Saturday, December 5, 2020

60>|| অযোধ্যা পাহাড় ||12/11/1984 to 15/11/1984=4 days

     


60>|| অযোধ্যা পাহাড় || 12/11/1984 to 15/11/1984=4 days 

                  <--©➽--আদ্যনাথ-->


এবার আমাদের ভ্রমন  পুরুলিয়ার 

অযোধ্যা পাহাড় ।

আমার সমগ্র চাকুরী জীবন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে।সুদূর মারাঠা থেকে ঝাড়খন্ড পর্যন্ত।

আর নিজের মতন ঘুড়ে বেড়িয়েছি, বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে। এমনি চাকুরী করতে করতে 1984 তখন আমি ধানবাদে কোলইন্ডিয়ার, বি সি সি এল, এর আন্ডারে এরিয়া থ্রী তে কাজ করি।

এমনসময় একদিন বলরামের সাথে আলাপ হল । বলরাম আমাদের এখানে ডাম্পার অপারেটর ।একদিন আমরা একই বাসে যাত্রা করছিলাম।আমি যাব টাটা মানগোতে আর বলরাম যাবে ওর বাড়ি ঝালদা তে।

বলরাম বলছিল যে ওর বাড়ি অযোধ্যা পাহাড়ের কাছে। আর সেই কারণেই 

আমি ঠিক করলাম কজন মিলে  অযোধ্যা পাহাড় বেড়াতে যাব। 


অযোধ্যা পাহাড় দলমা পাহাড়ের একটি অংশ এবং পূর্বঘাট পর্বতমালার একটি সম্প্রসারিত অংশ। এই পাহাড়ের উচ্চতম শৃঙ্গ হল গোরগাবুরু। অন্য আরেকটি শৃঙ্গ হল মায়ুরি। আসলে এটি ছোট নাগপুর অঞ্চলের একটি অংশ, অযোধ্যা পাহাড় তার সবচেয়ে নীচু ধাপ। এর সবচেয়ে কাছের শহর হল বাঘমুন্ডি। বাঘমুন্ডি সহ অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন সমস্ত অঞ্চল হল মালভূমির অংশবিশেষ। এই পাহাড় ট্রেকিং শেখার জন্য আদর্শ জায়গা, যারা নবিশ ট্রেকার- তারা এই পাহাড়ে প্রায়শই অনুশীলনের জন্য আসেন।


অযোধ্যা পাহাড়ের নামকরণের ইতিহাস এইরকম-----

হিন্দু পুরান রামায়ন অনুযায়ী, রাম ও সীতা বনবাসের সময়ে এই পাহাড়ে এসেছিলেন। এক দিন সীতা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে রাম তীর দিয়ে মাটির ভিতর থেকে জল বের করে আনেন। এই কারণেই এই পাহাড়টির নাম হয় অযোধ্যা পাহাড়। যেই কুণ্ডটি এর ফলে সৃষ্ট হয়, তার নামকরণ করা হয়েছে সীতাকুণ্ড।


আজ অযোধ্যা পাহাড়ের পরিচিতি অনেক, পাহাড় জঙ্গলের উন্নতিও হয়েছে অনেক।

কিন্তু সেই 1984 সালের অযোধ্যা পাহাড় 

আর আজকের অযোধ্যা পাহাড়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক।

সেদিনের জঙ্গলের মানুষ দারুন দারিদ্রতার মধ্যে বাস করত, কিন্তু তাদের প্রাণ ছিল উদার । তারা প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে এক হয়ে থাকতো।সেদিনের মানুষ নিজেকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করে ভাবতো না। আজও তাঁরা আছে ।

আজকের মানুষ শুধু প্রকৃতি থেকে নিতে জানে। প্রতিদানে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে।

নিজেদের স্বর্থ নিয়েই চলে।

তাই সেদিন যে পাহাড় ছিল জঙ্গলে পূর্ন, আজ যেই স্থানে সুন্দর রাস্তা, দোকান পাট,কত হোটেল, লজ,রিসোর্ট,কতকি।

এখন জঙ্গল মহল অনেক সুন্দর হয়েছে।

কিন্তু সেই প্রাণ হারিয়েছে।


সে যাইহোক আমি সেই 1984 সালের  অযোধ্যা পাহাড়ের সামান্য একটু লিখতে বসেছি।

বলরাম বললো অযোধ্যা পাহাড়ের ঝর্ণা গুলো দেখবার উপযুক্ত সময় নভেম্বর মাস। তবে তখন কিন্তু রাত্রে বেশ ঠান্ডা লাগবে।

আমরা ভেবে ছিলাম ধানবাদে থেকে গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে যাব। বলরাম বললো ওর মামার   দুটো জিপ গাড়ি আছে।

দুটো জিপই ওরা টুরিস্ট গাড়ি হিসাবে চালায়। বলরাম আর ওর এক ভাই বুধন দুজনেই আমাদের সাথে থাকবে, আর থাকা খাওয়ার কোন চিন্তা করতে হবেনা ।

আমরা রোজ ওদের বাড়ি থেকেই পাহাড় দেখতে যাব। কারন তখন দু একটি হোটেল ছিল কিন্তু সেখানকার খাওয়া দাওয়া তেমন ভালো নয়। সেই কারণে

ওরাই সকল ব্যবস্থা করবে।প্রয়োজনে ওদের জানাশোনা হোটেল আছে, সব জায়গাতে।

      1=প্রথম দিন::-------


আমরা চার জন আর বলরাম ও তার ভাই এই মোট 6 জন-

( -আমি নিজে, -শম্ভু সিং,

শংকর তিওয়ারী, রাজনাথ হালদার।

 বলরাম মাহাতো আর ওর তার ভাই বুধন মুর্মু )


নভেম্বরের মাঝা মাঝি আমরা চার জন ও বলরাম ,এই পাঁচ জন চাষ বোকারো থেকে বাস ধরে পুরুলিয়ার বলরাম পুরে পৌঁছলাম।

বলরাম পুরে পৌঁছেই বুঝতে পারলাম  বলরাম এবং ওর ভাই বুধনের বিশাল পরিচিতির বহর।

আমরা যখন বাস স্টান্ডে পৌঁছলাম তার আগেই ওদের গাড়ি স্টান্ডে হাজির ছিল।

সত্যি দেখলাম একদম নুতন সুন্দর জিপ গাড়ি।

আমাকে তো এইরুটে এনেক বার যাতায়াত করতে হতো । কারন আমি চাকুরী করতাম ধানবাদের কাত্রাস এলাকায়। আর আমার শ্বশুরবাড়ি টাটা মানগোতে । কাত্রাস থেকে  কাছেই বোকার স্টিল প্লান্ট।

তারপরে পুরুলিয়া। পুরুলিয়ার পরে বলরাম পুর। ঝালদা, চান্ড্রিল, তারপরেই টাটা।আর এই রুটে বেশ কটি বাস চলে নিয়মিত ভাবে।

সেইকারনে আমাকে প্রায়ই এই রুটে যাতায়াত করতে হতো। যাইহোক সেদিন আমরা বলরাম পুরে পৌঁছলাম সকাল নটায়। সেখান থেকে বলরাম আমাদের

নিয়ে গেল ওদের বাড়িতে ঝালদায়।

ওদের  বাড়ি বেশ বর ও কিসুন্দর । মাটির বাড়ি কিন্তু এত সুন্দর সাজানো গোছানো।

ওদের বাড়ি থেকেই দেখা হচ্ছে পাহাড়।

সবুজে সবুজে পরিপূর্ন।

আমরা পৌঁছতেই ওর বাড়ির সম্পুর্ন পরিবার বেরিয়ে এসে আমাদের আপ্যায়ন 

করলো।

বলরাম বললো আজ দুপরের খাবার খেয়ে তারপরে সাইট সিন দেখতে বের হবে।

দিনের বেলা খাবারের এলাহী ব্যাপার 

 ওদের নিজের পুকুরের মাছ। নিজেদের 

পোষা মুরগি ও তার ডিম। 

দিনের বেলা বিশাল ভুঁড়ি ভোজের পরে আরকি বেড়াতে মন চায়। তাই প্রথম দিন ওদের গ্রাম টা ঘুড়ে দেখলাম।

প্রত্যেক বাড়িতেই দেখলাম ইয়া তাগড়া তাগড়া মোরগ।বিশাল তার সাইজ।

জানলাম প্রতি রবিবার ওদের হাটে এই সকল মোরগের লড়াই হয়।

তাতে আবার বাজি ধরে খেলা চলে।

ওদের বিখ্যাত খেলা মোরগ লড়াই।

এবার আমরা গেলাম ঝালদা বাজারে,

ও ঝালদার প্রত্যন্ত গ্রামে।যেখানে জঙ্গলের মাজে মাজে একটি কি দুটি করে বাড়ি। তবুও প্রতিটি বাড়ি দেখবার মতন সুন্দর।

আর  দেখি অনেক বাড়িতেই কারখানা পেতল কাঁসার বাসন তৈরি হচ্ছে।

এখান থেকেই নাকি বহু জায়গাতে পেতল কাঁসার বাসন যায়। এখানে দামটাও একটু কম।

ঘরে ঘরে মেয়েরাও কাজে হাত লাগায়।

বেশ কিছু বাড়ির মেয়েদের দেখলাম 

বিড়ি বানাচ্ছে। কেন্দু পাতার মধ্যে বিড়ির মসলা পুড়ে শুতো দিয়ে বেধে দিচ্ছে।

কি নিপুন হাতের কাজ দেখে চোখ ফেরান যায় না।

আজ ইন্টারনেট ঘেঁটে জানলাম আজকের পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের টুরিস্ট স্পটগুলি এইরকম।  লহরিয়া, আপার ও লোয়ার ড্যাম, পাখি পাহাড়, ময়ূর পাহাড়, মার্বেল লেক, বামনী ফলস, তুরগা ড্যাম, খয়েরবেরা ড্যাম, মুরগুমা ড্যাম এবং দেউলঘাটা,

চরিদা মুখোশ গ্রাম,

এগুলি  এছাড়াও আরও অনেক দেখার মতন স্পট আছে ।

সেদিন সেই 1984 সালেও এই জায়গা গুলি ছিল। তবে সব জায়গাতে যাবার মতন রাস্তা ছিল না। কারন তখনও এত স্পটতৈরি হয়নি। সেই কারণে সেদিন অনেক স্থানই দুর্গম ছিল।

=========================

   2=দ্বিতীয় দিন::-------

আমরা পরের দিন সকলে উঠেই রওনা দিলাম পাহাড়ের দিকে।

বুধন ও বলরাম ওদের সাথে করে তির ধনুক, টাঙি, ও কাটারী নীল।

আমি বললাম এগুলি কি হব?

বুধন বললো এখানে আমরা ঘর থেকে বাইরে বের হলেই সাথে এগুলি রাখতে হয়। কে জানে কখন কোন কাজে লাগে।

তার ওপরে আজ আপনার আছেন যদি 

কোন বিপদ আসে পথে তবে।

আমি বললাম বিপদ মনে কি আশা করছো?

বুধন বললো দুদিন আগেও ঠাকুর নেমেছিল । আমি বললাম ঠাকুর মনে কি?

বুধন বুঝিয়ে বললো যে ওরা হাতিকে ঠাকুর বলে। তাই ঠাকুর নেমেছিল মনে একদল হাতি পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল।

তাছাড়া এখানে প্রাই হয়না ও চিতা বাঘের উপদ্রব হয়। সেই কারণে নিজেদের বাঁচাতে কিছু অস্ত্র সাথে রাখতেই হয়।

আমাদের গাড়ি এগিয়ে যেতে যেতে

প্রথমে দেখি খানিকটা নেরা পাহাড়ের মতন দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট এক বা দুইটি পাহাড় আর পুরো এলাকা নানান 

রঙের পাখির কিচির মিচির।

অপূর্ব সব পাখি।

 অনেকেরই পাখিরই নাম জানিনা।

 এবার গেলাম  ছোটোখাটো একটা গ্রামে। গ্রামটির নাম চড়িদা গ্রাম।

লাম অযোধ্যা পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কোথাও কোথাও পাহাড়ের পর্যটন ক্ষেত্রগুলির পথ নির্দেশক বোর্ড রয়েছে। কিন্তু এই চড়িদা গ্রামের বিষয়ে জানতে এখানকার মানুষের কাছে বার বার জিজ্ঞাসা করে পৌঁছতে হয়েছে এই চরিদা

গ্রামে।

ছৌ-নাচের দলগুলি ঝাড়খণ্ড, ওডিশা থেকে এসে চড়িদার মুখোশ কিনে নিয়ে যায়।

এখানেই জানলাম অযোধ্যা পাহাড়ের প্রাচীন নাম ছিল অঝোইদা। ‘অঝোই’ শব্দের অর্থ অঝোর, দা শব্দের অর্থ ‘দহ’ বা ‘হ্রদ’। পাহাড়ের প্রচুর ঝরনা, মাটির নীচে জলের অফুরন্ত উৎস দেখে অনেকে বলেন, অঝোর জল দেখে অঝোইদা নাম দেওয়া হয়েছিল। তেমনইএই চড়িদা গ্রামেও দা বা দহ শব্দটি আছে। এই গ্রামে প্রচুর জল রয়েছে ভূগর্ভে। তাই এখানকার মানুষ আগে পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ছিলেন। সূত্রধর পরিবারগুলি কাঠের কাজ করতেন। কেউ কেউ মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছৌ-নাচের হাত ধরে এখানে মৃৎশিল্পের বিকাশ ঘটে। এই কাজে 

গম্ভীর সিং মুড়ার অবদান অস্বীকার করেন না শিল্পীরা।

(গম্ভীর সিং মুড়া,১৯৩০- ৯ নভেম্বর ২০০২ একজন ভারতীয় ছৌ নাচ শিল্পী ছিলেন যিনি তার নৃত্যকুশলতার জন্য ভারত সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন।)

এখানে বেশ কটি দোকানও আছে আর প্রত্যেক দোকানে সাজানো নানারঙের নানান বেশের মুখোশ। কোনওটা দু্র্গা তো কোনওটা অসুর, এমন কত কি আবার কোনটা দেখলাম  গণেশ তার পাশে সাঁওতাল বর-বউয়ের মুখোশ। 

কিছু শিল্পী মানুষ  বসে কাগজের মণ্ড আর আঠা দিয়ে রংবেরঙের মুখোশ বানাচ্ছেন। প্রায় ২০০ বছর আগে নাকি বাঘমুন্ডি রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ছৌ-নাচের উৎপত্তি। পুরাণে বর্ণিত নানা দেবদেবীর গল্প বলে ছৌ-নাচ। আর তা ওই মুখোশ আর শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতায় গুনেই এটি আরও সুন্দর হয়ে ওঠেছে।

আজতো ছৌ-নাচ পৃথিবী বিখ্যাত নাচ। 

এর পরে রাস্তা পাহাড়ের পথে একে বেঁকে

এগিয়ে চলেছে।

খাড়াই পথ ধরে ছুটছে গাড়ি। 


এক জায়গায় সংকীর্ণ এবং পাশেই পাথরের খাদ তাই গাড়ি সাবধানে চলছিল। 

 নীচে দেখি পরিষ্কার নীল জল। ছবির মতোই সুন্দর নীচের গ্রামগুলো। জানলাম  এটা লোয়ার ড্যাম। বামনিঝোরাকে বাঁধ দিয়েই তৈরি হয়েছে এই ড্যাম। আরও একটু উপরে উঠে পৌঁছলাম আপার ড্যামে। প্রায় দেড় কিলোমিটারেরবেশি দৈর্ঘ্যের এই ড্যামের জলের রংও উজ্জ্বল নীল। এখানে  প্রচন্ড হাওয়ার বেগ যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তার মধ্য দিয়ে পৌঁছলাম একটু খালি পরিষ্কার জায়গাতে গাছের নিচে ।

সকালে বের হবার সময় ওরা সাথেকোরে কিছু খাবার পরোটা সবজি আর আমের আচার।আর খাবার জন্য জলও নিয়ে এসেছিল।

আমরা সবাই মিলে গাছের নিচে বসে খাবার খেলাম।

খাবার খাবার পরে বুধন গাড়ি নিয়ে একটু

এগিয়ে গিয়ে এক ফ্লাক্স গরম চা নিয়ে এলো এক দোকান থেকে।

আমরা চা খেয়ে এখানে বসে  বস্থা পেতে ঠান্ডা হাওয়ায় একটূ গা এলিয়ে দিলাম।

প্রায় তিন ঘন্টা বিশ্রাম করে আবার রওনা দিলাম ।

আধা ঘন্টা যাবার পরে আর রাস্তা নাই তাই কিছুটা হেটে যেতে হবে সীতাকুণ্ডে যাবার জন্য। দেখলাম পাহাড়ের  ভিতর ছোট্ট একটা প্রস্রবণ। কথিত আছে, রামচন্দ্র বনবাসের সময় এখানে কিছু দিন আত্মগোপন করেছিলেন। সে সময় একদিন সীতা দেবীর জল তৃষ্ণা পেলে রামচন্দ্র নিজে তির মেরে ভূমি ভেদ করে জল বের করে সীতার তৃষ্ণা মিটিয়েছিলেন 

স্থানীয় আদিবাসী দের কাছে ভারী পবিত্র এই জায়গা, সীতাকুন্ড। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে স্থানীয় আদিবাসীরা এখানে বন্য পশু শিকার উৎসবে যোগ দেয়।

আশেপাশের সকল আদিবাসীরাই এই বৈশাখী পূর্ণিমার দিন এখানে এসে  শিকার করে ও পুজো দেয়।


এরপরে আরো একটু উৎরাইয়ে নেবে আবার চোরাইতে চড়ে হেটে পৌঁছলাম

ময়ূর পাহাড়, অযোধ্যা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু টিলা এটি। ব্যাপারটা বলা সহজ হল কিন্তু এক পরের চূড়া থেকে আরেক পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে আমাদের অবস্থা খাস্তা। তবুও বিকেলের মায়াবী আলোয় সূর্য ডোবে এখানে। আর খানিকটা উঠলেই একটা ছোট ভাঙা চূড়া মন্দির  হনুমানজী র মন্দির। 

মন্দিরের পাশে থেকে সূর্যাস্ত দেখা।

সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। সেই সৌন্দর্য 

লিখে বর্ণনা করার মতন ক্ষমতা আমার নাই।

তবে বলতে সেদিন যা দেখেছিলাম

আজও সেই ছবি মনের ভিতরে গেঁথে

আছে।

সন্ধ্যা হতেই আমরা নিচে নেমে আসলাম।

বুধন বললো অন্ধকার হয়ে গেলে শ্বাপদ সঙ্কুল জঙ্গলের পথে চলা অসুবিধা হতে পারে, তাই আমরা আর দেরি না করে খুব 

তাড়াতাড়ি নেমে এলাম।

আসতে আসতে রাস্তায় দেখলাম এক জায়গাতে হেজাক ও কার্বাইটের লাইট জ্বলছে।বুধন বললো ওগুলি আদিবাসী বাজার বা হাট।

দেখতে পারেন ,আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম আদিবাসী হাট ।

বহুদিন পরে এখানে খেলাম গুড়ের কটকটি, বাদাম চিনি।

এরপরে ফিরলাম বুধনদের বাড়িতে।

==========================


     3=তৃতীয় দিন::------

পর দিন সকালে

 

 রাঙামাটির রাস্তা ধরে বেরিয়ে  পরে দেখলাম মার্বেল খাদান যার বর্তমান নাম মার্বেল লেক। 

এখান থেকেই প্রয়োজন মতো পাথর কেটে নিয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে আসে পাশের বাঁধগুলি। আর লেকের  সামান্যই দূরে বামনি ফলস। গাড়ি থেকে নেমে বেশ খানিকটা জঙ্গল ও  অনেকটা পাথুরে পথ হেটে জল প্রপাত। এমনি চড়াই-উতরাই বেয়ে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দেখা মিলল বামনি ফলসের। উপরের দিকে খাঁড়া পাথরের খাঁজ বেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অশান্ত বামনি নদী।


আমরা আরও  একটু এগোলাম মূল ঝরনার  দিকে। সেখানে প্রায় তিন ধাপে অনেকটা উপর থেকে পাহাড়ের শরীর কেটে নেমে আসছে ঝরনার জল। 

ঝর্ণার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কত পাখি,

গাছে গাছে প্রচুর কাঠ বেড়ালী,

পথ পার হতে দেখলাম খয়েরী রঙের বড় বড় খরগোশ।

এই বামনি ফলস থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরেই টুর্গা ফলস।আমাদের

মধ্যে দুজন রাজনাথ ও শম্ভু আর এগোতে রাজি না হওয়ায় আমরা চার জন, আরো খানিকটা এগিয়ে গেলাম।

হঠাৎ দেখি কয়েকটা হরিণ দৌড়ে পালালো।

বামনির মতো বড় না হলেও দিব্যি সুন্দরী টুর্গা। তার জলকে বেঁধেই তৈরি হয়েছে টুর্গা ড্যাম। অনেকটা খাড়াই পথ ওঠানামার পরিশ্রমে ক্লান্ত লাগছে। 

আর বুঝলাম সকাল বেলায় যা খেয়েছিলাম তা সবটাই হজম হয় এখন আবার ভীষণ খিদে পেয়েছে। তাই ফিরতে হল গাড়ির কাছে।

আজকের খাবার মাংস ভাত ও ভেন্ডি ভাজা।

আমরা দিনের খাবার খেয়ে ,

গাড়ির পাশে গাছের ছায়াতে আরাম কিরছিলাম।

হঠাৎ বুধন একটা লাঠি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।আমরাও দেখলাম চারটে নেকড়ে দৌড়ে পালালো।

বিকেলে আমরা গেলাম মুরগুমা লেক। 

গাড়িতে একটু যাবার পর আর রাস্তা নাই সামনে বড় বড় পাথর তাই আমরা হেটেই রওনা দিলাম লেকের দিকে।

বেশ গোলকধাঁধার মতো রাস্তা,

শেষে পৌঁছে গেলাম নির্জন পাহাড়ের ঢালে। চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, শুধু চলার পথে শুকনো পাতা পাড়ানোর শব্দ

দূরে দেখা যাচ্ছে মুরগুমা লেক।

আমরা আজ আর ওদিকে নাগিয়ে

জঙ্গলে ধীর পায়ে হেটে হেটে কিছু বন্য জন্তুর উপস্থিতি টের পেতে চাইলাম।

দেখলাম ঝাঁজে ঝাঁকে মউর আর নানান জাতীয় পাখি।

এখন থেকে আমরা সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম।

==========================


       4=চতুর্থ দিন::---


জেনেছিলাম মুরগুমা ড্যামের সূর্যদয় নাকি অপূর্ব। দেখার মতন।

আমরা সেই মতই শেষ রাত্রেই রওনা দিলাম। আমরা জখন রওনা দিলাম    তখন চারিদিক অন্ধকার।

শুধু জিপের আলো সেই গভীর নিকষ অন্ধকারকে খান খান করে ভেঙে নিজের পথ ধরে আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

আমরা শীতে কম্বল মুড়ে বসেও যেন কাঁপছি। তবুও দেখতেই হবে সূর্যোদয়।

আমরা পৌঁছে গেলাম মুরগুমা গ্রাম ।

এত সকালেও দেখি মেয়েরা ঘর উঠোন লেপাই পোতাই তে ব্যস্ত।

 আদিবাসীদের সুন্দর সাজানো নিকোনো বাড়ি উঠোন পার করে আমরা ছুটে চললাম মুরগুমা ড্যামের দিকে। 

দেখলাম কিছু শেয়াল জাতীয় কিছু 

রাস্তা পার করছে।

বুধন সঙ্গে করে চার ব্যাটারির তিনটি টর্চ সঙ্গে এসে ছিল।আর তির ধনুকতো ওদের সর্বক্ষণের সাথী।  টর্চের আলো ফেলতেই শেয়াল গুলি একসাথে অদৃশ্য হয়ে গেল।এত ভোরেও পাখিদের কলতানে মুখর চারিদিক।

হঠাৎ দেখি কিছু হনুমান গাছ থেকে নেমে আসছে নিচের দিকে। এখন থেকেই নিচের গাছগুলিতে ওদের দাপাদাপি শুরু।

সামনে আর যাওয়া যাবেনা কারন কিছু বড় বড় বোল্ডার পথে পরে আছে ওগুলো

সরানো এখন সম্ম্ভব নয়। তাই আগের রাস্থা টুকু আমাদের হেটেই যেতে হবে।

চারিদিকে ঝড়া পাতা, সেই ঝড়া পাতার 

উপড়দিয়ে হেটে চলেছি। পাতার খস খস আওয়াজ। হাতের কাঠি দিয়ে আগে পাতা সরিয়ে তারপরে পা ফেলতে হচ্ছে কারন সাপ বিছা থাকতে পারে পাতার নীচে।

একমাত্র বুধন ছাড়া আমরা কেহই গামবুট

পরে নাই।তাই খুব সাবধানে পাতা সরিয়ে টর্চের আলোতে ভালোকরে দেখে দেখে পা ফেলতে হচ্ছিল।

পাতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইঁদুর ও খরগোশ আমাদের দেখেই ভয়ে পালাচ্ছিল। যদিও ওদের দেখে  আমাদেরও ভয় লাগছিল।ওদিকে বানরের উৎপাত বেড়েই চলেছিল। হাতের লাঠি দেখে একটু দূরে দূরেই থাকছিলো। এমনি ভাবে চলতে চলতে অন্ধকারে আমরা কোথায় কতদূর পৌঁছেছি সেটাও বুঝতে পারছিলাম না।

চারিদিকে সুদু বিশাল বিশাল গাছ।

শাল সেগুনে  বহেরার জঙ্গল। একসময়

বুধন  আমাদের নিয়ে গিয়ে বাঁধের এক ধারে এক জায়গাতে  দারকরিয়ে দিলো।

এবং দিক নির্দেশ করে এখান থেকেই ওই দিকে তাকিয়ে থাকতে বলল।

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে হঠাৎ দেখি সামনের পাহাড়ের মাথার উপরে কেযেন পড়তে পড়তে লাল রঙ ছড়িয়ে দিয়ে গেল। একটু পরেই লাল হলুদের মেলা। মনেহচ্ছিল কোন আর্টিস্ট তুলি দিয়ে নিজের মনের মতন করে আকাশ পাহাড় জঙ্গল ড্যামের জল সবকিছুকে 

রাঙিয়ে দিচ্ছে।

আর সেই রক্তিম আকাশের প্রতিচ্ছবি

সামনের বিশাল শান্ত জল রাশিতে পড়ছে। কি অপূর্ব ছবি।

হঠাৎ যেন একঝাঁক পাখিদের ঘুম ভেঙে গেল, তারা কিচির মিচির করে চারিদিক মুখুর করে তুলল।


কি অপূর্ব সেই শোভা। আজ সার্থক  আমাদের অযোধ্যা পাহাড় ভ্রমণ।

ওখানে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে আমরা 

ফেরার জন্য ব্যস্ত হলাম।কারন প্রচন্ড ঠান্ডা হওয়া।যেন হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

এত সকালে একেবারেই নিরিবিলি। কখনও কদাচিৎ এক আধটা গ্রাম্য মানুষজন চোখে পড়ছে। সকালের আলোয় বড়ই মোহময়ী দেখাচ্ছে মুরগুমাকে। বিশুদ্ধ প্রকৃতির মাঝে ড্যাম ও জলাধারের অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য প্রাণ ভরে উপভোগ করতে লাগলাম সকালের নরম আলোয়। লেকের জলে অনেক পাখির সম্ভার। এখানকার বাতাসে কোন দুষণ নেই, আছে এক বুনো গন্ধ, যা আমার মত কোলিয়ারির মানুষকেও তাজা করে দেয়। ক্লান্ত জীবনে একটু টাটকা হওয়া । 

দেখলাম ড্যামের কাছেই ‘সিআরপিএফ ক্যাম্প’। 

তারপরে আমরা ফিরলাম।

ফেরার পথে এক জায়গাতে আমাদের

দারকরিয়ে বুধন কিছু কাঠ ও আগুনের ব্যবস্থা করে সেখানে আমাদের বসিয়ে দিল ।

কয়েকটি মেয়ে এসে আমাদের সকলকে একটি করে ছোট তুলের মতন বা পোয়ালের মোড়া দিয়ে গেল বসবার জন্য।

তার পরেই ওরা নিয়ে এল গরম গরম চা।

আমাদের চা খাওয়া শেষ হতে না হতেই 

ওরা নিয়ে এল বাঁধা কপির চপ।

এই ঠান্ডায় এত সকালে চপ আর চা বেশ ভালোই লাগছিল।

এবার রওনা দেবার পালা আমি বুধন কে বললাম ওদের চায়ের জন্য কত দেব।

বুধন হেসে বললো এটা ওর মাসির বাড়ি তাই কেউকি পয়সা নেবে!

বরঞ্চ যদি আমরা এখানে চা খেতে না থামতাম তবে মাসি ভীষণ দুঃখ পেত।

অগত্যা আমাকে চুপ থাকতে হল।

বেড়াতে এসে বার বার এই সরল আদিবাসীদের একান্ত আপ্যায়নে আমরা

মুগ্ধ।

এখানকার যেখানেই গেছি সকলেই এক কথা "আর দুটু দিন থাকুন।"

"আমাদের পড়বে আসুন।"

এরপরে আবার বুধনের বাড়িতে ফিরেই আগে গরমাগরম চা।

একটু পরেই এলো কিছু ভাজা ভুজি।

তারপরে সকালের টিফিন  লুচি মাংস  খেয়েই আমরা ফেরার জন্য তৈরি হলাম।

বুধন আমাদের বলরামপুর পর্যন্ত এগিয়ে দিল যাতে আমরা 9টার ধানবাদের বাসটা

ধরতে পারি।

আমরা বললাম বুধন বাসে তো ভিড় হবে 

জায়গা পাবনা।

বুধনের এক কথা আপনারা আমার বাড়িতে এসেছেন তা আপবাদের এত চিন্তা কিসের। বাস পাঁচটি সিট খালি নিয়েই আসবে।

যখন বাস আসলো দেখলাম আমাদের পাঁচটি সিট ঠিক খালি আছে।

তাই আমরা আরামে পৌঁছে গেলাম মহুদা 

মোড়ে । মহুদা থেকে ট্রেকারে করে 

পৌঁছে গেলাম কাত্রাস।

       <--©➽--আদ্যনাথ-->

==========================

  || পুরুলিয়ার মুরগুমা ড্যাম ||

                     <--©➽--আদ্যনাথ-->


এখনও রাত্রির একটু বাকি,

চলেছি পাহাড়ের ঢালে ধীরে সন্তর্পনে,

ঝরাপাতার খস খস শব্দপায়ের নিচে,

সকলেই ভীত অচেনা ডাক শুনে কাছে।

লাঠি দিয়ে সামনের পাতা সরিয়ে,

চলেছি সকলে অজানা পথে।

তবুও যেতে হবে ওই ড্যামের ওপরে

টর্চের আলো তে ছোট কিছু পালায় ছুটে,

পাখিদের কলতান শুরু হল সেই ক্ষণে,

চারিদিকে ছড়িয়ে রঙিন আবির গগনে।


মুরগুমা ড্যামের ওপারে পাহাড়ের চূড়ায়,

হঠাৎ যেন হল নুতন সূর্য্য উদয়,

আগুন যেন লাগলো পাহাড়ের মাথায়,

সবুজ পাহাড় গুলিও লালে রাঙিয়ে দিল,

ড্যামের জলে কে যেন রং ঢেলে দিল।

এইনির্জনে শেয়ালের ডাকও ভয়ঙ্করলাগে

তবুও মনে শান্তনা ওই পাখিদের দেখে,

পাখিরা কত সুন্দর সাবলীল ড্যামের জলে

ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা খাবারের খোঁজে,

ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় মুরগুমার শোভা খোলে।


অযোধ্যা পাহাড়ের মুরগুমা ড্যাম

প্রকৃতির সকল সৌন্দর্য আছে লুকিয়ে। 

প্রকৃতি যেন দিয়েছে উজাড় করে,

আমরাও ক্লান্ত এতটা  চড়াই চড়ে।

তবুও মনের আনন্দ মুরগুমাকে দেখে,

চেয়েছিলাম যেটুকু মনে

মুরগুমা দিয়েছে তার থেকে বহু গুনে।

আজথেকে সেই 36 বৎসর আগে,

পাহাড় জঙ্গল আর আদিবাসীদের ঘরে,

আদর দিয়ে ছিল ওরা  হৃদয় উজাড় করে।

 ======<--©➽--আদ্যনাথ-->======

===========================


মার্বেল লেক। ok


এখানে  নানান রঙের সব মার্বেল পাথর,সাদা-কালো আরো নানান রঙের। 

অযোধ্যা থেকে বামনি ঝরনা যাওয়ার পথে কিছুটা এগিয়েই এই পাহাড় ঘেরা  জলাশয়ের । যার নাম মার্বেল লেক, কিন্তু স্থানীয় কিছু ডাকনামও আছে।  অনেকে একে পাতাল ড্যাম বলে। তার কারণ গাড়ি যেখানে থামবে, সেখান থেকে হ্রদে যেতে অনেকটা নিচে নামতে হবে। আবার কেউ কেউ নীল স্বচ্ছ জলের জন্য নীল ড্যাম বলেও বলেন। প্রকৃত সত্য বোধহয় এটাই যে এখানে একটি বৃহৎ জলবিদ্যুৎতের 

প্রোজেক্টের কাজের জন্য বিস্ফোরণ করে পাথর ভাঙতে গিয়ে সেই পাথরের খাঁজে তৈরি হয় মার্বেল লেক। 

এমন অপরূপ হ্রদের দৃশ্য প্রাণ জুড়োয়, চোখ জুড়োয়। আক্ষরিক অর্থেই মার্বেল লেক প্রকৃতির দান।

পুরুলিয়াকে রুক্ষ শুষ্ক মাটির দেশ বলা হয়। এই রুক্ষ লাল মাটি ভেদ করে এমন স্বচ্ছ জল জন্ম নেওয়ার ইতিহাসটিও তাই চমৎকার। সেখানকার মানুষদের মতে এটি প্রকৃতির দান। 

_____________________

         END OF 4th day

XxxxxXXXXXXXXXXXXXXXXX

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX



 




No comments:

Post a Comment