পথে এই 
শ্রী যন্ত্র মহামেরু মন্দির। এই মহা মেরু মন্দিরের লম্বা চওড়া এবং উচ্চতা 52 ফুট। 
কথায় প্রচলিত আছে যে এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ তীর্থে স্নান করলে যে ফল প্রাপ্তি অতদ্রূপ ফল প্রাপ্তি হয় একবার এই মন্দির দর্শনে।

মাই কি  বাগিচা ------

শোন, ভদ্র পাহাড়ের গা বেয়ে যেতে হয় ‘মাঈ কি বাগিয়ায়’। এটি হল নর্মদা মায়ের উদ্যান। এখানে একটি কুণ্ডও আছে। সেই কুণ্ডের নাম চরণোদক। নর্মদা মন্দির থেকে পূর্ব দিগে একটু দূরে এক কিলোমিটার দূরে "মাই কি বাগিচা।  " 
ঘন বনের মধ্যে অপূর্ব এক বিশাল বাগান। বাগান টি ফলে ফুলে ভরা। 
কত রকমের যে ফল তা বোঝা মুস্কিল। 
আর আছে আম গাছ, কলা গাছ  ,কত রকমারি আম ,প্রতিটি আম গাছ আমে পড়ি পূর্ন। 
আর ফুলের হিসাব করাই মুস্কিল। এখানে আছে এক বিশেষ ফুলের গাছ 
যে ফুলের নাম " গুল বকাওলি".যার গন্ধ ছড়িয়ে পরে চরিদিগে। এখানে নানা জাতীয় 
গোলাপ ফুল দেখবার মতন। 
রোজ প্রত্যুষে 'মা ' নর্মদা স্বয়ং নিজের হাতে ফুল তুলতে আসেন শিব পূজার জন্য।  
মা নর্মদা এই সকল ফুলের সাথে বিশেষ করে গুল বকাওলি ফুলের সাথে রোজ খেলা 
করেন। 
এই গুল বকাওলি ফুল চোখের যে কোন রোগের জন্য বিশেষ উপকারী। 

এখানে গুলি বকাওলি ফুলের সুরমা পাওয়া যায়। 

মাইকী মণ্ডপ --

আমি দন্ডিবাবা এবং বিলাস তিনজনে মিলে গেলাম মাইকী মণ্ডপ।  নর্মদা নদী ঘিরে আছে নানান কুন্ড ও  অনেক ছোটবড় মন্দির। 
'মাই কি মন্ডপ' হল আরও একটি পবিত্র মিলন ক্ষেত্র। মায়ের মন্দিরের পূর্ব দিগে মাই কি বাগিচা থেকে কাঁচা রাস্তায় প্রায় 7 কিলোমিটার দূরে মায়ের মণ্ডপ। 
গল্প কথায় আছে চির কুমারী  নর্মদা মায়ের বিবাহ মণ্ডপ এখানেই তৈরী হয়ে ছিল। 
কথায় আছে মা এর বিবাহ সোনভদ্র নামক নদীর সাথে তয় হয়ে ছিল। 
বিবাহের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা হয়ে গিয়ে ছিল ,কিন্তু জহিলা নামক নদীর কারনে বিবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। 
তার পরের থেকে নর্মদা চির কুমারী থেকে যান। 
এমন আরও অনেক গল্প কথা প্রচলিত আছে। এই সোনভদ্র ও নর্মদা বিবাহের। 
এখন  থেকেই  সোনভদ্র ও জহিলা যদির উৎপত্তি হয়। 
প্রচলিত কথায় আছে যে মা এই ঘটনাটা রাগান্নিত হয়ে মা নর্মদা পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হন।

মাইকী মণ্ডপ দর্শন করে চলে গেলাম জ্বলেশ্বর মন্দির , সেখান থেকে আরও নীচে পাতালেশ্বর মন্দির। 

পাতালেশ্বর মহাদেব ---

নর্মদা কুন্ডের পশ্চিমে পায়েহাঁটা পথে একটু দূরেই আছেন পাতালেশ্বর মহাদেব। 
যদিও পথটি ভীষণ কঠিন। 
তার পরে আছেন জালেশ্বর মহাদেব ,সে পথ বড়োই কঠিন। 

জালেশ্বর মহাদেব ---------

নর্মদা মন্দির থেকে প্রায় 8 আট কিমি দূরে এই জালেশ্বর মহাদেবের মন্দির। 
এখান থেকেই অমরকণ্টকের তৃতীয় নদী জহিলার উৎপত্তি। 
কথা অনুসারে এই শিব লিঙ্গ শঙ্কর ভগবান নিজে স্থাপিত করেছেন। এবং 
শিব পার্বতী সদাই এখানে বাস করেন। 
এই জহিলা নদীর উৎপন্ন নিয়ে প্রচলিত গল্প হল 
তারকাসুরের তিন পুত্র তারকাক্ষ, কমলাক্ষ ,এবং বিন্দমালি। এরা তারকাসুরের নিকট 
তিনটি পুরের দাবি করে বা তিনটি নগরের দাবি করে যে নগর গুলি ধাতু দিয়ে তৈরী হবে। 
তিন দিগে পূর্ব,পশ্চিম,ও উত্তর দিগে লোহা স্বর্ণ এবং রজত দ্বারা নির্মিত। এক নগর থেকে 
আর এক নগরের দূরত্ব চার চার যোজন হতে হবে। 
তারকা সুর পুত্র দের মনোবাসনা পূর্ন করার জন্য তপস্যাতে বসলেন। তারকাসুরের তপস্যাতে 
তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা জি বড় দিতে চাইলেন তারকাসুর বড় হিসাবে তিনটি পুরের দাবি করলেন 
তিনটি পুর হবে অন্তরীক্ষে একটি লোহা দিয়ে তৈরী ,একটি সোনার এবং একটি চাঁদির। 
ব্রহ্মা জি তথাস্তু বললেন। দ্বিতীয় বরে তারকাসুর চাইলেন তার রাজ্যে একটি সরোবর যে সরোবরটি অমৃত পূর্ন হতে হবে। তৃতীয় বরে তারকাসুর অমরত্ব চাইলেন। 
ব্রহ্মা জি বললেন যে জন্মেছে সে মরবেই তাই অমরত্ব কোন মতেই সম্ভব নয়। 
তারকাসুর নিরাশ হয়ে ভূত ভাবন ভগবান ভোলেনাথের অঘোর দানি শিবের তপস্যা করে 
তাকে তুষ্ট করে আনন্দে উন্মাদ হয়ে দেবলোক আক্রমণ করে দেবতাদের সর্গ থেকে 
বিতাড়িত করেন। 
এর পরের গল্প আরও অনেক দীর্ঘ। তাই আমি সংক্ষেপে বলছি আসল কথা টুকু।
এর অনেক পরে শিব জি কার্তিকের নেতৃত্বে যুদ্ধ করে ভয়ঙ্কর এক অস্ত্রে তারকাসুরের 
তিন পুত্র কে বধ করেন। এবং তিনটি নগর ধ্বংস করেন। বিশাল অস্ত্রের আঘাতে তিনটি 
ভীষণ বিস্ফোটে আগুন লেগে একটি নগর এই স্থানে পতিত যেখানে এই জালেশ্বরের মন্দির। 
ভীষণ আগুনে চারিদিক ত্রাহি ত্রাহি। তখন দেবতা গণ শিবাজীকে এই আগুন নেবাবার জন্য 
প্রার্থনা করেন।  শিব জি নিজে দ্রবিত হয়ে জলপ্রবাহ রূপে সেই আগুনকে জলে পরিবর্তন 
করেন। আর সেই জল জুহিলানদী  রুপে  প্রবাহিত হতে থাকে। 
অন্য দুটি নগর হিমালয়ের পাহাড়ে দুই স্থানে পরে। সেখানেও ভীষণ ত্রাহি উৎপন্ন হলে 
শিব শঙ্কর নিজে লিঙ্গ রূপে ওই দুই স্থানে প্রকট হয়ে সকল জ্বালা শান্ত করেন। 
সেই জায়গা দুটি র একটি উত্ত দিগে  কুটেশ্বর অপর টি পূর্ব দিগে লোদ্ধেশ্বর। 
এই তিন পুরের তিন টি লিঙ্গ স্বয়ংভূ ত্রিপুর লিঙ্গ রূপে বিরাজমান। 

পরে কপিল মুনির তস্যায় তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব শঙ্কর এই লিঙ্গে আবিরভূত হয়ে 
সকল দেবতা ,মানুষ ও মুনিদের আশীর্বাদ হিসাবে অনেক দ্বিব্য অস্ত্র দান করেন। 
দেবতারা এই অস্ত্রটি র কোন প্রজন বোধ না করে সেটি সুরক্ষিত রেখে দেন। 
এটি ই সেই পিনাক অস্ত্র যেটি ভঙ্গ করে ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্র জানকীকে  লাভ 
করেন। 
এবং যে সাধক নর্মদার জল ভগবান জলেশ্বরে চড়াবেন তার সর্ব মনো কামনা 
পূর্ন হবে এবং তারশিব লোক প্রাপ্তি হবে। 

দূর্গা ধারা জল প্রপাত -------

আমরা যে পথে পেন্ড্রা রড থেকে অমরকণ্টক এসেছি ,সেই পথে যে অমর নালা
বা আম নালা পাড় করেছিলাম সেই অমর নালা ই দূর্গা জলধারার পথ। এখানে অনেক সাধু
সন্তের কুঠি আছে আর আছে প্রাকৃতিক সৌন্দযে পূর্ন বন। কত পাখি ফুলে ফুলে
এবং বনৌষধি তে পূর্ন বিস্তীর্ন অঞ্চল।
এখানে অসুরদের সাথে দেবতাদের বার বার যুদ্ধ হয়েছে ,এবং প্রতি বারেই দেবতারা
হার মেনেছেন।

কপিল ধারা ---- 

 গিয়েছিলাম বিলাস ও আমি কপিল ধারাতে। নর্মদা কুন্ড থেকে কয়েক  কিলোমিটার দূরে। 
এখানে নর্মদা প্রায় 20 ফুট চওড়া। কারণ কপিল মুনি নাকি এখানে নর্মদাকে আটকেরাখার প্রচেষ্টা করেন। এটি একটি অসাধারণ জলপ্রপাত। প্রায় দেড়শো ফুট নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে শ্বেত শুভ্র  জলধারা। পাশেই রয়েছে কপিলমুনির আশ্রম। আরও খানিক দূরে রয়েছে দুগ্ধধারা। এখানে নর্মদা ঝাঁপ দিচ্ছে গিরিখাতে। 
দন্ডি বাবা বললেন  এই স্থানে কপিল মুনি 'মা 'য়ের সাক্ষাৎকার পেয়েছিলেন। 
কপিল মুনি এইস্থানে সংখ্যা শাস্ত্র রচনা করেছিলেন। 
এই স্থান অতি মনোরম ও পবিত্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ন। 
এমন স্থান দর্শন ভিন্ন অমরকণ্টক দর্শন পূর্ন হয় না। 

মা নর্মদার প্রতিটি কাঁকড়ই হল শঙ্কর। এই হল কপিলধারা। ওপর থেকে নর্মদা ঝরে পড়ছে সশব্দে। আর এই গহন অরণ্যে জলপ্রপাতের সামনে বসে দীর্ঘকাল তপস্যা করেছিলেন কপিলমুণি। তা থেকে জলপ্রপাতের নাম কপিলধারা। অমরকণ্টকে এসে কপিলধারা দর্শন করলে মোক্ষলাভ হয়। এমনই জনশ্রুত।
পাহাড় জঙ্গলের বর্ণনা দিলাম না কারণ সকল প্রাকৃতিক সৌন্দযের বর্ণনা করতে গেলে 
লেখাটি অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। 

বারবার প্রয়াগ গিয়েও সেইরূপ  পুণ্য হয় না, যা একবার অমরকণ্টক আর কপিলধারা দর্শন করলে হয়। উপর থেকে পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে নর্মদার জলস্রোত সরু ধারা হয়ে বয়ে গিয়েছে আরও গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। পুণ্যলোভীরা  অনেকেই স্নান করেন এই জলধারায়। 
কপিলধারার উল্লেখ আছে স্কন্দ পুরাণে। মাথা উঁচু করে জেগে মৌন পর্বত, মনে হয় ধ্যানস্তব্ধ
ধ্যানগম্ভীর ভূধর। কপিলধারার বিরামহীন জলপ্রপাত মনে এক শিহরণ জাগিয়ে তোলে । 

নর্মদা নদী সমস্ত নদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আর অমরকণ্টক হল একাধারে শৈব পীঠ, তন্ত্র পীঠ ও অঘোর পীঠ।সেই কারণে তপস্যার উত্তম ভূমি নর্মদা তট। এখানে তপস্যা করলে, অন্য যে কোনও স্থানে তপস্যার চেয়ে অধিক ও দ্রুত ফল লাভ হয়। তাই প্রাচীনকাল থেকে সমস্ত মুনি-ঋষি সাধনক্ষেত্রে হিসেবে নর্মদা তটকে বেছে নিয়েছেন। তার অন্যতম কারণ এর শক্তি মাহাত্ম্য।

দুধ ধারা ---------


কপিল ধারা থেকে 1 কিলোমিটার দূরে পশ্চিম দিগে দুধ ধারা নামক নর্মদার অদ্বিতীয় 
জলপ্রপাত। এখানে অত্যন্ত ঘন জঙ্গলে এই জল প্রপাত দশ ফুট ওপর থেকে নিচে বয়ে চলেছে। 
এইস্থানেই মহামুনি দুর্বাসা তপস্যা করেছিলেন। 
জনশ্রুতি আছে যে এক ----
যেহেতু দুর্বাসা মুনি এখানে তপস্যা করেছিলেন তাই এই ধারার নান দুর্বাসা ধারা ,এই দুর্বাসা থেকেই 
পরে দুগ্ধ ধারা বা দুধ ধারা নাম হয়। 
দুই ----
নর্মদা মা বীরা রাজ্যের এক রাজকুমারের প্রতি প্রসন্ন্য় হয়ে দুধের ধারা রূপে দর্শন দিয়ে ছিলেন 
তাই এই ধারার নাম দুধ ধারা নাম খ্যাত। 
 প্রবাদ আছে  দুর্বাসা  মুনির  আহার জোগানোর জন্য মা নর্মদা ওই ধারার মধ্য দিয়ে দুধ বয়ে আনতেন।
এরপর গভীর জঙ্গলের মধ্যে রুদ্রচণ্ডী মায়ের স্থান।

তৃতীয় ---
নর্মদা নদী প্রচন্ড বেগে পাহাড়ের চট্টানে পড়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বইছে তাই এই স্থানের 
নাম দুই ধারা। এই দুই ধারা থেকেই হয় দুধ ধারা।

এরপরে গেলাম চক্র তীর্থ ---------


কপিল ধারার 2 কিলোমিটার পূর্বে এই চক্র তীর্থ নামক দিব্য তীর্থ। 
নর্মদা তটেই এই স্থান অবস্থিত। 
পূরাণের বর্ণনা অনুসারে ভগবান বিষ্ণু এই স্থানে কঠিন তপস্যা করে সুদর্শণ চক্র প্রাপ্ত করেন। 
এখানে নর্মদা খানিকটা ও এর করে আকারে প্রবাহিতা।

বান লিঙ্গ -------

"লিঙ্গরূপেণ সুচিরং প্লবয়ামি তব ক্রোড়ে -শিবলিঙ্গ হয়ে কন্যার কোলে তিনি নিত্যকাল ভেসে বেড়াবেন। মেয়ে নর্মদাকে নাকি এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভগবান শঙ্কর। নর্মদার বুকের সব পাথরই তাই শিব। কালের স্রোতে আমরা প্রত্যেকেই ভেসে চলেছি। কবে কোথায় কোন কূলে গিয়ে ঠেকব, কেউ জানি না। ক্ষণিকের বুদবুদের মতো জীবনে এই শিবময় মাতৃভূমিকে কোটি কোটি প্রণাম।"
প্রাচীন কালে বাঁশবনের ( বেনু বনে )ভিতরে  প্রথম মহাদেবকে খুঁজে পেয়েছিলেন মারাঠার রাজা দ্বিতীয় পেশোয়া প্রথম বাজীরাও। যেহেতু মহাদেবকে বেণুবনে পাওয়া গিয়েছিলো তাই মহাদেব 

এখানে বানেশ্বর নামে বিরাজিত হন।
 নর্মদা নদী উপত্যকায় ও  নদীগর্ভে 
বাণলিঙ্গ বা বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ পাওয়া যায়। 
বাণলিঙ্গকে "স্বয়ম্ভু লিঙ্গ" বা ঈশ্বরের সাক্ষাৎ চিহ্ন মনে করা হয়। কারণ, এটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়।

প্রাচীন কালে  বাণ নামে এক অসুর প্রতিদিন অমরকণ্টকের ধাবড়ী কুন্ডের তীরে রোজ মাটিদিয়ে এক সহশ্র  শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করতেন। আর পূজকরার 
পরে সেই শিবলিঙ্গ গুলি ধাবড়ী কুন্ডে নর্মদার জলে বিসর্জন  দিতেন। 
এইভাবে দীর্ঘদিন শিবপূজার ফলে শিব তাঁকে দর্শন দিয়ে একটি বর দিতে চান। বাণ বলেন, প্রতিদিন তাঁকে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করতে বেশ কষ্ট পেতে হয়। তাই বর হিসেবে তিনি উত্তম লক্ষণযুক্ত শিবলিঙ্গ চান। শিব চোদ্দো কোটি শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে বাণকে দেন। বাণ সেগুলি পেয়ে মনে ভাবেন, এগুলি পূজায় যখন বিশেষ ফল পাওয়া যায়, তখন এগুলি সর্বসাধারণের কল্যাণের কাজেই ব্যবহার করা উচিত। এই ভেবে তিনি তিন কোটি লিঙ্গ কালিকাগর্তে, তিন কোটি লিঙ্গ শ্রীশৈলে, এক কোটি কন্যাশ্রমে, এক কোটি মহেশ্বর ক্ষেত্রে এবং অবশিষ্ট লিঙ্গগুলি বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে স্থাপন করেন। বাণ নামক অসুরের দ্বারা পূজিত বলে (মতান্তরে শিবের অপর নাম বাণ বলে) এই লিঙ্গগুলি বাণলিঙ্গ বা বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ নামে পরিচিত হল।

এককালে প্রাকৃতিক রূপে ধাবড়ী কুন্ডে উৎপন্ন হতো বানলিঙ্গ। নর্মদার 
ওঁকারেশ্বরের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের অনতিদূরে নর্মদার কোলে ধাবরি কুণ্ডে। মামলেশ্বর বাঁধ নির্মাণের সময় (2003 --2007 )এই প্রকৃতির বিস্ময় ধাবরি কুণ্ডটি বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে বাণলিঙ্গের সৃষ্টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
আমাকে দন্ডি বাবা পাঁচটি বাণলিঙ্গ দিয়েছিলেন এই ধাবড়ী কুন্ড থেকে তুলে। 
পরের বাবে আবার যখন গিয়েছিলাম তখন দেখেছি কিছু ছোট ছোট ছেলে বসে আছে। ওরা 
বারবার জোরাজুরি করছিলো যে ওদের পয়সা দিলে ওরা কুন্ড থেকে বাণলিঙ্গ তুলে দেবে। 
তারপরের বার আবার যখন গিয়েছি তখন দেখেছি কুন্ডের  পাশে অনেকে দোকান সাজিয়ে বসে বাণলিঙ্গ বিক্রি করছে। 
আর শেষ বাড়ে যখন গিয়ে ছিলাম 2008 সালে তখন আর ধাবড়ী কুন্ডের অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। 
কারণ সেখানে তখন একবাঁধ তৈরী হয়েছে মামলেশ্বর বাঁধ। 

নর্মদা নদী মধ্যে ভারতের পঞ্চম দীর্ঘতম নদী।
নর্মদা শব্দের অর্থ  সুখপ্রদায়িনী।
আর অমরকণ্টক এর অর্থ ------
ওমরকণ্টক দুটি সংস্কৃত শব্দ   অমর  + কণ্টক
অর্থাৎ অমরত্ব  এবং বাঁধা।

"নর্মদা নদীর অপর নাম "রেবা" শব্দটি এসেছে সংস্কৃত "রেব" শব্দ থেকে, যার অর্থ পাথুরে নদীগর্ভ। এই নদীর গর্ভে যে বাণলিঙ্গ পাওয়া যায় তার উল্লেখ আছে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, টলেমির রচনা ও পেরিপ্লাস গ্রন্থে।বায়ু পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণ-এর রেবা খণ্ড অধ্যায়ে নর্মদা নদীর জন্ম ও গুরুত্বের বর্ণনা পাওয়া যায়। কথিত আছে, নর্মদা নদী শিবের অঙ্গ থেকে উৎসারিত। "নর্মদা" শব্দের অর্থ আলোকদাত্রী। তাঁকে "শঙ্করী"ও (শিবের কন্যা অর্থে) বলা হয়।
উত্তর ভারতের একটি প্রচলিত প্রবাদ হল "নর্মদা কে কঙ্কর সে উঠা শঙ্কর" (নর্মদার পাথর শিবের মূর্ত রূপ)। বাণলিঙ্গ তাই হিন্দুরা দৈনিক উপাসনার পর পূজা করেন। বৈষ্ণবদের কাছে শালগ্রাম শিলা যেমন বিষ্ণুর প্রতীক রূপে পূজিত হয়, শৈব ও স্মার্ত মতাবলম্বীরা তেমনি শিবের প্রতীক রূপে বাণলিঙ্গ পূজা করেন।"


কবির চবুতরা --------

নর্মদা মন্দিরের দক্ষিণ পশ্চিম কোনে প্রায় পাঁচ কি মি দূরে সোজা রাস্তা গেছে এই পবিত্র স্থানে  । 
কবির দাস জি এইস্থানে তপস্যা করে সিদ্ধি লাভ করে ছিলেন।
এমন প্রবাদ আছে রোজ প্রত্যুষে এখন থেকে দুধের ধারা বয়ে চলে। যা দেখবার জন্য খুব ভোরেই মানুষ পৌঁছে যায় এইপবিত্র স্থানে।   


কর্নমন্দির---


নর্মদা কুন্ডের দক্ষিণে প্রাচীন মন্দির কালচুরি রাজত্ব কালে কালচুরি মহারাজা কর্নদেব তৈরী 

করেছিলেন এই প্রাচীন মন্দির।

শ্রী কার্তিকেয় মন্দির ---

যার সংস্কার করেছিলেন ইন্দোরের মহারাজা। এখানে পূজা ধ্যান করলে নানান রোগ থেকে মুক্তি 
পাওয়া সম্ভব ,এমনি বিশ্বাস,
অর্শ,মৃগী ,ভগন্দর ,কোষ্ঠ প্রভৃতি রোগ থেকে মুক্তি লাভ হয়। 

বিনায়ক মন্দির ----

নর্মদা মন্দিরের দক্ষিণে 4 কিলোমিটার দূরে সিদ্ধি বিনায়ক এর মন্দির পাড় করে সফর বিনায়ক
মন্দির। সফর বিনায়ক দশ দিগপালের একজন। প্রস্তর নির্মিত প্রতিমা আছে এখানে।

শম্ভূ ধারা জলপ্রপাত -------

অমরকণ্টকের পশ্চিমে এই জলপ্রপাত বর্ষাতে ভীষণ রূপ ধারণ করে। 
এখানকার প্রাকৃতিক শোভা অতি মনোরম। 
এখানে পৌঁছোবার পথ গভীর জঙ্গলের ভিতরে সেই কারনে বিশেষ গাইড বা 
ভালোকরে জানে এমন সাথী ভিন্ন এখানে পৌঁছনো মুশকিল। বিশাল বিশাল 
বৃক্ষ ও লতা পাতায় ঘেরা এই স্থান।  

 অমরেশ্বর মহাদেব --------

লিঙ্গ অর্থাৎ অনন্ত ,শূন্য,এবং ব্রহ্মান্ডের সাথে নিরাকার  পরম পুরুষের প্রতীক।
শূন্য শরীরের অর্থেও লিঙ্গ রূপ প্রদর্শিত হয়। শিব লিঙ্গ ,শিব এবং দেবী শক্তির
আদি-অনাদি মিলিত রূপ।
সমগ্র ব্রহ্মান্ড এই লিঙ্গ প্রতীকে আবদ্ধ।
শরীর পদার্থে তৈরী আর আত্মা হলো উর্জা শক্তি।
অর্থাৎ লিঙ্গ অর্থে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মান্ড। .
বর্তমানে ,প্রাচীন জলেশ্বর মন্দিরের নিকটে অমরেশ্বর মহাদেবের মন্দির তৈরী হয়েছে।
শ্রাবন মাসের ভিড় সামলাবার জন্যই বিশেষ ভাবে নির্মিত এই মন্দির ছত্তিস  গড়ের
সীমানাতে অমরকণ্টক থেকে 15কিলোমিটার দূরে।
এখানে শিব লিঙ্গ 11ফুট উঁচু এবং 15 টন ওজনের। 
এই শিব লিঙ্গ ওঙ্কারেশ্বর থেকে আনা হয়েছে। 
অমরেশ্বর মহালিঙ্গ রূপেও পরিচিত। 
এখানে শিব লিঙ্গে জল চড়াবার জন্য বিশেষ সিঁড়ির ব্যবস্থা আছে।

শ্রী দিগম্বর জৈন সর্বোদয় মন্দির -------

এই জৈন মন্দিরে পরম আরাধ্য 1008 ভগবান শ্রী আদিনাথ জি এর অদ্ভুত মনোজ্ঞ ,বিশাল 
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ভারী 24টন অষ্টধাতুর প্রতিমা যিনি 28টন অষ্টধাতুর স্তম্ভের উপরে বিরাজমান 
(মোট ওজন 52 টন) সম্পূর্ণ স্বর্ণ মন্ডিত। 

বিশাল মন্দির গুড় ,চুন ,এবং রাজস্থানের পাথরে নির্মিত অদ্ভুত মন্দির। 
এই মন্দির নির্মাণ হেতু কোন প্রকার লোহা ,সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি। 
মন্দিরের মূর্তি কানপুরে  নির্মিত 24000 কিলোগ্রাম ওজনের অষ্টধাতুর  শ্রী আদিনাথজির পদ্মাসনে উপবিষ্ঠ প্রতিমা। 28000 কিলোগ্রাম অষ্ট ধাতুর স্তম্ভ।
নুতন মন্দিরের উচ্চতা 252ফুট। 
মন্দিরের সম্পূর্ণ এলাকা 3লক্ষ বর্গ ফুট। 
এই মন্দিরের দ্বারের উচ্চতা 51ফুট ,লম্বা 42ফুট এবং চওড়া 42ফুট। 

বহগড় নালা শ্রী গণেশ মন্দির ------

নর্মদা মন্দিরের উত্তর দিগে 35কিমি দূরে রাজেন্দ্র গ্রাম এর কাছে শ্রী গণেশজির মন্দির। 
শোনাযায় এই প্রতিমা প্রতিদিন একটু একটু করে লম্বা হয়ে চলেছেন। 
বর্তমানে প্রতিমার উচ্চতা 10 ফুট। অনেক আগে নাকি মাত্র এক ফুটের মূর্তি ছিল। 
এই মন্দিরের কাছেই কুলচুরিকালিনি শিব মন্দির খণ্ডিত অবস্থায় আছেন। 
এর কাছেই গৌরী কুন্ড তথা গৌরী গুহা। এই গৌরী গুহার মুখ শিব পাহাড়ি পর্যন্ত বিস্তারিত। 
কথায় আছে মাতা পার্বতী শিবের জন্য তপস্যা করেন এই স্থানে। এবং গণেশ জিএর অবতার 
এইস্থানেই হয়। 
সুন্দর সবুজে পরি পূর্ন অতি মনোরোন স্থান। 
প্রতি বৎসর বসন্ত পঞ্চমীতে এখানে তিন দিনের বিসাল মেলা বসে। 

ভৃগু কমণ্ডল ------------

নর্মদা মন্দিরের 4 কি মি দূরে এই ভৃগু কমণ্ডল 
এখানে ভৃগু মুনি কঠিন তপস্যা করেছিলেন, এবং তাঁর কমণ্ডল থেকে এক নদীর 
উৎপন্ন হয়ে নর্মদায়  মিশেছে। এখন দেখাযায় সেই কমুন্ডুল আকৃতি এক গুহা,
বা গর্ত যেখানথেকে জল বেরিয়ে নর্মদায় মিশেছে। 
পাশেই আছে এক গুহা যেখানে বর্ষার সময় ভৃগু মুনি আশ্রয় নিতেন ও যজ্ঞ করতেন। 

এটি ছোট একটি গর্ত যেখানে বারো মাস জল থাকে। প্রচন্ড গরমেও এই গর্তে হাত 
ডুবিয়ে অঞ্জলি ভর জল পাওয়া যায়। 
এই কমণ্ডল যাবার পথেই দেখতে পাওয়াযায় ধুনী পানী। 

ধুনী পানী ------------


নর্মদামন্দিরের 5কিমি দূরে দক্ষিণ দিগে ধুনি পানি নামক তীর্থ স্থান। ভৃগু কমণ্ডলের কাছে। 
এখানে নর্মদা পরিক্রম করি দেড় জন্য নিঃ শুল্ক বাসের ব্যাবস্থা আছে। 
এখানে অনেক মুনি ঋষি গণ তপস্যা ধ্যান যজ্ঞ করেছেন। 
এখানেধুনীর আকৃতি এক কুন্ড থেকে জল নির্গত হয়ে নর্মদায় মিশে যায়.

চন্ডিকা গুহা ----

নর্মদা মন্দিরের 4কিলোমিটার দূরে দক্ষিণে এই গুহা। 
এখানে পৌঁছোবার রাস্তা বড়োই কঠিন। এটি যোগী দিগের সাধন ক্ষেত্র। 
একে চন্ডিশক্তিপিঠ বলাহয়। 
দেবী সতীর নিতম্বের বাম ভাগ এই গুহাতে পড়েছিল। 
এখানে দেবী কালী শক্তি ,ভৈরব সহিত বিদ্যমান।  


এবার ফেরার পালা 
অমরকণ্টকের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ,প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য ও তীর্থ মহিমা এমনই যে বারবার এলেও মন ভরে না। তাই আমি আজও ব্যাকুল কবে আবার নর্মদা মায়ের দর্শন পাব।
  আজকাল যেকোন সময়ে  মন করলেই যাওয়া যেতে পারে অমরকণ্টক।
                             <---©-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী --->

=====================================



 19/5)|| নর্মদা কে নুড়ি/ কঙ্কর শিবশঙ্কর ||

( অমর নাথের পথে গৌরী কুণ্ডে দেখা পেলাম একদন্ডী বাবার।
একদন্ডী বাবার নির্দেশেই পরে গিয়েছিলাম অমরকন্টকে নর্মদা দর্শনে।
সেই পরম শ্রদ্ধেয় একদন্ডী বাবার মুখের কথা কিছু লিখলাম আজকে )

 একদন্ডী বাবা বলেছিলেন
 "শিবশঙ্করের প্রতীক শিবলিঙ্গ",:::---

শিবলিঙ্গ (সংস্কৃত: लिङ्गं, লিঙ্গ; অর্থাৎ, "প্রতীক" বা "চিহ্ন") হল পরমেশ্বর শিবের নির্গুণ ব্রহ্ম সত্বার একটি প্রতীকচিহ্ন। ধ্যানমগ্ন শিবের প্রতিরূপই শিবলিঙ্গ।
এই প্রতীকের সাহায্যে প্রকাশ করা হয় , 
পরমেশ্বর শিবকে।
হিন্দু মন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গ রূপেই  শিবের পূজা হয়। 
শিব আত্মধ্যানে স্ব-স্বরূপে লীন থাকেন। আর সব মানুষকেও আত্মনিমগ্ন তথা ধ্যানমগ্ন হতে উপদেশ দেন। 
   "লয়ং যাতি ইতি লিঙ্গম্"- 
  অর্থাৎ যাঁর মধ্যে সমস্ত কিছু এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সম্পুর্ন রূপে লয় প্রাপ্ত হয়, তাই লিঙ্গ।
 লিঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি সৎস্কৃত লিঙ্গম্ শব্দ থেকে যার অর্থ প্রতীক বা চিহ্ন। 

অনেকেই অজ্ঞতাবশত লিঙ্গ শব্দটি তার অর্থ পরিবর্তন করে বাংলায় পুরুষ জননেন্দ্রিয় অর্থ লাভ করেছে যা বিকৃত এবং অশালীন;

শিব লিঙ্গের উপরে ৩টি সাদা দাগ থাকে যা শিবের কপালে থাকে, যাকে ত্রিপুণ্ড্র বলা হয়।
শিবলিঙ্গ ৩টি অংশ নিয়ে গঠিত, 
সবার নিচের অংশকে বলা হয় ব্রহ্ম পিঠ, মাঝখানের অংশ বিষ্ণুপিঠ এবং সবার উপরের অংশ শিব পিঠ । 

একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ।

=======================

19/6)>|| নর্মদা নদী ||+বাণলিঙ্গ::--

" নর্মদা কে কঙ্কর শিব শঙ্কর"

নর্মদা নদীর প্রতিটি নুড়ি শঙ্কর রূপে পূজিত।
সনাতন ধর্মে সকল নদীকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নদী মাত্রই পবিত্র বলে মনে করা হয়।
গঁঙ্গা নদীর মতন নর্মদা নদীকেও পূজা করা হয়।

নর্মদা নদী , 
পূর্বে  কোথাও কোথাও নরবদা নামে ও  নরবুদ্দা নামেও পরিচিত ছিল , 
তবে এই নদী ভারতের পঞ্চম দীর্ঘতম নদী এবং সামগ্রিকভাবে দীর্ঘতম পশ্চিম-প্রবাহিত নদী। 

এছাড়াও নর্মদা নদী মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের বৃহত্তম প্রবাহিত নদী । এই নদীটি ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাট রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে । দুটি রাজ্যে বিভিন্ন দিক থেকে বিশাল অবদানের কারণে এটি "মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাটের জীবন রেখা" নামেও পরিচিত। নর্মদা নদী মধ্যপ্রদেশের অনুপপুর জেলার অমরকন্টক মালভূমি থেকে উত্থিত হয়েছে। এটি উত্তর ভারত এবং দক্ষিণ ভারতের মধ্যে ঐতিহ্যগত সীমানা গঠন করেএবং গুজরাটের ভারুচ শহর থেকে 30 কিমি (18.6 মাইল) পশ্চিমে আরব সাগরে খম্ভাত উপসাগরে পতিত হওয়ার আগে 1,312 কিমি (815.2 মাইল) দৈর্ঘ্য পথ ধরে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশ , মহারাষ্ট্র , গুজরাট
দুই কুলের শহর গুলি---
নর্মদাপুরম , বুধনি , জবলপুর , ডিন্ডোরি , নরসিংহপুর হরদা , মান্ধাতা , ওমকারেশ্বর , বারওয়াহা , মন্ডলেশ্বর , মহেশ্বর , মন্ডলা , ভরুচ , রাজপিপলা , সিনোর ( ভাদোদরা জেলা ), দাভোই ( ভাদোদরা জেলা ) , দাভোই ( ভাদোদরা জেলা ), 
উৎস::--বিন্ধ্যাচল পর্বত অমরকন্টক মালভূমি , অনুপপুর জেলা , মধ্য ভারত , মধ্যপ্রদেশের, অমরকন্টককের নর্মদা কুন্ড
 • স্থানাঙ্ক::--22°40′0″N 81°45′0″E
 • উচ্চতা::--1,048 মি (3,438 ফুট)
সঙ্গম:--খাম্বাত উপসাগর ( আরব সাগর )
 • অবস্থান::--ভারুচ জেলা , গুজরাট
 • স্থানাঙ্ক::21°39′3.77″N 72°48′42.8″E
 
দৈর্ঘ্য::--1,312 কিমি (815 মাইল) প্রায়

নর্মদানদীতেই পাইয়া যায় বাণলিঙ্গ ও
নর্মদেশ্বর::--

বাণলিঙ্গ::--

বাণলিঙ্গ বা বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ হল ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে নর্মদা নদী উপত্যকায় নদীগর্ভের এক ধরনের পাথর।
এই পাথরগুলি মসৃণ উপবৃত্তাকার। বাণলিঙ্গকে "স্বয়ম্ভু লিঙ্গ" বা ঈশ্বরের সাক্ষাৎ চিহ্ন মনে করা হয়। কারণ, এটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়।


পৌরাণিক কাহিনি

হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, প্রাচীনকালে বাণ নামে এক অসুর প্রতিদিন শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করতেন। এইভাবে দীর্ঘদিন শিবপূজার ফলে শিব তাকে দর্শন দিয়ে একটি বর দিতে চান। বাণ বলেন, প্রতিদিন তাকে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করতে বেশ কষ্ট পেতে হয়। তাই বর হিসেবে তিনি উত্তম লক্ষণযুক্ত শিবলিঙ্গ চান। শিব চোদ্দো কোটি শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে বাণকে দেন। বাণ সেগুলি পেয়ে মনে ভাবেন, এগুলি পূজায় যখন বিশেষ ফল পাওয়া যায়, তখন এগুলি সর্বসাধারণের কল্যাণের কাজেই ব্যবহার করা উচিত। এই ভেবে তিনি তিন কোটি লিঙ্গ কালিকাগর্তে, তিন কোটি লিঙ্গ শ্রীশৈলে, এক কোটি কন্যাশ্রমে, এক কোটি মহেশ্বর ক্ষেত্রে এবং অবশিষ্ট লিঙ্গগুলি বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে স্থাপন করেন। বাণ নামক অসুরের দ্বারা পূজিত বলে (মতান্তরে শিবের অপর নাম বাণ বলে) এই লিঙ্গগুলি বাণলিঙ্গ বা বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ নামে পরিচিত হল।


গুরুত্ব
নর্মদা নদীর অপর নাম "রেবা" শব্দটি এসেছে সংস্কৃত "রেব" শব্দ থেকে, যার অর্থ পাথুরে নদীগর্ভ। এই নদীর গর্ভে যে বাণলিঙ্গ পাওয়া যায় তার উল্লেখ আছে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, টলেমির রচনা ও পেরিপ্লাস গ্রন্থে। বায়ু পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণ-এর রেবা খণ্ড অধ্যায়ে নর্মদা নদীর জন্ম ও গুরুত্বের বর্ণনা পাওয়া যায়। কথিত আছে, নর্মদা নদী শিবের অঙ্গ থেকে উৎসারিত।
 "নর্মদা" শব্দের অর্থ আলোকদাত্রী। তাকে "শঙ্করী"ও (শিবের কন্যা অর্থে) বলা হয়।

উত্তর ভারতের একটি প্রচলিত প্রবাদ হল "নর্মদা কে কঙ্কর সে উঠা শঙ্কর" (নর্মদার পাথর শিবের মূর্ত রূপ)। বাণলিঙ্গ তাই হিন্দুরা দৈনিক উপাসনার পর পূজা করেন। 
বৈষ্ণবদের কাছে শালগ্রাম শিলা যেমন বিষ্ণুর প্রতীক রূপে পূজিত হয়, শৈব ও স্মার্ত মতাবলম্বীরা তেমনি শিবের প্রতীক রূপে বাণলিঙ্গ পূজা করেন।

নর্মদা নদী দর্শনকে হিন্দুরা গঙ্গা স্নানের সমতুল্য মনে করেন। বৃহৎ বৈবর্ত পুরাণ নামে এক হিন্দু ধর্মগ্রন্থে তিন প্রকার লিঙ্গের উল্লেখ করা হয়েছে - স্বয়ম্ভুব (স্বপ্রতিষ্ঠিত), বাণলিঙ্গ ও শৈললিঙ্গ (পাথরের লিঙ্গ)। এগুলিকে যথাক্রমে ব্যক্ত, অব্যক্ত ও ব্যক্ত্যাব্যক্ত বলা হয়েছে। হিন্দু ধর্মতত্ত্বে বলা হয়, ব্যক্ত লিঙ্গ মোক্ষদায়ী, অব্যক্ত লিঙ্গ আনন্দবর্ধনকারী এবং ব্যক্তাব্যক্ত লিঙ্গ মোক্ষ ও আনন্দ দুইই দেন।

শৈব সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠী পার্থিব শিবলিঙ্গ, কণ্ঠস্থললিঙ্গ, স্ফটিকলিঙ্গ, বাণলিঙ্গ, পঞ্চসূত্রী লিঙ্গ, পাষাণলিঙ্গ ইত্যাদি নানা ধরনের লিঙ্গ পূজা করেন।


পঞ্চদেবতা পূজা

বাণলিঙ্গ হিন্দুধর্মের পঞ্চায়তন পূজা বা পঞ্চদেবতা পূজার একটি অঙ্গ। অষ্টম শতাব্দীর হিন্দু দার্শনিক আদি শঙ্কর হিন্দুধর্মের সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য পাঁচটি প্রধান হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতার পূজাকে ব্যক্তির ইষ্টদেবতা পূজার অঙ্গ হিসেবে প্রবর্তন করেন। এর মধ্যে শিবের পূজা প্রবর্তিত হয়েছিল নর্মদা নদীতে প্রাপ্ত বাণলিঙ্গের উপর।
বাণলিঙ্গ সকলের সব ধরনের ইচ্ছা পূর্ণ করে। 
=========================
19/7)|| নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ::----

নর্মদেশ্বর শিব লিঙ্গ সাক্ষাৎ ভগবান শিব রূপে পূজিত।
পুণ্যতোয়া ভগবতী নর্মদার প্রতিটি কঙ্কর ভগবান শঙ্কর রূপে বিরাজমান।
পবিত্র পুণ্যময়ী নর্মদা নদীর লিঙ্গাকৃতি পাথর কে নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ বা বানলিঙ্গ বলা হয়।

নর্মদেশ্বর বা বানলিঙ্গ ছাড়া অন্য সকল শিবলিঙ্গের যথা রীতি সংস্কার শোধন ও প্রতিষ্ঠা করেই পুজো করা হয়।
কিন্তু নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ বা বানলিঙ্গের কোন প্রকার শোধোন, সংস্কার বা প্রতিষ্ঠা ছাড়াই পূজা করা চলে।
তাছাড়া যেকোনো শিবলিঙ্গের উপরে নিবেদন করা দমস্ত দ্রব্যাদি নির্মাল্য হওয়ায় কারণে তা অগ্রাহ্য, অর্থাৎ সেই সকল দ্রব্যাদি গ্রহণ করা নিষেধ ।
কিন্তু নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গের উপরে চরান দ্রব্যাদি বা নিবেদিত সামগ্রী মহা প্রসাদ রূপে গণ্য, বা গ্রহণীয়।
নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গকে কোন প্রকার অনুষ্ঠান ব্যতিরেকেই পূজা গৃহে স্থাপিত করে পূজা পাঠ করা যায়।
একবার মাত্র পঞ্চগব্য দ্বারা ধুয়ে ধাতু নির্মিত বা পাথরনির্মিত যে কোন যোনিপীঠের উপরে স্থাপিত করে পূজা করা যায়।
নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ গৃহস্থের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ।
নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ ভুক্তি ও মুক্তি উভয়ের জন্যই শ্রেষ্ঠ ও উপযুক্ত।
নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ সর্ব গুণ সম্পন্ন হওয়ার কারণে সকল শিব ভক্তের পরম আরাধ্য।
       জয় নর্মদেশ্বর।
     ওঁ নমঃনর্মদেশ্বর নমঃ নমঃ।

নর্মদা নিজেকে গঙ্গার মতন পবিত্র ও মর্ত বাসীর পূজা পাবার জন্য বছরের পর বছর ভগবান ব্রহ্মার তপস্যা করেন।
ভগবান ব্রহ্মা নর্মদার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে নর্মদাকে  বর দিতে চাইলেন তখন নর্মদা নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করে বললেন যে সে গঙ্গার মতন পবিত্র নদী হতে চান।
ভগবান ব্রহ্মা তখন বললেন যে যে কেউ যদি ভগবান শিবের মতন হন বা কেউ যদি ভগবান বিষ্ণুর মতন হন বা কেউ যদি কাশী শহরের মতন হয় তবেই সে গঙ্গার সমান হতে পারবে।
এমন কথায় নর্মদা ব্রহ্মার নিকট বরের আশা ত্যাগ করে কাশীতে গিয়ে ভগবান শিবের লিঙ্গ রূপ প্রতিষ্ঠা করে কঠোর তপস্যায় মগ্ন হন।
ভগবান শিব নর্মদা তপস্যায় তুষ্ট হয়ে নর্মদাকে তার কাঙ্খিত বর প্রদান করেন এবং ভগবানশিব নিজে নর্মদা নদীতে আবির্ভূত হয়ে নর্মদা কে নিজের কন্যা রূপে আদরে নিজের কোলে বসান এবং বলেন যে নর্মদা এতই পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ যে আমি সমস্ত নর্মদা তে সদা বাস কিরবো, নর্মদা সকল নুড়ি পাথরে ই আমার বাস কিরবো ।
গঙ্গানদীতে স্নান করলে সমস্ত পাপের থেকে মুক্তি লাভ হয়।
কিন্তু নর্মদাকে দর্শন করা মাত্রই পাপির সমস্ত পাপ মোচন হবে।
তখন থেকেই নর্মদার সকল নুড়ি পাথরই শিবের প্রতি রূপ হিসাবে গন্য।
আর নর্মদা নদীর সকল নুড়ি পাথরকে বলা হয় নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ।
   <-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
===========================


====================================
19/8)>||অমরকন্টক-নর্মদার উৎসস্থলে  সংক্ষিপ্ত--to word FOR  SV2 শোভেনিওর 2020



।। শ্বাপদ সংকুল গভীর জঙ্গলে,ভয়ঙ্কর দুর্গম ভ্রমণের এক অংশ ।।
           ।।-নর্মদার উৎসস্থলে -অমরকণ্টক পাহাড়ে ।।
                            আদ্যনাথ রায় চৌধুরী।
প্রাক কথা -------

হে মাতা নর্মদে,
শ্বাপদসংকুল গভীর জঙ্গল,পাহাড় ,
উপেক্ষা করে,নিতান্ত অর্বাচীন আমি ,
বারংবার  ছুটে গেছি তোমার দুয়ারে,
অস্থির মনে তোমার শ্রীপাদপদ্ম দর্শনে।

কোনদিন ফিরিনি শূন্য হৃদয়ে কুন্ঠিত মনে,
সদা হয়েছি তৃপ্ত তোমার দর্শনে।
ভয়ঙ্কর দুর্গম পথ,শ্বাপদ সংকুল গভীর জঙ্গল,
পদে পদে বিপদ ভীষণ,
পথ চলতে তোমার 'রেবা' নাম জপ সারাক্ষণ।
আনন্দময়ী তুমি, রেবা নামেতেই  তুষ্ট অতি,
সকল বিঘ্ন দূরকরে করুণা করেছো আমার প্রতি।
রেবা নামের মাহত্ম গুণে বাঁধা বিপদ গেছে দূরে,
রেবা,রেবা,রেবা,-রেবা নামেই আছো হৃদয় ভরে।
কোনোদিন ,কোন বাঁধাই থামাতে পারেনি আমায় ,
নিৰ্ভয়ে পৌঁছেছি  তোমার কৃপায়।
তোমাকে করেছি দর্শন মনের আশ মেটানোর ছলে,
ব্যাকুল মন, চায় বার বার পৌঁছতে তোমার আম্রকুটে।
কিন্তু আজ আর উপায় কোথায়,
বার্ধক্য ক্রমে  ঘিরিছে আমায়।
তাই ভাবনা পৌঁছবো কেমনে,
স্বর্গাধিক সুন্দর তোমার কাননে।
পাপী তাপি যত আসে তোমার দুয়ারে,
সকলে তুষ্ট তোমার আশীষ বলে।
তোমার দুয়ার হতে কেউ ফেরেনা খালি হাত ,
সকলের তরে বাড়াও  তোমার বরাভয় হাত।
আজ থেকে 48 বৎসর আগে,
তোমার দুয়ার পথ  রেখেছিলে কঠিনে ঢেকে।
তবুও  নির্ভয়ে পৌঁছে ছিলাম তোমার দুয়ারে ,
তোমার উৎসস্থলে তোমার আনন্দ কাননে ।
কপিল ধারায় দেখেছি তোমার ভয়ঙ্কর রূপ,
সমগ্র সৃষ্টি ধ্বংসের অতি বিক্রাল রূপ।
তোমার নৃত্য দেখেছি ওই স্রোতের মাঝে,
সু উচ্ছ হতে গভীরের  মাঝে।
তোমার শ্বেত শুভ্র ফেনিল জল ধারা,
জলপ্রপাত রূপে খ্যাত  কপিলধারা।
পাহাড়ে পাহাড়ে তার প্রতিধ্বনি,
ভাবলেও মনে শিহরণ জাগে।
শংকর তনয়া তুমি শঙ্করের সাজে।
করিছ প্রলয় নৃত্য আপন মনে সৃষ্টির তরে,
পিতা শংকর দেখিছে তোমারে হৃষ্ট মনে।
পিতার সদৃশ  জটাজুট ধারিণী,
রক্তবর্ণ ব্যাঘ্র চর্ম বসনে তুমি ভয়ঙ্করী।
শিবের মতন ত্রিশূল ডমুরু ধারিনি,
আনন্ত্য নৃত্যে মগ্ন জগৎ তারিণী ।
ভোলানাথ দেখিতেছেন তোমার নৃত্যে
নিকটে হইয়া উপনীত।
কি দারুন শোভায় সুশোভিত দিগন্ত।
ক্ষণিক দর্শনেই মন প্রাণ হয় শান্ত।

প্রভাতে শ্বেতশুভ্র বসনে,
নিজ কাননে একনিষ্ঠ মনে,
শিব পূজার তরে, নিজ করে,
নিবিষ্ট তুমি ফুল চয়নে।
অপরূপ রূপে  তুমি ষোড়শী  কুমারীর বেশে,
পিন উন্নত সুডোল পয়োধর উন্মুক্ত কেশে।
সুউচ্চ নীতম্ব,সূক্ষ্ম কটিবেষ্টনী,
যেন বিশ্বকর্মা নির্মিত স্বর্ণ কলাপিনী।
অপরূপ রূপ লাবণ্যে আলোকিত দিগন্ত,
শংকর তনয়া তুমি সদা হাস্য রত প্রশান্ত।
মালিনীর বেশে সুশোভিত ফুলমালা গলে, 
সে রূপে মোহিত দেবগন লালায়িত মনে।
তোমার রূপ যৌবনে উদ্ভাসিত দিগন্ত ,
কামুক দেবতাগণ অতিশয় বিভ্রান্ত।
প্রভাতে তোমার সঙ্গ লাভের তরে, 
তোমার বাগিচায় কামুক দেবগণ সকলে। 
কিন্তু বিধির বিধানে অসাধ্য তোমাকে পাওয়া, 
তুমি শিবের অতি আদরের, শিব তনয়া।
তোমারে রাখিতে খেয়াল সদাই ব্যাস্ত পিতা,
শিবলোক ছাড়ি তোমার উৎসকূলে বসেন সদা।
প্রত্যুষে তোমার বাগিচায় তুমি মঙ্গল বরদে, 
সৃষ্টির কল্যাণে তুমি মর্তে নর্মদা শুভদে।
মুনি ঋষি গণ জানেন এহেন সত্য,
মাই কি বাগিচাতে সত্য জ্ঞান সহজ লভ্য। 
সৃষ্টি উজাড় করে দিয়েছে ফল ফুলের সাজি,
তোমার নিত্য ভ্রমণের বাগিচাখানি।
যার শোভায় মুগ্ধ পৃথিবী বাসী,
সেই তোমার 'মাই কি বাগিচা ' বলে জানি।
তোমার স্নেহ স্পর্ষে আপ্লূত মুগ্ধ হৃদয় আমার,
তোমার আশীষ ভিন্ন চাহিনা কিছু আর।
মুনি গনের অতি কাম্য লভিতে সত্য জ্ঞান,
প্রত্যুষে তোমার বাগিচায় করেন জপ ধ্যান। 
হে মা নর্মদে তোমারে জানাই প্রণাম 
এই অধমের রাখিও মনে দিও সত্য জ্ঞান।  
মম নতিরেষা তব পদ কমল যুগলে,
অতি মূর্খ আমি,
জানি তুমি আছো আমার  হৃদকমলে।
                             <---©-আদ্যনাথ--->
======   ======    ======    =======

 অমরকণ্টক -----
মধ্যপ্রদেশের (বর্তমানে ছত্তিশগড় রাজ্যের )
শাহাদোল বা শ্যাডোল  জেলার অনুপপুরে অবস্থিত এই অমরকণ্টক তীর্থ ক্ষেত্র। 
উচ্চতা 1067/বা 1048 মিটার ( 3438 ফুট ),,অক্ষাংশ  22-67"N ,,দ্রাঘিমা 81-75"E
মন্দির ও পাহাড় দিয়ে ঘেরা পুন্য তীর্থ নগরী। //মাইকাল ও বিন্ধ্যা পর্বতের অপূর্ব মিলন স্থল। 
নর্মদা, সোন ও জুহিলা  নদীর উৎস স্থল। //শহরের প্রদূষণ থেকে মুক্ত জল প্রপাত ,ঘন জঞ্জলে পূর্ন ,মনোরম সবুজে ঘেরা ,শীতল আবহাওয়ায় যেতে কার না মন চায়। 

সন্ত কবির ভাষায় "নর্ম "অর্থাৎ সুখ শান্তি। //'সুখ -চৈন দক্ষতি ইতি " নর্মদা" '
সুখের তাৎপর্য সিদ্ধত্ব । সুখ, শান্তি, সিদ্ধত্ব, প্রাপ্তি স্থানের নাম নর্মদা।
অমরকন্টকের আবহাওয়াতে শরীরের উষ্ণতা যেমন কম হয় মনের অস্থিরতা ও তেমনি শান্ত হয়। 

1974 সালের MAY মাস----
সেদিন ইচ্ছা হল আবার একবার অমরকণ্টক যাবার। 1972 এতে প্রথমে একবার গিয়েছিলাম।
যে মন্দির বা তীর্থ স্থান সাধনা ও আরাধনার উত্তম স্থান।যেখানে গেলে বা দর্শন করলে মনে শান্তি পাওয়া যায় যেখানে  নিরালা  প্রশান্তিতে মনে প্রাণে আনন্দ অনুভব হয় , মন কিছু ভালো কাজ করবার জন্য উদ্ভুদ্ধ হয় সেখানে  যেতে বার বার মন চায়।
অমরকণ্টক তথা নর্মদার উৎসস্থল,প্রসিদ্ধ তীর্থ স্থান, ভ্রমনের উপযুক্ত মনমুগ্ধকর পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পূর্ণ বর্ণনাতীত সৌন্দর্যের খনি। সেই কারণেই অমরকণ্টক যাবার জন্য মন ব্যাকুল। সম্পূর্ণ অমরকণ্টকের বর্ণনা করা অসম্ভব।
আমি বলতে পারি যে আমি নিজে যতটুকু দেখেছি বা জেনেছি শুধু সেই টুক লিখতে গেলে  হাজার পৃষ্ঠাতেও  শেষ হবে না। সেই কারণে যথা সম্ভব  সামান্য একটু বর্ণনা করছি।
আজকাল যেকোন সময়ে  মন করলেই যাওয়া যেতে পারে অমরকণ্টক।
কিন্তু সেদিন, আজ থেকে 48 বৎসর আগে, অমরকণ্টক ছিল অতি ভয়ানক দুর্গম ,দিনের বেলাতেও হিংশ্র পশুর ভয়। সামান্য কজন সাধু সন্ত ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছান  প্রায় অসম্ভব ছিল।
পুণ্যতোয়া নর্মদা অমরকণ্টক থেকে উৎপন্ন হয়ে বিন্ধ্য পর্বত ও সাতপুরা  পর্বতের মধ্যে দিয়ে পাহাড় ভেদ করে ভীষণ ভীম বেগে ধাবিত হয়ে কাম্বে উপসাগরের সুরাটের কাছে বোরোচ বা ভারোচ নামক স্থানে গিয়ে মিলিত হয়েছে 813 মাইল পথ বেয়ে , যার উৎস স্থল অমরকণ্টকের মূল মন্দিরের নিচে।
নর্মদার উভয় তট অতি পবিত্র ও সাধন ক্ষেত্র।
পুরাণে উল্লেখ আছে , যমুনার জলে সাতদিনস্নান করলে, সরস্বতীর জলে তিনদিন ও গঙ্গার জলে একদিন স্নান করলে সকল পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । আর নর্মদার জল দর্শনমাত্রেই মোক্ষ লাভ।

সেদিন আমি যখন পেন্ড্রারোড পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা বাজে পথে হঠাৎ অলৌকিক ভাবে দন্ডি নাথ জি বা দন্ডি বাবার সাথে দেখা হয়ে গেল।ওনার সাথে ই ভেটেন্ডার ভয়ানক জঙ্গল পার করে পৌছে ছিলাম অমরকণ্টক ।সে এক ভয়ানক রোমাঞ্চকর দুর্গম পথের কাহিনী।  সময় সুযোগ পেলে সে কাহিনী পরে বলবো।
আমরা মোটা মুটি পরের দিন  সকাল 10  টা নাগাদ পৌঁছে গিয়ে ছিলাম মন্দির চত্বরে। দন্ডি বাবার চেনা জানা এক আশ্রমে। সেখানে আরও চার পাঁচ জন সাধু ছিলেন। দিনের বেলা ওই আশ্রমের খিচুড়ি ও মিষ্টি আলুর পোড়া খেয়ে কাটালাম।
আমি তো এই স্থানে আগেও একবার চার জনে মিলে মায়ের দর্শন করে গেছি কিন্তু আগের  কিছুই চিনিতে পারছি না। কি অদ্ভুত ,মাত্র দুই বৎসরে এতো পরিবর্তন ,ভাবতেই পারছিনা।
দন্ডি বাবাই বললেন সমগ্র অমরকন্টক মন্দিরময়। যেখানে যেদিগে যাবে মন্দির পাবে।
তবে দর্শনীয় স্থান গুলি  হল এই মা নর্মদার মন্দির।
মূল মন্দির থেকে এক কিলোমিটার দূরে "মাই কে বাগিচা "এখানে প্রচুর আম ও ফুল  গাছ। নানা জাতির আম ও নানা নরকমের ফুল গাছ এখানে পাওয়া যায়। অপূর্ব এই বিশাল বাগান। ঘন অরণ্যের মধ্যে এমন সুসজ্জিত ফুলে ফলে পূর্ন অপূর্ব বাগান যা কিনা ভাবনার অতীত।
অনেকে মনে করেন আম্রকুট থেকেই অমরকণ্টক নাম। এবং মহাকবি কালিদাসের আম্রকুট থেকেই এই অঞ্চলের নাম অমরকণ্টক। এখানে "গুল -ই -বকোয়ালি "নাম এক ক্যাক্টাস পাওয়া যায় ,যার অসাধারণ ভেষজ গুনও অতি সুমিষ্ট ও সুন্দর গন্ধ,এমন সুন্দর গন্ধ অন্য  কোন ফুলেই হয়না ।
এই বাগিচায় অনেকে জাগ্-যজ্ঞ করেন। কারণ এখানে নর্মদা অতিশয় জাগ্রত।
নর্মদা ও শোন নদীর মিলন স্থল "শোন মুড়া ",এখন থেকে সুর্যোদয়ের এক অসাধারণ মায়াবী দর্শণ হয়।উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত  ও দক্ষিণে সাতপুরা পর্বত মালা এই দুই পর্বত মালার  মিলন স্থানের নাম  মৈকাল বা ৠষ্য বা অমরকণ্টক। পুণ্যতোয়া নর্মদার তটে পুন্য তীর্থ অমরকণ্টক।
এছাড়াওআছে,প্রাচীন মন্দির কালাচুরি , কোপিল ধারা (কোপিল জলপ্রপাত ),
শ্রী যন্ত্র মন্দির , দুধ ধারা জলপ্রপাত , জালেশ্বর মহাদেব মন্দির, পরম বিনায়ক, ধূনিপানী, পুস্কর ড্যাম, শম্ভুধারা, চক্রতীর্থ, চন্ডীগুহা। শ্রী সর্বোদয় দিগম্বর জৈন মন্দির ,মৃত্যুঞ্জয় আশ্রম,অমরেশ্বর মহাদেব মন্দির , শোন্ উদ্যান মন্দির ,ভৃগু কমণ্ডল। আরও কত মন্দির, আশ্রম আছে এবং রোজই  তৈরী হচ্ছে  এখানে মন্দির ,হোটেল ধর্ম শালা ,যাত্রী নিবাস।
দন্ডী বাবার  সাথে ঘুরে কিছু লাভ তো হয়েছে। বেশ কিছু হটযোগে অভ্যাস করতে পেরেছি।
সেই কামাক্ষা মায়ের কাছে শেখা হটযোগের অনেককিছুই ভুলে গিয়ে ছিলাম।
দন্ডি বাবার কাছ থেকে অনেক কিছুই জালাম।
ওনার সাথে দুই দিন ঘুরে বেরিয়ে গাইডের মতন করে কত গল্প শোনালেন ও নানান মন্দির দর্শন করালেন।
নর্মদার জন্ম ও উৎপত্তির গল্পে বাবা বললেন মেখলাগিরির এই পুণ্যক্ষেত্রে অনাদিকাল শিব ছিলেন কঠোর তপস্যারত। কত দিন, কত বছর, কত যুগ ধরে যে তিনি ধ্যানমগ্ন ছিলেন তার হিসেব কেউ জানেনা । ঠিক এমনই সময় এক শুভক্ষণে শিবের কণ্ঠদেশ থেকে নির্গত হয়েছিলেন  নর্মদা।
এবারে দন্ডি বাবা একটু থামলেন এবং এক দোকানে গিয়ে দোকান দারের সাথে কিছু কথা বলে একটি ছেলের সন্ধান করেন। ছেলেটির নাম বিলাস তাবড়। বাবার নির্দেশে বিলাস মোটর সাইকেলে (এনফিল্ড মটর সাইকেল )আমাকে 35 কিলোমিটার দূরের শ্রী গণেশজির মন্দির, সাত কিলোমিটার দূরের কপিল ধারা ,মাইকী বাগিচা এবং কাছের ও দূরের সকল মন্দির ,জলপ্রপাত এবং আরও নানান স্থান দেখিয়ে আনলো ওর বাইকে করে।
বিলাস এখানে বেশ পরিচিত ছেলে এবং দন্ডি বাবার ভক্ত। ওই গাইডের মতন করে আমাকে নিয়ে তিনদিন ঘুরিয়ে দেখাল নর্মদা মন্দিরের সকল স্থান।
বাইকে করে গিয়েও প্রতিটি স্থান  দর্শনের জন্য পায়ে হেটে চড়াই উৎরাই পথে যেতে হয়েছে।
কারণ স্থান গুলি কোনটি সেই গভীর খাদের নিচে কোনটি পাহাড়ের উপরে 'প্রতিটি স্থানই জঙ্গলে ঘেরা। এক স্থান থেকে আরেক স্থান অনেক দূর কোন বাহন ছাড়া পৌঁছে আবার ফিরে  আসা মুশকিল।তার উপরে সকল স্থান এতো গভীর জঙ্গল যে জানা না থাকলে সকল স্থানে পৌঁছনই অসম্ভব। জানা না থাকলে এই সকল মন্দির খুঁজেই পাওয়া যাবে না।
দন্ডি বাবার কল্যানে বিলাস কে পেয়ে আমি অনেক মন্দির সিদ্ধ স্থান অনেক সহজে দর্শন করতে পারলাম।
প্রথম দিন দন্ডি বাবার সাথে মায়ের মন্দির ও আসে পাশের কোটি তীর্থ ,গোমুখ,রং মহল,
শোন মুড়া,মার্কেন্ডেয় মন্দির। ডাকবাংলো ,মন্দির গুলি দেখলাম বাবার সাথে  পুজো হোম করেছিলাম।
এখানে নর্মদা মাতার মন্দিরে এলে মন ভরে যায়। কালো কষ্টিপাথরের তিন ফুট উচ্চতার মূর্তি নর্মদা মায়ের। এক হাতে কমণ্ডলু অপর হাতে বরাভায়। মূর্তির সামনেই বিপরীত দিকে অমরেশ্বর শিবের মন্দির। মন্দিরের ঠিক পিছনদিকেই নর্মদার উৎস। উৎসমুখে জলস্পর্শ করে সংলগ্ন এলাকারই বাঁধানো কুণ্ডে স্নান করা যায়। এর নাম কোটি তীর্থ।
নর্মদা মাতার মন্দিরে বিশাল  চত্বরএই চত্বরের মাঝে বেশ বড়ো কুন্ড।  কুন্ড টির এগারোটি কোনা। কুন্ড টি দৈর্ঘে প্রস্থে বেশ বড়ো। বেশ পরিষ্কার স্বচ্ছ জল। এইটিই পবিত্র নর্মদা কুন্ড। দন্ডি বাবা বললেন এটিই  আসলি বিশা যন্ত্র। আর বিশা যন্ত্র মানেই সিদ্ধি লাভের মূল আঁধার।কুন্ডের উত্তর দিগে অমরকণ্টকেশ্বর মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বিরাজমান নর্মদেশ্বর মহাদেব। কন্যা নর্মদা মহাদেবের ডান পায়ের উপরে কৃতাঞ্জলিপুটে দাঁড়িয়ে আছেন। কালো কষ্টিপাথরের মূর্তি। নিরাভরণ মূর্তি ,ক্ষীণকোটী ,উন্নত নাসা ,আকর্ন চক্ষু,তপস্বিনী মূর্তী। সামনের মন্দিরে বিরাজমানমহাদেব নিজ আত্মজার দিকে তাকিয়ে আছেন অপলক দৃষ্টিতে।
অমরকণ্টকে এলে হাঁটাপথেই বেশ কয়েকটি স্থান দেখে নেওয়া যায়। তার মধ্যে একটি হল শ্রীযন্ত্র মহামেরু মন্দির। অমরকণ্টকের সেরা মন্দির এটি। এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা সবই বাহান্ন ফুট। মন্দিরের গায়ে সর্বত্র বিভিন্ন দেবদেবীর সুন্দরকলার ভাস্কর্য বিদ্যমান। এরপর আছে স্বল্প দূরত্বে বিখ্যাত কর্ণ মন্দির। সেই একই চত্বরে আছে কেশবনারায়ণ মন্দির। আর আছে ষোলোটি স্তম্ভের ওপর নির্মিত অতী সুন্দর মৎস্যেন্দ্রনাথের মন্দির।
অমরনাথ মন্দিরের সামনে দুটি মন্দির একটি গোরক্ষনাথের অপরটি গৌরীশংকরের।এখানে কাছেই আছেন বিষ্ণু ও নারায়ণের মন্দির ,রোহিণীদেবীর মন্দির ,পার্বতী মন্দির ,বালাসুন্দরীর মন্দির ,মুরলীমনোহরের মন্দির ,মহাভৈরবের মন্দির ,ঘন্টেশ্বরের মন্দির ,রামচন্দ্রের মন্দির। সম্পূর্ণ মন্দির এলাকা যেন একটি দুর্গ। মন্দির দুর্গে বেষ্টিত অমরকণ্টকে মা নর্মদা সদা বিরাজমান।

এই পর্যন্ত জীবনে অনেক মন্দির দর্শন করেছি , শৈলতীর্থ অমরনাথ তিনবার দর্শন করেছি ,এমনকি সেই মরুতীর্থ হিংলাজ সেখানেও গিয়ে মাকে দর্শন করে এসেছি। গঙ্গোত্রী গোমুখ সেখানেও গিয়েছি। মোটামুটি বলতে পারি ভারতবর্ষের যতটা পেরেছি দর্শন করেছি। নেপাল ,পাকিস্তান, চীনের নন্দনকানণ ,  তিব্বতের মন্দির ,ফ্লাওয়ার ভেলি কিছুই বাদ দেয়নি। এতো দর্শন করে ও তেমন কোন উপলব্ধি বোধ করিনি যা পেয়েছি এই অমরকণ্টকে। তাইতো বার বার ছুটে গেছি অমরকণ্টকে।
আজ 69 বৎসরেও মন চায় আবার একবার অমরকণ্টক দর্শন করতে।
কিন্তু বয়সের ভার আর হাঠুর ব্যাথা তাই সাহসে ভর করতে পারছি না।
সত্যই অমরকণ্টক - এক মায়াময়  অতি সুন্দর অধ্যাত্মভূমি। না দেখলে এই ভূমির মাহাত্ম
অনুভব করা মুশকিল।  " জয় মা নর্মদে "
                             <---©-আদ্যনাথ--->
                               JANUARY 2020
============================================================



19/9)>||অমরকণ্টক  মোক্ষদাত্রী,
To diary No-ভ্রমন(29)- page No -(49)


অমরকণ্টক  মোক্ষদাত্রী,
 সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী মহাকুমারী শক্তির প্রতীক মা নর্মদার উৎপত্তিস্থল। অমরকণ্টকের অপর নাম মেকল বা ঋষ্য। রুদ্রতেজাৎসমুদ্ভূতা শিবকন্যা মা নর্মদার উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত ও দক্ষিণে সাতপুরা পর্বতমালা। এই দুই পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে নর্মদা পশ্চিগামিনী হয়ে আরবসাগরে গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত ভারোচ বা ব্রোচে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই স্থানের নাম ভৃগুকচ্ছ। 

অমরকণ্টকের চারিদিকে ঘনঘোর অরণ্যানি, সেই ভয়ঙ্কর অরণ্যানির তমসা ততধিক ভয়ঙ্কর। ভয়ঙ্কর শ্বাপদ গোষ্ঠীর উপদ্রব সহ্য করে, কণ্টকাকীর্ণ বনভূমি ও পাকদণ্ডী বেয়ে তীর্থযাত্রীদের যেতে হত এই মহাতীর্থে। কোল, ভীল, মুণ্ডা প্রভৃতি উপজাতির বাস এখানে। অমরকণ্টকের এই ঘনঘোর অরণ্যানি শাল, সেগুন, শালাই, বিজা, মহুয়া, লাখ, তেন্দুপাতা, গোঁত এবং অনেক বনৌ ঔষধিতে ভরপুর।

এছাড়া এখানেই আছে শোণ নদীর উৎপত্তিস্থল। আদিকাল থেকে নর্মদা ও শোণ দুই নদীর উদগমস্থল ছিল ঋষিমুণিদের তপস্যাভূমি।

এই নর্মদাক্ষেত্র মহাসিদ্ধপীঠ, শ্রেষ্ঠ তপস্যাস্থল।
 "নর্মদায়াং তপঃ কুর্যাৎ মরণং জাহ্নবীতটে" --- 

গঙ্গাতীরে মৃত্যু হলে জীবের উচ্চগতি হয় কিন্তু তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করতে হলে আসতে হয় নর্মদাতটে। মহাচৈতন্যময়ী চৈতন্যকারিণী নর্মদা মায়ীর কৃপা কটাক্ষ ছাড়া ঞ্জানসিদ্ধি বা কৈবল্যসিদ্ধি কখনই সম্ভব নয়।

মহর্ষি ভৃগু, মার্কণ্ডেয় থেকে আরম্ভ করে মহর্ষি পতঞ্জলি, গুরু গোবিন্দপাদ, শঙ্করাচার্য, গোরক্ষনাথজী সবাই ছুটে গিয়েছিলেন নর্মদায় তপস্যা করতে। ভারতের শ্রেষ্ঠ মহাত্মা মাত্রেই নর্মদার কৃপাসিদ্ধ, আশীর্বাদধন্য।

জগৎ সংসারে নর্মদা এমনই একমাত্র নদী যার পরিক্রমা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে কারণ পরম পরিতৃপ্ত বিধায়িনী, পরম সুখ ও আনন্দদায়িনী, মহাকুমারী শক্তির প্রতীক হলেন, মা নর্মদা।

তাই বৈদিক ঋষিরা ঘোষণা করেছেন ---


নর্মদা সরিতাং শ্রেষ্ঠা রুদ্রতেজাৎ বিনিঃসৃতা।
তারয়েৎ সর্বভূতানি স্থাবরানি চরানি চ।।

নর্মদা সমস্ত নদীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ; রুদ্রের তেজ হতে সমুৎপন্না, স্থাবর জঙ্গম সমস্ত কিছুই তিনি ত্রাণ করেন।

"সর্বসিদ্ধিমেবাপ্নোতি তস্যা তটপরিক্রমাৎ" --- শুদ্ধচিত্তে তাঁর তট পরিক্রমা করলে সর্বসিদ্ধি করায়ত্ত হয়।
=======================
 
19/10)>|| নর্মদা ||
To diary No-ভ্রমন(29)- page No -(52)


****** নর্মদা --- মধুনিস্যন্দিনী সংস্কৃত ভাষায় ঋষিদের অত্যন্ত তাৎপর্যময় এই শব্দটি মূর্তিমতী "গায়েত্রী" র মতই ত্র্যক্ষরা। নর্মন্‌ ধাতু হতে শব্দটি নিষ্পন্ন, নর্মন্‌ দদাতি ইতি নর্মদা। নর্মন হচ্ছে নৃ ধাতুর উত্তর মন্‌ ও কর্তৃবাচ্য। নর্ম মানে হচ্ছে ক্রিয়া, নর্ম মানে হচ্ছে খেলা, প্রিয়ত্ব বা বিহার। নর্ম --- দা + ড = নর্মদা। নর্মন্‌ দদাতি অর্থাৎ আনন্দ-বিলাস যিনি দান করেন। ব্রহ্মের যে আনন্দ-বিলাস, জগৎ জুড়ে যে আনন্দের লীলা চলছে।
উপনিষদ বলছে --- আনন্দ থেকে জাত, আনন্দের বুকেই সবাই আছে। অন্তে এই আনন্দেই সব লয় পাবে --আনন্দ ব্রহ্মের সেই অলৌকিক আনন্দ-বিলাস দেখবার, বুঝবার এবং অনুভব করার ক্ষমতা যিনি দান করেন --- তিনিই নর্মদা।
===========================
 19/11)>অমর কথা::-

To diary No-ভ্রমন(29)- page No -(41)
অমর কথা::---
মোক্ষদাত্রী নর্মদা---(সংগ্রহ)
   

বিন্ধ্যপর্বত চূড়ায় অমরকণ্টক, যেখানে আছে অতি সুন্দর কয়েকটি আশ্রম সংলগ্ন মনোরম স্থান।  
সেই আশ্রমগুলির চতুর্পাশের বনভূমি 
নানান বৃক্ষেতে পরিপূর্ণ, যেমন
চম্পক , কর্ণিকার , পুন্নাগ , নাগকেশর , দাড়িম , পুস্পিত অর্জ্জুন ,পাটলা , তিন্দুক , কপিত্থ , পনস ইত্যাদি।
এ ব্যাতীত আম্র , নিম্ব ও নারিকেল বৃক্ষের চারিপার্শে বিপুল জলাশয় সরোজসমূহে (সরোজ=পদ্মফুল) সুশোভিত। উহার কোথাও সিতোৎপল , কোথাও নীলোৎপল , কোথাও পীতপদ্ম আবার কোথাও শ্বেত ও অরুণপদ্মনিচয় প্রস্ফুটিত হইয়া জলাশয়ের সৌন্দর্য বর্ধন করিতেছে। সেথায় প্রতিনিয়ত হংস , (কান্ডব ,★?) চক্রবাক , কাক , বলাকা , কোকিলাদি পক্ষিগণ সদা আনন্দ ক্রীড়ায় মত্ত থাকে।
আশ্রমগুলির চতুর্দ্দিকের বনানী অতিশয় শ্বাপদসংকুল,
ভীষনকায় বাঘ , সিংহ , বরাহ , মহিষ , বিবিধ বর্ণের হরিণ , শশক , গন্ডক , গন্ডার , গোমায়ু(শৃগাল); প্রহরী , সুরভী , সারঙ্গ , মল্লক ইত্যাদি দ্বিপদ ও চতুস্পদদের বাস। 
তথাপি এই আশ্রমগুলি স্বত্তগুণ -সমন্বিত , মনোজ্ঞ ও সুখদুঃখ বিনির্মুক্ত। 
=======================


,