62>কুম্ভমেলা,-শ্রী আদিশঙ্করাচার্য। ||
( 1 to 7 )
62/1>|| ত্রিবেণী সঙ্গম::||
62/2>|| কুম্ভমেলা ||(কবিতায় )
62/3> || কুম্ভে নাগা সন্নাসীর রণহুংকার || (ভ্রমন)>>>>>>(আমার ভ্রমণ)
62/4>শ্রীশঙ্করাচার্যের 'দশনামী সন্ন্যাসী'
62/5>আদি শঙ্করাচার্যের দশনামী আখড়া।
62/6>|| প্রয়াগ কুম্ভ মেলা ||(কবিতা)
62/7>প্রয়াগ কুম্ভ;;---প্রয়াগ অর্থ::--
==========================
62>কুম্ভমেলা,---:-শ্রী আদিশঙ্করাচার্য।
মহাসমাধি:-শ্রী আদিশঙ্করাচার্য
৮২০ খ্রিস্টাব্দ মাত্র ৩২ বছর বয়সে
কেদারনাথ , মতান্তরে রামেশ্বরমে।
দৈবিক যোজনাতে সমাধিস্থ হন।
★★★★★★★★★★★★
কুম্ভ কখন কোথায় হয়::----
হরিদ্বারে একবার কুম্ভ হয়ে গেলে তার ছয় বছরের মধ্যেই বাকি তিনটি তীর্থে কুম্ভ সম্পন্ন হয়।
হরিদ্বার ও প্রয়াগে অর্ধকুম্ভ ও হয়।
এই যোগ অর্ধপরিমান ফলদায়ী।
হরিদ্বার,প্রয়াগ,নাসিক ও উজ্জ্বয়িনী,
এই চারটিস্থানেই কুম্ভমেলা হয় জানি।
সূর্য,চন্দ্র ও বৃহস্পতির রাশিগত অবস্থানের
কালের বিচারে,
মেলার স্থান,কাল,সময় নির্ধারিত হয় এই প্রকারে---
বৃহস্পতি ও সূর্য সিংহে অবস্থান কালে,
নাসিকের ত্র্যম্বকেশ্বরে;
সূর্য মেষে অবস্থান কালে হরিদ্বারে;
বৃহস্পতি বৃষে ও সূর্য কুম্ভে অবস্থান কালে প্রয়াগে;
সূর্য বৃশ্চিকে অবস্থান কালে উজ্জয়িনীতে।
এমন ভাবেই হয় মেলা আয়োজন---
প্রতি চার বছর অন্তর কুম্ভ,
প্রতি ছয় বছর অন্তর অর্ধকুম্ভ,
প্রতি বারো বছর অন্তর পূর্ণকুম্ভ,
আর বারোটি পূর্ণমুম্ভে(144 বৎসরে) হয় মহাকুম্ভ ।
<-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
=====================
■★★★★★★★★★★★★★■
62/1>|| ত্রিবেণী সঙ্গম::||
<------আদ্যনাথ----->
ত্রিবেণী সঙ্গম, তিন নদীর সঙ্গম।
গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর সঙ্গম।
সত্য,আনন্দ, জ্ঞান, তিন প্রবাহের সঙ্গম।
তাইতো প্রয়াগ শব্দ উচ্চারণ মাত্রেই
মুক্ত হওয়া যায়,অহং ত্যাগ হয়,
সমস্ত কষ্ট লাঘব হয়।
সেইহেতু কুম্ভ অর্থাৎ শুভ গ্রহ ও নক্ষত্র যোগে,পবিত্র স্নানের তরে ত্রিবেণী সঙ্গম।
গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী তিন নদী প্রবাহ সঙ্গম,
তিন নদীর মিলন, তিন প্রবাহের মিলন,
সত্য, আনন্দ ও জ্ঞানের মিলন।
ইড়া, পিঙ্গলা, এবং সুষুম্নার মিলন,
সহস্রারেই ত্রিবেণী সঙ্গম।
এ-হেন শ্রেষ্ঠ পবিত্র সঙ্গমে দিলে ডুব,
মনের গ্লানি ও সকল পাপ হবে দূর।
তাই ডুব দিতে হয় সঙ্গমে,
করতে হবে মন্থন,
যেমন হয়েছিল সমুদ্র মন্থন,
আমাদের এই অন্নময় শরীরই সমুদ্র,
সেই সমুদ্রকে করতে হয় মন্থন।
এই অন্নময় শরীরকে মন্থন করলেই
লাভ হয় সত্য ,আনন্দ,জ্ঞান রূপী অমৃত।
তখন ইড়া, পিঙ্গলা প্রবাহ সুষুম্না কে ঘিরে,
ষড় চক্র সজাগ হয়ে মিলিত সহস্রারে গিয়ে।
ত্রিবেণী সঙ্গমেই প্রাপ্তি হয় সত্য, আনন্দ ও জ্ঞান রূপ অমৃতের সন্ধান।
স্নান করা মানেই জলে ডুব দেওয়া,
সচ্চিদানন্দ রূপ জলে ডুব দেওয়া।
শরীর রুপি সমুদ্রে সচ্চিদানন্দ রূপ জলে
ডুব দিতে হয় শুদ্ধ মনে।
যে-মন যত পবিত্র শুদ্ধ সেই মন ততোই অমৃতের অধিকারী হন।
স্ত্রী শক্তির সত্য মাতৃরূপ তিন নদী
শিবশক্তি, নারায়ণ,ও ব্রহ্মা,তিন শক্তির মিলন,
গঙ্গা, সরস্বতী, যমুনা-র মিলন,
শরীর মধ্যে ইড়া, পিঙ্গলা, আন্তঃসলীলা সুষুম্নার মিলন।
সহস্রারে মিলন,প্রয়াগরাজে মিলন।
শরীরেই ত্রিবেণী সঙ্গম।
সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মার স্ত্রী সরস্বতী,
সৃষ্টির রক্ষা কর্তা নারায়নের স্ত্রী লক্ষ্মী,
সৃষ্টির ধ্বংসের কর্তা শিবের স্ত্রী দুর্গা।
শিব শংকরের জটা থেকে জন্ম গঙ্গার।
আবার শিবই ধ্বংসের কর্তা।
এ-হেন ত্রি শক্তির মিলন ত্রিবেণীতে,
তাইতো ত্রিবেণীর পুত পবিত্র জল জীবের কল্যাণের তরে।
এইতিন মাতৃ শক্তির মিলন,
এইতো সৃষ্টির অমোঘ কারণ,
স্বয়ং পৃথিবী তাঁরে করছে ধারণ,
শরীর পৃথিবীর সৃষ্টি, প্রকৃতির কারণ,
পৃথিবীতেই লয়, প্রকৃতির কারণ।
যা-আছে পৃথিবী তথা ব্রহ্মাণ্ডে,
তা-সকলই আছে এই শরীর খণ্ডে।
সৃষ্টির বীজ প্রকৃতি করে ধারণ,
মনুষ্য শরীর প্রকৃতির লীলার কারণ।
ইড়া পিঙ্গলা, সুপ্ত সুষুম্নাকে বেণীর মতন বেষ্ঠন করে প্রবাহিত মনুষ্য শক্তির
জীবনী শক্তির সুপ্ত কারণ।
তাইতো সদাসর্বদা শরীরমধ্যেই চলছে
মহাকুম্ভের মেলা,
এ যেন প্রকৃতির এক অদ্ভুত লীলাখেলা।
সৃষ্টি, স্থিতি, লয়, প্রবাহ প্রলয়,
সকলি প্রকৃতির লীলা ময়,
গঙ্গা যমুনা প্রবাহ সুপ্ত সরস্বতীকে ঘিরে,
ইড়া পিঙ্গলা বহিছে সুপ্ত সুষুম্নাকে ঘিরে।
প্রকৃতির সৃষ্টি প্রকৃতির খেলা
সৃষ্টি ও প্রলয় চলে দুই বেলা।
কুম্ভ গ্রহ নক্ষত্রের যোগের খেলা,
মনুষ্য জন্মও সৃষ্টি প্রবাহের খেলা।
ভারতীয় দর্শন বলে যাহা শীর্ণ হয়, তা-হা-ইতো শরীর।
জন্মিলে মরিতে হবে , অমর কে কোথা কবে,
"চিরস্থির কবে নীর, হায় রে জীবন -নদে?"
তাই-তো কুম্ভস্নান অমৃত লাভের লোভে।
16/02/2025::03:20 pm
<-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->
==========================
■★★★★★★★★★★★★★■
62/2>|| কুম্ভমেলা ||(কবিতায় )
<----আদ্যনাথ--->
গিয়েছিলাম প্রয়াগে ত্রিবেণী সঙ্গমে,
2001 সালের জানুয়ারিতে পূর্নকুম্ভে,
গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীর ত্রিবেণীসঙ্গমে,
শ্রেষ্ঠ তীর্থ মেলা প্রয়াগকুম্ভ সঙ্গমে।
প্রয়াগকুম্ভে ছিল অজস্র মানুষের ভীড়,
লক্ষ,লক্ষ, মানুষ যেন সকলেই অস্থির।
প্রশাসন ছিল অতিশয় শক্ত নিয়মনিষ্ঠ,
সকল ব্যবস্থাই ছিল সুন্দর ও সুষ্ঠ।
সকলের মনে ছিল নিষ্ঠা ও ধার্মিক যুক্তি,
কুম্ভস্নানে সমস্ত পাপের হবে মুক্তি।
সকলের ভাবনা চিন্তা পেতেচায় মুক্তি,
পার্থিব জীবন-মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তি।
তাইতো সার্থক করতে এই জীবনকে,
স্নান জরুরি প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমে,
ভোর4তেই লাইন দিয়ে স্নানের ভিড়ে,
অজস্র মানুষের লাইন চলছিল ধীরে।
তুলসিদাসী রামায়ণের একটু আছে মনে।
"মাঘ মকরগত রবি জব হই,
তীরথপতিহি আব সব কোই,
দেবদনুজ কিন্নর নরশ্রেণী,
সাদর মজ্জহি সকল ত্রিবেণী।"
এই জানুয়ারি মকর সংক্রান্তিতে,
লক্ষ-লক্ষ মানুষ ব্যাকুল তীর্থস্নানেতে,
নাগা-সাধু,গৃহি-মানুষ সকলেই মহা-উদ্যমে
প্রয়াগরাজ-কুম্ভ-ত্রিবেণী-সঙ্গমে।
দেখলাম কুম্ভযেন অজস্র সাধুর মেলা,
নানান দেশ বাসি দেখেন সাধুর মেলা,
নানান সাধু আর মানুষের সহবাস,
গাঁজার ধোঁয়া আর অমৃত পাবার আশ্বাস।
গাঁজার আড্ডা গুলিতেই ভিড়ছিলবেশ,
গাঁজার গন্ধে ভরপুর মেলার পরিবেশ।
মনেহয় গঞ্জিকার মাহত্যই অধিক শ্রেষ্ঠ,
বাতাস যেন গঞ্জিকার ধোঁয়ায় কৃষ্ট।
সাধুসন্তদের 'গঞ্জিকা, সেবনের কেরামত,
'প্রেমতক্তি'তে 'রতনকাটারি'র কসরত।
কল্কেতে 'টিকলি' লাগিয়ে গাঁজা ভরে,
ভেজা ‘সাফি’ জড়িয়ে,কল্কেতে আগুন দিয়ে ধরে।
বম-বম বলে চার আঙুল দিয়ে ধরে,
বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে জড়িয়ে ধরে।
কেউ টানে কেউ চায় কেউ করে আশা,
কুম্ভমেলা যেন গঞ্জিকা সেবকেই ঠসা।
সেই গঞ্জিকার ধোঁয়া আর কুয়াশায় মিলে,
চারিদিকে যেন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।
নূতনেরা বুঝি খক্ক খক্ক কাশে,
তবুও চলে বম-বম বোলে মৌতাতের বলে।
কুম্ভে গাঁজার টানে সাধু-সন্ন্যাসীগণ,
'তুরীয় আনন্দে ' মন বুঁদ হয় তখন।
কৌপীনধারী বাবারা দিনের পর দিন,
গাঁজার মৌতাতেই থাকেন সারাদিন।
বাউলরাও গঞ্জিলকাকে দেন বড়ই আদর-সন্মান,
বৈষ্ণবদের বড় কল্কেতে হয় না মৌজ ,
ওনাদের প্রেমের ছোট কল্কে,
যাকে ওরা বাঁশি বলে ডাকে।
সেই বাঁশির মৌতাতে ওরা ঝুমতে থাকে,
কল্কের মাহাত্যে কৃষ্ণ প্রেমের জোয়ার ডাকে,
কৃষ্ণ প্রেম হয় কি গঞ্জিকা বিহনে,
বৈষ্ণবীগণও মাতোয়ারানকৃষ্ণ প্রেমে।
নৃত্যের তালে তালে গঞ্জিকার ফোয়ারা,
সেই মৌতাতেই কৃষ্ণনামে মাতোয়ারা,
মহিমা অপার অনন্ত কৃষ্ণের নাম ধরি,
যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি।
কল্কের অন্তরে আছেন প্রেমের শ্রীহরি,
বৈষ্ণবীর মুখে শোন নাম সংকীর্তনের বুলি,
নৃত্যের তালে অলৌকিক গঞ্জিকা সেবন,
নিশ্চিত-বিশ্বাস হয় সর্ব পাপ বিমোচন।
কৃষ্ণ নাম হরি নাম বড়ই মধুর,
যে কল্কের গুনেতে কৃষ্ণ ভজে সে বড়ই চতুর।
মৌতাতে বিভোর হয়ে বলো হরি বোল,
নাম মাহত্য গুনে বাজাও নিত্যানন্দের খোল।
হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ বোল,
হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম বোল।
কল্কের ইতিহাস জানাই আদর করে,
গাঁজা কাটার ছুরি টি ‘রতনকাটারি’বটে,
যে কাষ্ঠে গাঁজা কাটে তাকে ‘প্রেম তক্তি’ বলে।
আর কল্কের তলায় জড়ানো কাপড়েকে,
'সাফি’নামে জানেন গঞ্জিকাপ্রেমী সকলে।
কল্কের ভিতরে নিচের ত্রিকোণ পাথরটি,
'টিকলি'র মাহত্য অনেক খানি খাটি।
কুম্ভ তো দেবাসুরের সংগ্রামের কথা
অমৃতের উপচে পড়ার গল্পকথা,
আর মর্তে বল্লম তরবারি হাতে সাধুনাগা, সকল সাধুদের শাহি স্নানের দৃশ্য দেখা।
প্রয়াগকুম্ভে স্নান সেরে বহু মানুষ যান
আকবরের দুর্গে,
আদরে পুজো দেন সেখানে অক্ষয়বটে,
যাকে ঘিরেই প্রয়াগের দুর্গ আজও আছে বটে,
সেই দুর্গ ও অক্ষয়বট আছে সেনাবাহিনীর অধীনে।
কুম্ভতেই দুর্গের দুয়ার থাকে খোলা,
কুম্ভ,মাসাধিক কালব্যাপী অস্থায়ী মেলা,
যেখানে শৈব দশনামী নাগা ও বৈষ্ণব বৈষ্ণবী,
আর কাপালিক,তান্ত্রিক,ফকির, শিখ সন্ন্যাসী, কবীরপন্থী।
সন্ত রুইদাসপন্থী চারিদিকে তাঁবুর মেলা,
নানা জাতী, নানা মত,নানা পথ, সঙ্গমে,
এক সাথে মেলা।
এ-হেন সর্বধর্ম মলিনই কুম্ভমেলা।
মতভেদ থাকলেও পাশাপাশি করেন স্নান
একই মাহেন্দ্রক্ষণে,
ত্রিশূলধারী,ভস্মাচ্ছাদিত নাগাসন্ন্যাসীদের শৃঙ্খলার কারণে।
কুম্ভমেলা এক চলমান সংস্কৃতির ধর্মীয় অনুষ্ঠান
যেখানে পূর্ব নির্ধারিত ক্ষণেইহয় শাহি স্নান।
কুম্ভতে দেখি আধুনিকতার ছোঁয়ার ছক,
নাগাসন্ন্যাসীরাও আজ মোবাইল, বাইক ধারক,
কারুর জিপ গাড়ি, কারুর চলেনা বহু মূল্য কার ছাড়া।
তাঁরা দেখান নানান কসরত বাজির খেলা।
কোন আখড়া রাখেন উট হাতি, ঘোড়া,
বসেন বহু মূল্য রত্নের সম্ভার সাজিয়ে,
পুরাকালে আসতেন রাজা-মহারাজারা,
আজ রাজা নাই,আছেন সাধু মহারাজেরা
কুম্ভেআজও আছে লক্ষ লক্ষ ধার্মিক মানুষের ভিড়,
গৃহী-সাধুদের আদানপ্রদানের ভিড়,
প্রয়াগকুম্ভ কেবল ধার্মিক তীর্থ মেলাই নয়,
এখানে আখড়ার সাধুদের পদোন্নতিওহয়।
গঞ্জিকার ধূম্রজালে আচ্ছন্ন সেই পরিসরে,
নির্বাচিত হন ‘শ্রীপঞ্চায়েতি আখড়া’র
কর্মাধ্যক্ষ গণে।
সাধুদের এ এক গণতান্ত্রিক চেতনা,
সমাজে হিন্দুধর্মকে রক্ষার শুভ ভাবনা।
অধম আমি সামান্য জ্ঞানে করি জতন,
ধৃষ্টতা-বলে, মহাকুম্ভের করিলাম বর্ণন,
ভুল ত্রুটি জন্য করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা
চাহিলাম প্রথম,
নহি লেখক, নহি পন্ডিত,সামান্য জ্ঞানে
চাক্ষুস করেছি যাহা, করিলাম বর্ণন।
<-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
------16/02/2002::07:30:am----
===========================
■★★★★★★★★★★★★★■
62/3> || কুম্ভে নাগা সন্নাসীর রণহুংকার ||
2001সালে এলাহাবাদের প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমে কুম্ভ মহামেলা দেখার পরে আমার মনে একটাই অনুভব হয়েছিল যে এ-হেন মহা মেলা এ শুধু মেলা নয় এ হল ভারতবর্ষের হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ সাধুদের মিলন ক্ষেত্র ও ভারতবর্ষের আধ্যান্তিক চেতনার এক বিশাল জাগরণ ক্ষেত্র।
এ-হেন মহা মিলনক্ষেত্রই বোধহয় ভারতের সর্ব ধর্ম সন্যয়ের শক্তির উৎস স্থল।
|| প্রয়াগ কুম্ভ ||
প্রতিটি সাধু নিজ শক্তিতে বলীয়ান,
দেখলাম সকলেই ধর্মে মহান।
নাগা সাধুরাই কুম্ভের মূল আকর্ষণ,
সাধারণ মানুষের চাহিদা পুণ্য আহরণ।
তাইতো স্নানের এমন মাহাত্ম্য,
সকলের চাহিদা পাপমুক্ত শুদ্ধ আত্মা।
জীবনের যত পাপ ও অন্যায়,
ত্রিবেণীর জলে ধুয়ে নিতে চায়।
============
2001 সালে জানুয়ারী মাসের 9 তারিখে
মঙ্গলবার আমরা চারজন ধানবাদ থেকে
চম্বল এক্সপ্রেসে পৌঁছে ছিলাম এলাহাবাদে আজ যা প্রয়াগরাজ বলে জানা যায়।
আমাদের কোন প্রকার পুণ্য অর্জনের কোন লোভ বা ইচ্ছা ছিল না। শুধু
কুম্ভস্নান দর্শনের ইচ্ছা নিয়েই পৌঁছে ছিলাম এই সঙ্গম স্থানে।
জানলাম এবার কুম্ভ স্নান চলবে 21সে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। আমরা ছুটি কম পাবার কারণে মাত্র সাতদিন ছিলাম।
★ প্রয়াগরাজ বা এলাহাবাদ শহরটি যার তিন দিক গঙ্গানদী এবং যমুনা নদী দ্বারা বেষ্টিত , শুধুমাত্র একটি দিক মূল ভূখণ্ড দোয়াব অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত।
হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে এই স্থানটি
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি পবিত্র তিনটি নদীর সঙ্গম ত্রিবেণী নামে পরিচিত।
যদিও ঋগ্বেদ অনুসারে, সরস্বতী নদী
অন্তঃসলিলা (subterranean river)
কিন্তু গঙ্গা নদীর তলদেশে প্রবাহিত হয়ে চলেছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
এই সঙ্গম টি একটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু তীর্থস্থান কুম্ভমেলার চারটি স্থানের মধ্যে একটি ।
2001 সালের কুম্ভমেলাটিও শুভ ছিল কারণ এটি জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গ্রহ-বিন্যাসে
অতি শুভ ছিল।
এই পবিত্র মেলাটি 6000 একর এলাকা জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল;
হিন্দু পুরাণে 12 বছরে একবার অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য এটির বিশেষ তাৎপর্য ছিল কারণ বিশ্বাস করা হয় যে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে অমৃতের জন্য যুদ্ধ 12 বছর ধরে চলেছিল।
জেনে ছিলাম আগামী 24 তারিখ বুধবার মৌনী অমাবস্যাতে শাহি স্নান হবে।
আমরা যখন পৌঁছে ছিলাম তখন বেশ ভিড় ছিল। সাধুসন্তেরাও অনেক পৌঁছে
গিয়েছিল। তবে অনুভব করলাম যে 10 তারিখ থেকে ক্রমশই ভিড় বাড়ছে।
যেমন সাধারণ মানুষ আসছেন, তেমনি সাধু সন্তেরাও আসছেন, বিশাল বিশাল প্রসেসন নিয়ে। কেউ হাতির পিঠে,কেউ উটের পিঠে, কেউ ঘোড়সওয়ার হয়ে।
অশ্বারূঢ়ও সাধুগণ তরোয়াল, ত্রিশূল নিয়ে সেকি আস্ফালন, নানান কেরামতি,
কত রকমের বাদ্য যন্ত্র, সিঙ্গা, শঙ্খ,কোনকিছুই বাদ নেই।
সেই দৃশ্য মনে পড়লে আজও শিহরিত হতে হয়। ওনারা প্রকৃত সাধু নাকি বিশেষ যোদ্ধা সেটাই বোঝা মুস্কিল।
শুনেছি ওনারা এক সময় হিন্দু ধর্ম রক্ষার জন্য অনেক যুদ্ধও করেছেন।
এদিকে আমাদের অবস্থা ওই ভিড়ের চাপে ওষ্ঠাগত প্রাণ,
শেষে পালিয়ে বাঁচলাম।
সাত দিনের মধ্যে বোধহয় তিনদিন একবার করে ডুব দিয়ে ছিলাম সঙ্গমের পবিত্র জলে।
স্নান করেছিলাম কয়েকটি ঘটে।
ব্যবস্থা ছিল সুন্দর কিন্তু লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের ভিড়,
সামলে চলাই মুস্কিল।
যা দেখেছি, শুনেছি, কিছু অনুভব করেছি,
জিজ্ঞাসু মন নিয়ে সাত দিন ঘুরে বেড়িয়েছি প্রয়াগের বালু চড়ে।
খাওয়া যেমন তেমন করে চলতো,
কখনো কোন লঙ্গরখানায়, কখনো কোন দোকানে সামান্য কিছু খেয়ে, কখনো ফলাহারে তাতে কোনপ্রকার কিছু অসুবিধা অনুভব করিনি। কারণ এমন মানুষের সমুদ্র নাদেখলে বিশ্বাসই করা যায় না।
সাধারণ মানুষ থেকে সাধু সন্ত সকলের এক ধ্যান-জ্ঞান, পবিত্র স্নান ও পুণ্য অর্জন।
কিন্তু মুশকিল হতো শৌচ কর্মের জন্যই দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হতো।
কখনো কাউকে লড়াই করতেও দেখেছি।
সে যাইহোক, রাত্রে শীতের জন্য কম্বলেও যেন শীত মিটতোনা। বেশ ঠান্ডা ছিল।
সকাল হলেই গরম বাড়তো।
বেলা বাড়ার সাথে গরম আর রাত্রে ঠান্ডা।
দেখলাম, হৃদয় দিয়ে অনুভব করলাম--
"অনন্ত মত ও অনন্ত পথ"
ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব বলেছেন
"যত মত ততো পথ"
সাথে রাজবেশে গৈরিক স্নান।
একমাত্র কুম্ভেই সম্ভব, এমন অলৌকিক দর্শন এর সাথে কুম্ভের প্রধান আকর্ষণ
নাগা সন্নাসীর দর্শন।
সর্বত্যাগী নিরহঙ্কার ভোলানাথ জেন,
সর্বাঙ্গে বিভূতি, ধীর-গম্ভীর চলন।
সেদিন ধর্ম ও সাধুজনের রক্ষা ও
দুষ্কৃতের দমনে আখড়া গুলি ছিল বলীয়ান।
বর্তমানে 16 টি আখড়া আছে সচল।
তিনটি প্রধান, আর আছে শাখা ও সংস্থান।
★জুনা, ★নির্বানী ও ★নিরঞ্জনী,
শাহী স্নানের মান্যতা তিনটি।
এক একদিন এক-একটি আখড়ার
স্নানের অগ্রাধিকার থাকে।
আর আছে বড় ও ছোট আখড়া,
সাথে আছে শৈব, বৈষ্ণব, উদাসী সম্প্রদায়।
এরাও ওই প্রধান তিন আখড়ার সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে স্নানে যায়।
কুম্ভে নুতন ত্যাগব্রতীদের সন্ন্যাস দেওয়া হয়।
অতিকায় এই স্নান-যাত্রার বাহিনীতে হাতি-ঘোড়া, উট, পাল্কির বীরোচিত বাহিনীর রণহুংকার ও বিরাট বিরাট পতাকার গৈরিক আন্দোলন আত্মবল, মনোবল, সকল দুর্বলতার সীমা লঙ্ঘন করে দেহবলকে জয়কারের গর্বে জাগ্রত করে জগদ্ধিতে আত্মোৎসর্গ করতে সকলকে সর্বভাবে উজ্জীবিত করে তোলে।
সন্ন্যাসীদের শাহী স্নান পর্বের শেষে , সেই পুত পবিত্র জলে সাংসারিক মানুষ নিজেদের সকল পাপ ধুয়ে নিতে বার বার পাঁচবার জলে ডুব দিয়ে পুণ্য সঞ্চয় করে নেয়। ইহ জন্মের সকল পাপ থেকে মুক্তির জন্য সকল মানুষ যার যেমন সামর্থ ও সাধ্য সাধুদের দান দেন। কেউ একুশ বা কেউ এগারোটি ঘৃতপূর্ন কুম্ভ কেউ নানা ন ফল মূল। দান করেন জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পাবার মন কামনায়।
শুদ্ধ মনে বহু লোকের সমাবেশ যেখানে ঈশ্বর নিজে উপস্থিত হন সেখানে এবং অতি প্রসন্ন ও সহজে তুষ্ট হন ইষ্টদেবতা।
তাইতো কুম্ভে মনের সন্তুষ্টি মেলে সহজে।
হোকনা কঠিন পদযাত্রা মন সন্তুষ্ট হয় পূর্ণতা।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কোটি কোটি মানুষের সমাবেশ, নানা ভাষা, নানা ধর্ম,
নানান সংস্কৃতি, কুম্ভে মেলে মিসে
একাকার।
★জুনা আখড়া::---
গুজরাটি ভাষায় জুনা অর্থ "পুরাতন" অথবা "প্রাচীন বৃত্ত"।
জুনা আখড়া এক সন্ন্যাসী দের বিশাল আখড়া। এই আখড়া 4,00,000-এরও বেশি সন্ন্যাসী সদস্য নিয়ে সংগঠিত ।
জুনা আখড়া হল ভারতের সবচেয়ে বড় সাধু সম্প্রদায়, আজ তাদের অধিকাংশই নাগা বাবা।
তাদের সনাতন ধর্মের রক্ষক বলা হয়। এই ক্ষেত্রে, নাগা শব্দটি সংস্কৃত শব্দ " নাগনা " থেকে এসেছে , যার অর্থ "নগ্ন"।
এবং প্রকৃতপক্ষে নাগা বাবারা কুম্ভমেলায় রঙিন পবিত্র স্নানের সময় নগ্ন, ছাই দিয়ে ঢেকে পদযাত্রা করার জন্য পরিচিত।
জুনা আখড়ার প্রধান হলেন আচার্য মহামণ্ডলেশ্বর যার উপাধি গিরি জী।
ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক এবং পবিত্র গ্রন্থের ভাষ্যকার, আদি শঙ্কর, সাধু, যোগী এবং শমনদের ব্রাহ্মণ্য বংশকে ভারতের প্রথম সন্ন্যাস ব্যবস্থা, দশনামের সন্ন্যাসী সম্প্রদায় (দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়) -এ সংগঠিত করেছিলেন যা আজও বিদ্যমান।
জুনা আখড়ার বংশবৃক্ষ বা মারহি বৃক্ষ
এক মহা বিশাল বৃক্ষ।
গাছের ডালের মতো ছড়িয়ে থাকা সমস্ত বংশধারা দশটি নামের একটির সাথে তাদের মূলে সংযুক্ত।
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে, সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের ৫২টি বংশ তাদের প্রাচীন সংগঠনকে একটি অভিজাত ভ্রাতৃত্ববোধে রূপান্তরিত করে। সেই সমাজ, প্রকৃত পক্ষে যা দত্তাত্রেয় আখড়া, পরে ভৈরন আখড়া নামে পরিচিত ছিল এবং অন্যান্য নতুন আখড়া তৈরি হওয়ার পর, এটি কেবল জুনা আখড়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
জুনা আখড়া একটি ঐতিহ্যবাহী সমাজ যেখানে ৫২ বংশের সাধু পরিবারের প্রতিনিধিত্ব তাদের স্বীকৃত প্রবীণরা আখড়ার একটি মহাপরিষদে করেন, যার প্রতিনিধিত্ব করেন নির্বাচিত সচিব এবং একজন সভাপতি (সভাপতি)। যেকোনো পদে নির্বাচিত হওয়ার পর, এই নিয়োগ আজীবনের জন্য স্থায়ী হয়।
সঙ্ঘের সমস্ত বিষয় দুটি প্রধান বিভাগে বিভক্ত, " সমাজ ", যা সমগ্র সমাজের সাথে সম্পর্কিত, এবং "ঘর" , যা একটি সাধু পরিবারের সাথে সম্পর্কিত। এই পরিষদের সদস্যরা সকলেই নাগা বাবা।
কুম্ভমেলার সময় নির্বাচন এবং দীক্ষাগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়, যা নাগা সাধুদের কাছে এই অনুষ্ঠানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
-------------------------------
★নির্বানী আখড়া:----
মহানির্বাণী আখড়া বা শ্রী পঞ্চায়েতি আখড়া মহানির্বাণী হল একটি শৈব শাস্ত্রধারী (আধ্যাত্মিক লিপি ধারক) আখড়া। এটি হিন্দু ঐতিহ্যের তিনটি প্রধান (মোট সাতটির মধ্যে) শাস্ত্রধারী আখাড়গুলোর একটি।
যদিও ঐতিহ্য অনুসারে মহানির্বাণী আখড়ার ঐতিহ্য দশ হাজার বছরের পুরানো, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত হয়েছিল।
৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে, অটল আখড়ার সাতজন সাধুর দল গঙ্গাসাগর নামক স্থানে তপস পরিবেশন করেছিলেন। তারা সাধক কপিল মহামুনির দর্শন দ্বারা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছিল। তাঁর আশীর্বাদে, তারা হরিদ্বারের নীল ধারার কাছে দাপ্তরিক নাম "মহানির্বাণী আখাদ" দিয়ে নাগা ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। আখড়াটির প্রধান উপাস্য দেবতা কিংবদন্তি সাধক কপিল মহামুনি।
আখড়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে আদি শঙ্করাচার্য তাঁর জীবদ্দশায় সংগঠিত করেছিলেন।
----------------------------------
★নিরঞ্জনী আখড়া ::-----
নিরঞ্জনী আখড়া একটি বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান যা কুম্ভমেলার প্রাণবন্ত পরিবেশে এক অনন্য আধ্যাত্মিক স্বাদ নিয়ে আসে। যোগব্যায়াম, ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের উপর জোর দেওয়ার জন্য বিখ্যাত, নিরঞ্জনী আখড়া এই পবিত্র সমাবেশে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য আখড়াগুলির মধ্যে একটি।
নিরঞ্জনী আখড়ার সুশৃঙ্খল যোগব্যায়াম এবং ধ্যানের মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধি অর্জনকে কেন্দ্র করে। "নিরঞ্জনী সন্ন্যাসী" নামে পরিচিত অনুসারীরা বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার লক্ষ্যে অনুশীলনে নিযুক্ত হয়।
নিরঞ্জনী আখড়ার সর্বাগ্রে রয়েছেন মহন্ত, একজন শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক নেতা যিনি অনুসারীদের আধ্যাত্মিক যাত্রায় নির্দেশনা
প্রদান করেন।
মহন্ত কেবল প্রশাসনিকভাবে আখড়া পরিচালনা করেন না বরং কুম্ভমেলার সময় আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠান এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নিরঞ্জনী আখড়া কুম্ভমেলার পবিত্র কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
মহন্ত এবং নিরঞ্জনী সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে একটি বিশাল ধর্মীয় স্নান, শাহী স্নান একটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান যা তীর্থযাত্রী এবং দর্শকদের আকৃষ্ট করে ।
শাহী স্নানের সময় সম্পাদিত আচার-অনুষ্ঠানগুলি একটি প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে, যা পবিত্র নদীতে শরীর, মন এবং আত্মার শুদ্ধিকরণকে নির্দেশ করে।
নিরঞ্জনী আখড়ার অনুসারীরা আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি সামগ্রিক পরিসরের সাথে জড়িত। এই অনুশীলনগুলির মধ্যে রয়েছে যোগাসন, ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক সত্য সম্পর্কে তাদের বোধগম্যতা আরও গভীর করার লক্ষ্যে শাস্ত্র অধ্যয়ন।
=========================
■★★★★★★★★★★★★★■
62/4>শ্রীশঙ্করাচার্যের 'দশনামী সন্ন্যাসী'
শ্রী আদিশঙ্করাচার্য হিন্দুধর্মের ভিত্তি স্থাপনের নিমিত্তে ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন:- এই মঠের উদ্দেশ্য হিন্দুধর্মে পঞ্চ দেবতা ও পঞ্চ যজ্ঞের পালন ও সমাজে বেদান্ত প্রতিষ্ঠা।
●উত্তরে- জ্যোতির্মঠ (বদ্রীকাশ্রমের কাছে)- অর্থববেদ- তোটকাচার্য
●পূর্বে- গোবর্ধন মঠ(পুরী,উড়িষ্যা)- ঋগ্বেদ - আচার্য পদ্মপাদ
●পশ্চিমে- দ্বারকা মঠ( দ্বারকা, গুজরাট)- সামবেদ- হস্তামলকাচার্য
●দক্ষিণে- শৃঙ্গেরী মঠ(কর্ণাটক)- যজুর্বেদ- সুরেশ্বরাচার্য।
এই চারটি মঠের এর নীচে আছে দশনামী সম্প্রদায় যার প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং আচার্য শঙ্কর।
নিবৃত্তি:---
"ধর্মীয় আচরণ দ্বারা মােক্ষলাভ হয়, সেই ধর্মীয় আচরণকে ধর্মের নিবৃত্তি লক্ষণ বলে।"
নিবৃত্তির পন্থা অবলম্বনকারী সন্ন্যাসী
কোন ভাবেই এক রাত্রির অধিক কাল এক গ্রামে বা এক স্থানে বাস করা চলবে না, সকল জীবের প্রতি দয়া প্রকাশ ও আশারূপ পাশ হতে মুক্তিলাভ করাই সন্ন্যাসীর একান্ত কর্তব্য।
নিবৃত্তির পন্থা অবলম্বনকারী সন্ন্যাসী কমণ্ডলু, উদক, বিলাসী পরিধেয় বস্ত্র, আসন, ত্রিদণ্ড, শয্যা, অগ্নি এবং সন্ন্যাসী হয়েও গৃহের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা কখনও কর্তব্য নয়। সন্ন্যাসী বীতস্পৃহ, স্নেহাদিবন্ধনবিমুক্ত এবং সংযতচিত্ত হয়ে সৰ্বদা বৃক্ষমূল, শূন্যগৃহ অথবা নদীর তীর কোন প্রভৃতি নির্জন স্থানে অবস্থান পূর্বক সর্বদা পরমাত্মতত্ত্ব চিন্তা করবে।
সন্ন্যাস ধর্ম অবলম্বন পূর্বক নিরাকার ও স্থাণুস্বরূপ হয়ে আত্মচিন্তা করলে দ্রুতই মােক্ষলাভ হয়।
মােক্ষার্থী সাধু ব্যক্তিদিগের পক্ষে এই বেদোক্ত ধৰ্ম অত্যন্ত সৎপথস্বরূপ। যে ব্যক্তি এই পথে অগ্রসর হন তিনি কখনই সংসারসাগরে পতিত হন না।
বৈরাগ্যের তারতম্য অনুসারে মােক্ষপথ অবলম্বনকারী সন্ন্যাসীদের চারপ্রকার সন্ন্যাসের বিধান দিয়েছেন যেমন---
●কুটীচক, ●বহুদক,
●হংস ও ●পরমহংস --এদের মধ্যে কুটীচক অপেক্ষা বহূদক, বহূদক অপেক্ষা হংস ও হংস অপেক্ষা পরমহংস শ্রেষ্ঠ। এ নিবৃত্তিধৰ্ম অপেক্ষা সুখ, দুঃখ, জরা ও মৃত্যু নিবারণের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় আর কিছুই নেই।
যে তীব্র বৈরাগ্যবান সন্ন্যাসীর শরীর তীর্থযাত্রাদি করতে অসর্মথ। তিনি তখন নিজ কুটিরে বাস করে সাধন ভজন করেন, তাঁকে 'কুটীচক-সন্ন্যাসী' বলে।
ঐরূপ বৈরাগ্যবান্ পুরুষ যাঁর তীর্থপর্যটনাদির সামর্থ্য আছে, তাঁকে 'বহুদক-সন্ন্যাসী' বলে।
তীব্রতর বৈরাগ্যবান্ পুরুষকে 'হংস-সন্ন্যাসী' বলে।
প্রত্যগাত্মজ্ঞান লাভ করতে অর্থাৎ
পরমেশ্বর ,ব্রহ্মচৈতন্যের জ্ঞান লাভ করতে, উপরক্ত তিনগুণের পরিণামরূপ ইহলৌকিক ও পরলৌকিক সর্ববিষয়ে যিনি তৃষ্ণারহিত্যরূপ পরবৈরাগ্য লাভ
(পর বৈরাগ্য হল সুখ এবং আত্মতৃপ্তির প্রকৃত উপায়ের উপলব্ধি)
করেছেন তাঁকে 'পরমহংস-সন্ন্যাসী' বলে।
এ চতুর্বিধ সন্ন্যাসীদের পক্ষে দশটি সাধারণ ব্রত আবশ্য পালনীয়।
যথা- ●অহিংসা, ●সত্য, ●অস্তেয়, ●ব্রহ্মচর্য, ●অপরিগ্রহ, ●অক্রোধ,
●গুরুশুশ্রুষা, ●শৌচ, ●নিষিদ্ধ আহার পরিত্যাগ এবং ●কায়মনোবাক্যদ্বারা প্রমাদবর্জন।
মহাভারতে বর্ণিত চারপ্রকার সন্ন্যাসীদের ভিত্তিকে অবলম্বন করে বৈদিক ধর্ম প্রচারের সুবিধার্থে শ্রীশঙ্করাচার্য দশপ্রকার সন্ন্যাসী সঙ্ঘ গড়ে তোলেন।
শ্রীশঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত ●সরস্বতী, ●ভারতী, ●পুরী, ●বন, ●অরণ্য, ●তীর্থ, ●আশ্রম,●গিরি, ●পর্বত এবং ●সাগর -এ দশপ্রকার সন্নাসীদের 'দশনামী-সন্ন্যাসী' নামে অবিহিত করা হয়। আলস্য ত্যাগ করে এ দশনামী-সন্ন্যাসীদের সদা সক্রিয় থাকার আদেশ দিয়েছেন শ্রীশঙ্করাচার্য তাঁর মঠানুশাসনে। ধর্মরক্ষার্থে তাঁর সকল সাঙ্গঠনিক রূপরেখা পাওয়া যায় মঠানুশাসনের শ্লোকগুলাতে।
"হে আমার সন্ন্যাসীবৃন্দ ( দশনামী), এই সময়ে ধর্মের মহতী হানি হয়েছে, তাই এই সময়ে সন্ন্যাসীদের ধর্মপ্রচারে মন্থরতা অবশ্য পরিত্যাজ্য। ধর্মপ্রচারে সর্বদা দক্ষতার আশ্রয় করবে অর্থাৎ আলস্য ত্যাগ করে ধর্মপ্রচারে সদা তৎপর হবে।
হে সন্ন্যাসীবৃন্দ তোমাদের বলছি, ধর্মপ্রচারে বিঘ্ন যতই অধিক হোক, উপযুক্ত অধিকারী, যথোক্ত গুণসম্পন্ন আচার্য থাকলে, কেউ কখনও আমার মঠ উচ্ছেদ করতে পারবে না। যেহেতু আমাদের ধর্মই সনাতন। অর্থাৎ উপযুক্ত উপদেশকেই সনাতন ধর্মের রক্ষক এবং ধর্মের প্রচারে উপযুক্ত উপদেশকের অভাব হইলে সেই মঠ অকর্মণ্য।"
শ্রীশঙ্করাচার্য চিন্তা করেছেন, এক প্রকারের সন্ন্যাসী দিয়ে সকল শ্রেণির মানবের কাছে বৈদিক ধর্মের প্রচার অসম্ভব।
শ্রীশঙ্করাচার্য অধ্যাত্ম পথের পথিক এবং সাধারণ গৃহীদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্য চার মঠের অন্তর্ভূক্ত একদল সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। ফলে ভারতবর্ষে তৈরি হয় শক্তিশালী এক সন্ন্যাসী সম্প্রদায়। ভারতবর্ষের অধিকাংশ ধর্মীয় মত, পথের সংগঠন এ চারমঠ এবং দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত।
সন্ন্যাসীর আত্মপরিচয় এই পর্যায়ে স্বামী বিবেকানন্দের বিবরণ থেকে জানা যায় ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ’ শ্রীপাদ শঙ্করাচার্যের শৃঙ্গেরী মঠের অধিভূক্ত একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান।গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতের প্রাণপুরুষ শ্রীগৌরাঙ্গদেব দুজন গুরুর কাছে মন্ত্রদীক্ষা এবং সন্ন্যাস নিয়েছিলেন; তাঁরা হলেন শ্রীঈশ্বরপুরী এবং শ্রীকেশব ভারতী। তাঁরা দুজনেই শৃঙ্গেরী মঠভূক্ত সন্ন্যাসী। এমনকি যে নামে শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমাদের মাঝে খ্যাত ‘শ্রীচৈতন্য’; এই ‘চৈতন্য’ নামটি শৃঙ্গেরীমঠভূক্ত ব্রহ্মচারীদের উপাধি। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যও শ্রীশঙ্করাচার্যের দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের পরম্পরাগত সন্ন্যাসী। বঙ্গের স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের 'ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ', নিগমানন্দ পরমহংসদেবের 'আসাম বঙ্গীয় সারস্বত মঠ' এর সন্ন্যাসীরাও শ্রীশঙ্করাচার্যের দশনামী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
বিভিন্ন প্রকারের সন্ন্যাসী স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শাশ্বত ধর্মের প্রচার করবে।
1>★.গিরি:
বাসো গিরিবনে নিত্যং গীতাধ্যয়নতৎপরঃ ।
গম্ভীরাচলবুদ্ধিশ্চ গিরিনামা স উচ্যতে॥(জ্যোতির্মঠান্নায়:৬)
"যিনি পার্বত্য গিরিকাননে বাস করে সর্বদা গীতা অধ্যয়ন করেন; গম্ভীর ও স্থিরবুদ্ধি, তাঁকেই 'গিরি' নামে অবিহিত করা হয়।"
যিনি 'গিরি-সন্ন্যাসী' তিনি পার্বত্য গিরিগুহায় বাস করে গম্ভীর ও স্থিরবুদ্ধি হয়ে সর্বদা গীতার চর্চা করবেন।
2>★পর্বত:
বসন্ পর্বতমূলেষু প্রৌঢ়ং জ্ঞানং বিভর্তি যঃ ।
সারাসারং বিজানাতি পর্বতঃ পরিকীর্ত্যতে ॥(জ্যোতির্মঠান্নায়:৭)
"যিনি পর্বতমূলে বাস করে দৃঢ়জ্ঞান ধারণ করেন, যিনি সার (নিত্য) ও অসার (অনিত্য) বিষয় সম্যক জানেন, তাঁকেই 'পর্বত' বলে অভিহিত করা হয়।"
যিনি 'পর্বত-সন্ন্যাসী' তিনি পর্বতমূলে বসবাস করে দৃঢ়জ্ঞান ধারণ করে নিত্য ও অনিত্য বিষয় অবগত হবেন।
3>★সাগর:
তত্ত্বসাগরগম্ভীরো জ্ঞানরত্নপরিগ্রহঃ।
মর্যাদাং নৈব লঙ্ঘ্যেত সাগরঃ পরিকীর্ত্যতে ॥ (জ্যোতির্মঠান্নায়: ৮)
"যিনি তত্ত্ববিষয়ে সাগরবৎ গম্ভীর, যিনি জ্ঞানরূপ রত্নের ধারণ করেন এবং বৈদিক শাস্ত্রমর্যাদা লঙ্ঘন করেন না; তাঁকেই 'সাগর' বলে অভিহিত করা হয়।"
তত্ত্ববিষয়ে সাগরের মত যিনি গম্ভীর, জ্ঞানরূপ রত্নকে যিনি ধারণ করেন এবং বৈদিক শাস্ত্রকে যিনি লঙ্ঘন করেন না, তাঁকে 'সাগর-সন্ন্যাসী' বলে।
4>★সরস্বতী:
স্বরজ্ঞানরতো নিত্যং স্বরবাদী কবীশ্বরঃ।
সংসারসাগরাসারহন্তাসৌ হি সরস্বতী॥
(শৃঙ্গেরীমঠান্নায়:৬)
"যিনি সর্বদা বেদের স্বরজ্ঞানে রত, স্বরোচ্চারণে দক্ষ ও কবিশ্রেষ্ঠ এবং অসার সংসার সাগরের হন্তা; তাঁকেই 'সরস্বতী' বলে।"
যিনি সর্বদা বেদের স্বরজ্ঞানে রত, স্বরোচ্চারণে দক্ষ, কবিশ্রেষ্ঠ এবং অসার সংসার সাগরের হন্তা তাঁকেই 'সরস্বতী-সন্ন্যাসী' বলে।
5>★.ভারতী:
বিদ্যাভরেণ সম্পূর্ণঃ সর্বং ভারং পরিত্যজন্ ।
দুঃখভারং ন জানাতি ভারতী পরিকীর্ত্যতে ॥(শৃঙ্গেরীমঠান্নায়:৭)
"যিনি সকল ভার পরিত্যাগ করে বিদ্যাভারের দ্বারা পরিপূর্ণ; এজন্য দুঃখভারকে জানেন না, তাঁকেই 'ভারতী' বলে।"
যিনি সকল ভার পরিত্যাগ করে বিদ্যাভারের দ্বারা পরিপূর্ণ; কোন প্রকার দুঃখভার যাঁকে স্পর্শ করতে পারে না তাঁকে 'ভারতী-সন্ন্যাসী' বলে।
6>★পুরী:
জ্ঞানতত্ত্বেন সম্পূর্ণঃ পূর্ণতত্ত্বপদে স্থিতঃ ।
পরব্রহ্মরতো নিত্যং পুরীনামা স উচ্যতে॥(শৃঙ্গেরীমঠান্নায়: ৮)
যিনি জ্ঞানতত্ত্বের দ্বারা পরিপূর্ণ, পূর্ণব্রহ্মপদে অবস্থিত এবং নিত্য পরব্রহ্মে নিমগ্ন ; তাঁকেই 'পুরী' বলে।
অখণ্ড জ্ঞানতত্ত্বে পরিপূর্ণ হয়ে সর্বদা পরব্রহ্মেপদে যিনি অবস্থিত, তাঁকেই 'পুরী-সন্ন্যাসী' বলে।
7>★.তীর্থ:
ত্রিবেণীসঙ্গমে তীর্থে তত্ত্বমস্যাদিলক্ষণে ।
স্নায়াত্তত্ত্বার্থভাবেন তীর্থনাম্না স উচ্যতে ॥(শারদামঠান্নায়: ৬)
"যিনি তত্ত্বমস্যাদিরূপ (তৎ, ত্বং,অসি) ত্রিবেণীসঙ্গমতীর্থে তত্ত্বার্থভাবে স্নান করেন অর্থাৎ তত্ত্বমস্যাদিপ্রতিপাদ্য বস্তু অবগত ; তাঁকেই 'তীর্থ' বলে।"
যিনি তৎ, ত্বং এবং অসি এ ত্রিপদরূপ ত্রিবেণীসঙ্গম তীর্থে স্নান করেন, তাঁকে 'তীর্থ-সন্ন্যাসী' বলে।
8>★.আশ্রম:
আশ্রমগ্রহণে প্রৌঢ় আশা-পাশ-বিবর্জিতঃ।
যাতায়াতবিনির্মুক্ত এষ আশ্রম উচ্যতে ॥ (শারদামঠান্নায়:৭)
"যিনি সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণে সামর্থ্যযুক্ত, যিনি আশারূপ বন্ধনশূন্য ও সংসারের গতাগতি বিরহিত; তাঁকেই 'আশ্রম' বলে।"
যিনি সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণে সামর্থ্যবান আশারূপ পাশ বিবর্জিত ও সংসারের গতাগতি বিরহিত, তাঁকে 'আশ্রম-সন্ন্যাসী ' বলে।
9>★. বন:
সুরম্যে নির্জনে স্থানে বনে বাসং করোতি যঃ।
আশাবন্ধবিনির্মুক্তো বননামা স উচ্যতে॥ (গোবর্দ্ধনমঠান্নায়:৬)
"যিনি অতি রমণীয় নির্জনস্থানরূপ বনে বাস করে সমস্ত আশাবন্ধন হইতে নির্মুক্ত ; তাঁকেই 'বন' বলে অভিহিত করা হয়।
রমণীয় নির্জনস্থানরূপ বনে বাস করে যিনি সমস্ত আশাবন্ধন হইতে নির্ম্মুক্ত হন, তাঁকেই 'বন-সন্ন্যাসী ' বলা হয়।
10>★. অরণ্য:
অরণ্যে সংস্থিতো নিত্যমানন্দে নন্দনে
বনে।
ত্যক্ত্বা সর্বমিদং বিশ্বমরণ্যং পরিকীর্ত্যতে ॥(গোবর্দ্ধনমঠান্নায়:৭)
"সমগ্র বিশ্ব পরিত্যাগ করে যিনি সর্বদা আনন্দময় নন্দনবন সদৃশ অরণ্যে বাস করেন; তিনিই 'অরণ্য' নামে কীর্তিত।"
এ সমুদায় বিশ্ব পরিত্যাগ করে আনন্দময় নন্দনবন সদৃশ অরণ্যে যিনি সর্বদা বাস করেন, তাঁকে 'অরণ্য-সন্ন্যাসী' বলে।
প্রাচীনকালের সঙ্ঘের ধারণা যা ছিল, বিচ্ছিন্ন, অপূর্ণাঙ্গ এবং প্রয়োগহীন। তাকে
শ্রীশঙ্করাচার্য প্রবর্তিত সঙ্ঘ ধর্ম রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন এবং সনাতন ধর্ম রক্ষায় সঙ্ঘের পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেন।
‘শঙ্কর মঠ’ কোন একক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ভারতবর্ষের চারপ্রান্ত থেকে চারটি মঠের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।
(যা প্রবন্ধের প্রথমেই বর্ণনা করা হয়েছে।)
এই চারটি মঠ সনাতন ধর্ম রক্ষায় চারটি দুর্গের ন্যায়।
●সিন্ধু, সৌবীর, মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমাঞ্চলের জন্য শারদা মঠ;
●অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ, উৎকল, গৌড়, সুক্ষ্ম, পৌণ্ড্র, ব্রহ্মপুত্র তীরবাসীসহ সমগ্র পূর্বাঞ্চলের জন্য গোবর্দ্ধন মঠ;
●কুরুক্ষেত্র, কাশ্মীর, কম্বোজসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের জন্য জ্যোতি মঠ এবং
●অন্ধ্র, দ্রাবিড়, কর্ণাট, কেরল প্রভৃতি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য শৃঙ্গেরী মঠ।
★"অহং ব্রহ্মাস্মি",
★"প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম",
★"তত্ত্বমসি" এবং
★"অয়মাত্মা ব্রহ্ম"
বেদের এ চারটি মহাবাক্যকে অবলম্বন করে সংস্থাপিত হয় চারটি মঠ। শ্রীশঙ্করাচার্য এ চার মঠের আচার্য হিসেবে নিযুক্ত করেন, সুরেশ্বর, পদ্মপাদ, তোটক এবং হস্তামলক শ্রেষ্ঠ চার শিষ্যকে। এ চার শিষ্য চার মঠের প্রধান হয়ে, চার বেদের পূর্ণাঙ্গ বৈদিক জীবন বিধানের শিক্ষা দিতে থাকেন দিকে দিকে। ফলে সনাতন সমাজ একটি সুদৃঢ় সাংগঠনিক রূপ পায়।
ভারতবর্ষের অধিকাংশ সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ই
শ্রীশঙ্করাচার্যের দশপ্রকার সন্নাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
(সংগৃহীত)
===========================
■★★★★★★★★★★★★★■
62/5>আদি শঙ্করাচার্যের দশনামী আখড়া ::---
দশনামী আখড়া নাম করণের সার্থকতা এই কারণে যে এই আখড়া দশটি
শৈব সম্প্রদায়ের অন্তর্গত আখড়া, যা দশ নামের ঐতিহ্যে ভিত্তি করে গঠিত। এটি একটি হিন্দু সন্ন্যাসী ঐতিহ্য। দশনামী আখড়ার অন্তর্গত রয়েছে ●জুনা আখড়া, ●নিরঞ্জনী আখড়া, ●আনন্দ আখড়া, ●অটল আখড়া, ●আবাহন আখড়া, ●অগ্নি আখড়া ইত্যাদি।
দশনামী সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য:
দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের একদণ্ডী সন্ন্যাসী বলা হয়।
এই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা শৈব ত্রিশূলধারী এবং বৈষ্ণব ত্রিদণ্ডী সন্ন্যাসীদের থেকে আলাদা।
ভারতীয় দার্শনিক আদি শঙ্করাচার্য এই সম্প্রদায়ের পুনঃসংগঠন করেছিলেন।
দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা সাধারণত অহিংসার মধ্যে থাকেন।
কিছু দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা ভারতীয় কুস্তি খেলার অনুশীলন করেন।
দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা ব্রহ্মচর্য এবং বস্তুগত সম্পদ ত্যাগ করেন।
দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা ধর্ম রক্ষার জন্য অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ।
দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা যে মঠে বাস করেন, সেগুলিকে দশনামী আখড়া বলা হয়।
আখড়া বলতে অনুশীলনের জায়গা, ধর্মীয় ত্যাগীদের জন্য সম্প্রদায় মঠ.
দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের দশটি নামে পরিচিতি থাকে।
ভারতীয় দার্শনিক আদি শঙ্করাচার্য এই সম্প্রদায়টি পুনঃসংগঠিত করেছিলেন।
দশটি নাম যারা একদণ্ডী ঐতিহ্যে সন্ন্যাসে প্রবেশ করে তারা এই সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত দশটি নামের একটি গ্রহণ করে:
●গিরি, ●পুরী, ●ভারতী, ●বন/বান, ●অরণ্য, ●সাগর, ●আশ্রম,●সরস্বতী, ●তীর্থ ও●পর্বত। অদ্বৈত বেদান্ত ও দ্বৈত বেদান্তের সন্ন্যাসীরা একদণ্ডী ঐতিহ্যের অন্তর্গত।
এই নামগুলির ভিত্তিতেই এই সম্প্রদায়ের নামকরণ করা হয়।
দশনামী সম্প্রদায় অদ্বৈত বেদান্ত ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত একদণ্ডী সন্ন্যাসীরা অনুশীলনে 'শৈব ত্রিশূলধারী' এবং 'বৈষ্ণব ত্রিদণ্ডী' সন্ন্যাসীদের থেকে আলাদা।
মহাকুম্ভে তথা ...সারা দেশে মোট ১৩টি আখড়া রয়েছে, যেগুলো তিনটি ভাগে বিভক্ত। এই আখড়াগুলি হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত আচার-অনুষ্ঠান এবং উৎসবগুলি আয়োজন করে।
বর্তমানে আখড়ার গুলি হল দশনামী নাগের---
1>জুনা আখড়া , 2>নিরঞ্জনী আখড়া , 3>আনন্দ আখড়া , 4>অটল আখড়া , 5>আবাহন আখড়া , 6>অগ্নি আখড়া এবং 7>প্রয়াগরাজের নির্মল পঞ্চায়েতি আখড়া । প্রতিটি আখড়ার আছে উপ-শাখা ও ঐতিহ্যে বিভক্ত।
যেমন জুনা নাগা স্থাপনার নগ্ন সাধুদের দত্তাত্রেয় আখড়া (উজ্জয়ন)।
নাগ সাধুরা সাধারণত অহিংসার পরিধিতে থাকেন, যদিও কিছু অংশ ভারতীয় কুস্তি খেলা অনুশীলন করার জন্যও পরিচিত । দশনামী সন্ন্যাসীরা অহিংসা , সত্য , অস্তেয় (চুরি না করা), অপরীগ্রহ (লোভ না করা) এবং ব্রহ্মচার্য (ব্রহ্মচর্য / সংযম) এর বৈদিক এবং যোগিক যম নীতি অনুশীলন করেন।
==========================
মহাসমাধি:-শ্রী আদিশঙ্করাচার্য
৮২০ খ্রিস্টাব্দ মাত্র ৩২ বছর বয়সে
কেদারনাথ , মতান্তরে রামেশ্বরমে।
দৈবিক যোজনাতে সমাধিস্থ হন।
★★★★★★★★★★★★
কুম্ভ কখন কোথায় হয়::----
হরিদ্বারে একবার কুম্ভ হয়ে গেলে তার ছয় বছরের মধ্যেই বাকি তিনটি তীর্থে কুম্ভ সম্পন্ন হয়।
হরিদ্বার ও প্রয়াগে অর্ধকুম্ভ ও হয়।
এই যোগ অর্ধপরিমান ফলদায়ী।
=====================
No comments:
Post a Comment