Monday, June 24, 2019

34>||কেদার-বদ্রীনাথ যাত্রা=18Days ||


34 > ||কেদার-বদ্রীনাথ  যাত্রা=18Days  ||

           18 দিনের ভ্রমণ---

 (প্রথম ভাগ----ভ্রমণের বিবরণ)

(দ্বিতীয় ভাগ---কেদারনাথ মন্দির বিষয়ে

 কিছু কথা।)

(তৃতীয় ভাগ----বদ্রীনাথ মন্দির বিষয়ে

কিছু কথা।)


আজথেকে 52 বৎসর আগে 1970 সালে গিয়েছিলাম কেদারনাথ দর্শনে।

পুরানো ডাইরী খুঁজে পেলাম সেই ভ্রমণের কিছু কথা। সেই কথাই লিখছি আজ।

আমাদের পোগ্রাম ছিল 18 দিনের জন্য।

12/09/1970  to 29/09/1970,

আমরা দুইজন মানিক ও আমি, 

12ই সেপ্টেম্বর শনিবার দিন ট্রেনে করে রওনা দিলাম হরিদ্বারের উদ্দেশ্যে।

দুই দিন 1st and 2nd day ট্রেন জার্নি করে  পৌঁছে গিয়েছিলাম হরিদ্বার।


3rd day---

 হরিদ্বার পৌঁছে । রাতে ভারত সেবাশ্রম এ বিশ্রাম। এখন থেকে শোনপ্রয়াগ জন্য গাড়ি ঠিক করে  কথা বার্তা বলে রাখলাম।

জিপ ওয়ালা পাঁচজনকে নিয়ে যাবে।

তাই ওই জিপ ওয়ালাই আরো তিনজন জোগাড় করে অপেক্ষা করছিলেন,

আমাদের পেয়ে জপ ওয়ালা ও আমরা সকলেই খুব খুশি।


4th day----

পরদিন সকালে আমরা রওনা  দিয়ে পৌঁছেজাই শোনপ্রয়াগ। বিকেল গিয়ে

কেদারনাথ যাবার পারমিশন করিয়ে নি।

রাতে হোটেলে বিশ্রাম।


5th day----

 পরদিন সকালে একটি লোকাল জীপ ভাড়া করে সকলে মিলে ঘুরে আসি ত্রিযুগিনারায়ন মন্দির । 

 গল্প কথায় শুনেছি এখানে শিব পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। সেই হোমের যজ্ঞাগ্নি আজও জ্বলছে। বিকেলবেলা শোনপ্রয়াগে ফিরে শোনগঙ্গা নদীর ধারে এসে কিছুক্ষণ ঘোড়া ঘুড়ি করে হোটেলে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম । 

কারণ পরদিন অনেক ভোরে থেকেই  হাঁটা শুরু করতে হবে।


6th day---- : 

আমরা ভোর 5.00 টায় রেডি হয়ে বেরিয়ে পরলাম কেদারনাথের উদ্দশ্যে। 

গৌরীকুণ্ড অবধি শেয়ার জীপ এ গিয়ে।7:00 টা নাগাদ হাঁটা শুরু করলাম কেদারনাথ এর উদ্দেশ্যে। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এ ভরপুর রাস্তা উপভোগ করতে করতে পৌঁছে যাই রামবারা । এর পর থেকে বাকি রাস্থা বেশ খাড়াই ও পাথুরে । 

 এমন বন্ধুর পথে চলা বেশ কষ্টের।  রামবারার পর রাস্তায় আর কোন রেলিং

জাতীয় কিছু নেই যে ধরে একটু সাহারা পাওয়া যায়, পথ চলার জন্য লাঠিই একমাত্র ভরসা ও সাহারা এমন খাড়াই রাস্থায় ট্রেকিং করা ভীষণ কষ্টের ও ভয়ের, তার উপরে আবার ঘোড়া ও ডুলি য়ালা দের উৎপাত।বার বার ওদের পথ ছেড়ে দিতে হচ্ছিল। তা না হলে হয়তো ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেবে । সেই কারণে  খুব সাবধানে পথ চলতে হচ্ছিল।

এভাবেই পৌঁছলাম বড় লিঞ্চলি ।

এখন থেকে আরও 4 কিমি পথ বাকি । 

মাঝে মাঝে এক এক টুকরো মেঘ এসে চারিদিক অন্ধকার করে দিচ্ছিল।

সেই মেঘেদের মধ্যদিয়ে হাটতে গিয়ে উইন্ডচিতার জলে ভিজে যাচ্ছিলো।

এভাবেই বেসকেম্প নামক জায়গাতে পৌঁছলাম।

এখানে বিশ্রাম ও প্রয়োজনে সরকারের টেন্টেও থাকার ব্যবস্থা করা যায়।

এখান থেকে আর মাত্র 2 কি মি।

আমরা সামান্য খরচে রাত্রে সরকারি টেন্টেই রাত কাটালাম।


7th day----- : 


ভোরে ঘুম থেকে উঠে টেন্ট থেকে বেরিয়ে 

চারিপাশের দৃশ্য দেখে মনে হোল যেন

স্বর্গে পৌঁছে গেছি।

চোখের সামনে বরফ আবৃত কেদার পাহাড়, চারিপাশ সুউচ্চ পর্বতে ঘেরা, বরফে ঢাকা পর্বতে ধীরে ধীরে সূর্যের আলো এসে পড়ছে, সে এক  অসাধারণ  সকাল । অপলক দৃষ্টিতে হিমালায়কে উপভোগ করে চলেছি। দূর থেকে কেদারনাথের মন্দির দেখতে পেলাম।

মন্দিরের কাছে যেতেই চোখ জুরিয়ে গেল ভক্তি শ্রদ্ধায়। 

মন্দিরের পিছনেই বরফে ঢাকা বিশাল কেদার পর্বত, সে যে কি সুন্দর পরিবেশ

সে কথা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নাই।

সেই কোন আদি একলে আদি গুরু শঙ্করাচার্যের প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির না জানি কত ইতিহাসের সাক্ষী। 

আমরা পুজো দেওয়ার পর চারিদিকে ঘুরে

ফিরে দেখলাম। দিনে মন্দির কমিটির ভান্ডারা তে খেয়ে গোটা দিনটা মনের মতো করে  কাটিয়ে ছিলাম সেই স্বর্গ ভূমিতে।

সারাদিন ঘুরে বেরিয়ে সন্ধ্যা আরতি দেখে 

নিজেকে ধন্য করলাম।

রাতে টেন্টে এ ফিরে বিশ্রাম । পরদিন সকালে আবার নিচে নামার পালা।


8th day------ : 


 কেদারনাথকে বিদায় জানিয়ে নেমে আসি নিচে, শোনপ্রয়াগ  হয়ে।

শোনপ্রয়াগ থেকে শেয়ার জীপ এ গুপ্তকাশি গিয়ে রাত্রে থাকার জন্য এক হোটেলে পৌছাই। হোটেল বলতে কোন মতে মাথা গোঁজার ঠাঁই। তবে ওরা দুই তিনটে করে কম্বল দিয়েছিল বলে রাত্রে ঘুমোতে পেরেছিলাম।

ইচ্ছা ছিল জোশিমঠে রাত কাটাবো কিন্তু 

এই  গুপ্তকাশি থেকে কোনও শেয়ার জীপ বা গাড়ি না পাবার কারণে  ওখানেই থেকে যেতে হয় আমাদের।


9th day----- : 


পরদিন ভোরেই পেয়ে গিয়েছিলাম শেয়ার জিপ । সেই জিপে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম জোশিমঠে।

তারপরে দুইদিন এই জোশিমঠে থেকে 

ঘুরে বেড়িয়ে ছিলাম ভুখহরতাল নামক বাস স্টান্ড হয়ে উখিমঠ, চোপতা, গোপেশ্বর, চামোলি প্রভৃতি স্থান ।



10th day---- :(জোশিমঠে)


জোশিমঠ থেকে লোকাল জীপ বুক করে  ঘুরে দেখেছিলাম  অসাধারন সুন্দর আউলি , আরও কত সব সুন্দর নাম না জানা পাহাড় পর্বত চারদিকে।এরপর গেলাম তপবন হট স্প্রিং। একটি ছোট্ট জায়গা দিয়ে ফুটন্ত গরম জলের ধারা বেরিয়ে আসছে। সঙ্গে গন্ধকের তীব্র গন্ধ। সেখান থেকে গেলাম বিষ্ণুপ্রয়াগ। একটি অপূর্ব সুন্দর স্থান। এই জায়গার নাম বিষ্ণুপ্রয়াগ। একদিক থেকে নীল রঙের অলকানন্দা ও অন্যদিকে ঘোলা জলের ধৌলিগঙ্গা প্রচণ্ড গর্জন করে এক জায়গাতে  মিলিত হচ্ছে। আর কি ভীষণ স্রোত নদী দুটোতে। দেখলেই ভয় লাগে। এখানে দেখেছিলাম নানান রঙের ফুলের বাহার।



11th day----:


জোশিমঠ থেকে শেয়ার জীপে  চলে যাই বদ্রীনাথ। বদ্রীনাথ যেতে 2 ঘণ্টা সময় লেগেছিল। বদ্রীনাথ গিয়ে সেখানে ভারত সেবাশ্রমে  ছিলাম দুইদিন।  মন্দিরে 

 পুজো দিয়ে খেয়ে নিয়ে সেদিনের মতন বিশ্রাম ।


12th day----:

সকালে দেখে নিলাম চরনপাদুকা হয়ে ,নীলকন্ঠ পর্বতের ভ্যালি। 

অপূর্ব সেই চারদিকের দৃশ্য অসাধারন। বিশাল নীলকন্ঠ পর্বতকে কাছ থেকে দেখতে দারুন লাগছিল। 

তার পরে ফিরে যাই বদ্রীনাথে।

  


13th day---:


 খুব ভোরে উঠে হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিলাম 4 কিমি দূরের মানা গ্রাম। 

শান্ত সুন্দর একটি গ্রাম। তারপরে

সরস্বতী নদির ওপর দিয়ে ভীম পুল পেরিয়ে হেঁটে ঘুরে দেখেএসেছি বসুধারা জলপ্রপাত। অসাধারণ দৃশ্যপট। 

বসুধারার রাস্তা বেশ খাড়াই ও পাথরে ভরা। বাসুধারা ফলস্ টি খুবই সুন্দর। প্রচণ্ড হাওয়ায় যার জলধারা মাটিতে পরার আগেই উড়ে যাচ্ছে । কেউ কেউ দেখলাম ওই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বাসুধারার জলে স্নান করছে। শুনেছি এই ফলসের জলে মেডিসিনাল ভ্যাালুও নাকি প্রচুর। মানা থেকে বসুধারা 6 কিমি রাস্তা । 

মানাতে ফিরে ব্যাস গুহা ও গনেশ গুহা ঘুরে শেয়ার জীপ এ করে ফিরে আসি বদ্রীনাথে।



14th day----:


 সকালের বাস ধরে চলে আসি রুদ্রপ্রয়াগ। 

এখানে যে গেস্ট হাউজে উঠেছিলাম সেখান কার লোকেশান দারুন। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে অলকানন্দা। 

একটু দূরেই দেখা যাচ্ছিল সঙ্গম।

দুপুরে হেঁটে ঘুরে আসি ৩ কিমি. দূরে কোটেশ্বর মহাদেবের মন্দির। 

দেখেছিলাম  প্রয়াগের সন্ধ্যা আরতি।

সেই সন্ধ্যা আরতি তে আমরা সকলেই আরতির প্রদীপ হাতে নিয়ে আরতি করার সুযোগ দিয়ে ছিলেন সেখানকার পূজারী গণ।

 রুদ্রপ্রয়াগ এর সঙ্গমে দাঁড়িয়ে নিজে হাতে আরতি করেছি আমরা।

সার্থক হয়েছিল সেদিন আমাদের ভ্রমন।


এবার তো ফেরার পালা


15th day---:


শেয়ার জীপ ধরে চলে আসি  হরিদ্বারে। 

আবার একবার হরিদ্বারে গঙ্গার আরতি দেখে, হোটেলে রাত কাটালাম ।



16th day----:


আজ হরিদ্বারের থেকে হাওড়ার ট্রেন ধরে 

বাড়িতে ফিরলাম।


 


প্রয়োজনীয় তথ্য :,----  

কিছু জেনেরখা ভালো, আমরাও মনে রেখেছিলাম। 

শুনেছিলাম মে ও জুন মাস সিজিন টাইম, 

খুব ভীর হয় কেদার বদ্রিনাথে, কেদারে ওঠার সময়ে ঘোড়া, ডুলি, লোকের ধাক্কাধাক্কি সব মিলিয়ে বেশ বিরক্ত কর ও বিপদ জনক অবস্থা হয়।

কিন্তু একটু  শান্তিতে ফাকায় ফাকায় ঘুরতে হলে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে খুব ভালো।

হোটেল ও গাড়ি ভাড়া কম থাকে। 

জুলাই, অগাস্ট এ বৃষ্টি হয় খুব ও পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামে। রাস্তা বন্ধ থাকতে পারে ধসে। ওই সময়টা এরিয়ে যাওয়াই ভালো।

যে সময়েই যান না কেন কেদার বদ্রিনাথ যাবার সময় মনে করে বেশ কিছু ভালো জেকেট সোয়েটার এবং উইঞ্চিটার সঙ্গে নিতে ভুললে চলবে না।

আর বিশেষ দরকারি কিছু ঔষধ অতি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে। 

একটু কর্পূর সঙ্গে রাখবেন। উচ্চতার কারনে শ্বাসকষ্ট হলে এটি কাজে আসতে পারে। হেঁটে ওঠার সময়ে একটু কর্পূর রুমালে করে হাতে বেঁধে রাখলে, শ্বাসকষ্ট হলে এর গন্ধ শুঁকলে আরাম হবে। এছাড়া homeopathy ওষুধ coca 30 ,আর সর্দি, জ্বর, বমি, মাথাব্যাথা, পেন কিলার, আ্যন্টিসেপ্টিক, ব্যান্ড এড, পেট খারাপ এর ওষুধ, ORS, জিওলিন সঙ্গে রাখা ভালো। মনে রাখবেন পাহাড়ি রাস্তায় বাস জার্নিতে মাথা ঘোরা বা বমি হতে পারে। এছাড়া হার্টের বা আ্যজমা পেশেন্ট রা কেদারনাথ ট্রেকিং এ যাবার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া অতি জরুরি। পাহাড়ে হাটবার সময় 

 লজেন্স্, শুকনো খেজুর, কিসমিস বিশেষ উপকারী। পথে সকল সময়  পর্যাপ্ত খাবার জল সাথে রাখা উচিত। 

পাহাড়ে ওঠার সময় অবশ্যই একটা লাঠি কিনে নিতে হবে। পথে ওই লাঠিই সাহারা হবে।

নিজের পরিচয় পত্র সঙ্গে রাখতে হবে।

(আজ কাল তো সব সময়  অরিজিনাল আধার কার্ড ও তার বেশ কয়েকটি জেরক্স কপি সঙ্গে নেবেন।)

 <--আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->

=========================

          (2)   ★★★★★★★★

দ্বিতীয় ভাগ---কেদারনাথ মন্দির বিষয়ে

 কিছু কথা।

 || মন্দির কেদারনাথ মন্দির:;-||


 (প্রথম ভাগের পরে-----

দ্বিতীয় ভাগ---কেদারনাথ মন্দির বিষয়ে

 কিছু কথা।)


আজথেকে 52 বৎসর আগে গিয়েছিলাম কেদারনাথ দর্শনে।

সেই দিনের কথা কিছুই নাই মনে।

তথাপি আপনি যখন বলছেন কিছু লিখতে, সেই কারণে লিখলাম মন্দিরের কিছু কথা।


1970 সালে নিজের চাক্ষুষ দর্শন ও অভিজ্ঞতার অবলম্বনে লিখলাম। আজ 2022 অর্থাৎ 52 বৎসরে নিশ্চই অনেক পরিবর্তন হয়েছে।


ভারতের বিখ্যাত তীর্থযাত্রাগুলির মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হল কেদারনাথ।


সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৫৮৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কেদারনাথ মন্দির। এই কেদারনাথ শহরটি মূলত উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত । কেদারনাথ মূলত চার ধাম যাত্রার (বৈদ্যনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনেত্রী) অন্তর্ভূক্ত।


ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের গাড়োয়াল হিমালয় পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত কেদারনাথ মন্দিরটি  স্থাপত্য শিল্পের এক  সেরা নিদর্শন।   এই কেদারনাথ মন্দির  তৈরি কে তৈরী  করেছিলেন  সেই বিষয়ে নানা মুনির নানা মত আছে, তথাপি বাস্তবে আজকের বিজ্ঞানের অনুমান কে  সাক্ষী করেই বলাচলে  কেদারনাথ মন্দির সম্ভবত অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। একথাও অনুমান করাহয় যে এই মন্দিরটি অন্তত 1200 বছর ধরে বিদ্যমান। কেদারনাথের মন্দির যে জায়গায়  অবস্থিত সেই স্থান একবিংশ শতাব্দীতে যে আজকের থেকেও ভীষণ ভয়ঙ্কর প্রতিকূল ছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই । একদিকে 22,000 ফুট উঁচু কেদারনাথ পাহাড়, অন্য দিকে 21,600 ফুট উঁচু করাচকুন্ড এবং 22,700 ফুট উঁচু ভারতকুন্ড। এই তিনটি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পাঁচটি নদী যথাক্রমে, মন্দাকিনী, মধুগঙ্গা, চিরগঙ্গা, সরস্বতী ও স্বরন্দরী। পুরাণেও এই সকলের নদীর কথা উল্লেখ আছে। প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে এই এলাকাটি "মন্দাকিনী নদীর" ধারেই স্বস্থিত, বরঞ্চ বলাচলে যে "মন্দাকিনী নদীর" অববাহিকায় অবস্থিত এই কেদার নাথ মন্দির।


একথা অতি সহজেই অনুমান করা চলে  যে শীতের সময়ে  প্রচুর পরিমাণে তুষারপাত এবং বর্ষায় প্রবল বেগে জল প্রবাহিত হওয়া সত্ত্বেও এমন ভয়ঙ্কর  জায়গায় একটি শিল্পকর্ম তৈরি করা কতটা কঠিন ও দুর্ষাধ্য ব্যাপার  সেটা আমাদের কল্পনার অতীত।


(ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ জিওলজি, দেরাদুন, কেদারনাথ মন্দিরের পাথরগুলির উপর লিগনোম্যাটিক ডেটিং এর একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেছে। এটি "পাথরের বয়স" নির্ণয় করার জন্য করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে মন্দিরটি 14 শতক থেকে 17 শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে বরফে ঢাকা ছিল। তবে মন্দির নির্মাণে কোনো ক্ষতি হয়নি।)


2013 সালের ১৬ই এবং ১৭ই জুন কেদারনাথে যে বিপর্যয়কর বিধ্বংসী  বন্যা আঘাত হানে তা সকলের ই নিশ্চয়ই জানা আছে ।এক সমীক্ষায় যানাযায় যে এই সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমান  স্বাভাবিকের (গড়ের) চেয়ে 375% বেশি হয়েছিল। এবং  বন্যায় "5748 জন" (সরকারি পরিসংখ্যান) নিহত হয় এবং 4200টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতীয় বায়ুসেনা 1 লাখ 10 হাজারেরও বেশি লোককে এয়ারলিফট করেছে। সব কিছু নিয়ে গেল কিন্তু এমন প্রলয়ঙ্করী বন্যাতেও কেদারনাথ মন্দিরের পুরো কাঠামো বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। যে পদ্ধতিতে ও জায়গা নির্বাচনে এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে তার পিছনে কোনো অদ্ভুত শক্তি  রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আজ বিজ্ঞান বলছে, মন্দির নির্মাণে যে পাথর ও কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে তার কারণেই এই বন্যায় মন্দিরটি টিকে থাকতে পেরেছিল।


আরও আশ্চর্যের বিষয় যে --কেদারনাথ মন্দির টি "উত্তর-দক্ষিণ" হিসাবে নির্মিত। যদিও ভারতের প্রায় সব মন্দিরই ‘পূর্ব-পশ্চিম’। বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্দিরটি যদি "পূর্ব-পশ্চিম" হত, তবে এটি ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে যেত। অথবা অন্তত ২০১৩ সালের বন্যায় তা ধ্বংস হয়ে যেত।


এদ্বারা অতি সহজেই অনুমান করা চলে যে এই দিক নির্দেশনার কারণেই টিকে আছে কেদারনাথ মন্দির। আরেকটি বিষয় হলো এতে ব্যবহৃত পাথর খুবই শক্ত ও টেকসই। বিশেষ বিষয় হল এই মন্দির নির্মাণে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তা সেখানে পাওয়া যায় না, তাহলে এটাও আমাদের ভাবায় যে কিভাবে সেই পাথর সেখানে নিয়ে আসা হয়ে ছিল। 


সেই সময়ে এত বড় পাথর বহন করার মতো যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হয়নি। আবার এই পাথরের বৈশিষ্ট্য হল বরফের নীচে থাকে 400 বছর পরেও এর "বৈশিষ্ট্য"-এতোটুকুও কোন পার্থক্য নেই। এই সকল কারনেই প্রকৃতির এহেন ভয়ানক আবর্তে ও মন্দিরটি তার শক্তি বজায় রেখেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় এটা যে মন্দিরের এই মজবুত পাথরগুলো কোনো সিমেন্ট ব্যবহার ছাড়াই "Ashler" পদ্ধতিতে একত্রে জোড়া হয়েছে। তাই পাথরের জয়েন্টে তাপমাত্রা পরিবর্তনের কোনো প্রভাব ছাড়াই মন্দিরের শক্তি দুর্ভেদ্য।


যা দেখা গেছে 2013 সালে, অলৌকিক ভাবে , মন্দিরের পিছনে একটি বড় পাথর আটকে যায় এবং জলের প্রচন্ড ধারাকে দুইপাশে বিভক্ত করে দেয় এবং মন্দির এবং মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া লোকেরা সুরক্ষিত থাকে। . যাদের পরের দিন ভারতীয় বিমান বাহিনী এয়ারলিফট করে।


এটা অবশ্যই কোনো অজানা শক্তির অবদান । তবে কোন সন্দেহ নেই যে মন্দিরটি নির্মাণের জন্য স্থানটি, এর দিকনির্দেশ, এর নির্মাণ সামগ্রী সকল কিছুর মিলনের সাথে ভূ-প্রকৃতিকেও সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা হয়েছিল যা 1200 বছর ধরে এর সংস্কৃতি এবং শক্তি সংরক্ষণ করবে।


সবথেকে  আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে  আমরা অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞান যেটা এখন ভাবছে  ও করছে , সেটি 1200 বছর আগে করা হয়েছিল। আর সেই চিন্তা ধারার কারনেই কেদারনাথ মন্দিরের  6-ফুট উচ্চ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞান মূলক চিন্তার ব্যবহার করা হয়েছে তা ভেবে আজ আমরা হতবাক হতে হই। আজ, সমস্ত বন্যার পরে, আমরা আবারও কেদারনাথের সেই বিজ্ঞানীদের নির্মাণের সামনে মাথা নত করছি যারা একই জাঁকজমকের সাথে 12টি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ার সম্মান পাবেন।


বৈদিক হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতি কতটা অগ্রসর ছিল তার নিদর্শন এটি। সেই সময়ে, আমাদের ঋষিরা, অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা, স্থাপত্য, আবহাওয়া, মহাকাশ বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদে অসাধারণ জ্ঞান ও প্রয়োগ বিদ্যায় অত্যন্ত দক্ষতা লাভ করেছিলেন।


 2013 সালের  জুনে কেদারখন্ডে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে গৌরীকুন্ড থেকে 14 km  পথ পাহাড়ি চড়াই পথে ট্রেকিং করে মন্দিরে যেতে হাত।কিন্তু আজ কিভাবে যাবার পথ সে কথা আমার জানা নাই।


 মন্দির টি  কেবল এপ্রিল মাসের শেষ থেকে কার্তিক পূর্ণিমা অবধি খোলা থাকে। 


শীতকালে কেদারনাথ মন্দিরের মূর্তিগুলিকে ছয় মাসের জন্য  উখিমঠে নিয়ে গিয়ে পূজা করা হয়। এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল কেদারখণ্ড; তাই এখানে শিবকে কেদারনাথ অর্থাৎ, কেদারখণ্ডের অধিপতি নামে পূজা করা হয়।


      <--আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->


=============================

        (3)★★★★★★★

তৃতীয় ভাগ----বদ্রীনাথ মন্দির বিষয়ে

কিছু কথা।


★★বদ্রীনাথ মন্দির★★


উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের চামোলি জেলায় গাড়ওয়াল পার্বত্য অঞ্চলে অলকানন্দা নদীর তীরে বদ্রীনাথ মন্দিরটি অবস্থিত। 

এই মন্দিরের অপর নাম::--

বদ্রীনারায়ণ মন্দির

বদ্রীনাথ শহর ও বদ্রীনারায়ণ মন্দির ‘চারধাম’ ও ‘ছোটো চারধাম’ নামে পরিচিত তীর্থগুলির অন্যতম। বদ্রীনাথ মন্দির ‘দিব্য দেশম’ নামে পরিচিত 108 টি বৈষ্ণব তীর্থেরও একটি। 


এই মন্দিরটি  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 3133 মিটার বা 10279' ফুট  উচ্চতায় অবস্থিত।  

মন্দিরের উল্টোদিকে আছে নর পর্বত। অন্যদিকে দেখাযায় নীলকণ্ঠ শৃঙ্গের পিছনে নারায়ণ পর্বত ।


মূল মন্দিরটি তিনটি  অংশে বিভক্ত: 1>গর্ভগৃহ, 2>দর্শন মণ্ডপ ও 3>সভামণ্ডপ।গর্ভগৃহের ছাদটি এক বিশেষ রূপে তৈরি শঙ্কু-আকৃতিবিশিষ্ট। 

এটি প্রায় 15 মিটার / 49 ফুট । এর মাথায় সোনায় গিলটি করা একটি ছোটো গম্বুজ রয়েছে। 

মন্দিরের সামনের অংশ টি পাথরের তৈরি  আর  জানালা  খিলান-আকৃতি বিশিষ্ট। প্রধান প্রবেশপথটিও একটি সুউচ্চ খিলান-আকৃতির দরজা।  চওড়া সিঁড়ি বেয়ে এই দরজার কাছে পৌঁছাতে হয়। প্রধান প্রবেশদ্বার পার হলেই  বৃহদাকার ও স্তম্ভযুক্ত মণ্ডপে উপস্থিত হতে হয়। 

এই মন্ডপ টি  পার হলেই মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে যাওয়া যায়। এই মণ্ডপের স্তম্ভগুলি ও দেওয়ালগুলি সূক্ষ্ম ও সুন্দর কারুকার্য দেখার মতন।


গর্ভগৃহে বদ্রীনারায়ণের 1 মিটার/ 3.3 ফুট উচ্চতার  কষ্টিপাথরের শালিগ্রাম বিগ্রহটি একটি বদ্রী গাছের তলায় সোনার চাঁদোয়ার নিচে রাখা আছে। বদ্রীনারায়ণের মূর্তি উপরের দুই হাত উত্তোলিত অবস্থায় আর সেই হাতে শঙ্খ  ও চক্রধরে আছেন এবং নিচের দুটি হাতে যোগমুদ্রায়  উপবিষ্ট মূর্তির কোলের উপর  রয়েছে।

গর্ভগৃহে বদ্রীনারায়ণ ছাড়াও  কুবের, নারদ, উদ্ধব, নর ও নারায়ণ ঋষির মূর্তি আছে। 

মন্দিরের চারপাশেও অনেক মূর্তি ।

এর মধ্যে আছেন বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী, নারায়ণের বাহন গরুড় ও নবদুর্গার মূর্তি। এছাড়াও মন্দিরে লক্ষ্মী নৃসিংহ এবং আদি শঙ্কর  ও আরও অনেক মন্দির আছে , 

মন্দিরের সকল মূর্তি কষ্টিপাথরে তৈরি।


সময় নির্ঘন্ট::---

প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষভাগ থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ছয় মাস এই মন্দিরটি খোলা থাকে। 



বদ্রীনাথ মন্দিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবটি হল ‘মাতা মূর্তি কা মেলা’। গঙ্গার পৃথিবীতে অবতরণকে স্মরণ করে এই উৎসব পালন করা হয়। বদ্রীনাথ মন্দিরটি উত্তর ভারতে অবস্থিত হলেও এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বা ‘রাওয়াল’রা দক্ষিণ ভারতের কেরল রাজ্যের নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে নির্বাচিত হন।

বদ্রীনাথ ও কেদারনাথ মন্দির কমিটির সদস্যরা রাজ্য সরকারের দ্বারা মনোনীত হন। প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বিষ্ণুপুরাণ ও স্কন্দপুরাণ-এ এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। বদ্রীনাথ মন্দিরের কাছে তপ্তকুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবন আছে।

   

মন্দিরের ঠিক নিচে তপ্তকুণ্ড নামে একটি উষ্ণ গন্ধক প্রস্রবন রয়েছে। এটির ঔষধিগুণ আছে বলে মনে করা হয়। অনেক তীর্থযাত্রী মনে করেন, মন্দিরে যাওয়ার আগে এই কুণ্ডে স্নান করা আবশ্যক। মন্দিরের দুটি পুকুরের নাম নারদ কুণ্ড ও সূর্যকুণ্ড।


আদি শঙ্করাচার্জ 9ম শতাব্দীতে  প্রথম বদ্রীনাথকে একটি তীর্থস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, ৮১৪ থেকে ৮২০ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তিনি এই অঞ্চলে বাস করেছিলেন। বছরে ছয় মাস তিনি বদ্রীনাথে ও বাকি ছয়মাস কেদারনাথে থাকতেন। হিন্দুরা আরও মনে করে যে, বদ্রীনাথের মূর্তিটি তিনিই অলকানন্দা নদী থেকে উদ্ধার করে তপ্তকুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণের কাছে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন।


পথ নির্দেশ::----


 হৃষিকেশ থেকে বদ্রীনাথ মন্দিরের  দূরত্ব 298 কিলোমিটার বা 185 মাইল। 

পথে দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, যোশীমঠ, বিষ্ণুপ্রয়াগ ও দেবদর্শিণী হয়ে হৃষীকেশ এসে 

হৃষীকেশ থেকে বদ্রীনাথ আসতে হয়। 

আবার অন্য পথে

কেদারনাথ থেকে 243 কিমি বা 151 মাইল  দীর্ঘ রুদ্রপ্রয়াগের পথ ধরে 

বা 230 কিমি বা 140 মাইল  দীর্ঘ উক্তিনাথ ও গোপেশ্বরের পথ ধরে বদ্রীনাথ আসা যায়


বিঃ দ্রঃ::-----

ইন্টারনেট থেকে জানতে পারলাম যে

2012 সালে মন্দির কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের জন্য টোকেন ব্যবস্থা চালু করে। দর্শনের সময়-জ্ঞাপক এই টোকেনগুলি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের তিনটি স্টল থেকে পাওয়া যায়। প্রত্যেক ভক্ত 10-20 সেকেন্ড বদ্রীনাথকে দর্শন করার জন্য সময় পান। পরিচয়ের প্রমাণ দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়।

       <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

==========================

             THE END




No comments:

Post a Comment