94>ভ্রমণ মাইহারের মা শারদা মন্দির মধ্যপ্রদেশ।::--
<-----আদ্যনাথ---->
আমি চাকুরী জীবনে কাটনীতে ছিলাম কিছুদিন। এবং সেই সময়ে মাইহারের শারদা মন্দির দর্শন করেছিলাম।সেই সময়েই উপলব্ধি করেছি যে 'মা' এখানে সদা জাগ্রত।
"মাই কা হার", সেখান থেকেই মাইহার। দেবী এখানে অবস্থান করেন শারদা রূপে। সতীর কণ্ঠহার হার পড়েছিল এইস্থানে,সেই কারণে "মাই কা হার" অর্থাৎ মাইহার।
লোকমুখে শোনাজায় এবং এখানকার মানুষের বিশ্বাস এমন যে এই মন্দিরে মানুষের আগে পুজো দেন প্রেতাত্মারা! মা কখনই সন্তানের ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বিচার করেননা এমনকী, মৃত্যুও মা আর সন্তানের স্নেহের বাঁধন ছিন্ন করতে পারে না। মায়ের মৃত্যুর পরে সন্তান তাকে মনে রাখুক বা না-ই রাখুক, মা কিন্তু অপেক্ষা করে চলেন মৃত সন্তানের জন্য। এই আশা নিয়ে, একদিন ঠিক তাঁর সন্তান তাঁর কাছে ফিরে আসবে। মৃত্যুর বাঁধন উপেক্ষা করে সন্তান ফিরে আসে না ঠিকই! কিন্তু, সে তো মানুষের জগতে। 'মা' যেখানে স্বয়ং জগদীশ্বরী শারদা, সেখানে এই সব নিয়ম খাটে না। মধ্য প্রদেশের মাইহারে শারদা মাতার মন্দিরে তাই প্রতি দিন ব্রাহ্মমুহূর্তে সমাবেত হন মৃত সন্তানরা! এমনটাই জানা যায় এবং এখানকার সকল ভক্তের এমনটাই বিশ্বাস।
মাইহারের ইতিহাস একটু খোঁজ করলেই জানা যাবে অনেক কথা, আর সেই সকল কথা জানতেই চোখ রাখতে হবে পুরাণ-কথায়! সেই কারনেই একটু গল্পের ছলেই শোনা যায় সেই পূরণের কথা::-- সেই দক্ষ-যজ্ঞের কথা::---
যে দিনের কথা, সেদিন শিব এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী সতী- কারও পক্ষেই ভাল ছিল না। সকাল থেকেই শুরু হয়েছিল বিবাদ। সতী দেখেছিলেন, কৈলাসের পথে তাঁর দিদিরা সবাই সেজেগুজে বিচিত্র সব রথে চলেছেন কোথাও!ব্যাপারটা জানতে সতী দৌড়ে যান দিদিদের কাছে। জানতে চান, তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন!
দিদিরা অবাক হন! প্রজাপতি দক্ষ আয়োজন করেছেন মহাযজ্ঞের, সারা পৃথিবী সেই যজ্ঞে আমন্ত্রিত। আর দক্ষের সব চেয়ে আদরের মেয়ে সতীই সে কথা জানেন না! সতীর জানার কথাও নয়। কারণ দেবসভায় দক্ষকে দেখে উঠে সম্মান জানাননি শিব! তাই দক্ষও তাঁর যজ্ঞে শিবকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য দক্ষ শিব বিহীন যজ্ঞ্ করার পন করেছেন এবং সেই সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সতীর থেকেও!
সতীর ম্লান মুখ দেখে খারাপ লাগে দিদিদের। তাঁরা প্রস্তাব দেন, সতীও তাঁদের সঙ্গেই চলুন! প্রথমটায় সতী যেতে চাননি! কিন্তু, দিদিরা যখন বলেন বাপের বাড়ি যেতে মেয়েদের আমন্ত্রণ বা নিমন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না, তখন কথাটা তাঁর মনে দাগ কেটে যায়। দিদিদের বলেন এগিয়ে যেতে, তিনিও স্বামীর অনুমতি নিয়ে রওনা হবেন। শিব কিন্তু সম্মতি দেননি! বুঝিয়ে বলেন ওখানে গেলে কেবল অপমানই প্রাপ্য হবে সতীর! কিন্তু নাছোড়বান্দা সতী তার নিজের জেদ বজায় রাখতে একের পর এক দশটি উগ্র রূপ ধরে ভয় দেখান শিবকে। শিব যে দিকেই যান, ভয়ানক রূপে তাঁর পথরোধ করেন সতী। বিব্রত হয়ে অবশেষে সম্মতি দেন শিব। সতি ফুলের গয়নায় সেজে, নন্দীর পিঠে সওয়ার হয়ে যাত্রা করেন যজ্ঞস্থলের দিকে। শিব কিন্তু যা বলেছিলেন, তাই হয়! দক্ষ সতীকে দেখে খুশি হননি একটুও! বরং তীব্র নিন্দা করেন মেয়ে-জামাইয়ের। অভিযোগ তোলেন, ভিখারি শিব দুটো ভাল খাদ্য-বস্ত্রের জন্য আমন্ত্রণ না পেয়েও পাঠিয়েছেন স্ত্রীকে।
স্বামীর সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে প্রাণ বিসর্জন দেন সতী! খবর পেয়ে দক্ষের যজ্ঞ পণ্ড করেন শিব এবং তাঁর দলবল। কিন্তু, শোক শিবকে মূহ্যমান করে তোলে। সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তিনি উন্মাদের মতো বেরিয়ে পড়েন আকাশমার্গে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে চলতে থাকে শিবের তাণ্ডব নৃত্য। এহেন ভয়ঙ্কর নৃত্য ও শিবের আক্রোশে সমগ্র পৃথিবীতে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। বিশ্ব ব্রহমান্ড লয় পাবার অবস্থায়, বিপাক দেখে শিব কে শান্ত করতে এগিয়ে আসেন বিষ্ণু। সুদর্শন চক্রে ছিন্নভিন্ন করে দেন সতীর শরীর। সেই শরীরের একেকটি অংশ যেখানে যেখানে পড়ে, সেই স্থানে জন্ম নেয় শক্তিপীঠ। সতীর গয়নাও যেখানে পড়ে, তা মর্যাদা পায় উপ-শক্তিপীঠের।
মাইহার সেই উপ-শক্তিপীঠের অন্তর্গত। পুরাণ বলে, এখানে মায়ের কণ্ঠহার নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। 'মাই কা হার', সেখান থেকেই মাইহার। দেবী এখানে অবস্থান করেন শারদা রূপে। তবে, মন্দিরে কিন্তু শারদা দেবী একা বিরাজ করেন না। প্রথামাফিক সঙ্গে থাকেন তাঁর ভৈরব বা শিবের রূপ। এছাড়াও এই মন্দিরে শারদা দেবীর পায়ের কাছে দেখা যায় একটি প্রস্তরফলক। সেখানে খোদাই করা রয়েছে দুই বীর যোদ্ধার মূর্তি। এই দুই বীর ভাইয়ের নাম আলহা আর উদল। এই আলহা আর উদলের জয়গান আজও গাওয়া হয় মধ্যপ্রদেশে। প্রবল পরাক্রমশালী এই দুই ভাইয়ের সৌজন্যে একাধিকবার শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে মাইহার। পৃথ্বীরাজ চৌহানের মতো অমিতবিক্রম যোদ্ধাও পরাজয় বরণ করেছিলেন আলহা-উদলের কাছে।
এমন গল্প শোনাজায় যে , আলহা আর উদলের শক্তির উৎস ছিলেন স্বয়ং দেবী শারদা। দেবীর পুজো না করে কখনই যুদ্ধে যেতেন না আলহা-উদল। বিশেষ করে আলহা! দেবীও তুষ্ট হয়েছিলেন আলহার এই ভক্তিতে। শোনা যায়, দেবীর বরে আলহা পেয়েছিলেন ১২ বছরের অমরত্ব। সেই ১২টি বছরে তিনি ছিলেন সবার ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে। তবে, সকল মানুষকেই একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতেই হয়। সেই নিয়মেই মৃত্যু হয়েছিল আলহা-উদলেরও! কিন্তু, তাঁরা প্রাণপ্রিয় মাইহার এবং শারদা মাতার মন্দির ছেড়ে কোথাও যেতে পারেননি! প্রতি দিন ব্রাহ্মমুহূর্তে তাঁরা মন্দিরে এসে পুজো দিয়ে যান শারদা মাতার। ঠিক যেমনটা তাঁরা করতেন জীবদ্দশায়।
চিত্রকূট পর্বতের পাদদেশে শারদা দেবীর মন্দিরের ঠিক নিচেই রয়েছে এক পবিত্র হ্রদ। আলহার নামে তার নাম রাখা হয়েছে আলহা কুণ্ড। স্থানীয়রা বলেন, রোজ ব্রাহ্মমুহূর্তে আলহা আর উদল সেই কুণ্ডে স্নান সেরে প্রবেশ করেন মন্দিরে।
সেই জন্যই রাত ২টো থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে মন্দিরের দ্বার। এই সময়ে কাউকে মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এমনকী, পুরোহিতরাও অপেক্ষা করেন মন্দিরের বাইরেই! ওই সময়েই যে প্রেতলোক থেকে নিত্যপূজা সম্পন্ন করতে আসেন আলহা আর উদল। তাঁরা প্রাণপ্রিয় শারদা মাতার পূজায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত সহ্য করতে পারেন না। অন্যের উপস্থিতিতেও বিঘ্ন ঘটে তাঁদের মনঃসংযোগে। নৈবেদ্যে, অর্ঘ্যে শারদা মাতার পূজা সেরে আলো ফোটার আগেই তাঁরা ফিরে যান প্রেতলোকে। নানা সময়ে অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি এই কাহিনি। জোর করে কোন পুরোহিত একবার ওই সময়ে লুকিয়ে ছিলেন মন্দিরের গর্ভগৃহে। সকালে মন্দিরের দ্বার খুলতেই সকলের চোখে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকা পুরোহিতের মৃতদেহ । এরকম ঘটনা মাঝেমাঝেই ঘটেছে। প্রাণ হারিয়েছেন অবিশ্বাসীরা। তাই এখন আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না এই সময়টায় মন্দিরে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, আলহা আর উদল কেন কারও উপস্থিতি সহ্য করতে পারেন না? কেউ বিরক্ত না করলে তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আসলে, এখন কেবল ভক্তিটুকুই এই পৃথিবীর সঙ্গে বেঁধে রেখেছে তাঁদের। কালের প্রকোপে হারিয়ে গিয়েছে তাঁদের সব কিছুই! পড়ে রয়েছে শুধু শারদা মাতার মন্দিরটুকুই! এটাই কেবল তাঁদের একমাত্র জায়গা, যেখানে তাঁরা এক সময়ের অভ্যেসমতো বেঁচে ওঠার আস্বাদ পান!
এবার একটু আলহা আর উদলের গল্প বলি--
52 টি যুদ্ধের মহা নায়ক বীর দুই ভাই আলহা আর উদলের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে সেই কারণে ঐতিহাসিক গণ সেই সময়কে আলহাখন্দের বিশেষ্ মর্যাদা দিয়েছেন। এই বীর যোদ্ধা মহোবা রাজ্যেকে রক্ষা করার জন্যই সর্বদা যুদ্ধ করেছেন এবং সর্বদাই যুদ্ধে জয়লাভ করে নিজ রাজ্যকে বিজয়ী করেছেন এবং সর্বদা সকল প্রকার শত্রুর আক্রমন থাকে মহোবা রাজ্যকে রক্ষা করেছেন । এমন বীর যোদ্ধার বীরত্বের গান আজও গাওয়া হয় মধ্য প্রদেশে। মধ্যপ্রদেশের মানুষ পুরুষের পর পুরুষ এই দুই বীরের বীরত্বের গান গেয়ে চলেছেন।
12ই শতাব্দীতে মহোবা রাজ্যে চন্দেল বংশের শাসক পরবর্তী দেবের শাসন ছিল। এই পরবর্তী দেবের সেনাপতি ছিলেন আলহা আর উদল।আলহা আর উদল জীবনে 52 টি যুদ্ধ করেছিলেন এবং প্রতিটি যুদ্ধেই তাঁরা জয়লাভ করেছিলেন। জীবনের শেষ যুদ্ধ করেছিলেন পৃথীরাজ চৌহানের সাথে। উদল এই যুদ্ধে মারা যান। আর এই যুদ্ধের পরেই আলহা যুদ্ধ থেকে সন্যাস নিয়ে ছিলেন। আলহা আর উদল গোরক্ষ নাথের শিষ্য ছিলেন এবং মা সরদার আশীর্বাদ লাভ করে 12 বৎসর যুদ্ধ জয়ের অমরত্ব লাভ করেছিলেন। মা সরদার একান্ত ভক্ত ছিলেন আলহা আর উদল।
৺মা সারদা, মেহরের ঐতিহাসিক ধার্মিক পবিত্র মা শারদা মন্দির মধ্যপ্রদেশের সতনা জেলার মেহর গ্রামে অবস্থিত। মেহর সড়ক পথ ও রেল পথ উভয় ভাবেই ভালো ভাবে যুক্ত। মায়ের মন্দির সতনা জেলা মুখ্যালয় থেকে 40 কিলোমিটার দূরে ত্রিকুট পর্বতের 600 ফুট উপরে অবস্থিত। মন্দিরের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছতে (1001)একহাজার এক টি সিঁড়ি চড়তে হয়। মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ জেলা কলেক্টরের অধীনে মন্দির সমিতি দ্বারা সম্পন্ন হয়। এই সমিতি সমস্ত ভক্তদের সকল সুবিধা প্রদান করে। ভক্তদের সুবিধার্থে পাহাড়ের উপরে অতি সুন্দর যান-বহন চলার উপযুক্ত পথ তৈরি করেছেন। এছাড়া মন্দির পর্যন্ত পৌঁছবার জন্য বিশেষ *রোপওয়ে ও আছে।
মেহরের নিকট তম এয়ারপোর্ট জব্বলপুর,খজুরাহ, এবং এলাহাবাদ।
এই সকল এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেন বাস, টেক্সি, দ্বারা সহজেই পৌঁছনো যায়।
জব্বলপুর থেকে মেহর মাত্র 150 কিলোমিটার।
খজুরাহ থেকে মেহর 130 কিলোমিটার,
এলাহাবাদ থেকে মেহর 200 কিলোমিটার।
মেহরের নিকট তম রেলস্টেশন মেহর কিন্তু সকল ট্রেন এখানে থামে না।
নবরাত্রিয় সময় সকল ট্রেনই এখানে থামে। কিন্তু নিকট টম বড় স্টেশন বা জংশন হল সতনা ।
এই সতনা থেকে মেহরের দূরত্ব 36 কিলোমিটার। এবং মেহর থেকে কাটনী স্টেশনের দূরত্ব 55 কিলোমিটার।
মেহর জাতীয় সড়ক পথে 7 দ্বারা যুক্ত।
যেপথে বাস সেবা সর্বদা উপলব্ধ।
<----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
=========================
No comments:
Post a Comment