Tuesday, November 2, 2021

67> বাঁকুড়ার সোনামুখী ভ্রমন ||হটনগর মা কালীর ===05/11/1999

 

67>|| বাঁকুড়ার সোনামুখী  ভ্রমন ||05/11/1999

         || হটনগর মাকালী ||==


আমার বাঁকুড়া ভ্রমনের কিছু কথা।

আমার এক বন্ধু শম্ভু কুন্ডু বাড়িতে গিয়ে ছিলাম 1999 সালের 5 নভেম্বর

বাঁকুড়ার সোনামুখী অঞ্চলে।

শম্ভুর মুখেই অনেক বার শুনেছিলাম হটনগর মাকালীর গল্প কথা।

সেই কারণে কালি পূজার ঠিক দুইদিন  আগে গিয়েছিলাম শম্ভুর বাড়িতে 

সোনামুখীতে।

কালি পূজা ছিল 7নভেম্বর।

গ্রাম বাসীদের মুখে শোনা গল্প কথা,

 সোনামুখীর সেই গল্প কথা ই আজ লিখলাম।

শুনে ছিলাম হটনগর মাকালী কথা।

প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন জাগ্রতা  "মা" হটনগর কালী।

 বাঁকুড়ায় বেশ কয়েকটি কালী পুজো হয়, কিন্তু তার মধ্যে সবথেকে প্রাচীন কালীপুজো এই সোনামুখীর  হটনগরের মাকালীর পুজো।

   প্রায় চারশো বছর আগের কথা। তখন বিনিময় প্রাথা চালু ছিলো। অর্থাৎ কিছু দ্রব্য ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যম ছিল ধান।

কিছু বিক্রি করলে পরিবর্তে  টাকা নয় ধান পাওয়া যেত।  

বাঁকুড়ার এই সোনামুখীতে থাকতেন এক দরিদ্র সূত্রধর পরিবারের এক বিধবা,নাম তারিনী সূত্রধর। 

তিনি নিজের সংসার চালাতে রোজ চিঁড়ে মুড়ি বিক্রি করতে যেতেন পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে। প্রতি দিন সন্ধ্যায় নিরিশায় চিঁড়ে বিক্রি করে বিনিময়ে পাওয়া ধান ঝুড়িতে করে নিয়ে বড়োজোড়ার নিরিশা গ্রামের হাটা পথে  খাল পেরিয়ে সোনামুখী ফিরতেন।

হাটা পথে পরিশ্রান্ত হয়ে সেই খালের পাশে বসে সঙ্গে সাথে থাকা মুড়ি খেয়ে একটু বিশ্রাম করতেন, আর ঠিক সেই সময় কোন কোন দিন একটি শ্যামাঙ্গী ও লালপেড়ে শাড়ি পড়া একটি ছোট্ট মেয়ে  আসতো বৃদ্ধার কাছে এবং সে বায়না ধরতো তাকেও নিয়ে যেতে হবে তাঁর সাথে সোনামুখীতে। কিন্তু বৃদ্ধা নানান ভাবে, যেনো তেনো প্রকারে তাকে ভুলিয়ে রাখতো। কিন্তু একদিন সেই মেয়েটি নাছোড়বান্দা হয়ে বায়না ধরে বসলো। সেদিন তারিনী বৃদ্ধা  কিছুতেই আর না করতে পারেন না। কিন্তু তার হাতে বস্থা ও মাথায় ধানের ঝুড়ি থাকায় তিনি কি করে ছোট্ট মেয়েটিকে এতোটা পথ নিয়ে যাবেন সেই ভাবনায় অস্থির হলেন।

তখন মেয়েটি তাঁকে তাঁর মাথার ঝুড়ি তে চাপিয়ে নিয়ে যেতে বলেন। বৃদ্ধা তারিনী অবশেষে সেই সর্তেই রাজি হন এবং সেই ছোট্ট শ্যামাঙ্গী মেয়েটিকে মাথার ঝুড়িতে বসিয়ে ধীর পায়ে চলতে শুরু করেন। কিন্তু বৃদ্ধা অদ্ভুদ ব্যাপার অনুভব করলেন যে মেয়েটির ভার যেন কম হয়ে গেল  ধীরে ধীরে। এরপর বাড়ি ফিরে যখন বৃদ্ধা মাথার ঝুড়িটি নামালেন তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলেন।"একি মেয়েটি গেলো কোথায়!"

মেয়েটি নেই,তার জায়গায় ঝুড়িতে দেখেলেন দুটি কালো রঙ্গের পাথর খন্ড। 

বৃদ্ধা অবাক বিস্ময়ে পাথর দুটি তুলসী তলায় রেখে দিলেন।

সেদিন রাত্রিতে বৃদ্ধা তারিনী সূত্রধরের স্বপ্নে আসেন মা কালী। মা স্বপ্নে বৃদ্ধা তারিনীকে বলেন,"আমি মা কালী । মেয়ে সেজে আমিই তোর মাথায় ঝুড়িতে করে এসেছি। তোর যাতে ভারবোধ না হয়,তাই তো পাথর হয়ে এলাম। তুই আমায় তোর বাড়ির সামনে আঁকড় গাছের তলায়,

প্রতিষ্ঠা করে,পুজার ব্যাবস্থা কর।"


(আঁকড় গাছ বা আঁকড়কাঁটা গাছ অথবা Alangium salviifolium (L.f.) Wangerin.কেউ আবার আকরকাঁটা,বাঘ-আকর, ধলা আকর, আকর, আঙ্কুরা গাছও বলে থাকে)


বৃদ্ধা, "মা"য়ের আদেশ মতো তাঁর বাড়ির সামনের আঁকড় গাছের তলায় সেই শিলাখন্ডকে রেখে । মায়ের স্বপ্নাদেশের কথা ও সেই পাথর খন্ডের কথা তিনি সোনামুখীর লালবাজার বাসীদের সকলকে জানান। নিমেষের মধ্যেই মায়ের পুজার তোড়ঝোড় শুরু হয়ে যায়। কিন্তু বাধ সাধে পুরোহিত। তখনকার দিনে জাত পাত বা বর্ন প্রথা ছিলো অতি কঠোর। সেই কারণে কোন পুরোহিত রাজি হলেন না,

এক সূত্রধরের হয়ে পুজা করতে।

কিন্তু সেদিন রাতেই এক পুরোহিত দারুন ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। 

দেবী স্বপ্নাদেশে সেই পুরোহিত কেই তাঁর বাড়ি থেকে পুজা নিয়ে যেতে বললেন ও পুজা করার নির্দেশ দিলেন। সুস্থ হয়ে সেই পুরোহিত পরদিন সকালেই নিজের বাড়ি থেকে পুজা নিয়ে গেলেন ও ক্ষমা প্রার্থনা করে পুজা শুরু করলেন। সেই থেকে আঁকরগাছের তলায় প্রতিষ্ঠিতা হলেন মা কালী সেই কালো পাথর খন্ডের মাধ্যমে।

    পরে তারিনী সূত্রধরের কাছে মায়ের মহিমার কখা জানতে পান,তৎকালীন সোনামুখীর জমিদার গিন্নি কাদম্বিনি দেবী। 

কাদম্বিনি দেবী মায়ের মহিমা শুনে মন্দির নির্মানের জন্য জমি ও অর্থ উৎসর্গ করলেন ও সেখানে মন্দির নির্মানের সম্পূর্ন অর্থ প্রদান করলেন। অচিরেই গড়ে উঠলো মায়ের ভব্য মন্দির। নিত্য সেবার কাজ চললো সুষ্ঠুভাবে।


এই কালী হটনগর কালী নাম হওয়ার পিছনেও এক জনশ্রুতি রয়েছে। বহুকাল পুর্বে একজন হটযোগী সাধু এখানে মাতৃসাধনা করেছিলেন। তিনি মা কালীর আরাধনা করতেন। সেই হটযোগী সাধুর থেকেই এখানকার "মাকালীর" নাম ছড়িয়ে পড়ে হটনগর কালী নামে।

    মায়ের পুরাতন মন্দির টি ভগ্নপ্রায় হয়ে গেলে নতুন মন্দির নির্মান করা হয়।  বর্তমানের নুতন  মন্দিরটি নির্মান করে দেন বর্ধমানের  সমাজ সেবক অজিত সিংহ নামে এক ব্যাক্তি।

      তারিনী সূত্রধরের আনা সেই শিলাখন্ড রুপি মা কালী আজোও পূজা হয় এখানে সেই  আঁকড় গাছের তলায় বেদিতে। 

আর তার পাশেই গড়ে উঠেছে মৃন্ময়ি প্রতিমার পুজার মন্দিরটি।


আজো পুরানো প্রথা মেনেই এখানে কালীপুজোর ঘট প্রতিষ্ঠা হয় সূত্রধর দের বংশধরদের হাতেই।

এই হট নগর মা কালীর থানে নিত্য পুজা এবং অম্যাবস্যাগুলিতে হয় বিশেষ পুজা।

শনি মঙ্গল বারে মায়ের থানে ভিড় করে ভক্তরা। কিন্তু কার্তিক অম্যাবস্যার কালীপুজোতে এই হটনগর মা কালীর পুজোকে ঘিরে মানুষের ভিড়ে সোনামুখীর বাসিন্দাদের বেশ উৎসাহ উদ্দীপনা দেখলাম।   

বাঁকুড়ার আসে পাশের অঞ্চলের বহু মানুষের ভিড় ছিল দেখার মতন।

জয়  সোনামুখীর হটনগর মা কালীর  জয়।।

    আদ্যনাথ রায় চৌধুরী।

===========================



No comments:

Post a Comment