পুরীর মন্দিরের গোপন কথা-------
বিমলা দেবী
পুরীর মন্দির অর্থাৎ বৈষ্ণবক্ষেত্র,
এই বৈষ্ণবক্ষেত্রে বলি।
বলির এই শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসের ঐতিহ্য বুঝতে হলে আগে চোখ রাখতে হবে দেবী বিমলার স্বরূপে। পুরাণ এবং তন্ত্র মতে যিনি সাক্ষাৎ মহিষমর্দিনী।
অনেক রীতি রয়েছে যা নিয়মিত ভাবে পালন করা হয় পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে। তার মধ্যে একটি পাঁঠাবলি।
যা অনেকেই হয়তো জানেন না বা
জানলেও ঠিক বিশ্বাস করতে চাননা।
বৈষ্ণব ধর্মের মন্দিরে বলি কীভাবে সম্ভব?
জগন্নাথ মন্দিরের চত্বরেই বলি হয়।
তবে সেই বলি নীলমাধবের উদ্দেশে প্রদত্ত হয় না,সেই বলি প্রদত্ত হয় দেবী বিমলার উদ্দেশে যিনি নীলাচলবাসিনী সেই দেবী বিমলার উদ্দেশেই হয় বলি।
উৎকলে সতী দেবীর নাভিদেশ পড়েছিলো ,দেবীর নাম বিমলা,ভৈরব জগন্নাথ।এই জগন্নাথ ক্ষেত্রের বিমলা দেবীকে একান্নটি শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ বলে ধরা হয় ।
""উৎকলে নাভিদেশশ্চ বিরাজক্ষেত্রমুচ্চতে।
বিমলা সা মহাদেবী ,জগন্নাথস্তু ভৈরব।।'"
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রাঙ্গনের দক্ষিণ-পশ্চিমে দেবী বিমলার মন্দির অবস্থিত।
বছরে একবার বলি হয় শ্রীমন্দিরের চত্বরে। তবে অবশ্যই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে। ওই দিন জগন্নাথ দেবের শয়ন হওয়ার পর শুরু হয় বলির আয়োজন। আতপচাল দিয়ে বানানো হয় ঢিপি। তার উপরেই হয় বলি। এমনকি সূর্যোদয়ের আগেই চুনজল দিয়ে গোটা মন্দির চত্বর পরিষ্কার করা হয়। যাতে বলির কোনও চিহ্ন না থাকে।
মহাদেবী বিমলা যিনি জগন্নাথধামের সর্বময়ী কর্ত্রীও। তাঁর পূজা না হলে জগন্নাথের পূজা শুরু করার নিয়ম নেই।
প্রচলিত রীতি ও বিশ্বাস এমনি যে মহাদেবী বিমলা অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই এই মন্দিরে দুই স্ত্রী লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং দুই ভাইবোন বলভদ্র, সুভদ্রাকে নিয়ে বাস করতে পারেন নীলমাধব।
এমনি জানা যায় যে শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথের মন্দির স্থাপিত হওয়ার বহু পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল দেবী বিমলার মন্দির। নগরের প্রাণকেন্দ্রে ছিল তাঁর অবস্থান। পরে এই মন্দিরকে বেষ্টন করেই গড়ে ওঠে জগন্নাথধাম। সেই জন্যেই দেবী বিমলার কাছে জগন্নাথের এই অনুমতি গ্রহণের কাহিনিটি প্রচলিত হয়েছে।
এ তো গেল পুরান ও তন্ত্রের কথ। ইতিহাসও বলে, বিমলা মন্দিরের ইতিহাস সম্ভবত বৈষ্ণব জগন্নাথ-মন্দিরের চেয়েও প্রাচীন। জগন্নাথ মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর পরে নির্মিত। অথচ বর্তমান বিমলা মন্দিরটি খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজত্বকালে নির্মিত। তাও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়েছে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত আদি বিমলা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপরই গড়ে উঠেছে নবম শতাব্দীর এই মন্দিরটি।
কষ্টিপাথরের নির্মিত বিমলা চর্তূভূজা।দেবীর পূজা হয় তন্ত্রমতে,পঞ্চমকারে।ধ্যানমন্ত্র -চন্ডীর ধ্যান।যখনই বলছি শক্তিপীঠ এবং তা তন্ত্রসম্মত, তখন দেবী বিমলার পূজাও তন্ত্রমতে হতে বাধ্য। অর্থাৎ পঞ্চ ম-কার মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন সহযোগে। তবে পঞ্চমকারের অনুকল্প ব্যবহৃত হয় এখানে।মৎস=হিং দিয়ে রান্না করা শাক।মাংস = আদা কুচি।মদ্য = কাসার পাত্রে ডাবের জল।মুদ্রা = জলে গোলা ময়দা আর চিনি।মৈথুন=রক্ত চন্দনে মাখা অপরাজিতা পুষ্প ও শ্বেত চন্দনে মাখা কলকে।
আশ্চর্যের ব্যাপার, বছরের সবকটা দিন কিন্তু দেবী বিমলাকে বলি উৎসর্গ করা হয় না। তার কারণ দেবীর বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস। হিন্দুধর্মে দেবতাকে উচ্ছিষ্ট প্রসাদ নিবেদন করা নিষিদ্ধ। তবে জগন্নাথ মন্দিরের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। সাধারণত বিমলার জন্য আলাদা ভোগ রান্না করা হয় না। তিনি জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করেন। যা কি না নিরামিষ! এবং, সেই উচ্ছিষ্ট ভোগ দেবী বিমলা গ্রহণ করার পরেই তা মহাপ্রসাদের মর্যাদা পায়! অর্থাৎ, বছরের অন্য দিনগুলো বিমলা নিরামিষ আহারই ভক্ষণ করেন। যার পিছনেও নিহিত এক লোক কাহিনি। সেই কাহিনি বলে, শিব একবার বৈকুণ্ঠে গিয়েছিলেন বিষ্ণুদর্শনে। সদ্য তখন আহার সমাপ্ত হয়েছে শ্রীভগবানের। কিছু উচ্ছিষ্ট পড়ে রয়েছে মাটিতে। সেই ঐশ্বর্যময় ভোগকণা দেখে শিব আর লোভ সংবরণ করতে পারলেন না। মেঝে থেকে তুলে নিয়ে ভক্ষণ করলেন সেই আহারকণা। মুছে ফেললেন মুখ। একটি অন্ন যদিও লেগে রইল তাঁর দাড়িতে। শিব যখন কৈলাসে ফিরলেন, তখন সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন নারদ। তিনি সেই অন্নকণা দর্শনমাত্র তা মহাবিষ্ণুর প্রসাদ বলে চিনতে পারলেন। এবং তড়িৎগতিতে ভক্ষণ করলেন তা! ঘটনায় রীতিমতো ক্রুদ্ধ হলেন দেবী পার্বতী। প্রথা অনুযায়ী, শিবের ভাগে তাঁরই অধিকার, নারদের নয়। তিনি বৈকুণ্ঠে গিয়ে নালিশ জানালেন বিষ্ণুকে। পার্বতীর প্রীতিসম্পাদনের জন্য তখন কথা দেন বিষ্ণু, কলিযুগে তিনি নীলমাধব রূপে অবস্থান করবেন শ্রীক্ষেত্রে। পার্বতীও তখন বিমলা রূপে অবস্থান করবেন সেই মন্দির-প্রাঙ্গণে। এবং, প্রতি দিন তাঁকে উৎসর্গ করা হবে জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট ভোগ! সেই প্রতিশ্রুতিমতো দেবী বিমলা বছরের অন্য দিনগুলো নিরামিষ ভোগেই তুষ্টা থাকেন!
কিন্তু, দুর্গাপূজার নবরাত্রির সময় চতুর্ভুজা,জপমালা-অমৃতকুম্ভ-নাগপাশ-বরদমুদ্রাধারিণী বিমলা পূজিতা হন উগ্রা মহিষমর্দিনী রূপে। তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করতেই এই কয়েক দিন তাঁকে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। পবিত্র মার্কণ্ড কুণ্ডের মাছ দেওয়া হয় ভোগে। আর দুর্গাষ্টমী এবং দুর্গানবমীর দিন উৎসর্গ করা হয় একটি পুরুষ পশু। আগে মহিষ বলি দেওয়া হত, এখন মূলত ছাগল বলি দেওয়া হয়। এই বলিদানেরও রয়েছে কিছু নিজস্ব প্রথা। রাতে জগন্নাথ দেব নিদ্রা যাওয়ার পর শুরু হয় এই আয়োজন। বৈষ্ণব মন্দিরে বলির জন্য পশুটিকে সরাসরি নিয়ে আসা হয় না, তাতে বৈষ্ণব লোকাচার ক্ষুণ্ণ হবে বলে! রাতেই মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে একটি বাঁশের ভারা বাঁধা হয়। সেই ভারায় উঠে বলির পশুটিকে নামিয়ে দেওয়া হয় মন্দিরের ভিতরে। অতঃপর, বলিদান! সেই বলিদান, ভোগ নিবেদন ও সেই নিবেদন করা প্রসাদ ভক্ষণ সব কাজই সেরে ফেলতে হয় জগন্নাথের ঘুম থেকে ওঠার আগে। বলিদানের পর সমস্ত চত্তর জল ও চুন দিয়ে ধূয়ে দেওয়া হয় ও বলিদানের সমস্ত দ্রব্য পশ্চিম দ্বার দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। বৈষ্ণব ও স্ত্রী ভক্তদের এই সময় বিমলা মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। অনুষ্ঠানের অল্প কয়েকজন দর্শকই শুধু “বিমলা পারুষ” বা বিমলার আমিষ ভোগ পান। দেবী বিমলার ভক্তদের বিশ্বাস, দুর্গাপূজায় দেবী উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। সেই সময় তাঁকে শান্ত করতে আমিষ ভোগ দিতেই হয়। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় জগন্নাথের গর্ভগৃহের দরজা, শুরু হয় প্রভাত-আরতি। জগন্নাথ দেবের মন্দির চত্বরে পশুবলি ও আমিষ ভোগ নিবেদন নিয়ে বৈষ্ণবরা একাধিক বার আপত্তি জানিয়েছেন।
যাহোক, শতাব্দী ধরে এই প্রথা চলছে। এভাবেই শাক্ত আর বৈষ্ণব মতের সমণ্বয়ে পরিচালিত হয়ে চলেছে নীলাচলধামের দেবজীবন। তুষ্টা থাকেন দেবী বিমলা, প্রসন্ন থাকেন তাঁর ভৈরব জগন্নাথও!
তথ্য সূত্র
1) "Vimala temple at the jagannath temple complex, Puri" - Rajakar Mahaptra
2) কালিকা পুরান গ্রন্থ
3) বিমলা মন্দির - wikipedia
==================<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->================
=================================================================
No comments:
Post a Comment