Tuesday, May 18, 2021

65>|| ভ্রমন তামিলনাড়ু || 1979

   65>|| ভ্রমন তামিলনাড়ু ||===at 1979  

                          <--আদ্যনাথ-->

 গ্রানাইট পাথরের নটরাজ মন্দির।

তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরের বৃহদেশ্বর মন্দির

এমন স্থানে ভ্রমনের সময় স্থানীয় মানুষের মুখের কথা ও পরে ইন্টানেট ঘেঁটে কিছু তথ্য জোগাড় করে সত্যকে যাচাই করতে পারলাম।

1979 নাগ পুরে থাকার সময় ভি,সি,আর,মান্নি (আমরা মানি বলেই ডাকতাম ) এর সাথে গিয়েছিলাম তামিলনাড়ু  ভ্রমণে।

ভারতের ইতিহাস, 

 ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই মন্দির শুধু ধর্মীয় গাম্ভীর্য নয়, স্থাপত্য শৈলি এবং দৃষ্টিনান্দনিকতার দিক থেকেও এহেন মন্দির গুলি এক একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। এমনই একটি মন্দির, তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরের বৃহদেশ্বর মন্দির। 

হাজার বছরের পুরনো এই নটরাজ মন্দির। 

যদিও আগে এই মন্দিরটি

রাজরাজেশ্বরম মন্দির নামে পরিচিত ছিল। 

মন্দিরের ভেতর আছে ৫ মিটার লম্বা নৃত্যরত শিবের মূর্তি। মন্দিরের কারুকাজে ফুটে উঠেছে সে সময়ের সমৃদ্ধি ও জীবনবোধ। বৃহদেশ্বর মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব হলেও পাশাপাশি মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে চন্দ্র, সূর্য, দক্ষিণ মূর্তির বিশালাকার নানা চিত্র আঁকা রয়েছে। এখানে আট মিটার লম্বা ‘অষ্ট-দিকপালক’-র-( ইন্দ্র, অগ্নি, যম, বরুণ, নৈঋত, বায়ু, ঈশান, কুবের) মূর্তি রয়েছে। এছাড়া মন্দিরের ছাদে রয়েছে রঙিন তৈলচিত্র। প্রাচীন তৈলচিত্র গুলিতে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রাকৃতিক রং। মন্দিরে রয়েছে শিবের বাহন নন্দীর একটি মূর্তি (দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট এবং উচ্চতা ১৩ ফুট) যা একটি মাত্র পাথর কেটে বানানো।


জানা গেছে একাদশ শতাব্দিতে ১০০৩ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তামিল  রাজা চোল প্রথম এই মন্দিরটি দ্রাবিড় স্থাপত্য রীতির অনুকরণে  নির্মাণ করেছিলেন।


এটি গোটা বিশ্বের মধ্যে গ্রানাইট পাথরে তৈরি প্রথম মন্দির। 

কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত, মহাদেবকে সমর্পিত এই মন্দির পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য শিল্প গুলির মধ্যে অন্যতম। দ্রাবিড় স্থাপত্য রীতির অনুকরণে প্রস্তুত এই বিশাল ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের পরতে পরতে মিশে আছে ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। ইতোমধ্যেই এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট-এর তকমা দিয়েছে ।

তাদের খাতায় এটি 'গ্রেট লিভিং চোলা টেম্পলস' হিসেবে চিহ্নিত।

এই মন্দির নিয়ে আরও কিছু শোনা গল্প কথা।

 জানলাম মন্দিরের নাম পরিবর্তনের কথা,

চোল শাসনে এই মন্দিরটি রাজরাজেশ্বরম মন্দির নামে পরিচিত ছিল। 

সমস্ত উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই মন্দির। পরে নায়াকা এবং মারাঠারা ওঅ এলাকা দখল করে। সে সময় ওই মন্দিরে কিছু পরিবর্তন আসে। একই ভাবে মন্দিরের নাম বদলে হয় বৃহদেশ্বর মন্দির।

বিশাল বিশাল সব গ্রানাইট পাথর কেটে গোটা মন্দির তৈরি করা হয়েছে। বস্তুত এটি বিশ্বের প্রথম মন্দির যেটি সম্পূর্ণভাবে গ্রানাইট পাথরে তৈরি। এই মন্দির নির্মাণে ১,৩,০০০ টন গ্রানাইট ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অনুমান।


বৃহদেশ্বর মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ২১৬ ফুট। যার মাথায় রয়েছে প্রায় ৮০ টন ওজনের একটি গম্বুজ। 

মন্দিরের কারুকাজে ফুটে উঠেছে সে সময়ের সমৃদ্ধি ও জীবনবোধ।

১৯৫৪ সালে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক ১০০০ টাকার নোট প্রকাশ করে। এই নোটের একদিকে ছিল বৃহদেশ্বর মন্দিরের প্রতিরূপ।


ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা আজও ভেবে পাননি মন্দিরটি ঠিক কীভাবে নির্মিত হয়েছিল। কাছাকাছি কোথাও খুঁজে পাওয়ার মতো কোনও গ্রানাইট নেই....কমপক্ষে ৫০ মাইলের মধ্যে তো নয়। তবুও মন্দিরটি ১৩০,০০০ টন কঠিন গ্রানাইট পাথর দ্বারা গঠিত। এই বিশাল বিশাল দৈত্যাকার পাথরের টুকর যা কোনও মানুষের পক্ষে বয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। চুন-সুরকি-সিমেন্ট ছাড়া কিভাবে এই কঠিন পাথরগুলোকে একটার সাথে আরেকটা হাজারবছর ধরে জুড়ে রাখা হয়েছিল, এত ঝড় বৃষ্টি, বন্যা-ভূমিকম্প সহ্য করেও কিভাবে স্বস্থানে, স্বমহিমায় এই অপূর্ব সুন্দর মন্দির অটল থাকতে পারল....এটা সত্যিই এক বিস্ময়। 


গ্রানাইটের মত শক্ত শিলাতে এরকম অপরূপ কারুকাজ অসাধারণ দক্ষ শিল্পী ছাড়া সম্ভব না। কি ধরনের যন্ত্রপাতি তারা ব্যবহার করেছিল এটাও একটা রহস্য! ভাবলে সত্যি অবাক হতে হয় যে সে যুগে আজকের মত ক্রেন বা হেভি লিফটিং কোন মেশিনারি ছিলনা। তবুও কিভাবে ২১৬ ফুট লম্বা ( পৃথিবীর উচ্চতম মন্দির) মন্দিরের চূড়ায় ৮০ টন ওজনের 'কলস' স্থাপন করা হয়েছিল?


১.৩ লাখ গ্রানাইট পাথর থেকে ইন্টারলক বা পাজল পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির অর্থাৎ দুটি পাথরকে একসাথে ধরে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়নি প্লাস্টার বা সিমেন্ট। পাথরকে ধাপে ধাপে সাজিয়েই আজ থেকে ১০০০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির যা তখন রাজরাজেশ্বর মন্দির নামেও পরিচিত ছিল। 


তাঞ্জাভুরের ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোন পাহাড়। শোনা যায় তাই ৩০০০ হাতি নিয়োগ করা হয়েছিল বহু দূর থেকে পাথর বয়ে আনার জন্য। মন্দিরের মুখ্য মিনার যা গোপুরম নামে পরিচিত তাঁর উচ্চতা ২১৬ ফুট। মন্দিরের মাথায় রয়েছে ৮১ টন ওজনের একটি পাথর যার নাম কুম্বম। এই বিশাল ওজনের পাথরটিকে কি করে মন্দিরের চূড়ায় তোলা হল আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্র ছাড়া তা এক বিস্ময় বটে। শোনা যায় মন্দিরের নীচ থেকে চূড়া অবধি একটি ৬ কিলোমিটার লম্বা ঢালু স্তর বসানো হয়। বহু শ্রমিক, হাতি, ঘোড়ার সাহায্যে এটিকে যথাস্থানে বসাতেই লেগেছিল ৬ বছর! মন্দিরের নিচে রয়েছে ১০০ ও বেশি ভূগর্ভস্থ পথ যা চোল প্রাসাদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সাথে যুক্ত। পূজা অর্চনার বিশেষ দিনে রাজপরিবারের মানুষরা এই পথ ব্যবহার করতেন। মন্দিরের স্থাপত্যের আরেক আশ্চর্যের দিক হল গোপুরম এমন ভাবে তৈরি যাতে দিনের বেলা এর ছায়া কোনো সময় মাটিতে পড়ে না!


আমাদের গর্বের বিষয় যে এই অপূর্ব অতূলনীয় স্থাপত্য ৬ টি ভূমিকম্প উপেক্ষা করেও আজও তার ঐতিহ্য নিয়ে সগৌরবে বিদ্যমান।

<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

 =========================


No comments:

Post a Comment