Sunday, August 14, 2022

82>| | কামাখ্যা মন্দির ||


     82> || কামাখ্যা মন্দির ||


ভারতের ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম এই কামাখ্যা মন্দিরটি অসমের নীলাচল পাহাড়ের পশ্চিমে গুয়াহাটি শহরে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত। মন্দিরের গর্ভগৃহটি রাজধানী শহর তেজপুরের সূর্যমন্দিরের আদলে গঠিত । এই গর্ভগৃহের শিখরটি বাংলার চারচালা আঙ্গিকে নির্মিত । গর্ভগৃহে স্থাপিত আছেন দেবী।কামরূপ কামাখ্যা নামটি কাম দেব ও কামাখ্যা দেবীকে স্বরণ করে।দুজনের নাম মিলিয়ে এই কামরূপ কামাখ্যা। মন্দির প্রতি দিন   সকাল ৮ টায় খোলে এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে মায়ের মন্দির খুব রহস্যময় ও আকর্ষণীয়। যে প্রস্তরটি পূজিত হয় ও ফুল দিয়ে ঢাকা থাকে সেই খান থেকে প্রাকৃতিক ভাবে অনবরত জল বের হয়। এই জল কোথা থেকে আসছে তা সকলেরই অজানা। প্রতিবছর তিন রাত ও চারদিন অম্বুবাচী তিথিতে মায়ের মন্দির বন্ধ থাকে। সেই সময় এখানে বিরাট মেলা বসে। এই পীঠস্থানে তান্ত্রিক ও অঘোরীদের খুব যাতায়াত। মা এখানে খুবই কৃপাময়ী। ভগবান শিব ও দেবী সতীর প্রিয় স্তান এই তীর্থভুমি।

এখানে যাদু টোনার রোমহর্ষক গালগল্প, সুন্দরীর সন্মোহনে পুরুষে ভেড়া হয়ে ম্যাঁ-ম্যাঁ করে ঘুরে বেড়ানোর টান টান পৌরাণিক কাহিনী! নীলাচলের গুহায় গুহায় রাতভর তন্ত্র মন্ত্রের জাগরণ চলে।প্রাচীন কাল থেকে তন্ত্র মন্ত্র ও গুপ্ত সাধনার কেন্দ্র ভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে দেবী তীর্থ কামাখ্যা। মা এখানে চিরযৌবনা কামেশ্বরী। ৬৪ কলার গোপন সাধনা কেন্দ্র। এই শক্তিপীঠের কথা দেবী ভাগবত, দেবী পুরান, তন্ত্র চূড়ামণি, কালিকা পুরাণ, যোগিনী তন্ত্র, হেবজ্র তন্ত্র সহ প্রাচীন গ্রন্ত্রে রয়েছ। ভারতবর্ষের শক্তি সাধনার অত্যন্ত সুপ্রচীন কেন্দ্র কামরূপা কামাখ্যা।  কামাখ্যা মিন্দরের চুড়ো সপ্তরথ আকৃতির। তার গড়নে পাওয়া যায় মৌচাকের আদল। সাতটি ডিম্বাকৃতি গম্বুজের প্রতিটির ওপর তিনখানা স্বর্ণকলস বসানো আছে। মিন্দরের বহিরাংশে গণেশ ও অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিকৃতি ও পুরাণ কাহিনীর নানা খণ্ডচিত্র খোদাই করা প্যানেলের সারি। দেবী সতীর গর্ভ এবং যোনি এখানে পড়েছিল এবং এইভাবে দেবী কামাখ্যাকে উর্বরতার দেবী বা "রক্তক্ষরণকারী দেবী" বলা হয়।  

এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও আছে। এই মন্দিরগুলোতে দশমহাবিদ্যা সহ মহাকালী, তারা, ষোড়শী বা ললিতাম্বা ত্রিপুরসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী বা জগদ্ধাত্রী, কামাখ্যা, শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী বা তপস্যাচারিণী, মঙ্গলচন্ডী, কুষ্মাণ্ডা, মহাগৌরী, চামুণ্ডা, কৌষিকী, দাক্ষায়ণী-সতী, চন্দ্রঘন্টা, স্কন্দমাতা, কালরাত্রি, কাত্যায়ণী, সিদ্ধিদাত্রী, শাকম্ভরী, হৈমবতী, শীতলা, সংকটনাশিনী, বনচণ্ডী, দেবী দুর্গা, মহাভৈরবী, ধূমাবতী, ছিন্নমস্তা, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও দেবী কমলা – এই ত্রিশ দেবীর মন্দিরও রয়েছে। 

এর মধ্যে ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতঙ্গী ও কমলা প্রধান মন্দিরে পূজিত হন। অন্যান্য দেবীদের জন্য পৃথক মন্দির আছে।  তন্ত্রসাধকদের কাছে এই মন্দির অন্যতম প্রাচীন এবং এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।কথিত আছে দেবী কামাখ্যা নিজে এই মন্দির টি নির্মাণ করেছেন ।

এখানে ডাকিনী যোগিনী 



কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে: গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ (যেগুলির স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির)। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।

    অন্যগুলির স্থাপত্য তেজপুরের সূর্যমন্দিরের সমতুল্য। এগুলিতে খাজুরাহো বা অন্যান্য মধ্যভারতীয় মন্দিরের আদলে নির্মিত খোদাইচিত্র দেখা যায়।  মন্দিরের চূড়াগুলি মৌচাকের মতো দেখতে। নিম্ন আসামের বহু মন্দিরে এই ধরনের চূড়া দেখা যায়।  গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা। এখানে কোনো মূর্তি নেই। শুধু একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়।

গর্ভগৃহটি ছোটো ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সরু খাড়াই সিঁড়ি পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। ভিতরে ঢালু পাথরের একটি খণ্ড আছে যেটি যোনি আকৃতিবিশিষ্ট। এটিতে প্রায় দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত দেখা যায়। একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে এই গর্তটি সবসময় ভর্তি রাখে। এই শিলাখণ্ডটি দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত এবং দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ১৫৬৫ সাল নাগাদ কোচ রাজা চিলরায় মধ্যযুগীয় মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুসারে মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করে দেন। মন্দিরের তিনটি প্রধান কক্ষ। পশ্চিমের কক্ষটি বৃহৎ ও আয়তাকার। সাধারণ তীর্থযাত্রীরা এটি পূজার জন্য ব্যবহার করেন না। মাঝের কক্ষটি বর্গাকার। এখানে দেবীর একটি ছোটো মূর্তি আছে। এই মূর্তিটি পরবর্তীকালে এখানে স্থাপিত হয়। এই কক্ষের দেওয়ালে নরনারায়ণ, অন্যান্য দেবদেবী ও তৎসম্পর্কিত শিলালেখ খোদিত আছে।  মাঝের কক্ষটিই মূল গর্ভগৃহে নিয়ে যায়। এটি গুহার আকৃতিবিশিষ্ট। এখানে কোনো মূর্তি নেই। শুধু যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর ও ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনটি আছে। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে অম্বুবাচী মেলার সময় কামাখ্যা দেবীর ঋতুমতী হওয়ার ঘটনাকে উদ্‌যাপন করা হয়। এই সময় মূল গর্ভগৃহের প্রস্রবনের জল আয়রন অক্সাইডের প্রভাবে লাল হয়ে থাকে। ফলে এটি ঋতুস্রাবের মতো দেখায়।


কালিকা পুরাণ অনুসারে, কামাখ্যায় পূজা করলে সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়। শিবের তরুণী স্ত্রী ও মোক্ষদাত্রী শক্তিই কামাখ্যা নামে পরিচিত। 

কামাখ্যার পূজা বামাচার ও দক্ষিণাচার উভয় মতেই হয়। সাধারণত ফুল দিয়েই পূজা দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে পশুবলি হয়। স্ত্রীপশু বলি সাধারণত নিষিদ্ধ হলেও, বহু পশুবলির ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়।

কালিকা পুরাণের মতে, কামাখ্যা মন্দিরে সতী শিবের সঙ্গে বিহার করেন। এখানে তার মৃতদেহের যোনি অংশটি বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র হওয়ায় বার্ষিক অম্বুবাচী মেলা অনুষ্ঠানে এখানে প্রচুর মানুষ আসেন। এছাড়া বার্ষিক মনসা পূজাও মহাসমারোহে আয়োজিত হয়, দুর্গাপূজা কামাক্ষ্যা মন্দিরের একটি অন্যতম প্রধান উৎসব।

★★কি হয় কামাখ্যা মন্দিরে?

কামরূপ কামাখ্যাঃ যোনি পূজা, তন্ত্র-মন্ত্র,এদেশের আবাল বৃদ্ধ বনিতার কাছে আবহমান কাল ধরেই কামরূপ কামাখ্যা মন্দির এক অনাবিল রসহ্যমন্ডিত স্থান। ভারতবর্ষের প্রতিটি কোনায় কোনায় এ মন্দিরের নাম ছড়িয়ে আছে । সতীর মৃতদেহের ৫১ খন্ডের অংশ হিসেবে। এখনে পতিত দেবী সতীর মাতৃযোনী, প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের মন্দির, অম্বাবুচী মেলা, নরবলি, প্রভৃতি বিষয়গুলোর কারনে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত কামরূপ কামাখ্যা । বলাই বাহুল্য, এই মন্দিরটি আরও বেশি খ্যাতি অর্জন করেছে, জাদু টোনা, অশরিরী আত্মা ও ভুত, প্রেত চালনা, কাল জাদু ও বশীকরণ, তন্ত্র সাধনা ইত্যাদির আতুরঘর হিসেবে। তাই পুরাণ, ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের সংমিশ্রনে গঠিত আসামের এই শক্তিপীঠের আকর্ষন উপেক্ষা করতে পারেন না ভারতবর্ষের বাইরের পর্যটকরাও।  পৌরাণিক এই মন্দিরকে ঘিরে যেমন অজস্র রহস্য, রোমাঞ্চ ও চমৎকারের কাহিনী শুনতে পাওয়া যায়, তেমনি এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায় প্রায়শই। এখানকার রীতি রেওয়াজের অপব্যাখ্যা বা নেতিবাচক কাহিনীও নেহায়েত কম শোনা যায় না।


বলা হয় একসময় এ জায়গায় কেউ গেলে আর ফিরে আসত না। এখনো জাদুবিদ্যা সাধনার জন্য বেছে নেওয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই।  কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্য আর নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় ভালো-মন্দ আত্মারা। ছোট্ট দুটি শব্দ ‘কামরূপ কামাখ্যা’। আর এই দুটি শব্দের মধ্যেই লুকানো তাবৎ রহস্য, রোমাঞ্চ আর গল্পগাথা।


তবে সবকিছু ছাপিয়ে কামাখ্যার জাদুবিদ্যা আর সাধকদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার গল্পই সবার মুখে মুখে।


ভয়ংকর জায়গা কামরূপ কামাখ্যা ৷ 

শুধু কামরূপ কামাখ্যা নয়, ওখানের আশেপাশে অরণ্যে আর নির্জন পথেও নাকি দেখা মেলে ভূত-পেত্নী আর ডাকিনী-যোগিনীর।। 

◆◆◆

কামরূপ-কামাখ্যা নারী শাসিত পাহাড়ী ভূ-খন্ড। সেখানকার নারীরা ছলাকলা ও কামকলায় ভীষণ পারদর্শী। কামরূপ-কামাখ্যার ডাকিনী নারীরা পুরুষদের মন্ত্রবলে ভেড়া বানিয়ে রাখে । কামরূপ কামাখ্যা নিয়ে এরকম অনেক মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে।


চৈনিক পর্যটক সুয়ানচাং ৭ম শতাব্দীর দিকে ভাস্করবর্মণের শাসনকালে এই রাজ্য ভ্রমণ করেন। কামরূপের রাজাদের বিশেষ করে ভাস্করবর্মণের বিভিন্ন অভিলিখন হতে অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।


কলিকা পুরাণ এবং চৈনিক পর্যচক সুয়ানচাং-এর মতে কামরূপের পশ্চিম সীমানায় ঐতিহাসিক করোতয়া নদী এবং পূর্ব সীমায় তামেশ্বরী দেবীর মন্দির এবং দক্ষিণ সীমানা ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা এবং ময়মনসিংহ জেলার মধ্যবর্তী এলাকায়। ফলে এটি সমগ্র ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নিয়ে গঠিত ছিল এবং সময়ে সময়ে বর্তমান সময়ের ভুটান এবং বাংলাদেশের কিছু অংশও এর অধীন ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় এই অঞ্চলে প্রাপ্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলাদি হতে।

 



====+==================


😵🦴ডাকিনী🦴😵


 


          'ডাকিনী'.......... কথাটা শুনলেই সবার আগে কি মনে পড়ে 

সেই ছোটবেলা থেকে বয়স্ক ঠাকুমা দাদুর মুখে শুনে আশা মা কালীর পাশে থাকা দুইজন রক্তপিপাসু উলঙ্গ পৈশাচিক নারী মূর্তি তাইতো....

হ্যাঁ ব্যাপারটা কিছুটা তাই। 

মায়ের সঙ্গে যে দুইজন সহচরী থাকে তাদের একজন হলেন ডাকিনী।


এবার শাস্ত্রে ডাকিনীর বর্ণনা যেমনটা দিয়েছে তা কিছুটা এমন........


    "ডাকিনী হলেন জলন্ত অগ্নিপিণ্ডের ন্যয় উগ্ৰ মূর্তি ..... এনার তিনটে চোখ, রক্তাক্ত দাঁত এবং মাথায় জটাজূট। ভীষণ ভয়ানক পৈশাচিক মুখমন্ডল এবং উন্নত স্তন।

ইনি মহাশক্তিশালী মুক্তকেশী এবং উলঙ্গ মূর্তি।

দেবীর লোলমগ্ন লকলকে জিভ, এবং গলায় নর করোটির মালা।

দেবীর এক হাতে কাটারী এবং অপর হাতে রক্তপূর্ণ নরকপাল।"

এই হল ডাকিনীর বর্ণনা। 

ডাকিনী হলো হিন্দু তান্ত্রিক পরম্পরায় একজন অতি ভয়ঙ্করী মহাশক্তিশালী অপবিদ্যা।

 ইনি মা কালীর একটি পৈশাচিক রূপ। 

ডাকিনীর শক্তি বর্ণনা করতে গিয়ে মহাদেব বলেছেন এই ডাকিনী শক্তির কাছে, ইন্দ্রাদি দেবতাগণ ব্যর্থ হয়। 

তাহলে এখান থেকেই বোঝা যায় যে এনার শক্তি কতটা মারাত্মক ভয়ঙ্কর। 

           মানুষ মারা গেলে, প্রেত এ পরিণত হয়। তখন তার অবস্থান হয় প্রেত লোকে। আর সেইখানের দেবী হলেন ডাকিনী। 

যেহেতু ডাকিনী মহাবিদ্যা কালীর একটি তাহাবিদ্যা সেই কারণে এনার মারাত্মক শক্তি তান্ত্রিক সাধকরা তাদের ক্রিয়াকর্মে ব্যবহার করে। 

অনেক আগে, এই ডাকিনীবিদ্যা প্রয়োগ করা হতো। এখন কতটা হয় সেটা বলা সম্ভব না। 

তবে কোন একটা সময় ভারতবর্ষের এবং ভারতবর্ষের বাইরে অনেক স্থানে এই ডাকিনী চর্চা হতো। 

তবে ডাকিনীবিদ্যা বা  ডাকিনী চর্চা অত্যন্ত মারাত্মক ভয়ঙ্কর এবং পৈশাচিক ক্রিয়া কর্ম। সাধারণভাবে এই সবের কোন ব্যাখ্যা হয় না।


ভারতবর্ষে কিছু শ্রেণীর মানুষদের আরাধ্যা তথা ইষ্ট দেবী ছিলেন..... ডাকিনী। 


 সেখানে ডাকিনী দেবীকে অবিদ্যা নয় বরং ইষ্ট জ্ঞানেই পুজো করা হতো। মহাশক্তি এবং অলৌকিক ক্রিয়াকর্মের শক্তি লাভ করার জন্য। 

সেই শ্রেণীর সাধকেরা কখনোই নিজেকে ডাকিনী সাধক বলে পরিচয় দিত না সমাজে। এদের বিশ্বাস অনুযায়ী ডাকিনী মহাজ্ঞান এবং ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে রক্ষাকারী দেবী। পরবর্তীকালে হিন্দু তন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে ত্রিবেটিয়ান বজ্রযান তন্ত্রেও ডাকিনী চর্চার উল্লেখ পাওয়া যায়। 

    এবং শুধু তা-ই নয় সেখানে বিভিন্ন ডাকিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়...... যেমন 

    বজ্র-ডাকিনী, রক্ত-ডাকিনী, সিংহ-মুখী ডাকিনী, কাল-ডাকিনী  ইত্যাদি ইত্যাদি। 

এছাড়াও মজার বিষয় হলো এই যে বৌদ্ধ বজ্রযান তন্ত্রে রক্ত মাংসে গড়া ডাকিনীরও উল্লেখ পাওয়া।



    এই বৌদ্ধ ধর্মীয় ডাকিনীরা হল বৌদ্ধ ধর্মালম্বী নারী সাধিকা।

পরবর্তীকালে, এরা ভারতবর্ষের বেশ কিছু জায়গায় বসবাস করা শুরু করে। প্রথমদিকে এদের দাঁড়া কোন খারাপ কিছু না দেখা গেলেও পরবর্তীকালে সমাজের চাপে বা বিভিন্ন কারণে এরা সমাজের অমঙ্গলের জন্য কিছু তান্ত্রিক ক্রিয়া কর্ম তথা ডাকিনী বিদ্যা চর্চা করে থাকে। যেগুলো তৎকালীন সময়ে ডাইনি বিদ্যা বলেও প্রচলিত ছিল।




   আমাদের কুণ্ডলিনী শক্তি প্রথম চক্রেই(মূলাধার চক্র) অবস্থানকারী শক্তি হলেন ডাকিনী। সাধকের এই চক্র উন্মোচন হয়ে গেলে, ডাকিনীর শক্তি লাভ করে সাধক। 


কিন্তু সে পথ অতি কঠিন বললেও কম বলা হবে। খুব উচ্চকোটি মহাজ্ঞানী বীরাচারী তান্ত্রিক সাধক যার মধ্যে অতি দূঃসাহস........সে ছড়া ডাকিনী সাধনার পথে একচুল আগানোর আগেই মৃত্যুদণ্ড। 



তবে হ্যাঁ সৎ যদি কোন সাধক এই  উগ্র ভয়ংকরী শক্তি সাধনা সম্পূর্ণ করতে পারে, তারপরে মহাবিদ্যা আয়ত্ত করা কোন কঠিন কাজ হবে না। সেই তান্ত্রিক সাধকের শীঘ্রই ইষ্ট লাভ হবে। কারণ ডাকিনী উগ্ৰ পৈশাচিক বিদ্যা হলেও তিনি মহাবিদ্যার সহচরিনী।

যেহেতু দেবীর এই রূপ অতি ভয়ঙ্কর উগ্র এবং পৈশাচিক সেই কারণে, এই দেবী  বলির রক্ত, কাঁচা মাংস এই সব বিষয়ের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। 



আসামের গুহাটিতে......... নীলাচল পর্বত থেকে কিছু দূরেই হলো ডাকিনী পাহাড় আবার ওটাকে যোগিনী পাহাড়ও বলে। 

এই পাহাড়ে কোন এক সময় খুব সাংঘাতিক ডাকিনী চর্চা করা হতো। এছাড়া......... জাদুটোনার দেশ মায়ং গ্রামের নারীদের মধ্যে আগে এই ডাকিনী চর্চা প্রচলিত ছিল কোন একটা সময়। 


সেখানকার নারীরা........ যাদু-টোনা মায়া ইত্যাদি ব্যবহারের জন্য সেখানকার নারীরা এই বিদ্যার প্রয়োগ করতো। সে গুলোকে ডাকিনীবিদ্যা আবার কখনও কখনও ডাইনিবিদ্যা বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। 


  

 এই বিদ্যা চিরযৌবন ও  সৌন্দর্য ধরে রাখার বিদ্যা.......... 

  সেখানে ডাকিনীর পুজো করে, বিশেষ সংখ্যক জপ ও নানান ক্রিয়া কৌশলের প্রয়োগ ও উপাচার করতে হয়।


*মায়া বিদ্যায় পারদর্শী হলে সহজে ই যে কোন পুরুষকে আকর্ষন করার বিদ্যা অর্জন করতে পারে।

উজ্জল কণ্ঠস্বরের অধিকারী হওয়া যায়।


 কোন একটা সময় এই বিদ্যা গুলো কিন্তু  প্রচলিত ছিল। 


এখন সেই সব কিছুই নেই।  

হয়তো প্রচলিত আছে এমন কোন জায়গায় যেখানে শিক্ষার আলো এখনো গিয়ে পৌঁছায় নি। যেখানে হয়তো মানুষ এখনো অন্ধকারের জগতে বিচরণ করে।



ডাকিনীবিদ্যা যে আসলে কত ভয়ঙ্কর এবং শক্তিশালী তা আমাদের চিন্তাধারা কল্পনা সবকিছুর বাইরে। তবে একেক জায়গায় ডাকিনীবিদ্যার প্রচলন একেক রকম।   


সাধকের উপরে নির্ভর করে, সে ডাকিনী কে ভালকাজে না খারাপ কাজে ব্যবহার করবে। 

কারণ ভারতবর্ষের বিভিন্ন সিদ্ধ সাধকেরাও এই ডাকিনী দেবীর ক্ষমতা উল্লেখ করে গেছেন। 

আবার অনেক সাধকরাও ডাকিনীর সিদ্ধ হয়ে, ইষ্টের পথে অগ্রসর হয়েছে।

তাই এই বিষয়টা আদৌ খারাপ না ভালো সেটা আলাদা আলাদা মানুষের ভাবনা চিন্তার উপরে নির্ভর করে।


তবে এই সকল উগ্র অবিদ্যার সাধনা সাধারণ গৃহী মানুষের চিন্তা করা উচিত নয়। যে সম্পূর্ণ  জীবন মরণ ভয় থেকে মুক্ত হতে পারবে, ভিশন শক্তিশালী এবং উচ্চ মানের সাধকে পরিণত হলে তবেই ডাকিনী সাধনার চিন্তা মাথায় আনা উচিত।

  

         জয় মা ভবতারিণী


=====================■■

■■■■■■■■■■■■■■■◆


কামাখ্যা মন্দিরে হয় বাৎসরিক লিঙ্গ পূজা।

                        

এবং প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময় এখানে একটা পূজা হয়।যাকে লিঙ্গ পূজা বলে।।।।

অনেক মানুষ বলে ঐখানের মানুষ উলঙ্গ থাকে তাদের কোনো কাপড় নেই। সেখানে তিনটা জাদু বিদ্ধা আছে

1)সতী ,রতি, অঘোরী

এই তিনটা শক্তিশালী বিদ্ধা আছে ঐখানে।যারা সতী বিদ্ধা তারা সাদা পোশাক পরিধান করে।

আর যারা রতি বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত তারা লাল পোশাক পরিধান করে।

আর যারা অঘোরী তারা কালো কালো কাপড় পরিধান করে।

               


রতি রা কালি দেবীর অনুসারী।

সতী রা দুর্গা দেবীর অনুসারী

আর অঘোরী রা মহা দেব এর ভক্ত এখানে সব চাইতে শক্তিশালী হলো অঘোরী বিদ্যার মানুষ, এমন টাই বলে সবাই।




তবে এখন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না ওখানে তবে ওই খানে এমন কিছু লোক আছে যারা দাবি করে যে তাদের বয়স ২০০ বছর এর ও বেশি।


কিন্তু তাদের দেখলে মনে হয় তারা ৩০-৪০ বছরের তারা বলে যারা তাদের জাদুর বিদ্যা দ্বারা এখনো যুবক।।


ওই দেশের প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে শুধু একটা কাজ এ জঘন্য তম আর সেটা হলো।( যদিও এই পূজা অতি গোপন ভাবে হয়।)

কামাখ্যা মন্দির এ তাদের বাৎসরিক লিঙ্গ পূজা।এই পূজার সময় একটা কুমারী মেয়েকে উলঙ্গ করে।দেবীর মূর্তির সাথে বসানো হয়।এবং তার পর তাতে দেবী ভর করে।এবং দেবির এই লিঙ্গের পূজা করে সবাই।যার যা যা ইচ্ছা দেবীকে বলে।দেবী নাকি সবাইকে সমস্যার সমাধান দেয়।

           

আর তার পর দেবীর উপস্থিত যেই ছেলে পছন্দ সেই ছেলেকে দিয়ে তার যৌন তৃপ্তি মেটায়।আর ওই খানে থাকা।সব ছেলে মেয়ে সবার সামনে।একজন আরেকজনের সাথে। যৌন মিলনে লিপ্ত হয়। ওখানে বাহির থেকে যাওয়া অনেক মেয়ে।ওই জাদুগর দের সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হয়।তারা মনে করে।জাদুগর রা তাদের সমস্য সমাধান করতে পারবে।

আর এভাবেই তাদের পূজা সম্পূর্ণ হয়।।

======================




★★★

পুরাকালে প্রাগজ্যোতিষে কামরূপ রাজ্যের কেন্দ্রে কামাখ্যা অঞ্চল ছিলো 'নায়িকা দ্বারা আকীর্ণ'। এই নারীরা নানারকম তান্ত্রিক ও যৌগিকশক্তির আধার ছিলেন। বহিরাগতদের তাঁরা জাদুবলে পশুতে পরিবর্তিত করে দিতে পারতেন। এই রাজ্যে এককালে দেবতা ​​​​​​​ মহাদেব স্বয়ং 'রহস্য' নামে এক কঠোর তপস্যা করেছিলেন। 



প্রাগজ্যোতিষের অধিকার নিয়ে শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে এসেছে। যেহেতু কামাখ্যাদেবীর অধিকার পেলেই একসঙ্গে প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যের অধিকারও অর্জন করা যায়, তাই উভয়গোষ্ঠীর মধ্যে বিসম্বাদ কখনও থামেনি। 



কালীর নামান্তর ছিলো রুদ্রাণী, শংকরী বা শিবদূতী। দেবী জন্ম-জন্মান্তর ধরে নানারূপে আবির্ভূতা হয়েছিলেন শিবের শক্তি হয়ে। শিবের মনোযোগ আকর্ষণ, তাঁকে জয় করাই ছিলো শক্তিদেবীর প্রধান উদ্দেশ্য।


আজকের দিনেও দেশের উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে আমরা জনজাতিক মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা দেখতে পাই। একসময় কামরূপ এই ব্যবস্থার কেন্দ্র ছিলো। স্বাভাবিক ভাবেই এই রাজ্যের মেয়েরা ছিলেন পুরুষদের থেকে উজ্জ্বলতর মানবগোষ্ঠী। বর্ণাশ্রমী ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা এটা মেনে নিতে পারতো না। নারীদের এতো প্রভাব-প্রতিপত্তি তাদের পীড়িত করতো। কিন্তু সরাসরি বিরোধিতাও করতে পারতেন না তাঁরা। শেষ পর্যন্ত কামরূপের নারীদের বিরুদ্ধে ডাকবিদ্যা চর্চার অভিযোগ তুলে বহিরাগত আর্য পুরুষদের জন্য সাবধানবাণী প্রচার করা হতো। কামরূপের স্বাধীনা, রূপসী, বরনারীদের আকর্ষণে যেন আর্য বীরেরা মোহগ্রস্ত না হয়ে পড়ে। এক কথায় ঐ নারীরা ডাকিনী -যোগিনী- জাদুকরী। তারা মোহগ্রস্ত পুরুষদের রুধির পান করে থাকে। তাদের প্রতি মোহ জয় করতে না পারলে দিগ্বিজয়ী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও বীর ক্ষত্রিয়রা 'মেষজন্ম' লাভ করবে। এই সব প্রচারে যে বিশেষ লাভ হয়েছিলো, তা নয়। বহিরাগত আর্য পুরুষরা স্থানীয় নারীদের সঙ্গিনী করে তন্ত্র-মন্ত্র চর্চায় সুখে দিনাতিপাত করতেন। তা আর্যাবর্তের পুরোহিতরা যতো রাগই করুন না কেন। যেমন, সব সুস্থ, স্বাভাবিক নারীর দল 'শাশুড়ি' পদ পেয়ে গেলেই মনে করতে থাকেন তাঁদের সোনার চাঁদ পুত্রকে বধূটি ‘ভেড়া’ বানিয়ে দিয়েছে। ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে।



?????????????????★★★★★★★★

★★★★★★★★★★★★


  


ডাকিনী-যোগিনী প্রসঙ্গে দু-চার কথা

 


পাড়ায় পাড়ায় বারোয়ারি কালীপুজোর মণ্ডপে মূল প্রতিমার দু'পাশে প্রায়শই তাঁদের দেখা মেলে। অতি উগ্র, অতি বীভৎস দুই নারী- প্রায় নগ্নিকা, দুই হাতে মনুষ্যাকৃতি কোনও জীবের শরীর থেকে লোলুপ ভঙ্গীতে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছেন। ঘোরদর্শনা এই দুই শক্তি-সহচরীর নাম কমবেশি সবাই জানেন, ডাকিনী-যোগিনী। এঁরা কারা? পুঁথিপত্র ঘাঁটলে জানা যাবে ডাকিনী-যোগিনীর বিচিত্র ইতিহাস।


দেবী দক্ষিণাকালীর প্রচলিত পূজাপদ্ধতি পড়লে জানা যায়, মূল দেবতার পূজার পর পূজিত হন আবরণ দেবতার দল, অর্থাৎ যাঁরা মূল দেবতার (এক্ষেত্রে কালীর) সহচর, পার্শ্বচর বা পার্ষদ। ডাকিনীগণ ও যোগিনীগণও এই আবরণ দেবতা শ্রেণীটির অন্তর্ভুক্ত। কালীপূজার সময়ে এঁদের পঞ্চোপচারে পূজার বিধি রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে দুজন দেবতা নন, পূজিত হচ্ছেন দুটি শ্রেণী বা গোষ্ঠী- ডাকিনীগণ, যোগিনীগণ। এই দুটি গোষ্ঠীর প্রতিভূ হিসাবেই বারোয়ারি কালীপূজায় ওই দুই প্রতিমার স্থাপনা। 


প্রথমে যোগিনীদের কথা বলি। 



সোশ্যাল মিডিয়ায় 'ইয়োগা' ডাকনামে এখন যে যোগের রমরমা, তা মূলত হঠযোগের একটি লঘু সংস্করণ- শরীর-মনকে তাজা, কর্মক্ষম রাখাই তার মূল উদ্দেশ্য। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে 'যোগ' বিষয়টি কখনওই এমন একমাত্রিক ছিল না। বেদ, উপনিষদেও যোগের উল্লেখ আছে। বেদভিত্তিক ষড়দর্শনের অন্যতম 'যোগদর্শন' গ্রন্থে পতঞ্জলি মুনি বলেছেন, যোগ কথার অর্থ "চিত্তবৃত্তিনিরোধ:" অর্থাৎ চিত্তের চঞ্চল প্রবণতাগুলিকে সংযত করা। মহাভারতের অন্তর্গত ভগবদগীতার আঠেরোটি অধ্যায়ের নামের সঙ্গেই 'যোগ' শব্দটি সংযুক্ত। গীতামুখে শ্রীভগবান কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, অষ্টাঙ্গযোগ, ভক্তিযোগ প্রভৃতি নানাবিধ যোগপথের মাহাত্ম্যখ্যাপন করে অর্জুনকে যোগী হবার উপদেশ দিয়েছেন। বৈষ্ণব চতু:সম্প্রদায়ের ব্যাখ্যায় ভক্তিযোগই এই সমস্ত যোগপন্থার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আবার শাক্ত, শৈব প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ধর্মেও ক্ষেত্রেও নিজস্ব যোগপদ্ধতির ধারণা আছে। অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশে অতীন্দ্রিয় অনুভূতি লাভের সাধনা মাত্রেই কোনও না কোনও মার্গের যোগসাধনা, একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে। যাঁরা যোগ-অন্ত প্রাণ, তাঁরাই যোগী, স্ত্রীলিঙ্গে যোগিনী। 



যোগশাস্ত্রের পণ্ডিতেরা বলেন, জীব ও আত্মার ঐক্যই যোগ। শিব ও আত্মার অভেদ দশাকে শিবোপাসকগণ যোগ বলেন। আগমবেত্তাদের মতে, শিবশক্ত্যাত্মক জ্ঞানই হলো যোগ। সাংখ্যমতে যিনি পুরুষ, ন্যায়মতে যিনি ঈশ্বর, বৈষ্ণবমতে যিনি নারায়ণ- তাঁর পরিচয়লাভই যোগ। কামাদি শত্রুগণকে জয় করার মাধ্যমে যোগপন্থায় যাত্রা শুরু হয়। (পটল ২৫, শ্লোক ১-৩) 




শাক্ত শাস্ত্রকার এইভাবেই যোগের বহুমাত্রিক তাৎপর্য নির্ণয় করেছেন । আর শক্তি-উপাসিকা সিদ্ধযোগিনীরাই দেবীর সহচরী। 


উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চৌষট্টি যোগিনীর প্রাচীন মন্দিরগুলি এখন পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট। এই সব দেবালয়ে মধ্যস্থলে থাকেন শিবশক্তি যুগল, তাঁদের ঘিরে চক্রাকারে অবস্থান করেন যোগিনীবৃন্দ। লোকবিশ্বাস অনুসারে, নিশুতি রাতে মন্দির যখন একেবারে নির্জন, তখন এই যোগিনীরা বায়ুপথে পাড়ি দেন আকাশমণ্ডলে, আবার ভোর হবার আগেই ফিরে আসেন। তাঁদের উড্ডয়নের পথ অবাধ রাখতেই এই মন্দিরগুলি হয় ছাদবিহীন। এই যোগিনীদের নাম নির্দিষ্ট নয়। এমনকী সংখ্যারও হেরফের হয়, বিয়াল্লিশ বা একাশি যোগিনীমণ্ডলের হদিশও পাওয়া গেছে। আর যাঁরা দুর্গাপুজোর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র একটু মন দিয়ে খেয়াল করেছেন তাঁরা জানেন, ভদ্রকালীরূপিণী দেবী দুর্গা কোটিযোগিনী-পরিবৃতা। অর্থাৎ শক্তির এই সহচরীরা এককথায় অসংখ্য। 



'ডাকিনী' শব্দের ব্যঞ্জনা বহুমাত্রিক। তন্ত্রমার্গে শরীরমধ্যস্থ মূলাধার চক্র, যেখানে কুলকুণ্ডলিনী শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকেন, সেই চক্রে অধিষ্ঠান করেন ডাকিনী শক্তি। আবার, মহাবিদ্যা ছিন্নমস্তার দুই পার্শ্বে থাকেন তাঁর দুই সহচরী ডাকিনী ও বর্ণিনী। ডাকিনীগণ শিব-শক্তির লীলাসহচরী বিশেষ একটি গোষ্ঠীও বটে। পুরাণে বিভিন্ন যুদ্ধের বিবরণে ডাকিনীগোষ্ঠীকে শিব ও শক্তির সেনাদলে দেখা গেছে। বাংলার মঙ্গলকাব্যেও দেখতে পাই তাঁদের। অন্নদামঙ্গলে দক্ষযজ্ঞনাশে শিবের সেনাদলে ডাকিনী যোগিনীদের দেখা মেলে, চণ্ডীমঙ্গলে কলিঙ্গরাজ এবং সিংহলরাজের বিরুদ্ধে চণ্ডী যখন যুদ্ধযাত্রা করেন, তখন অজস্র ভূত প্রেত পিশাচের সঙ্গে ডাকিনী-যোগিনীরাও তাঁর সঙ্গিনী হয়। 



রহস্যময় গুপ্তবিদ্যার অধিকারী প্রাজ্ঞ মানব-মানবীরাও এককালে 'ডাক' ও 'ডাকিনী' নামে পরিচিতি পেতেন। চর্যাপদের সঙ্গেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রকাশ করেছিলেন 'ডাকের বচন'। বিশেষ করে বৌদ্ধ তান্ত্রিকসমাজে ডাকিনীরা ছিলেন সম্মাননীয়া, চুরাশি সিদ্ধর কাহিনীতে তাঁদের সিদ্ধসাধিকা ও গুরু, দুটি ভূমিকাতেই একাধিকবার দেখা গেছে। 


আবার এই গুপ্তবিদ্যার অপপ্রয়োগের ফলেই তাঁদের ঘিরে তৈরী হয়েছে জনতার ভয়, ক্ষোভ, রোষ। মধ্যযুগে তো বটেই, আধুনিক যুগেও ভারতের নানা প্রান্তে কত নারী যে ডাইনি সন্দেহে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা তো গুণে শেষ করা যাবে না। এঁদের মধ্যে অনেকে নির্মমভাবে নিহতও হয়েছেন। মধ্যযুগের সাহিত্যে ডাকিনীদের নিয়ে এই সামূহিক ভীতির নিদর্শন মিলবে। মুকুন্দ চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে দেখি, ধনপতির বাণিজ্যযাত্রার আগে তার কনিষ্ঠা পত্নী খুল্লনা স্বামীর মঙ্গলকামনায় চণ্ডীপূজা করছে। ঈর্ষাকাতর সপত্নী লহনা বণিকের কাছে গিয়ে নালিশ করল, "তোমার মোহিনী বালা/ শিক্ষা করে ডাইন কলা/ নিত্য পূজে ডাকিনী দেবতা।" লহনার শঙ্কাকাতর দৃষ্টির সামনে উপাস্য ও উপাসক দুজনেই ডাকিনী, আর ধনপতির চিন্তাও সেরকমই। তাই ক্রুদ্ধ ধনপতি খুল্লনার কেশাকর্ষণ করে ভর্ৎসনা করে, দেবীঘটে লাথি মারে। পরিণামে চণ্ডীর কোপে তার নিগ্রহের শেষ থাকে না। আবার চৈতন্যজীবনীতে দেখি, বালকপুত্র নিমাইয়ের উপরে যাতে ডাকিনী যোগিনীর কুনজর না পড়ে, সেজন্য গৃহদেবতা বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করছেন জগন্নাথ মিশ্র (চৈতন্যভাগবত)। চৈতন্যচরিতামৃতকারের মতে, বিশ্বম্ভরের এই 'নিমাই' ডাকনামটির আড়ালে রয়েছে ডাকিনী আদি অপশক্তির ত্রাস। মাতৃস্থানীয়া প্রতিবেশিনীরা শিশুটিকে অপদেবতাদের কাছে অরুচিকর করে তোলার জন্য তার নাম রেখেছিলেন নিমাই (নিমের মতোন তেতো)। সুতরাং মধ্যযুগ জুড়ে জনতার মনে ডাকিনীদের নিয়ে যে কী তীব্র ভয় কাজ করত, তা তো দেখাই যাচ্ছে। ঔপনিবেশিক যুগেও এই শঙ্কা খুব একটা কমেনি, তার নিদর্শন ধরা আছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ডাইনী' গল্পে। কয়েকটি কাকতালীয় দুর্ঘটনার ফলে সমাজের চাপে পড়ে কীভাবে একটি নির্দোষ ও অসহায় মানবী 'ডাকিনী' কুখ্যাতি পেল, এ গল্প তারই আত্মদহন ও মর্মান্তিক মৃত্যুর আখ্যান। অবশ্য এখন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার ক্রমাগত চেষ্টায় ডাইনি সংক্রান্ত কুসংস্কার ও হিংসার ঘটনা অনেকটাই কমেছে। 


এই সামূহিক ত্রাস থেকেই দক্ষিণাকালীর দুই পাশে ডাকিনী যোগিনীর অমন ভয়াল মূর্তি। শাস্ত্রে ও ইতিহাসে যাঁদের রণরঙ্গিনী, সিদ্ধসাধিকা ও বিদ্যানিপুণা রূপের পুন:পুন: উল্লেখ, এই মূর্তিতে তাঁদের সেই উজ্জ্বলতার কোনও চিহ্নই কি ধরা পড়ে? জনগণ আজ তাঁদের কুৎসিত, নরমাংসলোলুপ, ভয়াল ভয়ঙ্কর ভাবতেই অভ্যস্ত। তবে এ কথা ঠিক, ডাকিনী যোগিনীর রূপকল্পনা যতই বীভৎস হোক, মানুষ এ কথা ভোলেনি যে তাঁরা শক্তিসহচরী, তাঁরা পূজনীয়া। তাই প্রলয়রূপিণী "মৃত্যুরূপা মাতা"-র দুই পার্শ্বে তাঁদের নিত্য অবস্থান।

======================____


★★★★★★

নারীদের দেশে নারীরাই ছিল অধিপতি




ছোট বেলায় রাক্ষস আর পেত্নির গল্প না শুনে একটি বাঙালীও বড় হয়নি। ভূত-পেত্নি-ডাকিনী-যোগিনী-শাকচুন্নি, অশরীরী, প্রেত, পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, পিশাচ, ডাইনী, শাঁকচুন্নী, যক্ষ, মামদো গল্পে শোনা ভয়ঙ্কর রুপী নারীর ছবি। মাথায় গেঁথে থাকা এই ছবি গুলির দিকে যখন চেয়ে থাকি, সত্য তখন থেকে যায় এর সবকিছু থেকে দূরে, অন্য কোথাও, যার সন্ধান এখনো অজানা।


পুণ্ড্রের পাঁচালীর এই পর্বে রাক্ষসী বলতে গত্রদেবী বা প্রধানপুজরিনী কিংবা বৈদ্য বা শল্য চিকিৎসক পরিচয় খুঁজব। তেমনি ডাইনী যোগিনীর তত্ত তালস করব। ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা আসলে মস্তিষ্কে গেঁথে যাওয়া কিছু তৈরি ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়- এই কথার বাইরে হাঁটব।


রাক্ষসীদের পরাজয় কিংবা গণতন্ত্রের সূচনা

গোপাল নামের এই নেতার খুবই অল্প পরিচিতি। তবু গোপালের বীজয়ের কথা সুদূর তিব্বত পৌঁছেছিল এবং সেখানকার ঐতিহাসিক লামা তারনাথ গোপালের সিংহাসন আরোহণ নিয়ে এক রূপকথার অবতারণা করেন।


তাঁর কাহিনীর সারকথা- দেশে দীর্ঘদিন যাবৎ অরাজকতার ফলে জনগণের দু:খ-কষ্টের আর সীমা ছিল না।  দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিরা একমত হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন ‘রাজা’ নির্বাচিত করেন। কিন্তু ‘নির্বাচিত রাজা’ রাতে এক কুৎসিত নাগ রাক্ষসী কর্তৃক নিহত হন। এরপর প্রতি রাতেই একজন করে ‘নির্বাচিত রাজা’ নিহত হতে থাকেন। এভাবে বেশ কিছু বছর কেটে গেল। অবশেষে একদিন চুন্ডাদেবীর এক ভক্ত এক বাড়িতে এসে দেখে সে বাড়ির সকলেরই মন খুব খারাপ। কারণ, ঐদিন ‘নির্বাচিত’ রাজা হবার ভার পড়েছে ঐ বাড়িরই এক ছেলের উপর। আগন্তুক ঐ ছেলের পরিবর্তে নিজে রাজা হতে রাজি হন। পরবর্তী সকালে তিনি রাজা ‘নির্বাচিত’ হন। সে রাত্রে নাগ রাক্ষুসী এলে তিনি চুন্ডাদেবীর মহিমাযুক্ত লাঠির আঘাতে রাক্ষুসীকে মেরে ফেলেন। পরের দিন তাকে জীবিত দেখে সকলেই আশ্চর্য হয়। পরপর সাতদিন তিনি এভাবে রাজা ‘নির্বাচিত’ হন। অবশেষে তাঁর অদ্ভুত যোগ্যতার জন্য জনগণ তাঁকে স্থায়ীভাবে রাজা রূপে ‘নির্বাচিত’ করে।


পাল আমলের মুদ্রায় নারী 


প্রাচীনতম সভ্যতা সমূহের তত্ততালাশ করলে দেখি, কৃষিকেন্দ্রিক প্রাচীন সমাজে তাই নারীরাই ছিল অধিপতি। নবপলিয় যুগ থেকে চলে আসা রীতি অনুযায়ী বছরান্তে ফসল কাটার পরে গত্রদেবী তার পুরুষ সঙ্গীকে বলি দিয়ে দেবতার পুজা করত। ভূমীর উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য এই পূজার আয়জন হাজার দেড়েক বছর চল ছিল।

কিন্তু নারীতন্ত্রের এই আধিপত্য বৈদিক ধর্মের প্রসার কালে এসে খয় ধরতে শুরু করে। কৃষিকাজ যেহেতু মেয়েদের আবিষ্কার, সেহেতু বাংলায় এই আধিপত্য বিলোপ ঘোটান সহজ ছিল না। তৃতীয়-চতুর্থ খ্রিস্টপূর্ব শতকে, ‘সমগ্র দেশের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ নারীদের অধীন; এটা এই জন্য যে অনেক ধনী উত্তরাধিকারিণী আছেন, এবং প্রচুর যৌতুক দেওয়া হয়।’  

পাঁচশ খৃস্টাব্দে বরেন্দ্র অঞ্চলের গত্রদেবীর পুরুষ সঙ্গীরা আর সহজে বলি হতে চাচ্ছিল না। এ বিষয়ের নাথা মুনি মিন নাথের ইতিহাসে। নারীদের দেশে বন্দী মিন নাথকে উদ্ধার করে গরক্ষনাথ।           


নারীতন্ত্রের এই আধিপত্য বিলোপ ঘোটান গোপাল নামের সাধারণ এক ভূমিপুত্র। ৭৫০ সালে তিনি গত্রদেবী বা প্রধানপুজরিনীকে রাক্ষসী হিসেবে বধ করে গণতান্ত্রিক ভাবে অধিপতি হয়েছিলেন। আমাদের অঞ্চলে নারীদের এই ঐতিহাসিক পরাজয় ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্য মাত্রা যোগ করে।   

বাংলার কৃষিসভ্যতার শুরুতে সাপের উপদ্রব খুবই ছিল; সাপের কামড়ে অনেককেই প্রাণ দিতে হত; অন্ত্যজ বর্ণের যাযাবর ডোম-শবর-পুলিন্দ-নিষাদ-বেদে প্রভৃতিদেরই অন্যতম বৃত্তি ছিল সাপ-খেলানো, যাদুবিদ্যার নানা খেলা দেখানো ইত্যাদি।

এ বিষয়ে নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন-সাপ বিদ্যায় পারদর্শী কোন নারী গত্রপ্রধান নাগ রাক্ষুসী। মনসা-পূজাই তাহার অন্যতম সাক্ষ্য। পুণ্যতোয়া নদী করতোয়ার তীরের পোদদের দেশ পুণ্ড্রে গুপ্তযুগের শেষভাগে এই প্রথার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।  

রুমানিয় পন্ডিতের নাম মির্চা ইলিয়াদ তার গবেষণায় দেখান বাংলার সাপুড়েরা একধরনের শামান। তিনি শামানবাদ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে এখানকার লোকে বিশ্বাস শামান বা ওঝাদের রয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা, তারা বশীকরণ মন্ত্র জানে, তারা বাণ মারতে পারে। রোগবালায় দূর করতে পারে।


বাঙলার প্রাচীন সমাজটি ছিল তান্ত্রিক। এই তান্ত্রিকতার চর্চা নারী কেন্দ্রিক। শাক্ত মতে বিশেষত তন্ত্র সাধনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একজন নারী।

ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের নিরিখে আমাদের দেশের তন্ত্র ও শক্তিসাধনার ইতিবৃত্ত এখনও প্রকৃত অধিকারীর মনোযোগ পায়নি। নারীদেরকে পুরুষদের মত বারংবার আলোচনা করা হয়নি।






অব্যাখ্যাত শক্তিসাধনার ইতিবৃত্ত  


মাতৃদেবীর পূজার উদ্ভব এখাই ঘটেছিল। লক্ষ্মীর পূজার সুতিকাগার এই অঞ্চল। জানা যায়, মনুবংশীয় মঙ্গল রাজা সৰ্ব্ব প্রথম লক্ষ্মীর পূজা করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না প্রাক্-আর্য কৌম সমাজের ধ্যান-ধারণা নিজস্ব পরিবেশ থেকেই শক্তি সাধনার আয়জন।     

প্রাচীন বাংলার নারীকেন্দ্রিক এই শক্তিসাধনাটি ছিল আর্যদের তুলনায় সুশোভন ও আদর্শকি। যেখানে আর্যদের পুরুষ তান্ত্রিক নিষ্ঠুর ধর্ম বিশ্বাসে নরবলি একটা উৎসব সেখানে বাংলার নারী তান্ত্রিকের ধর্মবিশ্বাসে স্বামীহন্তী পূজারিণীকে আনুষ্ঠানিক শোক পালন করতে হতো।  

আর্য অনার্যদের মাঝে চেতনাগত পার্থক্য দেখি। ঋষিরা চাচ্চেন—ইন্দ্র আমাদের সহান হোন, তিনি আমাদের বিজয় দিন, শত্রুরা দূরে পলায়ন করুক, ইত্যাদি; আর বাঙালির মেয়েরা চাইছে—‘রণে রণে এয়ো হব, জনে জনে সুয়ো হব, আকালে লক্ষ্মী হব, সময়ে পুত্রবতি হব’।

ব্রতের এই ছড়াটি থেকে আমরা পাচ্ছিঃ রণে রণে এয়ো রব, জনে জনে সুয়ো হব, অকালে লক্ষ্মী হব, সময়ে পুত্রবতী হব।এ কামনা যাদের মেয়েরা করতে পারে তারা অন্যব্রত হলেও আর্যদের চেয়েও যে সভ্যতায় নীচে ছিল তা তো বলা যায়না। রণচণ্ডীর যে মূর্তীখানি এই ছড়ার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, মেয়েদের হৃদয়ের যে একটি সংযত সুশোভন আদর্শ আমাদের কাছে উপস্থিত হয়, তাতে করে তাদের অন্যব্রত ছাড়া অকর্মা অমন্ত এ-সব উপাধি দেওয়া চলে না।  


চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী দূর্গা- কালী-বাসুলী- তারা-শিবানী। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছে কালীর কাছ থেকে। আবার শিব- এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তি লাভ করে করে নারী শক্তি থেকে।




 রাক্ষসী জরা রাজা জরাসন্ধর অস্ত্র পাচার করেন

 

পূজার এই অব্যাখ্যাত শক্তিসাধনা বাংলায় নারীকেন্দ্রিক তান্ত্রিক ধারণাটি পল্লবিত হয়েছিল।


গোকুলের ডাইনী কিংবা পুণ্ড্রের অসুরিণী


কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন অনার্য দেবতা শিব। তন্ত্রের মধ্যে থাকা মন্ত্র-  

ওঁ শয়ং চেতনায়ং সর্ব শক্তি ভুতয়াং দিব্য তিলং স্বহাঃ

মন্ত্রটি ডাকিনীবিদ্যা মূল মন্ত্র। ডাকিনী বা ডাইনী গোকুলে দেবীর মর্যাদা পায়। জ্ঞানী- স্ত্রীলিঙ্গে ডাকিনী বা ডাইনীরা।

গোকুল এলাকায় ডুমপুকুরের ধাপ ও কাঁঠালতলার ধাপ, রোজাকপুর (গোকুল থেকে পশ্চিমে) এবং বৃহত্তর বগুড়ার গিরিরডাঙ্গা, নিজগিরিরডাঙ্গা, গোলাবাড়ি, পোড়াদহ, রানীপারা, মহিষাবান, ছাইহাটা ইত্যাদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অধিবাসী ছিলেন।

সমকালীন উৎস থেকে ডাইনিদের তালিকা- ‘গয়, বিমল, শ্ৰীশ, শ্রীধর, মঙ্গলায়ন, মঙ্গল, রঙ্গবল্লীশ, রঙ্গোজী ও দেবনায়ক, ইহার গোকুলে নবনন্দ নামে কথিত’।


ডাইনিদের যে চিত্তাকর্ষক তালিকা পাই তা আমাদের একেবারেই অপরিচিত নয়। অদ্ভুত সংবাদ- ডাকিনী, রাকিণী, লাকিনী, কাকিনী, শাকিনী এবং হাকিনী নামের দেবীরা একটা ও সংষ্কৃত না।           

তবে সংস্কৃতে জরা শব্দের মানে হছে বৃদ্ধাবস্থা। কিংবদন্তির ঐতিহাসিক মতে এখানে রাক্ষসী জরা মানে বৈদ্য বা চিকিৎসক। এই রাক্ষসী অনেক জ্ঞানের ভারে বৃদ্ধা হয়েছিলেন। কিংবদন্তি অনুসারে রাক্ষসী জরা রাজা জরাসন্ধর অস্ত্র পাচার করেন।       

শল্য চিকিৎসক জরা রাজা জরাসন্ধর প্রাসাদে থাকতেন।   

রাজা জরাসন্ধর বন্দধু পুণ্ড্রের রাজার প্রাসাদে থাকত অসুর-অসুরিণী। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থে অসুর ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে অসুর বলা হচ্ছে। 

“অসুরানাং ভবেত বাচা গৌড় পুন্ড্রোদ্ভবা সদা”।


অসুর থেকে অসুরিণী। চকচকে কৃষ্ণবর্ণের অসুরিণীদের মদ্ধে ঊষা, রিত্নাসুর আমাদের অতীত নারী চরিত্রের উজ্জ্বল প্রতিভু। এছাড়াও প্রাচীন রাঢ় এবং সুহ্ম প্রদেশসহ এ অঞ্চলের সভ্যতা বিনির্মাণে অসুরিণীদের অন্যোন্য ভূমিকার কথা জানতে পারি বিদেশী পর্যটকদের বিবরণে।     

রাহুল সাংকৃত্যায়ন মতে বগুড়ার করতোয়া নদী কূলে অবস্থিত মহানগড়ে কোল-মুন্ডা জনগোষ্ঠীর নারী সমাজ খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতক থেকে পূর্ব ভারতে এক নতুন সভ্যতা প্রবর্তনে অবদান রাখে।

ভারত-বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত মৃৎশিল্পের নমুনা বিশ্লেষণ করলে দেখি-বৈদিক যুগে প্রতিমা পূজার প্রথা প্রচলিত ছিলো। পোড়ামাটির প্রতিমার তত্ততালাশ করলে প্রতিভাত হয় যে, বৈদিক ধর্মাচারের গোড়াপত্তন হয়েছিল এ অঞ্চলের মানুষের হাত ধরেই। নানাবিধ লৌকিক আচারের সাথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিশ্বাস-সংস্কারের মিশ্রণে বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্ম-বিশ্বাসের পৌনঃপুনিক বিবর্তনের পথ বেয়ে বাঙালির জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসবসমূহ এখন প্রচলিত। পুণ্ড্রর যন্ত্র-তন্ত্র-মন্ত্র চর্চা গৌরব ময় ইতিহাস হারায়ে বসেছি।




যোগিনী


যন্ত্র-তন্ত্র-মন্ত্র রহস্য


বৌদ্ধ তন্ত্রযানের দুজন মহাগুরু নাড়োপা এবং নিগু কিংবা কম্বলপাদ এবং শিলাদেবী যন্ত্র-তন্ত্র-মন্ত্র বিদ্যায় অসম্ভব দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তাদের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার প্রমাণ পাই বৈদিক সাহিত্যে।

কৃষিকেন্দ্রিক প্রাচীন নারীজীবনের নানারকম গোপন ও গভীর রহস্যের সঙ্গে জড়িত। সে সময়ে নারী সমাজে নিজেদের বিভিন্ন ধরনের জাদুকরী বা অতিমানবিক ক্ষমতা অর্জনের চর্চা ছিল। জাদুকরী ক্ষমতা নিয়ে যিনি কাজ করেন, বা ক্ষমতা রাখার দাবি করেন, তাকে ডাইনি বলা হয়ে থাকে।      

ডাইনী বা ডাকিনীবিদ্যার অতিব ভয়ঙ্কর সাধনা চলত আসামের কামরূপ-কামাখ্যা মন্দিরে। আবহমান কাল ধরে বাংলা একটা বড় অংশের মানুষ বিশ্বাস করে এসেছেন, নারী অধ্যুষিত কামরূপ-কামাখ্যা আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে যাদু।     

গ্রাম-শহরের হাটে-ঘাটে জাদুর পশরা নিয়ে বসা জাদুকরেরা গা ছমছম করা ডাকিনী সাধনা গল্পরা করে।

মায়ং থেকে ঘুরে আসা মনুষজন জানাচ্ছেন, গ্রামে প্রবেশ করলে দেখা মেলে বহু তান্ত্রিক ডাকিনী সাধনা করছে। এছাড়াও যোগিনী-তত্ব, ভূতশাস্তির ঔষধ, মন্ত্রে শাকিনীদমন ও ঐন্দ্রজালিক ও ডাকিনীবিদ্যা বিষয়ক সাধনা ব্যাপকভাবে চর্চিত হতে দেখা যায়।

দর্শনার্থী আকর্ষণ করার জন্য তান্ত্রিকরা ভূত, প্রেত, যোগিনী, ডাকিনী, পিশাচ সাধনার কথা বলে। তবে নানা গুহ্য, মন্ত্র, যন্ত্র, ধারণী প্রভৃতি ধ্যান-কল্পনায়, পূজাচারে, আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মে এবং গুহ্য, রহস্যময়, স্বার্থকযন্ত্র, মন্ত্র, ধারণী, বীজ, মণ্ডল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য চর্চা আদিম কাল থেকে বাংলায় হয়েছে।


বজ্রযান কে বলা হয় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম। মন্ত্র এবং যন্ত্র -এ দুই হল বজ্রযানের সাধনার উপকরণ। বিহারের বিক্রমশীলা বিহারটি ছিল বজ্রযানী বৌদ্ধদের অন্যতম কেন্দ্র। বজ্রাচার্য নাঢ়োপা অতীশ দীপঙ্করের শিক্ষক ছিলেন। নাড়োপা বিক্রমশীলা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় অতীশকে বিক্রমশীলার প্রধান পদে অভিষিক্ত করে যান।



পাল আমলের 


যোগিনী-তত্ব আবিষ্কারক কম্বলপাদ সম্বন্ধে ন্যারো-পার বোন নিগু-মা বলেন, তিনি এবং কম্বলপাদ ভিন্ন আয় কেউ মন্ত্রযান জানেন না। চুরাশি সিদ্ধাচার্যের অন্যতম  নাড়োপা এবং নিগু ডাকিনী উভয়েই চর্যাপদ রচনা করেছেন, দুজনেই ছিলেন হেবজ্রের উপাসক।

কৌতুহলোদ্দীপক এক মন্ত্র-  

‘ওম মনিপদ্মে হূম’ জপ করা হয়।’আহা, মনিই প্রকৃত পদ্ম’

– অনেকের মতে, এই মন্ত্রটি বুদ্ধ এবং প্রজ্ঞাপারমিতার এবং বোধিসত্ত্ব এবং তারা দেবীর যৌনমিলনের প্রতীক। তবে বজ্রযান কেবলি যৌন সাধনপন্থা নয়, বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একটি রহস্যময় রূপ।


রহস্যময় শয়তানি বিদ্যা কিংবা ভয়ঙ্কর জাদু বিদ্যা সভ্যতার শুরু থেকে এই দুইয়ের প্রতিই মানুষের সীমহীন সেই আগ্রহ এখনো আছে। সেই আকাংখা তান্ত্রিক ধারার শুরু হয়েছিল যা সিদ্ধ ধারা নামে। এই ধারার অনুগামীদের লক্ষ্য ছিল সিদ্ধি বা অমরত্বের সাধনা।  

ব্যাক্তিজীবনে এবং সামাজিক জীবনে ঝাড়-ফুঁক-মন্ত্র-ওঝা-তান্ত্রিক সিদ্ধদের প্রয়োজনীয়তা আছে। আবহমান কাল ধরে বাংলার মানুষ গভীর বিশ্বাসকে লক্ষ্য করে

কোকা পণ্ডিত ‘বৃহৎ ইন্দ্রজাল’ নামে বই লেখেন। বইটি মুলত নানা তন্ত্র শাস্ত্র হতে সংগৃহীত মন্ত্র-তন্ত্র-শ্লোকের সংকলিত রূপ। কোকা পণ্ডিতের বৃহৎ ইন্দ্রজালের ‘বশীকরণ-পদ্ধতি’ ব্যাপক জনপ্রিয়।   

যেখানে নারী পুরুষকে বসে আনতে বেস্ত। জাদুবিশ্বাসের এই নারীকে ডাকিনী বলা হয় (যোগিনীতন্ত্রম)।




কোকা পণ্ডিত ‘বৃহৎ ইন্দ্রজাল’ বইয়ের প্রচ্ছদ 


অতীন্দ্রিয় যোগিনী কিংবা মায়াবী যক্ষী কুবন্না


যোগিনীতন্ত্র হিন্দু ও বৌদ্ধতন্ত্রের ঐতিহ্যের অংশ। যোগিনী হিসাবে এমন নারীদের

কথা বলা হয় যারা আধ্যাত্মিক জ্ঞানচর্যার পথের প্রাগ্রসর তান্ত্রিক। ডোম্বিযোগিনী, সহজযোগিচিন্তা, লক্ষ্মীঙ্করা, মেখলা, কঙ্কাল গঙ্গাধরা, সিদ্ধরাজ্ঞী ও অন্যান্যদের মত প্রচুর নারীরা সম্মানিত যোগিনী ইতিহাস ক্ষেত।

মহাস্থানের প্রত্ন স্থান যোগীর ভিটা বা ধাপ বাংলায় যোগিনী সাক্ষ্য বহন করছে। এখানকার বেশ কিছু নারী ছিলেন, যেমন নারায়ণ-শিলা, গণেশ, ভৈরব, বৌদ্ধ জম্ভিল, হারীতী, একজটা, নৈরাত্মা, ভৃকুটি প্রভৃতির দেবদেবীর যাঁরা যথেষ্ট বিদুষী ছিলেন। দর্শন রচনা ও চর্চা করতেন তাঁরা, জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিদ্যায় ছিলেন পারদর্শী, তাঁদের আয়ত্তে ছিল তীর-ধনুক চালনা, জাদুবিদ্যা, শিক্ষকতা ও গুরুর দায়িত্ব পালন করা। ফলে আদিকালে নারীরা কেবল গুরুপত্নীই নন, সাক্ষাৎ গুরুও ছিলেন।      

মূর্তিতত্ত্বের ইতিহাস অনুযায়ী এসব যোগিনী আদিবাসী কৌম-সমাজের তান্ত্রিক। পূর্ব-ভারত তথা বাঙলা অঞ্চলে ধর্মের আবির্ভাবের আগেও মানুষের মধ্যে আধ্যাত্দিক চর্চা ছিল। আবার ধর্মের আবির্ভাবের পরও এই চর্চা অব্যাহত ছিল।


তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে, মিরান্ডা সাউ বলেন যে, নারীর শাশ্বত রূপ, অর্থাৎ তার মধ্যে কতগুলো বিশেষ মানবিক গুণের সমাহার – যেমন, দয়ামায়া, স্নেহ, সেবা, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, সহ্যশক্তি ইত্যাদি, তেমনি দেখা যায় মারামারি, দাঙ্গাবাজি, খুন বা যুদ্ধে প্রায়শই নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা, সেইসঙ্গে আবার কোনো কোনো নারীর ভেতর দেখা যায় কুটিলতা, জটিলতা, হিংসা, লোভ, প্রতিশোধস্পৃহার প্রবল উপস্থিতি।     

সিংহল জয়ী বিজয় সিংহের কাহিনীতে বাংলার নারীর মায়াবী যক্ষীর রুপে পাই। ওই কাহিনী অনুযায়ী, বিজয়ের অনুচরেরা কুবন্না নামে এক মায়াবী যক্ষীর খপ্পরে পড়লে বিজয় তাকে হারিয়ে নিজের সঙ্গীদের মুক্ত করলেন। তারপরে তার সাহায্যে আবার যক্ষরাজ কালসেনকে তার কন্যার বিবাহের সময়ে বধ করে তার পোষাক গায়ে দিলেন।

কুবন্নার ইতিহাসের নথিপত্রের মাতৃদেবীর পুজার লীলাকেন্দ্র বাংলায় নারীদের চিত্র পাই তা রীতিমত কৌতুককর ও ভয়াবহ। ধর্মের নামে অর্থহীন অত্যাচার সমগ্র বৈদিক সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে কুৎসিত এবং জঘন্য দৃষ্টা। মনুর পরে ব্রাহ্মণ্যবাদী নিষ্ঠুরতায় যিনি সবচেয়ে বেশী কৃতিত্বের পরিচয় দেন তিনি হলেন শংকরাচার্য।   

গর্ভবতী নারীদের প্রসব বন্ধ করা থেকে শুরু করে যৌনাকাঙ্খা চিরতার্থ করার মত বিভৎস সব যাদু বিধানের চর্চা হতো তখন। এসময়ে বিশ্বাস করা হতো বশিকরণের মাধ্যমে মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা যায়।


মধ্যযুগে রেনেসাঁর আলো যতই ছড়াক না কেন, জ্যোতিষীদের হাত থেকে কেউই রক্ষা পায়নি! অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিক অস্তিরতা প্রভৃতি কারণে জনমানসে তখনও ভবিষ্যত জানার প্রবল স্পৃহাই এর কারণ ছিল।

বৈদিক সাহিত্যের অমানবিক ও নিষ্ঠুর অধ্যায়ের বাইরে প্রত্নতাত্বিক আলামত ও ‘সামাজিক ইতিহাস’ ঘাঁটলে নারীর সম্মান দেবার ঘটনা বিরল।  


খুব সম্প্রতি ডাইনি সন্দেহে ভারতে এক দম্পতিকে পিটিয়ে হত্যা 

  

বাঙালিত্বের শেকড়ে আছে নিন্দাবাদ

বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে মাতৃকারা পাপের প্রতীক। নারী সম্পর্কে এ ধরনের বহু নিন্দাবাদ প্রচলন ঘটে বৈদিক ধর্ম প্রচার কালে। ইষ্টসিদ্ধির জন্যে প্রয়োজন মতো নারীকে ডাইনি বলে অত্যাচার করা হয়। কলহণ অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে সহমরণে সতী হওয়ার বিবরণ দেন; এক স্ত্রী সহমরণে যাননি, তার প্রভূত নিন্দাও তিনি করেন। রাজতরঙ্গিনী-তে শূদ্র অশিক্ষিত, রুচিহীন; ডোম্বী বর্বর; কিন্তু কলহণ বড় শিল্পী এবং সৎ ঐতিহাসিক; তাই অপক্ষপাত চিত্রণে দেখি দ্বিজ ব্রাহ্মণও বহুবার ওই রূপে চিত্রিত। কলহণ শিল্পীর দায়িত্ব পালন করেছেন, কবি-ঐতিহাসিকের সততা রক্ষা করেছেন।


নারী সম্পর্কে বহু নিন্দাবাদ করেও তিনি বারে বারেই নিঃস্বর্থ প্রজাহিতৈষিণী, আত্মত্যাগে অকাতর বহু নারীকে চিত্রিত করেছেন। তেমনই ভবভূতি যে-সমাজে বাস করতেন তা নারী সম্পর্কে নিষ্ঠুর, কিন্তু কবি ভবভূতির ক্রান্তদর্শিতা তাঁকে এমন একটা লোকোত্তর বোধে উৰ্ত্তীৰ্ণ করেছিল যেখানে তাঁর কাছে প্ৰতিভাত হয়েছিল যে, নারী সমাজে কখনও সুবিচার পায়নি–যথা স্ত্রীণাং তথা বাচাং সাধুত্বে দুর্জনো জনঃ।’

গ্রামবাংলার মানুষের মুখে ফেরে ডাইনিদের লোমহর্ষক কাহিনী। তাদের নির্মম কাহিনী কারণে কালে কালে হাজার হাজার ঐন্দ্রজালিক, ডাইনি হত্যা করা হয়েছিল।


ঐতিহ্য-পরম্পরায় নারীকে এক ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বোধ হতে পারে। নামে নারীই 'শক্তি', কিন্তু শক্তি সাধনের ষটকর্মে সাধনসঙ্গিনীর যে সব লক্ষণ নির্দেশ করা হয়েছে, তার থেকে সম্মাননা বা অবমাননার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অমৃতভাষিণী ও মন্ত্রসিদ্ধকারী মোহময়ী কুহকিনী, সাধনসঙ্গিনী হিসেবে পদ্মিনী নারী শান্তিদায়িনী অপর পক্ষে রক্তনেত্রা, নির্লজ্জা, হাস্যহীনা, নিদ্রালু ও বহুভক্ষিণী উল্লেখ করা যায়। কিংবা ভূত-পেত্নি-ডাকিনী-যোগিনী-শাকচুন্নি, অশরীরী...ভূত, প্রেত, পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, পিশাচ, তাল, বেতাল, একানড়ে, ডাইনী, বাইনী, শাঁকচুন্নী, যক্ষ, মামদো, গোভূত, ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে কোথাও কোথাও নারীদের সম্মানিত করার তথ্য পাই। বিরল এই ঘটনা আমাদের সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান পুণ্ড্রে পাই।


নারীর অনিবার্য আখ্যান


পুণ্ড্র বা বরেন্দ্র অঞ্চলের কথিত আছে, রাজাদের মধ্যে রামপালের বিশেষ খ্যাতি ছিল ন্যায়বিচারক হিসেবে। পুত্র যক্ষপাল এক প্রজার পত্নিকে ধর্ষণ করায় তাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন তিনি। তখন শোকে কাতর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তাঁর পত্নি ও পুত্রবধূ।


নারীর সম্মান দেবার এই আখ্যান অনিবার্য ভাবেই চলে আসে। যেমন ভাবে ভবানন্দ বিপন্ন হয়ে দেবীকে ডাকলেন। ভক্তের স্তবে তুষ্ট হয়ে মহামায়া ভূতসেনা পাঠালেন, তারা দিল্লি আক্রমণ করলে--

ডাকিনী যোগিনী শাঁখিনী পেতিনী গুহ্যক দানব দানা।

ভৈরব রাক্ষস বোক্কস খোক্কস সমর দিলেক হানা।।

■■■■■■■■◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆

 


"শীতলা", "মনসা", "ওলা" এইসকল দেবীর নামে মারণ ব্যাধির দাবী রূপে প্রচলিত। বসন্ত রোগের "শীতলা দেবী", কলেরার "ওলা দেবী" গ্রামে-গঞ্জে প্রচন্ডভাবে বিদ্যমান।

ইতিহাস ঘেঁটে জানাজায় ভুত প্রেতের উৎপাত থেকে শুরু করে রোগব্যাধীর নিরাময় এমন কি সাপে কাটলেও তার প্রতিকারের জন্য আলাদা আলাদা যাদুবিদ্যার আশ্রয় নিত এরা, আর এইসব কাজ করার জন্য নারী ওঝা ছিল!




◆◆◆●●●◆◆●●●●●●●●●●●●●●●●

●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●●



■■■■■((( এই বৌদ্ধ নারী সাধিকা তথা ডাকিনী দের নিয়ে বিভিন্ন গল্প কথা প্রচলিত আছে। সেই গুলো নিয়ে অন্য কোন একদিন আলোচনা হবে। )))■■■■




No comments:

Post a Comment