Friday, January 3, 2020

37>|| আদি শঙ্কর || { Part of KERALA TOUR ( 36 ) }



37>|| আদি শঙ্কর ||
( 788--820 খ্রিষ্টাব্দ)
আদি শঙ্কর বা আদি শঙ্করাচার্য।
তদানীন্তন ভারতীয় দার্শনিক গনের
একজন শ্রেষ্ঠ ভারতীয় দার্শনিক।
বেদান্তের অদ্বৈত দর্শনের শাখাটিকে তিনি সুসংহত রূপ দেন এবং সুচারু রূপে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর মতে ব্রহ্ম হলেন নির্গুণ।
রাজা রবি বর্মা  ছিলেন আদি শঙ্করের শিষ্য।
আদি শঙ্করের জন্ম 788 খ্রিস্টাব্দে
কালাডি গ্রামে, চের রাজ্যে ( বর্তমানের ভারতের কেরল রাজ্যে )
মৃত্যু 820 খ্রিস্টাব্দে (বয়স 32 )
কেদারনাথ, পাল সাম্রাজ্যে,
(বর্তমানে ভারতের উত্তরা খন্ডে)
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব, স্বামী বিবেকানন্দ
উভয়েই তাঁর মত ও কর্মের প্রতি  প্রভাবান্বিত
ছিলেন।
আদি শঙ্করাচার্যের মূল উক্তি
"ব্রহ্ম সত্য জগন্মিথ্যা জীব ব্রহ্মৈব ন অপরঃ"
তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ  পর্যটন করে অন্যান্য দার্শনিকদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের দার্শনিক মতটি প্রচার করেন।
তিনি চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মঠগুলি অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের ঐতিহাসিক বিকাশ, পুনর্জাগরণ ও প্রসারের জন্য বহুলাংশে দায়ী। শঙ্কর নিজে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে খ্যাত। এছাড়া তিনি হিন্দু সন্ন্যাসীদের দশনামী সম্প্রদায় ও হিন্দুদের পূজার সন্মত নামক পদ্ধতির প্রবর্তক।
সংস্কৃত ভাষায় লেখা আদি শঙ্করের রচনাবলির প্রধান লক্ষ্য ছিল অদ্বৈত তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা। সেযুগে হিন্দু দর্শনের মীমাংসা শাখাটি অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার উপর জোর দিত এবং সন্ন্যাসের আদর্শকে উপহাস করত।
আদি শঙ্কর উপনিষদ্‌ ও ব্রহ্মসূত্র অবলম্বনে সন্ন্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উপনিষদ্‌, ব্রহ্মসূত্র ও ভগবদ্গীতার ভাষ্যও রচনা করেন। এই সব বইতে তিনি তার প্রধান প্রতিপক্ষ মীমাংসা শাখার পাশাপাশি হিন্দু দর্শনের সাংখ্য শাখা ও বৌদ্ধ দর্শনের মতও খণ্ডন করেন।
প্রচলিত মত অনুসারে, শঙ্কর বিজয়ম নামক বইগুলিতে শঙ্করের জীবনকথা লেখা আছে। এই বইগুলি আসলে মহাকাব্যের আকারে পদ্যে লেখা ইতিহাস-সম্মত জীবনী ও প্রচলিত কিংবদন্তির মিশ্রণ।
এই জাতীয় কাব্যধারায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বই হল মাধব শঙ্কর বিজয়ম ।
চিদবিলাস শঙ্কর বিজয়ম।
ও কেরলীয় শঙ্কর বিজয়ম।
শঙ্কর এক রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবার নাম ছিল শিবগুরু ও মায়ের নাম আর্যাম্বা। তারা অধুনা কেরল রাজ্যের অন্তর্গত কালাডি গ্রামে বাস  করতেন। তাঁরা বহুদিন
নিঃসন্তান ছিলেন। তাই তারা ত্রিশূরের বৃষভচল শিবমন্দিরে পুত্রকামনা করে পূজা দেন। এরপর আর্দ্রা নক্ষত্রের বিশেষ তিথিতে শঙ্করের জন্ম হয়।
শঙ্করের শিশু কালেই তার বাবা মারা যান।
শঙ্কর ছেলেবেলা থেকেই খুব বিদ্বান ছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি চারটি বেদ আয়ত্ত্ব করে নেন।
বাল্য কাল থেকেই শঙ্কর সন্ন্যাস গ্রহণের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু তার মা তাকে অনুমতি দিতে চাইছিলেন না। শেষে তিনি খুব আশ্চর্যজনকভাবে মায়ের অনুমতি পান।
কথিত আছে, একদিন তিনি পূর্ণা নদীতে স্নান করছিলেন। এমন সময় একটি কুমির তার পা কামড়ে ধরে। শঙ্করের মাও সেই সময় পূর্ণার তীরে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মা-কে বলেন, মা যদি সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেন, তাহলে কুমিরটি তার পা ছেড়ে দেবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মা তাকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিলেন। তার পর থেকে কোনোদিন পূর্ণা নদীতে কোনো কুমিরকে দেখা যায়নি।
শঙ্কর গৃহ ত্যাগ করে গুরুর খোঁজে বেরিয়ে পড়েন।শেষে নর্মদানদীর তীরে ওঙ্কারেশ্বরে তিনি
গোবিন্দ ভগবদপাদের দেখা পান।
গোবিন্দজী শঙ্করের পরিচয় জেনে খুব খুশি হন এবং শঙ্করকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
গল্প কোথায় জানাজায়,
এর পরে শঙ্কর যখন কাশীতে আসেন। সেখানে সনন্দন নামে এক যুবকের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। এই যুবকটি দক্ষিণ ভারতের চোল রাজ্যের বাসিন্দা ছিল। সে-ই প্রথম শঙ্করের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কথিত আছে, কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করতে যাওয়ার সময় এক চণ্ডালের সঙ্গে শঙ্করের দেখা হয়ে যায়। সেই চণ্ডালের সঙ্গে চারটি কুকুর ছিল। শঙ্করের শিষ্যরা চণ্ডালকে পথ ছেড়ে দাঁড়াতে বললে, চণ্ডাল উত্তর দেয়, "আপনি কী চান, আমি আমার আত্মকে সরাই না এই রক্তমাংসের শরীরটাকে সরাই?" শঙ্কর বুঝতে পারেন যে, এই চণ্ডাল স্বয়ং শিব এবং তার চারটি কুকুর আসলে চার বেদ। শঙ্কর তাকে প্রণাম করে পাঁচটি শ্লোকে বন্দনা করেন। এই পাঁচটি শ্লোক "মণীষা পঞ্চকম্‌" নামে পরিচিত।
বদ্রীনাথে বসে তিনি তার বিখ্যাত  টীকা ভাষ্য ও দর্শনমূলক প্রবন্ধ রচনা করেন।
একবার শঙ্কর বিশেষ কিছু কারনে দিনের
পর দিন অধিক বিতর্ক বিতর্কের করার পর মন্দন মিশ্র পরাজয় স্বীকার করেন,
যেখানে মন্দন মিশ্রের সহধর্মিণী উভয়া ভারতী বিচারক হিসেবে কাজ করেন। উভয়া ভারতী তখন আদি শঙ্করকে 'বিজয়' সম্পূর্ণ করার জন্য তার সঙ্গে বিতর্কে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করার জন্য আহ্বান জানান। তিনি আদি শঙ্করকে পুরুষ ও মহিলার মধ্যকার যৌন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করেন - যে বিষয়ে শঙ্করাচার্যের কোন জ্ঞান ছিল না, কারণ তিনি ছিলেন কুমার এবং সন্ন্যাসী। শ্রী শঙ্করাচার্য 15 দিনের "বিরতি" চান। লোককাহিনী অনুসারে তিনি "পর-কায়া প্রবেশের" শিল্প ব্যবহার করেন।
(এই বিশেষ শিল্পে  আত্মা এক  দেহ থেকে বার হয়ে  অন্যের দেহে প্রবেশ করে ,)
এই বিশেষ প্রক্রিয়ায় শঙ্কর তার নিজের দেহ থেকে বের হন,এবং দেহটি  তিনি তার শিষ্যদের দেখাশোনা করার জন্য বলে তিনি নিজের আত্মকে দৈহিকভাবে একজন রাজার মৃতদেহে প্রবেশ করেন।
গল্পে আছে যে রাজার দুই স্ত্রীর নিকট তিনি "ভালবাসা শিল্পের" সকল জ্ঞান অর্জন করেন।
প্রেম, কাম, রতি ক্রিয়ার সকল ক্রিড়া কৌশল
ইত্যাদির প্রকৃত জ্ঞান দুচারু রূপে অর্জন করেন।
এদিকে রানীরা "পুনরুজ্জীবিত" রাজার সুতীক্ষ্ণ
মেধা ও প্রবল ভালবাসায় রোমাঞ্চিত হয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে তিনি তাদের পুরনো স্বামী ছিলেন না।
তখন রাণীরা বিশেষ কিছু অনুমান করেন।
এবং বুঝতে পারলেন যে মৃত রাজার শরীরে অন্য কোন বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন সাধক প্রবেশ করে তাঁদের এমন সুখ ও আনন্দ দিতে সক্ষম হয়েছেন।
যখন রানী সকলে  তাদের বিশেষ বিশ্বস্ত কাজের লোকদের  বললেন আসে পাশের সকল স্থান খুঁজে দেখতে কোন যুবক সাধুর প্রাণহীন দেহ
এবং যদি পাওয়া যায় তবে  তা শীঘ্র দাহ করতে।
যাতে করে রাজার দেহে প্রবেশ কারী সাধু আর ফিরে যেতে না পারে।
তাহলেই রানীরা বহুদিন এমন আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।
রানীর লোকেরা খুঁজে পেলেন শঙ্করের দেহ যে দেহ কজন সাধু পাহারা দিচ্ছিলেন।
রানীদের লোকেরা জোর করে শঙ্করাচার্যের প্রাণহীন দেহ চিতার উপর রেখে এতে আগুন দিতে যাওয়া মাত্রই শঙ্কর তার নিজের দেহে প্রবেশ করেন এবং পুনরায় জ্ঞান ফিরে পান।
এর পরে
পরিশেষে তিনি উভয়া ভারতীর সকল প্রশ্নের উত্তর দেন; এবং উভয়া ভারতী বিতর্কের পূর্ব-সম্মত নিয়মানুসারে মন্দন মিশ্রকে সুরেশ্বরাচার্য সন্ন্যাসী-নাম ধারণ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করার অনুমতি দেন।
আদি শঙ্কর তারপর তার শিষ্যদের সাথে নিয়ে মহারাষ্ট্র ও শ্রীশৈলম ভ্রমণ করেন।
 মাধবীয়া শঙ্করাবিজয়াম অনুসারে একদা শঙ্কর কপালিকা দ্বারা বলি হতে যাচ্ছিলেন, পদ্মপদাচার্যের প্রার্থনার উত্তরস্বরুপ ভগবান নরসিংহ শঙ্করকে রক্ষা করেন। ফলস্বরুপ আদি শঙ্কর লক্ষ্মী-নরসিংহ স্তোত্র রচনা করেন।
==================
তারপর তিনি গোকর্ণ, হরি-শঙ্করের মন্দির এবং কোল্লুড়ে মুকাম্বিকা মন্দির ভ্রমণ করেন। কোল্লুড়ে তিনি এক বালককে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন যে বালকটিকে তার পিতামাতা বাকশক্তিহীন বলে মনে করতেন। শঙ্কর তার নাম দেন হস্তামলকাচার্য ("বৈঁচি-জাতীয় ফল হাতে কেউ", অর্থাৎ যিনি নিজেকে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করেছেন)। পরবর্তীতে তিনি সারদা পীঠ প্রতিষ্ঠা করতে শৃঙ্গেরী ভ্রমণ করেন এবং তোটকাচার্যকে তার শিষ্য বানান।
এরপর আদি শঙ্কর অদ্বৈত দর্শনের বিরোধিতা করা সকল দর্শন অস্বীকারের দ্বারা এর প্রচারের জন্য দিগ্বিজয় ভ্রমণ শুরু করেন। তিনি দক্ষিণ ভারত হতে কাশ্মীর অভিমুখে ভারতের সর্বত্র এবং নেপাল ভ্রমণ করেন এবং পথিমধ্যে সাধারণ মানুষের মাঝে দর্শন প্রচার করেন এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য পন্ডিত ও সন্ন্যাসীদের সাথে দর্শন বিষয়ে তর্ক করেন।
মাধবীয়া শঙ্করাবিজয়ম অণুসারে সারদা পীঠে মন্দিরে চারটি প্রধান দিক থেকে পন্ডিতদের জন্য চারটি দরজা ছিল।
এক এক দিকের দরজা সেই দিকের প্রতিনিধিত্বকারী পন্ডিতদের নির্দেশ করে।
দক্ষিণ দরজা (দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্বকারী) কখনই খোলা হয়নি যা নির্দেশ করত যে দক্ষিণ ভারত থেকে কোনো পন্ডিত সারদা পীঠে প্রবেশ করেনি।
আদি শঙ্কর সকল জ্ঞানের শাখা যেমন মীমাংসা, বেদান্ত এবং অন্যান্য হিন্দু দর্শনের শাখাসমূহে সকল পন্ডিতকে বিতর্কে পরাজিত করে আদি শঙ্কর দক্ষিণ দরজা খোলেন; তিনি সে মন্দিরের সর্বোৎকৃষ্ট জ্ঞানের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
তার জীবনের শেষদিকে আদি শঙ্কর হিমালয়ের কেদারনাথ-বদ্রীনাথে যান এবং বিদেহ মুক্তি ("মূর্তরুপ থেকে মুক্তি") লাভ করেন। কেদারনাথ মন্দিরের পিছনে আদি শঙ্করের প্রতি উৎসর্গীকৃত সমাধি মন্দির রয়েছে।
আদি শঙ্কর হিন্দু ধর্মের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন।
এগুলো দক্ষিণে কর্ণাটকের শৃঙ্গেরীতে, পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকায়, পূর্বে ওড়িশার পুরীতে এবং উত্তরে উত্তরখন্ডের জ্যোতির্মঠে (যশীমঠে)।
হিন্দু পরম্পরাগত মতবাদ বিবৃত করে যে তিনি এসব মঠের দায়িত্ব দেন তার চারজন শিষ্যকে যথাক্রমে: সুরেশ্বরাচার্য, হস্তামলকাচার্য, পদ্মপাদাচার্য এবং তোটকাচার্য। এ চারটি মঠের প্রত্যেক প্রধান প্রথম শঙ্করাচার্যের নামানুসারে শঙ্করাচার্য ("পন্ডিত শঙ্কর") উপাধি গ্রহণ করেন।
আদি শঙ্করাচার্য অদ্বৈতবাদী ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন । তিনি বলেন যে , ব্রহ্মই হল একমাত্র সত‍্য - এই জগৎ ব্রহ্মময় । তার মতে , " সঠিক বিদ‍্যা না থাকার ফলে মানুষ ব্রহ্মকে বুঝতে পারে না '' । আত্মাই হল ব্রহ্ম । এই ব্রহ্ম নির্গুণ এবং আনন্দময় । কিন্তু ব্রহ্ম আবার পারমার্থিক দৃষ্টিতে ব্রহ্ম হলেও ব‍্যবহারিক দৃষ্টিতে ঈশ্বর বলে প্রতিভাত হয় । অবিদ‍্যা ব্রহ্মের শক্তিবিশেষ যার ফলে জীব নিজেকে ব্রহ্মের থেকে ভিন্ন মনে করে । প্রকৃতপক্ষে , জীবাত্মা ও পরমাত্মা অভিন্ন ।
ভারতের  কেদারনাথ মন্দিরের পিছনে তাঁর সমাধি মন্দির আছে।
========== <--©-আদ্যনাথ-->=======

No comments:

Post a Comment