Thursday, March 16, 2023

96>|| ভ্রমণ জয়রামবাটী ও কামারপুকুর |

 


96>|| ভ্রমণ জয়রামবাটী ও কামারপুকুর ||
                   <---আদ্যনাথ--->

বাংলার দর্শনীয় অতি পবিত্র স্থান দুটি, কামারপুকুর ও জয়রামবাটি ।

কামারপুকুর গ্রামটি হুগলী জেলার আরামবাগ সাব ডিভিশনের গোঘাটের ২নং ব্লকে অবস্থিত। ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবের জণ্মস্থান হিসাবে বিখ্যাত।  

এবং জয়রামবাটী হল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত বিষ্ণুপুর মহকুমার কোতুলপুর থানার একটি গ্রাম।জয়রামবাটি স্থানটি বিশেষ ঐতিহ্যমণ্ডিত, কারণ এটি শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর জন্মস্থান।

জয়রামবাটী ও কামারপুকুর দুই জায়গাতেই খুব সহজেই পৌঁছনো যায়:;--
কলকাতা থেকে সরক পথে প্রথমে পড়ে কামারপুকুর  দূরত্ব একশ' কিলোমিটারের মতো । পৌছোঁতে দুই কি আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। জয়রামবাটি বা কামারপুকুরে কোনও রেলওয়ে স্টেশন নেই। তারকেশ্বর রেলওয়ে স্টেশনই এর নিকটবর্তী রেলওয়ে স্টেশন। তারকেশ্বর স্টেশন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার কামার পুকুর। আর কামার পুকুর থেকে জয়রামবাটির দূরত্ব ৭.৩ কিলোমিটার।

তারকেশ্বর থেকে বাস অথবা ট্যাক্সি করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় জয়রামবাটি ও কামারপুকুর। এছাড়াও, বাস পরিষেবা রয়েছে। ধর্মতলা থেকে  কামারপুকুরের বাস পাওয়া যায়।
জয়রামবাটী ও কামারপুকুর দু’টি স্থানের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও, এই দু’টি জায়গাই রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের অন্তর্গত।

Dunlop Express way SBSTC counter এতে টিকিট পাওয়া যায় Bishnupur, joyrambati, kamarpukur যাবার বাস পাওয়া যায়। বাসের টাইম সকাল 7.30 মিনিট । 

গুমটির ফোন নম্বর 7044093183 আমর দা।      SBSTC counter .




      ||  জয়রামবাটি মাতৃ মন্দির  ||
                   <----আদ্যনাথ--->

গ্রাম-তীর্থ-জয়রামবাটী,
পবিত্রতায় সোনার থেকেও খাঁটি।
আমরা আজ সকাল 10.30 মিনিটে পৌঁছে গেছি পুণ্যভূমি জয়রামবাটিতে।
মঠের ভেতরে অফিসে গিয়ে মহারাজকে আমাদের পরিচয় দিয়ে আগে থেকে গেস্ট হাউজ বুক করার মেল ও মেসেজ দেখাতেই মহারাজ আমাদের জন্য এলট করা ঘরটি দেখিতে দিয়ে ঘরের চাবি আমাকে দিলেন।

শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর (বাংলা ১২৬০ সনের ৮ পৌষ, হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, অগ্রহায়ণ কৃষ্ণা সপ্তমী তিথি ) পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার কোতলপুর থানার অধীনে  প্রত্যন্ত এক গ্রাম জয়রামবাটীর এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে সারদা দেবীর জন্ম হয়।
পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮১০ - ১৮৭৪) ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী।   
পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে জয়রামবাটীর অবস্থান স্থানাঙ্ক: ২২.৯২৩° উত্তর ৮৭.৬১° পূর্ব।

সারদা দেবীর পিতৃকূল পুরুষানুক্রমে রামের উপাসক ছিলেন।
সারদা দেবী ছিলেন তাদের জ্যেষ্ঠা কন্যা তথা প্রথম সন্তান। জন্মের পর প্রথমে সারদা দেবীর নাম রাখা হয়েছিল "ক্ষেমঙ্করী"। রাশি অনুসারে নাম রাখা হয়েছিল "ঠাকুরমণি"। পরে "ক্ষেমঙ্করী" নামটি পালটে "সারদামণি" রাখা হয়। শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দু ধর্মগুরু শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের পত্নী ও সাধনসঙ্গিনী এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সংঘজননী। ভক্তগণ তাকে শ্রীশ্রীমা নামে অভিহিত করে থাকেন। রামকৃষ্ণ আন্দোলনের বিকাশ ও প্রসারে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের অনুগামীদের কাছে জয়রামবাটি গ্রামটি  একটি তীর্থস্থানের মর্যাদা পায়। জয়রামবাটি বাঙালির কাছে এক অতি পরিচিত পবিত্র দর্শনীয় স্থান। গ্রামটি রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের  জন্মস্থান কামারপুকুর গ্রাম থেকে ৭.৩ কিলোমিটার পশ্চিমে। বিষ্ণুপুর থেকে ২৭ মাইল ও আরামবাগ শহর থেকে  ১২ মাইল দূরে অবস্থিত। এবং এই গ্রাম থেকে আধ মাইল দূরে অবস্থিত আমোদর নদ। জয়রামবাটী  সম্পুর্ন রূপে কৃষিভিত্তিক একটি গ্রাম। এই পবিত্র স্থানটি আমাদের ধর্ম, কর্ম এবং মোক্ষের পথ দেখায়। ভগবান শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের  আধ্যাত্মিক সঙ্গী শ্রীশ্রী সারদা দেবী আন্তরিক, বাহ্যিক, তথা সর্ব প্রকারে আধুনিক যুগের একজন সত্যিকারের গুরুমাতা। শ্রীশ্রীঠাকুর ৩৪ বছর বেঁচে ছিলেন পবিত্র মায়ের সংস্পর্শে। শ্রীশ্রীঠাকুরের সমস্ত শিষ্যের মা ও গুরুর জন্মস্থান এবং চিরন্তন শান্তি ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য মানুষের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে এই জয়রামবাটির মাতৃমন্দির।

জয়রামবাটি  মঠের খোলা ও বন্ধের সময় নিম্নরূপ -
এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ঃ---
ভোর ৫:৩০ থেকে বেলা ১১:৩০ পর্যন্ত্য------বিকেল ৪ টে থেকে রাত ৮:৩০ পর্যন্ত্য ।

অক্টোবর থেকে মার্চ ঃ---
সকাল ৬ টা থেকে বেলা ১১:৩০ পর্যন্ত্য -------বিকেল ৩:৩০ থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত্য ।

মন্দিরের পূজা ও ভোগ প্রসাদ পাবার  সময় সূচি:---
মঙ্গল আরতি= ভোর ৪ টা.
টিফিন= সকাল ৬:৩০ মিনিট.
প্রসাদ= দুপুর ১১:৩০ মিনিট.
চা-------=বিকেল ৩:৩০ মিনিট.  
সন্ধাআরতি--------   -------
প্রসাদ= রাত্রি ৮:৩০ মিনিট.

** বিঃ দ্রঃ ---মঠের ভিতরে ফোটো তোলা সম্পুর্ন রূপে নিষেধ, সেটা বিভিন্ন জায়গায় সাইবোর্ডে লেখা আছে আর সেই সঙ্গে মন্দিরের নিরাপত্তারক্ষীরা সেই বিষয়ে কড়া নজর রাখে ।

স্বামী বিবেকানন্দের চোখে মা সারদা ছিলেন ‘জ্যান্ত দুর্গা। ১৯২০ সালে ২০ জুলাই জগজ্জননী মা সারদার মহাপ্রয়াণের পর ১৯২৩ সালে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ স্বামী সারদানন্দজীর উদ্যোগে সারদা দেবীর দুটি বাড়িকেই অক্ষত রেখে জয়রামবাটিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় মিশন
'মাতৃ মন্দির'  সেই  ‘মাতৃমন্দিরে’র উদ্যোগেই ১৯২৫ সালে প্রথম ঘট পেতে দুর্গা পুজা শুরু হয় জয়রামবাটিতে। পরে ১৯৩২ সালে প্রতিমা তৈরী করে পুজো শুরু হয়। তখন থেকে সেই প্রথা আজও চলে আসছে।
জয়রামবাটীতে আগে দুর্গাপুজা হত না। জগদ্ধাত্রী পুজো হতো বহু কাল আগে থেকে। জানা গিয়েছে, মা সারদা দেবীর মা শ্যামা সুন্দরী দেবী শুরু করেছিলেন জগদ্ধাত্রী পুজো। সেই থেকে ধুমধাম করে আজও মহাসমারোহে জগদ্ধাত্রী পুজো পালিত হয়।
জয়রামবাটি ‘মাতৃ মন্দিরে’র দুর্গা পূজার মূল আকর্ষণ মহাষ্টমীর দিন কুমারী পূজা। মা সারদার পবিত্র জন্মভূমিতে বছরভর দেশ বিদেশের পূণ্যার্থীদের ভীড় লেগেই থাকে। তবে পুজোর দিনগুলোতে সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। জয়রামবাটি মাতৃমন্দির সূত্রে জানানো হয়েছে, এখানে বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে মন্ত্র, বিধি ও তিথি মেনে দুর্গা পূজা হয়। অষ্টমীর দিন কুমারী পুজো দেখতে হাজার হাজার দর্শক মাতৃমন্দিরে আসেন। আড়ম্বর নয় মা সারদার জন্ম ভিটের দুর্গা পুজোর মূল বিষয়বস্তু ভাব, ভক্তি, শ্রদ্ধা আর পরম নিষ্ঠা। এই সব কিছুকে বজায় রেখে বছরের পর বছর ধরে দুর্গা পুজো হয়ে আসছে এই মাতৃ মন্দিরে।
তাইতো বলি জয়রামবাটির মাটি,
চির পবিত্র অমৃতসমান খাঁটি।

১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে ফলহারিনী কালীপূজার রাতে সারদামণিকে কালীজ্ঞানে শ্রীশ্রী ঠাকুর  পূজো করেছিলেন । আর এখানেই শ্রীসারদামায়ের জীবনে চরম ও পরম সার্থকতা ।  সারদা দেবী ও দিব্য মাতৃকাকে অভিন্ন জ্ঞান করে শ্রীরামকৃষ্ণ ষোড়শী পূজার আয়োজন করেন। কালীর আসনে বসিয়ে পুষ্প ও উপাচার দিয়ে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব  পূজা করেন তাঁকে। অন্য সকল নারীর মতো সারদা দেবীকেও তিনি দেবীর অবতার বলে মনে করতেন। এই কারণে তাদের বৈবাহিক জীবনও ছিল এক শুদ্ধ আধ্যাত্মিক সঙ্গত।
স্বামী সারদানন্দের মতে, তাদের বিবাহ হয়েছিল বিশ্বে আদর্শ দাম্পত্য সম্পর্কের এক নজির স্থাপনের উদ্দেশ্যেই।
গেস্টরুমের চাবি নিয়ে আমি আর সবিতা রুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় চেঞ্জ করে একটু বিশ্রাম করে খাবার ঘরে দিকে এগিয়ে গেলাম।
দুপুরের ভোগ প্রসাদ পাবার জন্য

ভোগ প্রসাদ:--

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর— উভয় জায়গাতেই সকালে, দুপুরে ও রাতে ঠাকুরের ভোগ প্রসাদ পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সকল পূর্ণার্থীর উদ্দেশ্যেই এই  ভোগ বিতরণ করা হয়। তবে যারা মঠের বাইরে থেকে শুদু ভোগ প্রসাদ পাওয়ার জন্য আসেন তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভোগের কুপন কাটতে হয়।
(ভোগের কুপন নেওয়ার জন্য
ঠাকুর সেবার নিমিত্তে সামান্য কিছু আর্থিক সহযোগিতা অবশ্যই উচিত।)
মিশনের গেস্টহাউজে থাকলে কোন কুপন কাটতে হয়না। তবে কিছু দান তো করা উচিত। অন্তত নিত্য পূজার নিমিত্বে কিছু দান তো দেওয়া একান্ত উচিত।
তবে সেই আর্থিক সহায়তা দিতে হয়  গেস্টহাউজ ছেড়ে যাবার দিন।
চেকে বা ক্যাশে। আর তার পরিবর্তে পাওয়াজায়  ইনকামটাস্ক ফ্রির রশিদ।

ঘড়িতে তখন 11.30 মিনিট। আমরা প্রসাদ নেওয়ার জন্য খাবার ঘরে এসে পৌঁছলাম।   খাবার ঘরটিতে ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম কি বিশাল ঘর আর
খাবার জন্য বসার ব্যবস্থা সম্পুর্ন পালটে গেছে।
আগে দুই একবার এসে ছিলাম তখন এই ঘরেই মাটিতে আসন বিছিয়ে বসতে হতো।
কিন্তু আজ দেখলাম খাবারের জায়গা সম্পূর্ন পাল্টে গেছে। সারি সারি স্টিলের বেঞ্চ ও স্টিলের টেবিল।
আজকাল আর শাল পাতায় খাবার খাওয়া নয়, এখন স্টিলের থালা স্টিলের গ্লাস।
খাবার পরিবেশন করার জন্যও নুতন ব্যবস্থা। বড় বড় ড্যাগ গুলি চাকাওয়ালা ঠেলা গাড়িতে বসিয়ে সুন্দর ভাবে পরিবেশনের ব্যবস্থা।
মনে হল হাজার খানিক লোক একসাথে বসে এখানে প্রসাদ গ্রহণ করতে  পারবে।
           
যাইহোক, আমরা হাত-মুখ ধুয়ে একটা বেঞ্চে এসে বসলাম প্রসাদ পাবার জন্য। প্রথমেই গরম গরম ভাত, তার সাথে একে একে পাঁচ-মিশালী তরকারি, আলু সয়াবিনের তরকারি,ডাল, চাটনি, মিষ্টি ,এবং সবশেষে পায়েস পরিবেশন করা হল।  সবকটা রান্নাই স্বাদে অতুলনীয়।  খিদের মুখে এরকম গরম গরম সুন্দর খাবার পেয়ে আমরাও পেট ভরে খেয়ে নিলাম।
খাওযার পরে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য আমরা আমাদের রুমে গেলাম। সেখানে আমরা তিনটে পর্যন্ত বিশ্রাম  নিলাম। বিশ্রামের পর আমরা মঠের ভেতরে একটু ঘোড়া ঘুড়ি করে একটু আনন্দ উপভোগ করলাম।
এর পরে বিকেলে চা বিস্কুট খেয়ে আশেপাশে একটু ঘোড়া ঘুরিকরে দেখলাম।
সন্ধ্যায় সন্ধ্যা আরতিতে যোগদিয়ে এক ঐশ্বরিক আনন্দ উপভোগ করলাম।
এরপরে বেশ কিছুক্ষণ মন্দিরে বসে ঠাকুরের গান শুনে ও একটু নিরালায় চুপ করে বসে কায়িয়ে দিলাম বেশ কিছু সময়
তারপরে রাত্রি 8.30 মিনিটে রাত্রের প্রসাদের লাইন।
প্রসাদ খেয়ে রুমে গিয়ে বিশ্রাম।
পরের দিন সকালে উঠে  সকালের জল খাবার মুড়ি ও আলুর তরকারি  খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পুণ্যভূমি জয়রামবাটির আসে পাশের মন্দিরগুলো দেখার জন্য।

১৮৫৯ সালের মে মাসে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের  সাথে শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর  বিবাহ হয়।
শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভক্তদের কাছে তাই এই গ্রামটিও একটি অতি পবিত্র তীর্থক্ষেত্ররূপে পরিগণিত হয়েছে।  শ্রীশ্রী সারদাদেবীর বাসভনটি (বর্তমানে মাতৃ মন্দির) রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের অধীনে ও রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের দ্বারাই
পরিচালিত।
★জয়রামবাটির দ্রষ্টব্য স্থান :::--

★1>শ্রী শ্রী মাতৃমন্দির :::-
★2>মায়ের পুরোনো বাড়ি  ::---:
★3>মায়ের নতুন বাড়ি ::: : --
★4>পুন্যিপুকুর ::::----
★5>ধর্মঠাকুরের মন্দির :::---
★6>সিংহবাহিনী মন্দির ::::---
★7>. আমোদার ঘাট:::------
★8> শিহড়:::---

★1>শ্রী শ্রী মাতৃমন্দির:--

মাতৃ মন্দির এখানকার একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। এখানেও প্রতিবছর বহু ভক্ত সমাগম হয়। এটি জয়রামবাটি মঠ নামেও পরিচিত।
স্বামী সরদানন্দ ১৯ এপ্রিল, ১৯৩৩-এর অক্ষয়া-তৃতীয়ার পবিত্র দিনে পবিত্র মাকে এই মন্দির উত্সর্গ করেছিলেন এবং মন্দিরটি তাঁর ঠিক জন্মস্থানে নির্মিত হয়েছিল এই মন্দিরটি মঠের কেন্দ্রস্থলে তৈরী করা হয়েছে।  মন্দিরটিতে ১৯৫৪ সালে  সারদা মায়ের একটি শ্বেতপাথরের মূর্তি বসানো হয়েছে তাঁর জন্মশতবর্ষপূর্তির সময়। তার আগে একটা তৈলচিত্র ছিল। এই তৈলচিত্রকেই তখন পূজা করা হত। বর্তমানে ওই তৈলচিত্রটি বেলুড় মঠে  রামকৃষ্ণ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত করা আছে। বর্তমানের শ্বেত পাথরের মূর্তিটির তলায় শ্রীশ্রীমার দেহাবশেষ রাখা আছে। মন্দিরটির সামনে একটা বিরাট প্রার্থনা কক্ষ আছে। যেখানে বসে সবাই প্রার্থনা বা ধ্যান করতে পারে। মন্দিরটির ওপরে অর্থাৎ চূঁড়ায় "মা"  শব্দটি  রয়েছে ও  একটা পতাকা সবসময় উড়ছে ।

. শ্রী শ্রী মাতৃ মন্দির
‘ধ্যান মুদ্রা’ পবিত্র মায়ের এক সজীব মার্বেল ভাস্কর্যটি এই সুন্দর মন্দিরে অবস্থিত।
শ্রীশ্রী মা এর পিতা, শ্রী রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এখানে তাঁর আসল বাড়ি ছিল এবং এই স্থানে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব এবং শ্রী শ্রী মা এর মধ্যে ঐশ্বরিক বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পবিত্র ‘মা’-কে যথাযথ ‘ভোগ’ ও আচার-অনুষ্ঠান দিয়ে প্রতিদিন উপাসনা করা হয়।

★2>মায়ের পুরোনো বাড়ি  ::---:

মঠের প্রবেশদ্বারের বাঁদিকে এই বাড়িটি রয়েছে। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত মা  সারদা দেবী এই  বাড়িতেই বসবাস করতেন।  এই বাড়িতে তিনি তাঁর ভক্তদের দীক্ষা দিতেন।

২. পুরাতন-বাড়ি  এবং নূতন-বাড়ি
মা সারদা ১৮৬৩ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত পুরাতন বাড়ীতে  বাস করতেন। পবিত্র মায়ের কাছ থেকে বহু আকাঙ্ক্ষী এই বাসস্থানটিতে ব্রহ্মচার্য, দীক্ষা ও সন্ন্যাস লাভ করেছিলেন। মা এখানে জগদ্ধাত্রীর দেবী পূজা শুরু করেছিলেন। স্বামী সরদানন্দ ‘পুণ্য পুকুর’ এর পশ্চিম দিকে একটি জমি বেছে নিয়েছিলেন, ‘পুণ্য পুকুর’, মা সারদার নিয়মিত ব্যবহারের করতেন। নূতন-বাড়ি নামে পরিচিত একটি পৃথক বাড়ি ১৯১৫-১৬ সালে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ভক্ত এবং পবিত্র মাকে আরও ভাল ভাবে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য নির্মিত হয়েছিল।

পুরনো বাড়ি - মাতৃমন্দিরের মূল ফটক থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে পড়ে সারদা মায়ের পুরনো বাড়ি । এখানে ১৯১৫ সালের আগে পর্যন্ত্য তিনি থাকতেন । নতুন বাড়ির মতো এখানেও খড়ের চাল দিয়ে ঢাকা কয়েকটা মাটির বাড়ি রয়েছে ।

★3>মায়ের নতুন বাড়ি ::: : --

এই নতুন বাড়ীটিও মঠের মধ্যে অবস্থিত। প্রবেশদ্বারের পাশে একটা ছোট গেট দিয়ে এই বাড়ীতে প্রবেশ করতে হয়।  এই বাড়ীতেই  সারদাদেবী  ১৯১৫ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বসবাস করতেন। এই বাড়ীতেও  তিনি অনেক ভক্তদের দীক্ষা দিয়েছিলেন।

নতুন বাড়ি - মাতৃমন্দিরের বাঁদিক দিয়ে কিছুটা হেঁটে গেলে একটা পাঁচিল ঘেরা জায়গার ভিতরে সারদা মায়ের নতুন বাড়ি । ১৯১৫ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত্য তিনি এখানে থাকতেন । রামকৃষ্ণের বাড়ির মতো এখানেও কয়েকটা খড়ের চাল দিয়ে ঢাকা মাটির কুঁড়েঘর আর একটা উঠোন রয়েছে ।

★4>পুন্যিপুকুর ::::----

মাতৃমন্দিরের ঠিক উল্টোদিকে এই পুকুরটি আছে। সারদাদেবী এই পুকুরটি ব্যবহার করতেন।  তাই ভক্তদের কাছে পুকুরটি খুবই পবিত্র।

পুন্যিপুকুর - মাতৃমন্দিরের ঠিক সামনেই পুন্যিপুকুর । সারদা মা এই পুকুর ব্যবহার করতেন । পুকুরটা বিশাল বড়, এবং চারদিক রেলিং দিয়ে ঘেরা ।

★5>ধর্মঠাকুরের মন্দির :::---

পুন্যিপুকুরের পাশেই এই মন্দিরটি আছে। মন্দিরটি সারদা মায়ের পরিবারের গৃহদেবতা  সূর্যনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির। এখানে নিয়মিত তাঁর পুজো করা হয়।  

★6>সিংহবাহিনী মন্দির ::::---

মঠের কাছেই এই মন্দিরটি অবস্থিত।  সিংহবাহিনী হল মা দুর্গার একটি রূপ এবং এটি  জয়রামবাটি গ্রামের দেবতা। মন্দিরটিতে সিংহবাহিনী, মহামায়া, চন্ডী  ও মনসার ধাতব মুখ রয়েছে, তবে কোনো সম্পূর্ণ মূর্তি নেই। সারদা দেবী বহুবার এই মন্দিরে পুজো দিয়েছিলেন। এখানকার লোকেরা এই মন্দিরের মাটিকে খুব পবিত্র হিসেবে ধরে এবং তারা এই মাটিকে ঔষধ হিসাবেও ব্যবহার করে থাকে।
শ্রী শ্রী সিংহবাহিনী মন্দির
পবিত্র মা, মা সিংহবাহিনীর পূজা করেছিলেন।শ্রী শ্রী মায়ের মতে দেবী এবং তাঁর দুই সঙ্গী, শ্রী মহামায়া এবং চন্ডী ভীষণ জাগ্রত। এই মন্দিরে আধ্যাত্মিক সংবেদন ও  ঐতিহাসিক তরঙ্গ অনুভব করতে পারেন।

★7>. আমোদার ঘাট ::---

আমোদার ঘাট এবং মায়ের ঘাট
আমোদর, পবিত্র প্রশাখা নদী। এই নদীতেই পবিত্র মা, গোলাপ মা, যোগিন মা এবং অন্যান্য মহিলা ভক্তদের সাথে স্নানের জন্য আসতেন। মা, পবিত্র আমোদরকে গঙ্গা বলে সম্বোধন করেছিলেন এবং চন্ডী পাঠ , গীতা পাঠ ও ধ্যানের ক্ষেত্রেও তীরে বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতেন। বর্তমানে শ্রী শ্রী মা স্নান করতেন এমন এক জায়গায় স্নানঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। মায়ের ঘাট হল মন্দিরের কাছে একটি বাস স্টপ এবং এটি ‘মায়ের দিঘির’ তীরে অবস্থিত যেখানে মা তার বাল্যকালে ঘাস কাটতে আসতেন।

★8> শিহড়:::---

জয়রামবাটি থেকে শিহড় গ্রাম তিন কিলোমিটার দূরে। শ্রী শ্রী ঠাকুরের প্রিয় ভাতিজা শ্রী হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায় এখানে থাকতেন এবং শ্রী রামকৃষ্ণ রচিত শ্রী চন্ডীর একটি পাণ্ডুলিপি এখনও অবধি এখানে সংরক্ষিত আছে।

★9>কোয়ালপাড়া:::--

জয়রামবাটীর যেদিকে কামারপুকুর তার বিপরীত দিকে আরও ৭.৫ কিলোমিটার গেলে পড়ে কোয়ালপাড়া আশ্রম । জয়রামবাটী থেকে আমরা রওনা দিলাম এই আশ্রমের উদ্দেশ্যে
কলকাতা যাতায়াতের সময়ে এখানে সারদা দেবী বিশ্রাম করতেন । পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে এই আশ্রম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে । এখানে একটা সাইনবোর্ড থেকে জানতে পারলাম যে স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে এই আশ্রম বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে । এই আশ্রমে সারদা মায়ের উদ্যোগ চরকা কেটে কাপড় বোনার কাজ শুরু হয় ।

আশ্রম থেকে বেরোনোর সময়ে দেখলাম এখানে একটা আমগাছ আছে, যেটা সারদা মায়ের আম খেয়ে ফেলে দেওয়া আঁটি থেকে তৈরি হয়েছে ।

শ্রীশ্রী মা সারদা-মা  সকলের 'মা' –
   একটু সত্য কথা গল্পে বলি---
     ___________________
একবার শ্যামাসুন্দরীদেবী তাঁর বড় কন্যা সারদার সাথে দক্ষিণেশ্বরে  এবং কামারপুকুরে গেছিলেন। কারণ ঠাকুরের অস্বাভাবিক অবস্থা কথা শুনে 'ক্ষ্যাপা জামাইয়ের' জন্য মনে কষ্ট পেতেন।
সেই কারনে  'ক্ষ্যাপা জামাইকে' চাক্ষুষ
দেখার ইচ্ছায় গিয়ে ছিলেন ।
তিনি তাঁর 'ক্ষ্যাপা জামাইয়ের' জন্য মনে মনে কষ্ট পেতেন, আর মা সরদার দুঃখময় জীবনের কথা চিন্তা করে প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। জামাই গদাধর একদিন জয়রামবাটীর শ্বশুরালয়ে অবস্থান কালে বাড়ির উঠানের একপাশে সজনে গাছের তলায় বসে আপনমনে গান গাইছিলেন,শ্যামাসুন্দরীদেবী 'ক্ষ্যাপা জামাইর' গান শুনছিলেন---
'ক্ষ্যাপা জামাই' গাইছিলেন―---
       'যার নাকেতে নাক ফুল,
           দু হাত মাপা চুল
তার সঙ্গে পাতাব আমি সজনাফুল।
           বড় সাধ আছে মনে,
সজনা ফুল পাতাব শাউড়ী তোর সনে'।।
গান শুনে শ্যামাসুন্দরীদেবী ভাবছিলেন
"এমন পাগল জামাইয়ের হাতে সারদাকে সঁপে দিলুম যে, ঘর-সংসার সুখভোগ তার কোন দিনও হোলোনি। কাকে নিয়ে হবে ? সে পাগল তো দিনরাত নিজের ভাবেতেই মত্ত হয়ে আছে। আমার মেয়ের সুখশান্তির কথা ভাববার অবসার কোথায় ? এত দুঃখও ছিল মেয়েটির কপালে!"

বিয়ের পর কন্যার সন্তানাদি না হওয়ায় শ্যামাসুন্দরীদেবী দুঃখ করতেন। ঠাকুর একদিন সেই কথা শুনে বললেন, তাঁর কন্যার এত সন্তানাদি হবে যে 'মা'-ডাক শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পড়বে। পরে কিন্তু জগজ্জননীরূপে সারদা-মা ভক্ত সন্তানদের 'মা' 'মা' ডাক শুনে বিহ্বল হয়ে পড়তেন।

ঠাকুরের সাথে মা-সারদার যেদিন বিয়ে হল, সেদিন রাতে বাসর-ঘরে সকলের অনুরোধে ঠাকুর গান গাইলেন, কিন্তু সেই গান ছিল 'শ্যামাসঙ্গীত'। তাঁর সুমধুর কণ্ঠের গান শুনে শাশুড়ি-মা আর স্থির থাকতে পারেননি। রান্নাঘরের সব কাজ ফেলে জামাইয়ের গান শুনতে বাসর-ঘরে উপস্থিত হয়েছিলেন।

দুঃখ করে মাঝে মাঝে শ্যামাসুন্দরীদেবী বলতেন– মানুষ 'মেয়ে-জামাই' নিয়ে কত আমোদ-আহ্লাদ করে, ভাল ভাল খেতে পরতে দেয়। "আমার ভাগ্যে তা আর হোলোনি।"

মা-জননীর মুখে এসব কথা বার বার শুনে সারদা-মা একদিন উগ্রমূর্তি ধরে তাঁকে বললেন– "দ্যাখো, বার-বার আমার কাছে তুমি 'পাগল' 'পাগল' কোরোনি বলে দিচ্ছি। 'একবার পতিনিন্দায় দেহ ছেড়েছি... আবার কি তুমি তাই দেখতে চাও" ? সারদা-মায়ের এই উত্তরে শ্যামাসুন্দরীদেবী অবাক হয়ে গেলেন। এরপর থেকে তিনি আর কোনদিনও তাঁর কন্যার সামনে জামাইয়ের নিন্দা করেননি।
       ( গল্পটি সংগৃহিত )
===========================
    <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
==========●●●●=============
■■■■■■■■■■■■■■■■■■■

   || কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠ ||
                 <----আদ্যনাথ--->
জয়রামবাটিতে তিন রাত্রি তিন দিন থেকে     মনে এক অদ্ভুর শান্তি ও আনন্দ উপভোগ করে চতুর্থ দিন আরও কিছু পাবার লোভে একটি টো টো ভাড়া করে কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ::-- মঠের মেইন গেট দিয়ে ঢুকে ভিতরে ঢোকার সময়ে একটা আমগাছ দেখা যায়, যেটা  ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের লাগানো । সেই কারণে সকল ভক্তমানুষের কাছে এই গাছটি একটি ধর্মীয় জিনিস, সেই কারণে সকলেই চায় গাছে একটু হাত দিয়ে ছুঁয়ে প্রণাম করতে।
মঠ কর্তৃপক্ষ তাই গাছের চারি পাশে একটা লোহার জাল লাগিয়ে দিয়েছে যাতে করে কেউ গাছে হাত দিতে না পারে।

মঠের ভিতরে দ্বিতীয় দ্রষ্টব্য হল শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মন্দির বা মঠ । এই মঠটির উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। এর ভিতরেই ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরম হংস দেবের একটি মূর্তি রয়েছে, এই মূর্তিটির পরিকল্পনা করে ছিলেন নন্দলাল বসু। এই জায়গাতেই শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব জন্মেগ্রহণ করেছিলেন।
কামারপুকুরের খ্যাতি শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্ম ভূমি ও বাসভূমি হিসাবে।
সারা বছরই এই স্থান দর্শনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পূর্ণার্থী আসেন। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পূর্বাশ্রমের নাম গদাধর চট্টোপাধ্যায় জন্ম
হুগলি জেলার কামারপুর গ্রামে,
১৮ই ফেব্রুয়ারি,১৮৩৬, পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়, মা চন্দ্রমণি দেবী, ভাই রামকুমার, স্ত্রী শ্রী শ্রী সারদামনি,
ঠাকুর ১৬ আগস্ট, ১৮৮৬ ইলোক ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন। কাশীপুর উদ্যান বাটিতে। ঠাকুর ৫০ বৎসর বয়সে মহাসমাধি লাভ করেন।

কামার পুকুরের এই মন্দিরের সঙ্গে লাগোয়া শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ প্ৰমহংসদেবের বাড়ি । আগেকার দিনে গ্রামবাংলায় যেরকম বাড়ি দেখা যেত, একেবারে সেই রকমের বাড়ি । খড়ের চাল দিয়ে ঢাকা মাটির কুঁড়েঘর । এইরকম কয়েকটা কুঁড়েঘর আর মাঝখানে উঠোন নিয়ে ছিল রামকৃষ্ণদেবের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি । এখানে রামকৃষ্ণের ঘর আর ওনার দাদার ঘর ছাড়াও দেখা যায় ওনাদের গৃহদেবতা রঘুবীরের
মন্দির।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঘরটাকে বর্তমানে বইপত্র রাখার কাজে হিসাবে ব্যবহার করা হয় আর ভিতরে সাধারণ দর্শনার্থীদের
প্রবেশ নিষেধ।
এ ছাড়া মঠের ভিতরে আছে অফিস ঘর
বা মঠকার্যালয়।
আর আছে যুগি শিবের মন্দির । যুগিবংশীয় রামানন্দ যুগি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । এর বৈশিষ্ট্য হল শ্রীরামকৃষ্ণ জন্মানোর আগে নাকি ওনার মা চন্দ্রামণি দেবী এই শিবের থেকে স্বপ্ন পেয়ে ছিলেন।

কামারপুকুর  মঠের খোলাবন্ধের সময় নিম্নরূপ -
এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ঃ--
ভোর ৫:৩০ থেকে বেলা ১১:৩০ পর্যন্ত্য ও বিকেল ৪ টে থেকে রাত ৮:৩০ পর্যন্ত্য ।
অক্টোবর থেকে মার্চ ঃ---
সকাল ৬ টা থেকে বেলা ১১:৩০ পর্যন্ত্য ও বিকেল ৩:৩০ থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত্য ।
এখানে ভিতরে ফোটো তোলা বারণ, সেটা বিভিন্ন জায়গায় লেখা আছে আর সেইসঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীরা সেই বিষয়ে কড়া নজর রাখে ।

আমরা সকাল ৯টায় কামারপুকুর  মঠে পৌঁছে প্রথমেই গেলাম মঠের অফিসে।
মহারাজকে অনুরোধ করে এক রাত্রি থাকার জন্য অতিথি শালায় একটি ঘর পেলাম।
ঘরে ব্যাগ রেখে মন্দির ও মঠ ঘুরেদেখে
ঠাকুরের মন্দিরে একটু বসে একটু ধ্যান জপ করে মনে এক অসীম আনন্দ উপভোগ করলাম।
তার পরে প্রসাদ পাবার জন্য ১১:৩০ মিনিটের লাইনে দাঁড়ালাম।
এখানেও সেই এক রকমের ব্যবস্থা।
সারি সারি স্টিলের বেঞ্চ ও স্টিলের টেবিল। স্টিলের থালা স্টিলের গ্লাস।
খাবার পরিবেশন করার জন্যও একই রকমের ব্যবস্থা বড় বড় ড্যাগ গুলি চাকাওয়ালা ঠেলা গাড়িতে বসিয়ে সুন্দর ভাবে পরিবেশনের ব্যবস্থা।
মনে হল হাজার খানিক লোক একসাথে বসে এখানে প্রসাদ গ্রহণ করতে  পারবে।
           
যাইহোক, আমরা হাত-মুখ ধুয়ে একটা বেঞ্চে এসে বসলাম প্রসাদ পাবার জন্য। প্রথমেই গরম গরম ভাত, শুক্তো,ডাল, দুই রকমের তরকারি,  চাটনি, মিষ্টি ,এবং সবশেষে পায়েস পরিবেশন করা হল।  সবকটা রান্নাই স্বাদে অতুলনীয়। 
এর পরে আমরা একটা টোটো ভাড়া করে
বেরিয়ে পড়লাম আসে পাশের দর্শনীয় স্থান গুলি দেখতে।

১৯৫১ সালে রামকৃষ্ণ মঠের সন্ন্যাসীরা এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্যরা একত্রিত হয়ে কমার পুকুরে ‘রামকৃষ্ণ মঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই রামকৃষ্ণ মঠ পরিদর্শনে সারা পৃথিবী থেকে প্রায় হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন।

উনিশ শতক ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায়। এই সময় কালই আমাদের পরাধীনতার  নাগপাশ থেকে মুক্তি দিয়েছিল।  এই সময়ে বাংলার ধর্ম, সাহিত্য এবং শিল্পকলায় যথেষ্ট প্রভাবিত
হয়েছিল।
এহেন মহা স্বরনীয় সময় অর্থাৎ ১৮৩৬ সালের ১৮ই ফ্রেব্রুয়ারী হুগলী  জেলার আরামবাগ মহকুমার গোঘাট থানার অন্তর্গত ছোট্ট  গ্রাম সুখলালগঞ্জে
(সুখলালগঞ্জই বর্তমানের  কামারপুকুর)
ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের এবং  চন্দ্রমণি দেবীর চতুর্থ ও শেষ  সন্তান , বালক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন, তার নামকরণ করাহয়েছিল গদাধর।
কামারপুকুর একটি ছোট্ট  গ্রাম হলেও
প্রাচীন গ্রন্থে কামারপুকুর নামে কোন গ্রামের কোনো নাম পাওয়া যায় না।

হুগলী  জেলার উত্তর পশ্চিমাংশে যেখানে বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলা মিশেছে, ঠিক সেই জায়গাতেই কামারপুকুর গ্রামটি অবস্থিত। শ্রী রামকৃষ্ণের স্মৃতি শ্রীপুর, মুকুন্দপুর ও কামারপুকুর পাশাপাশি অবস্থিত এই তিনটি গ্রামেই বিস্তৃত আছে। এই তিনটি গ্রামই ঠাকুরের বাল্য লীলাক্ষেত্র ছিল।  এই  গ্রাম তিনটিকে একত্রে বৃহৎ কামারপুকুর হিসেবে বর্তমানে ধরা হয়।

এইসব গ্রামের অধিবাসীরা বরাবরই খুব ধার্মিক প্রকৃতির । সেই প্রাচীনকাল থেকেই  প্রায় প্রতিটি ঘরেই নানান দেব-দেবীর পূজার্চনা করার রীতি রেওয়াজ ছিল আজও আছে। শ্রী রামকৃষ্ণদেবের পিতা শ্রী ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় তাঁদের পৈতৃক ভিটা থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর এই কামারপুকুরে এসে বসবাস শুরু করেন। ক্ষুদিরামের পরিবার বরাবরই শ্রী রামচন্দ্রের উপাসক ছিলেন। এই গ্রামটি ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণের জন্মস্থান বলে তাঁর অনুরাগীদের কাছে খুবই পবিত্র স্থান। আজ সারা পৃথিবীর মানুষই এই গ্রামটির সাথে পরিচিত।

শ্রী শ্রী সারদা মায়ের জীবদ্দশাতেই কামারপুকুরে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাঁর জন্মভিটায় একটা স্মৃতি মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। রামকৃষ্ণ মিশনের তৈরী করা এই মন্দিরটি ১৯৫১ সালে উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া কামারপুকুরে ও তার আশপাশে আরো বহু মন্দির রয়েছে,

কামারপুকুরের দর্শনীয় স্থান গুলি::---
★1>রামকৃষ্ণ মঠ :::--
  ★2>ঠাকুরের বাসভবন:; :--
★3>রঘুবীরের মন্দির ::---
★4>আম্রবৃক্ষ :::--
★5>যুগিদের শিবমন্দির :::---
★6>হালদার পুকুর:::---
★7>লক্ষ্মীজলা :;;--
★8>ঠাকুরের পাঠশালা::---
★9>লাহাদের চণ্ডীমণ্ডপ :::---
★10>লাহাদের বাড়ি ::----
★11>পার্বতীনাথ মন্দির ::::---
★12>দামোদর বা বিষ্ণুমন্দির ::::----
★13>পাইনবাড়ি : :::---
★14>চিনু শাখারীর ভিটা :::;----
★15>শান্তিনাথ শিবমন্দির :::----
★16>গোপীশ্বরের মন্দির :::---
★17>ধনীমাতার মন্দির ::::----
★18>ভূতির খালের শ্বশান :::;--
★19>কামারপুকুর'::--
★20>আনুড়ের বিশালাক্ষী মন্দির::--
★21>মানিক রাজার প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ:::---

কামারপুকুরের বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান পায়ে হেঁটেই দেখতে হয়।
তার কারণ এক একটি জায়গা এমনই সরু গলির মধ্যে যে সেখানে গাড়ি ঢুকবে না । তবে সকল জায়গা গুলি খুবই কাছে কাছে।
কোনও জায়গাই বিশাল কিছু দূর নয় যে হেঁটে ঘোরা অসম্ভব, তবে সঙ্গে বাচ্চা বা বয়স্ক লোক থাকলে একটু মুস্কিল হলেও হতে পারে।

তবে মঠের গেটের সামনে টোটো পাওয়া যায় যারা এই সবক'টা জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেয় । ভাড়া ১০০ টাকার মতন । একটু দরদাম করতে হয়।

★1>রামকৃষ্ণ মঠ :::--

ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব বসতবাড়ির ঢেঁকিশালে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন।  ঠিক সেই জায়গাতেই অর্থাৎ ঢেঁকিশালের  জায়গাতেই বর্তমান  মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে।  মন্দিরটির ভিতরে একটা বেদী  রয়েছে।  বেদীটির ওপরেই প্রায় আড়াই ফুট উচ্চতায় ঠাকুরের সমাধিমগ্ন মর্মর মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত। মন্দিরটির সামনে একটা নাটমন্দিরও আছে।  রামকৃষ্ণ মিশন ঠাকুরদের এই  পৈতৃক জায়গা ছাড়াও পরবর্তীকালে আরো প্রায় ৮৪ বিঘা জমি কিনেছে। ১৯৪৯ সালের ১লা মার্চ বিখ্যাত শিল্পী শ্রী নন্দলাল বসু পরিকল্পিত স্মৃতি মন্দিরটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল।

★2>ঠাকুরের বাসভবন:; :--

  দুটি কুটির নিয়ে তৈরী ঠাকুরের বাসভবন।  একটিতে ঠাকুর থাকতেন, আর একটি কুটিরে ঠাকুরের মধ্যমভ্রাতা রামেশ্বর তার পুত্র কন্যা নিয়ে বাস করতেন। এই কুঠিটি দ্বিতল। বর্তমানে এই দ্বিতল কুঠিটি মন্দিরের ভাড়ারঘর হিসেবে ব্যৱহৃত হয়।  ঠাকুরের বাসগৃহটি যথাযথ ভাবে একইরকম রেখে সুরক্ষা করা হয়েছে।  এই গৃহে ঠাকুরের একটা প্রতিকৃতিও  রাখা আছে।

★3>রঘুবীরের মন্দির ::---

ঠাকুরের বাসগৃহের সামনে এই মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরে রঘুবীর শিলা, শীতলাদেবীর ঘট, রামেশ্বর শিব পূজিত হয়।  এছাড়া ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী লক্ষ্মীদেবীর গোপাল ও নারায়নশীলার পুজোর  ব্যবস্থা রয়েছে।  ঠাকুরের উপনয়নের পর ঠাকুর এখানে রঘুবীরের পুজো করেছিলেন। বর্তমানে এই মন্দিরটি রামেশ্বরের বংশধরগণের তত্ত্বাবধানে আছে।  তারাই এখানকার পূজার্চ্চনা করে থাকে। মঠ থেকে পূজা ও ভোগের সব সামগ্রি দেওয়া হয়।

★4>আম্রবৃক্ষ :::--

ঠাকুরের বাস্তুভিটার সদর ঘরের পূর্বদিকে এই আম্রবৃক্ষটি  আছে।  ঠাকুর স্বহস্তে গাছটি রোপন করেছিলেন।

★5>যুগিদের শিবমন্দির :::---
ঠাকুরের বাসভবনের উত্তরদিকে রাস্তার পাশে এই মন্দিরটি আছে। যুগিবংশের রামানন্দ যুগি মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পূর্বমুখী আটচালা-বিশিষ্ট মন্দিরটি ছোটর ওপর বেশ সুন্দর। মন্দিরটির গায়ে পোড়া মাটির কাজ করা কিছু শিল্পকলাও আছে। এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শিবের নাম শান্তিনাথ।.বর্তমানে মন্দিরটি রামকৃষ্ণ মঠের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখানকার এক  মহিলার কাছে শুনলাম এই মন্দিরেই ঠাকুরের মাতৃদেবী চন্দ্রমণি দেবী  প্রার্থনা করেছিলেন। মন্দিরটির  থেকেই এক দিব্যজ্যোতি চন্দ্রমণি দেবীর  দেহে প্রবেশ করেছিল। এই ঘটনার পরেই ঠাকুরের আবির্ভাব হয়েছিল।

★6>হালদার পুকুর:::---

মঠের গেটের ঠিক উল্টোদিকে একটা পুকুর আছে, সেটার নাম হালদারপুকুর ।
যুগিদের শিবমন্দিরের উত্তরদিকে রাস্তার ধারে এই বিশাল পুকুরটি রয়েছে। পুকুরটিকে হালদার পরিবারের ছোট ছেলে খনন করেছিলেন। ঠাকুরের পিত-মাতা ও ঠাকুর স্বয়ং পুকুরটি ব্যবহার করতেন। এই পুকুরে রামকৃষ্ণদেব স্নান করতেন ।
পরবর্তীকালে মা সারদাদেবীও পুকুরটি ব্যবহার করেছেন। পুকুরটি রামকৃষ্ণ মঠ  কিনে নিয়েছেন এবং তারাই পুকুরটির  রক্ষনাবেক্ষন করেন।
পুকুরটার একটা বৈশিষ্ট্য হল এর আকৃতি চৌকো,

★7>লক্ষ্মীজলা :;;--

এই  জমিটিকে ভিত্তি করেই কামারপুকুর গ্রামে ক্ষুদিরামের বসবাসের সূচনা হয়েছিল।  হালদারপুকুরের পশ্চিমদিকে জমিটির অবস্থান। ক্ষুদিরাম এই জমিতেই চাষবাস আরম্ভ করেছিলেন। বর্তমানে মঠের কৃষিবিভাগ এই জমিতেই চাষ করে। এখানকার ধানেই আজও রঘুবীরের সেবা হয়ে থাকে।

★8>ভূতির খালের শ্বশান :::;--

শ্রী রামকৃষ্ণ মন্দিরের পশ্চিমপারে এই শ্বশানটি ছিল। এই শ্বশানের বটবৃক্ষের তলায় ঠাকুর বহুবার ধ্যানে বিভোর হয়েছিলেন। এখানে ঠাকুর স্বহস্তে একটা বেলগাছ রোপন করেছিলেন, কিন্তু তা আজ আর নেই। বর্তমানে  শ্বশানের মাঠটি খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে।  এই মাঠটির পশ্চিমদিকে শিশু উদ্দ্যান আর দক্ষিণদিকে যাত্রীনিবাস তৈরী করা হয়েছে। ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই শ্বশানে প্রতিবছর শ্রী রামকৃষ্ণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। শুনলাম এখানেই ১৯৩৬ সালে বেলুড় মঠ  শ্রী রামকৃষ্ণের জন্মশতবর্ষের  সূচনা করেছিলেন।


★9>ঠাকুরের পাঠশালা::---

রামকৃষ্ণ পাঠশালা : রামকৃষ্ণ মন্দিরটির পূর্বদিকে লাহাবাবুদের চন্ডীমণ্ডপটি রয়েছে। এই চণ্ডীমণ্ডপের ঠিক সামনে অবস্থিত আটচালাটিই ঠাকুরের পাঠশালা। এই পাঠশালাতেই বালক গদাধর পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হন। সেই আমলে আটচালাটি খড়ের ছাউনি দেওয়া ছিল।  পরে টিন দিয়ে ছাউনি দেওয়া হয়।  ছাপান্নটি কাঠের খুঁটি দিয়ে তৈরী সাবেক আটচালার কাঠামোটি। এখনও আটচালাটি অক্ষুন্ন আছে। এই পাঠশালাতেই গদাধরকে পড়িয়েছিলেন যদুনাথ সকার, রাজেন্দ্রনাথ সরকার এবং তাঁর  সহপাঠী ছিলেন গঙ্গাবিষ্ণু ও হারাধন। শিশু কালে রামকৃষ্ণ দেব অর্থাৎ গদাধর  - লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দিরের লাগোয়া এই পাঠশালায়  পড়তে যেতেন ।
গদাধর নাকি পাঠশালায় পড়তে না গিয়ে এই মন্দিরে এসে মা-কালীর মূর্তি আঁকতেন আর ধ্যান করতেন।
মন্দিরের লাগোয়া পাঠশালাটা বেশ সুন্দর। পাঠশালার ঠিক পাশে একটা রাসমন্দির আছে যেখানে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি রয়েছে ।

★10>গোপীশ্বরের মন্দির :::---

ঠাকুরের পাঠশালার পূর্বদিকে এই প্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত। ঠাকুরের পিতা  ক্ষুদিরামের আশ্রয়দাতা সুখলাল গোস্বামীর পূর্বসূরি গোপিলাল গোস্বামীর নামানুসারেই মন্দিরটি পরিচিত। মন্দিরটিতে শিবের অধিষ্ঠান আছে। শুনলাম এই মন্দিরের সাথে পূর্বে একটা নাটমন্দির ছিল, যা এখন আর নেই।
গোপেশ্বর শিবমন্দির::--

এরপর পথে দেখলাম গোপেশ্বর শিবমন্দির । এখানে রামকৃষ্ণ দেবের (গদাধরের) মা চন্দ্রামণি দেবী আসতেন । তারপরে আরও খানিকটা এগিয়ে আমরা পৌঁছলাম ভবতারিণী মন্দির ।

★11>লাহাদের চণ্ডীমণ্ডপ :::---

এই চন্ডীদালান বা দুর্গামন্দিরটি পূর্বমুখী। ১২৫৭ বঙ্গাব্দে ধর্মদাস লাহা মন্দিরটি পাকা করেন।  বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই মন্দিরে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।
লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দির - এরপর লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দির । ধর্মদাস লাহা ছিলেন এই বাড়ির মালিক । এনার সঙ্গে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল । এই মন্দিরটা দোতলা । এর নিচে বিষ্ণুর মন্দির আর উপরে দুর্গার মন্দির ।

★12>লাহাদের বাড়ি ::----

ধর্মদাস লাহা ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি।  তিনি ঠাকুরের পিতা  ক্ষুদিরামের পরম বন্ধু ছিলেন।  লাহা ও চট্ট্যোপাধ্যায় পরিবারের মধ্যেও একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ঠাকুরের  বাসভবনের দক্ষিণদিকে লাহাদের প্রাসাদোপম অট্টালিকাটি রয়েছে।  ওই আমলে এই প্রাসাদের এক কোনে  একটা পান্থনিবাস ছিল। সেখানে সাধুরা এসে বিশ্রাম নিতেন। এই পান্থনিবাসেই ঠাকুর সাধুদের সেবা করতেন। শুনলাম পাঠশালায়ওর উত্তরদিকে লাহাদের একটা রাসমঞ্চ ছিল, যা  ধ্বংস হয়ে গেছে।

★13>ধনীমাতার মন্দির ::::----

লাহাবাবুদের চণ্ডীমণ্ডপের দক্ষিণদিকে এই মন্দিরটির অবস্থান। মন্দিরের বেদীতে একটা রঙিন পট এবং এই পটটির  পিছনদিকে ঠাকুরের একটা তৈলচিত্র রয়েছে। কলকাতার  বৌবাজারের রাধারমণ দাস মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ভবতারিণী মন্দির;::--

রামকৃষ্ণদেবের জন্মদাত্রী ধাইমা ধোনী কামারনির মন্দির যিনি তৈরি করেন, সেই রাধাচরণ দাসের ঠাকুরবাড়ি হল এই ভবতারিণীর মন্দির ।

ধোনী কামারনির মন্দির::--

ধোনী কামারনির মন্দির ও বাড়ি - এরপর ধোনী কামারনির মন্দির এবং তাঁর বাড়ি । আগেই বলেছি ধোনী কামারনি ছিলেন গদাধরের  ধাইমা । সেইসঙ্গে উপনয়ন (পৈতে)-এর সময়ে তিনি গদাধরের
ভিক্ষামা-ও ছিলেন । ধোনী কামারনি ছিলেন অব্রাহ্মণ আর সেইযুগে অব্রাহ্মণদের ভিক্ষামা হওয়া ছিল রীতিবিরুদ্ধ। কিন্তু গদাধর চেয়েছিলেন তাঁর জন্মদাত্রী ধাইমা-ই তাঁর ভিক্ষামা হবেন । গদাধরের দাদা রামকুমার এর তীব্র বিরোধিতা করলেও শেষপর্যন্ত্য গদাধরই জয় হয় । অব্রাহ্মণ ধোনী কামারনি হয়ে যান গদাধরের ভিক্ষামা ।


★14>পার্বতীনাথ মন্দির ::::---

এই আটচালা শৈলীর মন্দিরটি পাঠশালার উত্তর-পূর্ব কোনে অবস্থিত। ধর্মদাস লাহার কন্যা প্রসন্নময়ী দেবী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।  মন্দিরটির বিগ্রহ  বাবা মহাদেব।

★15>দামোদর বা বিষ্ণুমন্দির ::::----

জগন্নাথ লাহা মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন।  তিন খিলানযুক্ত  বারান্দাসহ মন্দিরটি ঠাকুরের মন্দিরের পূর্ব-দক্ষিণ কোনে অবস্থিত। মন্দিরটির গর্ভগৃহের  সিংহাসনে দামোদরশিলা  আসীন আছেন।

★16>পাইনবাড়ি : :::---

লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ি::--
লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ির লাগোয়া মন্দির
লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ি - এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ( গদাধর) ছোটবেলায় যেতেন । এখানে রামায়ণ - মহাভারত ইত্যাদি পাঠ হত আর সেখানে গদাধর ভাবাবেশে উপস্থিত হতেন (এটা এই বাড়ির গায়ে লেখা আছে) । এই বাড়ির লাগোয়া একটা মন্দির  আছে, পাঠ সেখানেই হত ।
ঠাকুরের মন্দিরের  সতীনাথ পাইন ও দুর্গাদাস পাইনের বসতবাড়ীটি অবস্থিত।  এই বাড়ীতে গদাধরের অবাধ যাতায়াত ছিল। এই গৃহেই ঠাকুর তাঁতিবউ সেজে অন্দরমহলে প্রবেশ করে দুর্গাদাস পাইনের দর্পচূর্ণ করেছিলেন। এই বাড়ীরই সন্তান লক্ষণ পাইন যখনই কলকাতা থেকে দেশের বাড়ি ফিরতেন তখনই তিনি দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরের সাথে দেখা করে তবে ফিরতেন। এই বাড়িটির মধ্যেই পাইনদের একটা বিষ্ণুমন্দির ছিল। এই মন্দিরটির সামনেই কিশোর বয়সে ঠাকুর যাত্রায় শিবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ঠাকুরের স্মৃতিমাখা সেই বিষ্ণুমন্দিরটি আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত।

দুর্গাদাস পাইনের বাড়ি ::--

- লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে   দুর্গাদাস পাইনের বাড়ি । কামারপুকুরে এসে রামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় প্রথম কিছুদিন এই লক্ষ্মণ পাইনের বাড়িতেই বাস করেন । এই বাড়িতে এখন দুর্গাদাস পাইনের বংশধররা থাকেন বলে এই বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখা যায় না ।

★17>চিনু শাখারীর ভিটা :::;----

ঠাকুরের বাসভবনের পূর্বদিকে সামান্য দূরে চিনু ওরফে শ্রীনিবাস শাঁখারির বসতবাড়ীটি রয়েছে। এই চিনু শাঁখারিই সর্বপ্রথম বালক গদাধরকে দেখে অবতাররূপে চিহ্নিত করেছিলেন।  ঠাকুরের সাথে তাঁর "চিনুদাদা"-র  খুব সুনিবিড় সম্পর্ক ছিল।  চিনুর বাস্তুভিটায় ঠাকুরের যাতায়াত ছিল।  বর্তমানে চিনুদের এই বাস্তুভিটাটিও  রামকৃষ্ণ মঠ  ও মিশনের অন্তর্ভুক্ত।

চিনু শাঁখারির-এই ব্যক্তিই নাকি গদাধরকে প্রথমবার ঈশ্বররূপে দেখতে পান । গদাধর এনাকে বলেছিলেন
ব্যাপারটা গোপন রাখতে কিন্তু সে কথা চিনু শাঁখারি চতুর্দিকে  রাষ্ট্র করে বেড়ায় ।
চিনু শাঁখারির বাড়ি আজ আর নেই, বাড়ির এলাকাটা মঠের সম্পত্তি আর তারা এটা পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রেখেছে।

★18>শান্তিনাথ শিবমন্দির :::----

চিনু শাঁখারির বাড়ির পূর্বদিকে ঘোষপাড়ায় এই প্রাচীন  শিবমন্দিরটি রয়েছে। ভরত  ঘোষ ও তার পুত্র অর্জুন ঘোষ এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। টেরাকোটার কাজ করা মন্দিটির উচ্চতা ২৫ ফুট আর প্রস্থ ১৫ ফুট।  মন্দিরটিতে এখনও নিত্য পূজা ও শিবরাত্রির দিন বিশেষ পূজা করা হয়ে থাকে।

আজকে আমাদের কামারপুকুর দেখা শেষ । টোটো আমাদের মঠের সামনে নামিয়ে দিল । আমরা সন্ধ্যেয় মঠে পৌঁছে ঠাকুরের সন্ধ্যা আরতিতে যোগ দিলাম।
রাতের রুটি দুই রকম তরকারি মিষ্টি সুজির পায়েস।

পরেরদিন সকালে  চা মুড়ি তরকারি খেয়ে
স্নান করে মঠের অফিসে গিয়ে রুমের ছবি জমা দিয়ে, নগদ টাকায় ঠাকুরের পুজোর  জন্য কিছু জমা দিয়ে দিলাম।
ব্যাগ অফিসে রেখে দিয়ে আবার একটু ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম ।
আজ প্রথমে দেখলাম কামার পুকুর,
আনুড়ের বিশালাক্ষী মন্দির এবং মানিক রাজার প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ।

★19>কামারপুকুর'::--
- এরপর আমরা গেলাম 'কামারপুকুর' দেখতে । এটা একটা পুকুর আর এই পুকুরের নামেই গ্রামের নাম । পুকুরটার কোনও আলাদা বৈশিষ্ট্য নেই, এখনও এর জল স্বাভাবিক জনজীবনে ব্যবহার হয় ।

★20>আনুড়ের বিশালাক্ষী মন্দির::--

কামারপুকুরের খুব কাছে আনুড় বিশালাক্ষী মন্দির আছে । রামকৃষ্ণদেব ছোটবেলায় এখানে যাতায়াত করতেন ।
কামারপুকুর-জয়রামবাটী রোড থেকে ২.৮ কিলোমিটার ভিতরে গেলে পড়ে আনুড় বিশালাক্ষী মন্দির । এই মন্দিরে রামকৃষ্ণ আসতেন । মন্দিরটা খুব একটা বড় নয় তবে চারপাশটা খুব সুন্দর । আমরা এখানে কিছুক্ষণ থেকে আবার ফেরার পথ ধরলাম ।

★21>মানিক রাজার প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ;;--

মানিক রাজার প্রাসাদ - কামারপুকুর থেকে আমাদের গন্তব্য জয়রামবাটী । কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটীর দূরত্ব ৭.৬ কিলোমিটার  তবে পথে আরেকটা দেখার মতো জায়গা আছে । সেটা হল মানিক রাজার প্রাসাদ । কামারপুকুর থেকে কামারপুকুর-জয়রামবাটী রোড ধরে ১.৫ কিলোমিটার মতো গিয়ে একজায়গায় মেইন রোড ছেড়ে একটা মাটির রাস্তা ধরে ৭০০ মিটার মতো গিয়ে একজায়গায় আমরা গাড়ি রাখলাম । এই মাটির রাস্তাটা একেক জায়গায় বেশ সরু আর বর্ষার সময়ে কাদা হয়।

তাই বর্ষায় এ'পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো । গাড়ি একজায়গায় রেখে আমরা বাকি পথটা হেঁটে গেলাম মানিক রাজার প্রাসাদ দেখতে ।

মানিক রাজা ছিলেন এই অঞ্চলের জমিদার এবং একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি । এনার বাড়িতে রামকৃষ্ণের যাতায়াত ছিল । বাড়ি বলতে এখন আর কিছুই নেই, একটা বড় বাড়ির ভগ্নাবশেষ । তবে মাঠের মাঝখানে রাজবাড়ির মূলফটকটা আজও দাঁড়িয়ে আছে । জায়গাটা কোনওভাবে সংরক্ষণও করা হয় না, সেই কারণে  এর রাজ বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে  কিছুই জানতে পারলাম না ।

এই মন্দিরগুলো ছাড়াও কামারপুকুর আরো কয়েকটা মন্দির রয়েছে।
সেগুলি পরে দেখার চিন্তা করে মন্দিরে ফিরে গেলাম। এখন বেলা ১১:30 বাজে
সেই কারণে দুপুরের ভোগ প্রসাদ গ্রহণ করার জন্য মঠে ফিরে আসলাম।
প্রসাদ গ্রহণ করে  বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। বাসে করে তারকেশ্বর স্টেশন পৌঁছে লোকাল ট্রেন ধরে হাওড়া স্টেশন পৌঁছে গেলাম।
     <-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
=========================

No comments:

Post a Comment